Home আন্তর্জাতিক আসামের মুসলমানদের নিয়ে নতুন চক্রান্ত: বাদ পড়াদের নাগরিকত্ব প্রমাণ আরো কঠিন হবে

আসামের মুসলমানদের নিয়ে নতুন চক্রান্ত: বাদ পড়াদের নাগরিকত্ব প্রমাণ আরো কঠিন হবে

0

।। এম. নুরুন্নবী ।।

আসামের রাজনীতিতে এনআরসি নিয়ে এখনও উত্তাল অবস্থা বিরাজ করছে। বিশেষ করে নাগরিকত্বের ভিত্তি হিসেবে আগে থেকেই বিবেচিত হওয়া পাঁচটি নথি বাদ দিয়ে দেয়ার ফলে এনআরসি’র বাইরে থাকা ৪০ লক্ষ মানুষ নতুন করে চাপের মধ্যে পড়ে গিয়েছেন। আগামী ২৮শে অক্টোবর বাদ পড়া পাঁচটি নথি নিয়ে আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পূর্ব থেকে যারা আসামে বসবাসকারী-তারাই আসামের প্রকৃত নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পূর্ব থেকে বসবাসের প্রমাণ হিসেবে ১৫টি নথিকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছিল, যে ১৫টি নথির যে কোনো একটি কারো কাছে থাকলেই প্রমাণিত হবে যে ঐ ব্যক্তি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পূর্ব থেকে আসামে বসবাস করে আসছিলেন। এইসব নথির ভিত্তিতে খসড়া নাগরিক তালিকায় আসামের ২ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষের নাম নথিভুক্ত হয়েছিল।

তবে এনআরসি প্রধান প্রতীক হাজেলার আবেদনের ভিত্তিতে আকস্মিকভাবে ১৫টি নথির মধ্যে ৫টি নথিকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এই পাঁচটি নথির একটি হচ্ছে ১৯৫১ সালের এনআরসি তালিকা। আসামের অনেক গরীব মুসলমান আছেন, যাদের ১৯৭১ সালের পূর্ববর্তী সময়ের শিক্ষাগত কোনো সার্টিফিকেট নেই, নিজেদের নামে সেই সময়ের কোনো জায়গা-জমির দলিলও নেই, কেবলমাত্র ১৯৫১ সালের এনআরসি তালিকায় নিজেদের নামটিই তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণের একমাত্র দলিল। আকস্মিকভাবে এই নথিটিকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করায় বাদ পড়া বাঙ্গালী মুসলমানদের জন্য নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করাটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

আসাম রাজ্যের ৩ কোটি ২৯ লক্ষ বাসিন্দার মধ্যে খসড়া তালিকায় নাম উঠেছে ২ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষের, বাদ পড়েছে ৪০ লক্ষ মানুষ। যদিও প্রকাশিত তালিকাটি খসড়া তালিকা এবং বাদ পড়া মানেই বহিরাগত এটি বলার কোনো সুযোগ নেই, তারপরেও বাদ পড়া মানুষের মাঝে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

তবে বাদ পড়াদের মাঝে ৮০% হচ্ছেন এমন মানুষ যাদের পরিবারের অন্য কোনো না কোনো সদস্যের নাম তালিকায় রয়েছে। অর্থাৎ বাদ পড়া এইসব মানুষের কারো মা, কারো বাবা কিংবা কারো ভাই-বোন ইতিমধ্যেই খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

তারপরেও নিজেদের ছোটখাটো কোনো ভুলের কারণে খসড়া তালিকায় তাদের নাম আসেনি। অর্থাৎ এই ৮০% মানুষই ভবিষ্যতে নতুন নথিপত্র জমা দিলে ভুল সংশোধন করে চূড়ান্ত তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হবে।

বাকি ২০% মানুষের মধ্যে ১% হচ্ছে বাঙ্গালী মুসলমান যাদের পুরো পরিবারই খসড়া তালিকার বাইরে রয়েছে, এবং বাকি ১৯% হচ্ছে বাঙ্গালী এবং নেপালী হিন্দু। তবে ভারতীয় মিডিয়াগুলো অনবরত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন যে, বাদ পড়া এই ৪০ লক্ষ মানুষেরা সবাই বহিরাগত বাংলাদেশি মুসলিম।

১৮২৬ সালে আসাম তৎকালীন বার্মা থেকে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়, এবং এটিকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সাথে সংযুক্ত করা হয়। ১৮৭৪ সালে আসামকে বেঙ্গল থেকে আলাদা করে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ করা হয়।

ঘন বনজঙ্গল এবং পাহাড় পরিবেষ্টিত হওয়ায় সেখান কৃষিকাজের সুযোগ তুলনামূলকভাবে অনেক কম ছিল, এবং কৃষিকাজের উপযোগী না হওয়াতে এই অঞ্চল থেকে ব্রিটিশদের খাজনা উত্তোলনের হারও কম ছিল। এই সমস্যার সমাধানে ব্রিটিশরা দু’টি উদ্যোগ গ্রহণ করে।

প্রথমত, তারা বেঙ্গলের সিলেট-বরাক অঞ্চলকে এবং রংপুরের পার্শ্ববর্তী বৃহত্তর গোয়ালপাড়া অঞ্চলকে আসামের সাথে সংযুক্ত করে দেয়। দ্বিতীয়ত, তারা বেঙ্গল থেকে কিছু গরীব কৃষককে বনজঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদের জন্য মধ্য আসামে নিয়ে সেটল করে। মূলত বরাক অঞ্চল এবং গোয়ালপাড়া অঞ্চল বেঙ্গল থেকে আসামের সাথে দিয়ে দেয়ার কারণে আসামে ভাষাগত দিক থেকে বাঙ্গালী এবং ধর্মীয় দিক থেকে মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত অনেক বেড়ে যায়।

এই দু’টি অঞ্চলকে আসামের সাথে সংযুক্ত করে দেয়া এবং বেঙ্গল থেকে কৃষকদের সেখানে গিয়ে সেটল করবার কারণে স্থানীয় ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর মাঝে এক ধরণের বাঙ্গালী বিদ্বেষের জন্ম হয়, এবং তারা মনে করতে থাকে বাঙ্গালীদের কারণে তারা একসময় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে। যদিও আসামের ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীরাও কেউ তিব্বত, কেউ বার্মা সহ নানা জায়গা থেকে এসে এখানে নিজেদের বসতি স্থাপন করে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গঠিত হবার পর পূর্ব পাকিস্তানে নতুন নতুন কলকারখানা এবং নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশ থেকে বাঙ্গালী মুসলমানদের আসামে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, বরং আসামে সেটল হওয়া কৃষকদের একটি অংশ বাংলাদেশে ফিরে চলে আসে।

১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বৃদ্ধি পায়। ফলে বাংলাদেশ যখন আসামসহ বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী ভারতের যেকোনো রাজ্যের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে, তখন বাংলাদেশ থেকে আর কোনো বাঙ্গালী মুসলমানের আসামে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা থাকে না।

তবে ৪৭-পরবর্তী সময়ে এমনকি ৭১-পরবর্তী সময়েও বাঙ্গালী হিন্দুদের একটি অংশ উন্নততর জীবনের আশায় কিংবা স্থানীয় রাজনীতিবিদদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে কিংবা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে বসবাসের আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামে মাইগ্রেট করতে থাকে।

এদের মধ্যে ৪৭-পরবর্তীতে আসামে যাওয়া হিন্দুরা আসামের স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে বিবেচিত হলেও ৭১-পরবর্তীতে যাওয়া হিন্দুরা ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তির আলোকে বহিরাগত হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

খসড়া তালিকা প্রকাশ হবার আগ পর্যন্ত মুসলিমবিদ্বেষী নানা প্রোপাগান্ডার কারণে ধারণা করা হতো যে, আসামের মুসলিম মাত্রই বহিরাগত এবং বাংলাদেশি। সে কারণে আসামের ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর সাথে বাঙ্গালীদের যে সব দাঙ্গা হয় তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভিকটিম ছিল বাংগালী মুসলমানেরা। বিজেপি ক্ষমতাসীন হবার পর বাঙ্গালী বনাম অসমীয়া দ্বন্দ্বকে হিন্দু বনাম মুসলিম দ্বন্দ্বে পরিণত করা হয়।

বাঙ্গালী হিন্দুরা এবং ট্রাইবাল হিন্দুরা (অসমীয়া হিন্দু) উভয়েই মুসলমানদেরকে বহিরাগত অপবাদ দিতে থাকে। তবে খসড়া তালিকা প্রকাশের পর পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। আসামে বসবাসরত ১ কোটি ২০ লক্ষ মুসলমানের মাঝে ১ কোটির অধিক মুসলমানের নাম খসড়া তালিকায় আসে। বাকিদেরও অধিকাংশের পরিবারের কোনো না কোনো সদস্যের নাম খসড়া তালিকায় আছে। অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে চলা অপবাদ থেকে মুসলমানেরা অনেকটা মুক্ত হয়।

এখন বরং দেখা যাচ্ছে, বহিরাগত অভিযোগের তীর মূলত বাঙ্গালী হিন্দুদের দিকে। বাঙ্গালী হিন্দুদের কেউ কেউ এখন পুরো এনআরসি প্রক্রিয়াটি বাদ দেবার দাবী জানাচ্ছেন। অন্যদিকে, বাঙ্গালী হিন্দুরা তাদের জন্য ১৯৭১ এর পরিবর্তে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আগতদের আসামের নাগরিকত্ব তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করবার দাবী জানাচ্ছেন। তবে ট্রাইবাল হিন্দুরা (বা অসমীয়া হিন্দুরা) বাঙ্গালী হিন্দুদের এই দাবী মানতে নারাজ।

তারা ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চকেই নাগরিকত্বের ডেডলাইন হিসেবে মনে করেন। অন্যদিকে বাঙ্গালী হিন্দুরা বাঙ্গালী মুসলমানদেরকে ২০১৬ সালের নাগরিক বিলে সমর্থন জানানোর জন্য রাজী করাতে চেষ্টা করছেন। তবে বাঙ্গালী মুসলমানদের কাছে ২০১৬ সালের নাগরিক বিলের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ১৯৫১ সালের এনআরসি তালিকাকে নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি হিসেবে পুনরায় স্থাপিত করা।

আসামের সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা, অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমক্র্যাটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ প্রধান) ও এমপি বদরুদ্দীন আজমল বাদ পড়া ৪০ লক্ষ মানুষের মধ্যে যারাই ১৯৭১ সালের পূর্ববর্তী সময় থেকে আসামে বসবাস করে আসছেন, তারা হিন্দু হোক কিংবা মুসলিম তাদের জন্য আইনী লড়াই চালিয়ে যাবার ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি, বাদ পড়া পাঁচটি নথিকে বিশেষ করে ১৯৫১ সালের এনআরসি তালিকা এবং ১৯৭১ সালের পূর্বের শরণার্থী সার্টিফিকেটকে ফের নাগরিকত্বের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য আইনী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

লেখক: ইন্ডিপেন্ডেন্ট রিসার্চার, বেঙ্গল হিস্ট্রি এন্ড কালচার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.