Home শীর্ষ সংবাদ বসুন্ধরা, রামপুরা ও শাহবাগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের দিনভর সংঘর্ষ

বসুন্ধরা, রামপুরা ও শাহবাগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের দিনভর সংঘর্ষ

0
বসুন্ধরা, রামপুরা ও শাহবাগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সাথে দিনভর সংঘর্ষ হয়। ছবি- সংগৃহীত।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নবম দিনে রাজধানীর শাহবাগ, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, রামপুরা-আফতাব নগরের ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি হয়ে উঠে রণক্ষেত্র। শিক্ষার্থীদের ওপর কোথাও পুলিশ টিয়ারশেল-রাবার বুলেট নিক্ষেপ এবং কোথাও পুলিশের উপস্থিতিতে ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গতকাল শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও পুলিশের মধ্যে দিনভর চলে হামলা পাল্টা হামলা, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। এসব ঘটনায় পুলিশ এবং সাংবাদিকসহ অর্ধশত আহত হয়। পুলিশ কয়েকজনকে আটকও করেছে।

গতকাল (৬ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হঠাৎ দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। এতে দিনভর থেমে থেমে সংঘর্ষ ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীর জানায়, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ঢুকে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা হামলা করলে শিক্ষার্থীরা পাল্টা ইটপাটকেল ছোঁড়ে। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভিতরেই মিছিল করলে বাইরে থেকে পুলিশ টিয়াশেল মারে। দুপুরে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নার্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের সতর্ক অবস্থানের মধ্যেই শিক্ষার্থীরা মিছিল করলে তাদের ওপর হামলা করে স্থানীয় ছাত্রলীগ-যুবলীগ। তারা বসুন্ধরার গেটের ভেতরে ঢুকে পড়লে ভিতর থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলে শিক্ষার্থীরা। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, পুলিশী প্রহরায় ছাত্রলীগ-যুবলীগ শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ করলে গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে শাহবাগে অবস্থান করতে গেলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে পুলিশ গরম পানি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শিক্ষার্থীদের ওপর। তখন শাহবাগও রণক্ষেত্রে রূপ নেয়।

বসুন্ধরা স্পট:
রাজধানীর বসুন্ধরায় অবস্থিত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিসহ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গতকাল পুলিশ-ছাত্রলীগ-যুবলীগ-শ্রমিকলীগের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ ও সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে এ সময় গুলিও ছুড়ে। এ সময় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে পুলিশ বেশ কিছু টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে পুরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকালে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বেসরকারি নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় বেরিয়ে আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রগতি সরণিতে অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ধাওয়া দেয়। এরপর শিক্ষার্থীরা বসন্ধুরা আবাসিক এলাকার ভেতরে অবস্থান নেন। অন্যদিকে পুলিশ বাইরের সড়কে অবস্থান নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানিয়েছেন, ওই এলাকায় গাড়ি বের হলেই ছাত্রলীগ এবং শ্রমিকলীগের কর্মীরা অবস্থান নিয়েছে। তারা ভাঙচুর করেছে। সংবাদকর্মীরা ছবি নিতে গেলে তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়। উভয়পক্ষে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সড়কের আশপাশের দোকানপাটও বন্ধ হয়ে যায়। পরে দুপুর দেড়টার দিকে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হয়ে পুলিশকে ধাওয়া করে। বিকেল পর্যন্ত চলে থেমে থেমে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। সংঘর্ষের সময় পুলিশ টিয়ার সেল ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে এতে ১০ শিক্ষার্থী আহত হন বলে জানা গেছে।

নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ বিভাগের প্রধান বেলাল আহমেদ বলেন, পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা ছাড়াও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও রয়েছে। বিকেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

ভাটারা থানার ওসি কামরুজ্জামান বলেন, বসুন্ধরা এলাকায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের সড়কে কিছু শিক্ষার্থী নেমেছিল। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল মারে। এরপর পুলিশ তাদের সরাতে টিয়ারশেল ছুঁড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভেতরে অবস্থান নেয়। পুলিশও অন্যদিকে অবস্থান নিয়েছে। পরিস্থিতি বর্তমানে থমথমে বিরাজ করছে। পুলিশ সাঁজোয়া যান নিয়ে বাইরে অবস্থান করছে।

রামপুরা-আফতাবনগর স্পট:
গতকাল সোমবার সকালে ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রামপুরা ব্রিজের পাশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে অবস্থান করতে চাইলে পুলিশ তাদেরকে বাধা দেয়। এ সময় ছাত্র ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ চরম আকার ধারণ করে। ক্যাম্পাসে শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মীরা ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। তারা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে ভেতর থেকে শিক্ষার্থীরাও পাল্টা ইটপাটকেল ছুঁড়ে মারে। এদিকে যুবলীগের হেলমেট বাহিনী প্রথম আলো’র স্টাফ রিপোর্টার নাসরিন আক্তারকে হেনস্থা করে। সংঘর্ষ চলাকালে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ অবস্থান কর্মসূচি রত ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত শিক্ষার্থীকে আটক করে। আটককৃতদের মধ্যে পাঁচজন ছাত্র ও দুইজন ছাত্রী রয়েছে। বিকেল পর্যন্ত পুলিশ ও শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মীদের সাথে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ চলে। আফতাব নগরে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির জনসংযোগ কর্মকর্তা মহিউদ্দিন বলেন, সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার দিকে বাইরের কিছু ছেলে হঠাৎ ক্যাম্পাসের গেটের বাইরে থেকে ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের ধাওয়া করলে পালিয়ে যায়। এরপর ছাত্ররা বাইরে মিছিল করলে পুলিশ টিয়ারশেল ছোঁড়ে। পরে ছাত্ররা ভেতরে চলে অসে। পুলিশ বাইরে অবস্থান করছে।

বাড্ডা জোনের সহকারী কমিশনার আশরাফুল করির বলেন, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে গুলশান পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শাহানুল, ভাটারা থানার ওসি মো. কামরুজ্জামান ও কনস্টেবল আব্দুর রউফ আহত হয়েছেন। গুলশান বিভাগের এডিসি আব্দুল আহাদ জানান, পুলিশের ওপর হামলা করার কারণে অনেককে আটক করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা বলা যাচ্ছে না। তাদের সবাইকে থানায় পাঠানো হয়েছে।

শাহবাগ স্পট:
নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলমান ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলে জলকামানসহ লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এতে প্রায় বিশজনের মতো শিক্ষার্থী আহত এবং তিনজন শিক্ষার্থী গ্রেফতার হয় বলে আন্দোলনকারীরা জানায়।

এর আগে গতকাল দুপুরে কালো কাপড়ে লিখিত ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ ব্যানারে প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ হতে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে। পরে মিছিলটি রাজু ভাস্কর্য হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাহবাগ থানার সামনে পৌঁছালে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। পুলিশের বাধার মুখে শিক্ষার্থীরা সেখানে দাঁড়িয়েই স্লোগান দিতে থাকে। সে সময় পুলিশ জলকামান দিয়ে শিক্ষার্থীদের ছাত্রভঙ্গ করতে ব্যর্থ হলে একপর্যায়ে তাদেরকে লক্ষ্য করে টিয়ারগ্যাস ছুঁড়ে এবং লাঠিচার্জ করে। ফলে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং টিএসসির দিকে হটতে থাকে। পুলিশের এই হামলার সময় আন্দোলনকারীরাও পাল্টা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে এক পুলিশ সদস্য আহত হয় বলে জানা যায়।

ডিএমপির রমনা জোনের ডিসি মারুফ হোসেন সরদার সাংবাদিকদের জানান, শাহবাগ এলাকায় দুটি বড় বড় হাসপাতাল রয়েছে। আমরা সবসময় চেষ্টা করি এ জায়গায় যাতে কোনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি না হয়। এ কয়েক দিন আপনারা দেখছেন আমরা নিশ্চুপ ছিলাম। আজকে সকাল থেকে আমরা এখানে আছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে একদল শিক্ষার্থী শাহবাগের দিকে আসে। আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি। এরপর আমরা জলকামান ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেই। তারা ক্যাম্পাসে চলে গেছে। এ সময় আমাদের কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। কয়জনকে আটক করা হয়েছে।

মিরপুর স্পট:

মিরপুর-১০ নম্বর ও আশপাশের এলাকায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়নি গতকাল। তবে সকাল থেকে সেখানে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে থাকে। রাস্তায় নামানো হয় জলকামান-সাঁজোয়া যান। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছোট একটি মিছিল করার পর এলাকাতেই অবস্থান নেয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.