Home ওপেনিয়ন ডাকসু নির্বাচনে ইসলামি সংগঠন নিয়ে আপত্তি ভিত্তিহীন, এক বিদ্বেষ মাত্র

ডাকসু নির্বাচনে ইসলামি সংগঠন নিয়ে আপত্তি ভিত্তিহীন, এক বিদ্বেষ মাত্র

0

।। গৌতম দাস ।।

‘প্রগতিশীলতার’ ইসলামবিদ্বেষ সমস্যা এবার অনেকটা হাতেনাতেই ধরা পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের আয়োজন চলছে। সেটা ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মত হয় কী না তা অনেকেরই শঙ্কা। সে শঙ্কা থাক। কিন্তু এই আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রগতিশীলদের জ্ঞানবুদ্ধির দৌড়, খামতি উদাম হয়ে গেছে। তারা চিন্তায় কত খাটো আর অস্পষ্ট তা আমরা সবাই জানলাম।

এই নির্বাচনে আরও সবার মত ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাও অংশ নিতে ইচ্ছুক। প্রথম আলো ২৪ জানুয়ারিতে লিখেছে, “ডাকসু নির্বাচনে নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে মঙ্গলবার বিক্ষোভ করেছিল। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম ছাত্র সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলছে এ ঘটনা তাদের হতবাক করেছে”।

কেন? তাদের হতবাক হওয়া কেন? অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, যেন নমশুদ্র নিচুজাতের কেউ বামুনের রান্নাঘরের আঙিনায় ঢুকে পড়েছে! তাই কী? দলের নামের আগে “ইসলামী” লেখা আছে, এটাই কী প্রগতিবাদী আপত্তির কারণ?

তাদের এমন বক্তব্যের পিছনে দুইটা খামতি বা অভাবের দিক আছে। এক, রাষ্ট্র, ক্ষমতা আর কনষ্টিটিউশন সম্পর্কে সীমাহীন অজ্ঞাত থাকা। আর দুই, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের গভীর ইসলামবিদ্বেষ।

কনষ্টিটিউশন কী কাজে লাগে? খায় না মাথায় দেয়? মূলত প্রাকটিসিং কমিউনিস্ট চিন্তায় এই ব্যাপারটা একেবারেই অস্পষ্ট, অপরিস্কার। এমনকি নতুন কোন কমিউনিস্ট রাষ্ট্র কায়েম হলে তাদেরও “বুর্জোয়া” রাষ্ট্রের মত কোন কনষ্টিটিউশন থাকে কিনা; তা গঠন-রচনা করতে বসতে হয় কীনা – এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে অনেক তাবড় নেতা মাথা চুলকাতে থাকবে, জানি। মুখে জবাব আসবে না।

প্রগতি-ওয়ালাদের অজুহাত হল, প্রথম আলো লিখেছে, প্রগতি “সংগঠনগুলো বলছে,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল কর্মসূচি পালন করতে পারবে না বলে অলিখিতভাবে নিয়ম রয়েছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় সবগুলো ছাত্র সংগঠন ও প্রশাসনের সমন্বয়ে গঠিত পরিবেশ পরিষদের বৈঠকে তাঁরা এ বিষয়ে একমত হয়েছিলেন”।

লিখিত, অলিখিত বা গোপন তাদের চিন্তায় এটা যেখানেই থাক – এমন নিয়ম যেকোন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন বিরোধী।

ব্যাপারটা হল, একটা দলের নামে ইসলাম থাকা সত্বেও সেই দল দেশের মর্ডান রিপাবলিক ধরণের কনষ্টিটিউশন মেনে রাজনীতি করতে চাইছে – অথচ প্রগতিবাদীদের মন ভরছে না। দুঃখের কথা তাদের ইসলামবিদ্বেষ উদাম হয়ে উপচায়ে উঠছে! কারণ আপত্তি কী করে তুলতে হয় বা নিরসন করতে হয় এটা তাদের জানা নাই। ফলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে যেন তাদের রাজনীতি করতে তারা ইসলামি দলের কাছে দাবি করছে।

আচ্ছা, বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোর বা মাদ্রাসাভিত্তিক ছাত্র সংগঠনগুলোও কোনভাবে এক ভিসিকে হাত করে আর একটা “পরিবেশ পরিষদের বৈঠক” আয়োজন করে ফেলে এরপর তাঁরা যদি এ বিষয়ে একমত হয় যে প্রগতি-সংগঠনের ততপরতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলবে না – তাহলে কী হবে? ব্যাপারটা কেমন হবে? হজম হবে?

অনুমান করি এমন হলে ব্যাপারটার শেষে গড়াবে মানে আসল ফয়সালা হবে লাঠালাঠি-মারামারির গায়ের জোর দিয়ে। না, ভয় পাবার কিছু নাই, লাঠির জোরের ফয়সালার পরামর্শ দেওয়া আমাদের কাজ না। বরং বলার বিষয় হল, তার মানে একখানা নিজ নিজ প্রভাবাধীন “পরিবেশ পরিষদ” এই বিতর্ক মীমাংসার আসল অথরিটি নয়। “পরিবেশ পরিষদ” এই বিতর্ক নিরসনের কর্তা বা প্রতিষ্ঠান নয়।

বলাই বাহুল্য, কোন আইডিওলজি ভাল, “আগায় আছে মানে প্রগতিশীলতার” দাবিদার এই ভিত্তিতে অথরিটি ঠিক হয় না। তা কার্যকর করাই যায় না। আচ্ছা, করলে কী হবে? করলে সেটা আর যুক্তিবুদ্ধি বা চিন্তার ভিত্তিতে অথরিটি কে তা সাব্যস্ত হবে না, হবে লাঠির জোরে।

তাহলে মূল যে প্রশ্নের জবাব পেতে হবে তা হল, কোন “পরিবেশ পরিষদের” সিদ্ধান্ত ইসলামি অথবা প্রগতিবাদী নির্বিশেষে সকলের কাছে মান্য হবে? অর্থাৎ নিজ নিজ প্রভাবাধীন এক একটা “পরিবেশ পরিষদের” দাবিদার হওয়া কাজের পথ নয়। বরং এর সরল জবাব হল যে “পরিবেশ পরিষদ” কনষ্টিটিউশন মেনে, অনুসরণ করে তৈরি হতে হবে। আমরা আরও আগাতে পারি। জেনে নিতে পারি কোন বৈশিষ্ঠের কনষ্টিটিউশন?

স্বাধীন মন বা চিন্তার দিক থেকে কথা বললে, আমাদের প্রচলিত কনষ্টিটিউশন আমরা কেউ নাও মানতে পারি, যদিও আইনি বাধ্যবাধকতার দিক থেকে আমরা তা মানতে বাধ্য। তাই প্রশ্নের জবাবটা সাধারণভাবে দিব। কনষ্টিটিউশন ‘রিপাবলিক’ বৈশিষ্ঠের এমন হতে হবে। আর এছাড়াও গুরুত্বপুর্ণ হল যা নাগরিক-সাম্য ও ইনসাফের ভিত্তিতে রচিত। এমন কনষ্টিটিউশন মেনে বা এর কথা মাথায় রেখে ‘পরিবেশ পরিষদ’ বানালে তা সব পক্ষই সহজে মেনে নিবে।

রিপাবলিক বৈশিষ্ঠের মানে হল যা কোন রাজা-সম্রাটের রাষ্ট্র নয়, যা কোন এক কর্তৃত্ববাদী, একনায়ক স্বৈরাচার বা ফ্যাসিজমের রাষ্ট্র নয় বা এর কনষ্টিটিউশন নয়। নাগরিক গণস্বীকৃতির রাষ্ট্রই রিপাবলিক রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতার উৎস পাবলিক, ফলে যা নাগরিকের গণস্বীকৃত ক্ষমতা। পাবলিক যে ক্ষমতাকে অনুমোদন করে।

এছাড়া নাগরিক-সাম্য কথাটার মানে হল, নাগরিক পরিচয় নির্বিশেষে আপনি ইসলামি হন কী প্রগতিবাদী বা পাহাড়ি-সমতলি, কোন বিশেষ ফ্যাকড়ার ইসলাম বা অন্য যা কিছু হন না কেন সকল নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্যহীন আচরণ করবে, সমানভাবে আইন প্রয়োগ করবে – এই ভিত্তির রাষ্ট্র।

তাহলে সারকথা দাড়াল যে নিজ নিজ প্রভাবাধীন “পরিবেশ পরিষদের” দোহাই দিয়ে কারও রাজনৈতিক ততপরতা নিষিদ্ধ বলা যাবে না। এটা কোন পথ নয়। কারণ তাতে মানে হয়ে যাবে যেন আওয়ামি লীগকে বলা যে তাকে বিএনপির রাজনীতি মেনে রাজনীতি করতে হবে। অথবা উলটা। মানে, বিএনপিকে বলা যে তাকে লীগের রাজনীতি করতে হবে।

বরং ডাকসু নির্বাচনে দাঁড়াতে গেলে ছাত্র সংগঠনগুলোকে নুন্যতম কী বৈশিষ্ঠের হতে হবে – সেই নির্ণায়ক শর্ত বা ক্রাইটেরিয়া আগে বলে রাখতে হবে। যেসব ছাত্র সংগঠন সেসব শর্ত পুরণ করবে তারা সবাই নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। ঠিক যেমন নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলের রেজিষ্ট্রেশনের শর্ত আরোপ করে, অনেকটা সেরকম। তবে স্বভাবতই আমাদের কনষ্টিটিউশনে যা কিছু অনুমোদিত এর বাইরে গিয়ে কোন শর্ত আরোপ করা যাবে না। মোট কথা রিপাবলিক বৈশিষ্ঠ আর নাগরিক-সাম্য ও ইনসাফের ভিত্তি এসবের মধ্যেই থাকতে হবে সব শর্তকে। এসব শর্ত মেনেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন করে থাকে।

ঠিক সেরকম এমন শর্ত মানলেই যে কোন ছাত্র সংগঠন ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। তাতে সে সংগঠনের নামের মধ্যে ইসলাম থাকুক বা না থাকুক কিংবা কমিউনিস্ট থাকুক কি সেকুলার – কিছু এসে যাবে না। কাউকে আর বাধা দেয়া যাবে না।

আসলে রাষ্ট্র প্রসঙ্গে যথেষ্ট স্টাডি না থাকার কারণে বরং এর বদলে ইসলামবিদ্বেষী টনটনে থাকার কারণে প্রগতিবাদীতার নামে রাজনীতিতে এসব ঘৃণার চাষাবাদ হতে দেখা যায়।

আচ্ছা, আজকাল হিন্দু রাজনৈতিক দল খোলার কিছু হিড়িক দেখা যাচ্ছে। হাসিনা না থামালে তা হয়ত আরও বাড়ত। যেমন, হিন্দু ঐক্য জোট, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট, জাতীয়তাবাদী হিন্দু কল্যাণ দল ইত্যাদি নানান কিসিমের নামে এসব দল আছে দেখা যায়। এছাড়া ওদিকে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ তো আছেই। এখন এসব দলগুলো যদি ছাত্র সংগঠন খুলে বসে আর যদি তারা ডাকসু নির্বাচন করতে চায় তাহলে এসব প্রগতিবাদীদের প্রতিক্রিয়া কী হবে?

রাজনীতিক ততপরতা মানে তা বিদ্বেষের নয় বরং ইতিবাচক এপ্রোচে করার বিষয় – একথা মনে রাখলে অনেক প্রশ্নের সহজ মীমাংসা পাওয়া যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক। goutamdas1958@hotmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.