Home ধর্মতত্ত্ব পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

।। আল্লামা উবায়দুল্লাহ ফারুক ।।

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর খুশীর বার্তা নিয়ে আগমন করে আমাদের মাঝে পবিত্র ঈদুল ফিতর। এই ঈদ মুসলমানদের জন্য আল্লাহর দেওয়া এক অফুরন্ত নিয়ামত। এ দিনে সবার মুখেই থাকে হাসি। চতুর্দিকে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। সবার মন থাকে প্রফুল্ল। ঈদের নামায পড়তে যাই আমরা ঈদগাহে স্ব-স্ব সামর্থ অনুযায়ী সুন্দর সুন্দর পোশাক পরে, আতর মেখে আর টুপি মাথায় দিয়ে। কতই না সুন্দর দেখায় এ দিনে মুসলমানদের। গরীব-ধনী, মুনিব-দাসের মধ্যে এ সময় কোন পার্থক্য থাকে না।

আহা কতইনা সুন্দর দৃশ্য। শুধুমাত্র মুসলিম জাতি ছাড়া কোন জাতি কি এমন দৃশ্য সৃষ্টি করতে পারে? না কখনও পারে না। মানব শ্রেষ্ঠ রাসলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- সব জাতিরই ঈদ বা আনন্দ আছে। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা হল আমাদের আনন্দ আর খুশীর দিন। (মিশ্কাত শরীফ-১/১২৫)।

পূর্ণ একমাস রোযা রেখে আমরা নিজেদেরকে খাঁটি মানব হিসেবে গড়ে তুলি। রোযা শেষে ঈদের দিন থেকেই আমরা রোযার আদর্শে গঠিত জীবন বাস্তবে রূপায়িত করতে সচেষ্ট হই। তাই ঈদ আমাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দিবস। ঈদের মর্যাদা ও আনন্দ দীর্ঘ একমাস রোযা পালনকারী মুসলমানই অনুভব করতে পারে। সুস্থ থেকেও যে ব্যক্তি রোযা পালন করল না, ঈদের আনন্দ তার জন্য নয়। ঈদের মর্যাদাও সে দিতে পারে না। ঈদের দিনে আমরা অসহায়, গরীব-দুঃখীদের মাঝে ফিতরা বিতরণ করা ছাড়া আরও অনেক দান-খয়রাত করি। ধনীরা এ সময় অসহায়দের মাঝে যাকাত আদায় করে। ফলে গরীব-দুঃখীরাও এই আনন্দে শামিল হতে পারে।

ইসলামই আমাদেরকে প্রকৃত শাস্তি দিতে পারে। তাই তো আল্লাহ্ কুরআনে ঘোষণা করেন- ইসলামই একমাত্র আমার মনোনীত ধর্ম। রোযা এবং ঈদ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। রোযাকে বাদ দিয়ে ঈদের কথা কল্পনা করা যায় না। রোযাকে বাদ দিয়ে ঈদের কার্যকারিতাও নেই। সহজে পাওয়ার চেয়ে কষ্ট করে কোন কিছু পাওয়ার গুরুত্ব এবং আনন্দ অনেক বেশী। এ জন্যই কষ্টকর রোযা পালনের পর যে ঈদ আসে, তা আমাদের নিকট এত গুরুত্বপূর্ণ এবং আনন্দের। তবে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, ঈদের আনন্দ করতে গিয়ে যেন আমরা রোযার আদর্শকে ভুলে না যাই। রোযার আদর্শ ভুলে গিয়ে যদি আমরা ঈদের আনন্দটাই মুখ্য হিসেবে গণ্য করি, তাহলে এই আনন্দের কোন সার্থকতা থাকবে না। তখন আমরা আহমক এবং পাপী হিসেবে বিবেচিত হব।

দীর্ঘ একমাস রোযা পালন করে আমরা যে মানবীয় গুণে গুণান্বিত হই, তা আমাদেরকে আগামী দিনে সঠিক পথে পরিচালিত করে। আমরা যদি আন্তরিকভাবে শুধু মাত্র আল্লাহর জন্যই রোযা পালন করতে পারি, তাহলে এটা আমাদেরই সৌভাগ্য। কেননা, রোযা একজন মু’মিনকে পরহেযগার খাঁটি মানব হিসেবে গড়ে তুলে। এমন একজন মুসলমানকে আল্লাহ্ অবশ্যই সাহায্য করেন। তাই তার সঙ্গে শয়তান যুদ্ধ করেও পারে না।

আমাদের কর্তব্য, আমরা যেন ঈদের দিনে রোযার কথা বারংবার স্মরণ করি। কেননা, রোযা আমাদেরকে খাঁটি মানব হিসেবে গড়ে উঠার ট্রেনিং দেয়। রোযা শেষ হওয়ার পর দিন অর্থাৎ ঈদের দিনটা হল রোযার সমাপনী অনুষ্ঠান। এ দিনে আমরা আনন্দ করব। যেহেতু রোযার মাধ্যমে আমরা খাঁটি জীবন গঠনের ট্রেনিং নিয়েছি। ঈদের আনন্দের সাথে সাথে আমাদের চিন্তা করতে হবে, রোযার সব কিছু আমরা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে পেরেছি কি-না। যেহেতু আমরা ইনসান হিসেবে ভুলত্র€টির ঊর্ধ্বে নই। এ জন্য প্রত্যেকেই আপন বিবেকের কাছে প্রশ্ন করলে উত্তর পাব যে, রোযা আমরা যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছি কি-না।

এই ঈদের দিনে আমাদের খুবই সুশৃঙ্খল হতে হবে। এর প্রথম কারণ, ট্রেনিং শেষে যেদিন সমাপনী অনুষ্ঠান, সেদিন যদি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ি, তাহলে প্রমাণিত হবে যে, ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে আমরা কিছুই অর্জন করতে পারিনি। দ্বিতীয়তঃ শুরুতেই যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তাহলে তার শেষও হয় বিশৃঙ্খল অবস্থায়। যা আর নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় না। অপরদিকে শুরুটা যদি সুন্দর হয়, তাহলে শেষটাও সুন্দর হয়। এটাই স্বাভাবিক।

মহান আল্লাহ্ শয়তানকে মাহে রমযানে বন্দী করে রাখেন। এ বন্দী অবস্থায় থেকে শয়তান নানা কৌশল আয়ত্বে আনে। কীভাবে তার প্রতিপক্ষ মানুষকে কুমন্ত্রণা দিয়ে বিপথগামী করা যায়। আর রোযা শেষেই সে আবার মুক্তি পায়। সুতরাং রোযার পর অর্থাৎ ঈদের দিন থেকেই আমাদের সতর্ক হওয়া একান্ত প্রয়োজন। যেন আমরা শয়তানের ফাঁদে না পড়ি। এ জন্যই পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ খুবই সাবধানতা অবলম্বনের মাধ্যমে উপভোগ করতে হবে। আমরা যদি ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে আত্মহারা হয়ে যাই, তাহলে সুযোগ বুঝে দুষ্টু শয়তান অবশ্যই আমাদের ঘাড়ে চেপে বসবে। আমরা যদি আনন্দের সীমা লংঘন করি, তখন শয়তান সেই আনন্দে শামিল হয়ে আমাদের চেতনাকে লুপ্ত করে দিয়ে সর্বনাশ করে দিবে। যেহেতু শয়তান আমাদের শিরায় রক্তের কণায় কণায় মিশে যেতে পারে। সেই দুষ্টু শয়তানের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা পাওয়া খুবই কঠিন। একটু অবহেলা হলে তো আর কথা নেই। সে যে কোন দিক থেকেই আমাদেরকে আক্রমণ করবে। তাই আল্লাহ্ তাআলা ঘোষণা করেছেন- শয়তান মানব জাতির জন্য প্রকাশ্য দুশমন। (সরা ইউসুফ- ৫)। শয়তান তোমাদের জন্য প্রকাশ্য চরম শত্র€। (সরা ইয়াসীন)।

শয়তান কি পরিকল্পনা নিয়ে আমাদেরকে আক্রমণ করবে, তা আল্লাহ্ তাআলা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন- সে (শয়তান) বল্ল, যেহেতু আপনি (আল্লাহ্) আমাকে গোমরাহ্ করলেন, আমি শপথ করছি যে, আমি তাদের (ক্ষতির) জন্য আপনার সকল পথে বসব, অতঃপর তাদের উপর আক্রমণ চালাব তাদের সম্মুখ, পশ্চাৎ, ডান, বাম দিক হতে। (সরা আ’রাফ- ১৬, ১৭)। হাদীসে আছে, নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের শিরায় রক্তের কণায় কণায় মিশে চলতে পারে। (মিশ্কাত শরীফ-১/১৮)। অন্য এক হাদীসে আছে, এমন কোন সন্তান নেই, যাকে শয়তান জন্ম নেওয়ার সময় স্পর্শ করেনি (অর্থাৎ সন্তান জন্ম নেওয়ার পরপরই শয়তান তাকে স্পর্শ করে) সেই শয়তানের স্পর্শের কারণে সন্তান চিৎকার করে ক্রন্দন শুরু করে। কিন্তু হযরত মরিয়ম (আ.) এবং তার সন্তানকে শয়তান স্পর্শ করতে পারেনি। (মিশ্কাত শরীফ-১/১৮)।

এই শয়তান সব সময় যে কোন দিক থেকেই আমাদেরকে আক্রমণ করার চেষ্টায় আত্মনিয়োজিত থাকে। যেহেতু সে ঈদের দিন থেকেই মুক্ত হয়ে যায়, তাই সেদিন থেকেই আমাদের সচেতন হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

ঈদের দিনটা যেমন খুশীর দিন তেমনি ঈদটা অপর দিকে চিন্তার দিনও। ঈদটা কেন খুশীর দিন, তা তো পূর্বে বলা হয়েছে। কিন্তু চিন্তার দিন কেন? মাহে রমযান একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। রমযান চলে যাওয়ার পরেই আসে পবিত্র ঈদ। একজন খাঁটি মু’মিন বান্দা মাহে রমযানকে নিজের প্রাণের চেয়েও অধিক ভালবাসেন। এমন এক ভালবাসার বস্তু হারাতে হয় রোযা শেষে এই ঈদ এলে। একজন মু’মিনের নিকট এই হারানোর ব্যথাটা খুবই তীব্র। কারণ এই রোযার উসীলায় একজন মুসলমান তার চরিত্রকে সুন্দর পবিত্র করে, সে দীর্ঘ একটি মাসে বিশেষ বিশেষ ইবাদত করে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে চলাচল করে। সে রোযার বদৌলতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আত্মশুদ্ধি তথা তাক্বওয়া সৃষ্টির দীর্ঘ মেয়াদী প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপ্তি হয় ঈদ এলে।

একই সাথে বিগত কাজের দুর্বলতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে আগামী এগারটি মাসে প্রশিক্ষণ লব্ধ অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে কাজে লাগানোর এক সফল অনুষ্ঠান হয় এই ঈদে। এই ঈদ মুসলমানদের জন্য অতি গুরুত্ববহ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। ঈদুল ফিতরের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা পরস্পরের শুভেচ্ছা, আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা বিনিময়ের মাধ্যমে মানবিক ও সামাজিক সুসম্পর্ক সংহত করার লক্ষ্যে পরিচালিত। আর এটাই হল ঈদুল ফিতরের সামাজিক তাৎপর্য। সমগ্র বিশ্বের প্রত্যেক মুসলমান যাতে ঈদুল ফিত্রে আনন্দ উপভোগ করতে পারে, সে জন্য এ মাসে বেশী হারে দান-খয়রাত, যাকাত ও ফিতরা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। এটা হল ঈদুল ফিতরের অর্থনৈতিক তাৎপর্য। ইসলাম যে সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দান করেছে, ঈদুল ফিতরের আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমেও তার প্রকাশ লক্ষ্যণীয়। ধনী-গরীব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাদা-কালো নির্বিশেষে একই কাতারে মিলিত হওয়া মানব সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন।

আসলে পবিত্র রমযানের সিয়াম সাধনা কবুল হওয়ার মধ্যেই ঈদের যথার্থ আনন্দ নিহিত। এ আনন্দ কোন মুসলমান একা ভোগ করতে পারে না। কারণ, ঈদের তাৎপর্য অনেক অনেক মহিমান্বিত। প্রথমে আমাদের জানতে হবে, ঈদুল ফিতরের অর্থ কি? ‘ঈদ’ অর্থ খুশী এবং ফিতর এসেছে ফিতরা থেকে। সুতরাং ঈদুল ফিতরের অর্থ দাঁড়ায় দান-খয়রাতের মাধ্যমে পবিত্র ঈদের উৎসবকে সুখ ও আনন্দে উদ্ভাসিত করে তুলা। যাকাত-ফিতরার মাধ্যমে ধনী ও গরীবের মধ্যকার ভেদাভেদ দরীভূত হয়। আর এতেই হয় মুসলিম হৃদয় উদ্বেলিত।

অথচ আজকের মুসলিম সমাজে আমরা দেখতে পাই, আমরা আসলে ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য থেকে অনেক দরে সরে যাচ্ছি। কলহ-বিবাদ, হিংসা-বিদ্বেষের ফলে গোটা সমাজ তলিয়ে যাচ্ছে। তাই বর্তমান ঈদ নামে মাত্র আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়ে গেছে। সমাজের সর্বস্তরে কৃচ্ছতা সাধনের নামে চলছে অপব্যয়ের হোলি খেলা। অথচ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেন- অপব্যয়ীরা শয়তানের ভাই। ঈদের বাজারের দিকে তাকিয়ে দেখুন না! বিশেষ করে পুরুষের তুলনায় মেয়েরাই এ ব্যাপারে অধিক অগ্রগামী। এদেশের অধিকাংশ শহরে মহিলারা নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে ক্রমশ অন্ধকারের মাঝে তলিয়ে যাচ্ছে।

শহরের অলিগলিতে আজ বিউটি পার্লারের রমরমা ব্যবসা। তাই ঈদে আমরা দেখতে পাই অসহনীয় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে কে কার চেয়ে অধিক মুল্যবান পোশাক আশাকে সুসজ্জিত হয়ে সকলের দৃষ্টিতে আকর্ষণীয় হয়ে উঠলেন। পুরুষরাও এ ব্যাপারে পিছপা হন না। আমরা ঈদের মত একটি পবিত্র ও মহিমান্বিত উৎসবকে কলুষিত করে ফেলছি নানাভাবে। কারণ, ইসলাম ধর্মে অপব্যয় এবং বাড়াবাড়িকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ঈদুল ফিতরের যথার্থ শিক্ষা আমাদের জীবনে বাস্তবায়িত করে এই ধরাধামকে শাস্তির নীড়ে পরিণত করতে সকলকে সচেষ্ট হতে হবে। মহান দয়ালুর দরবারে দোয়া করি, যেন আল্লাহ্ আমাদেরকে তেমন ঈদ পালনের তাওফীক দান করেন। যেদিন সমগ্র পৃথিবীর মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি সদস্য এ উৎসবে মুখর হয়ে উঠতে পারবে। সমাজ থেকে যাবতীয় অসঙ্গতি দর হোক, হাইজ্যাক, খুনাখুনী, মারামারি, হিংসা-বিদ্বেষ, সন্ত্রাস, বিবাদ-বিসংবাদ এবং অনৈক্যের অবসান হোক, এটাই আজ ঐকাস্তিক মুনাজাত। আমীন॥

লেখক পরিচিতি: শায়খুল হাদীস- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা-ঢাকা, সাংগঠনিক সম্পাদক- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ এবং গবেষক ও বক্তা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.