Home শীর্ষ সংবাদ একাদশ সংসদের যাত্রার শুরুতেই ঢিমেতালে ভাব, নিরুত্তাপ আলোচনা

একাদশ সংসদের যাত্রার শুরুতেই ঢিমেতালে ভাব, নিরুত্তাপ আলোচনা

0
- ফাইল ছবি।

ফয়েজ উল্লাহ ভূঁইয়া: একাদশ জাতীয় সংসদের যাত্রার শুরুতেই অধিবেশনে অনেকটাই ঢিমেতালে ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রথম ছয় কার্যদিবসে দু-একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংসদে আলোচনায় এলেও তা ছিল স্বল্প পরিসরের ও নিরুত্তাপ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিকরা বিরোধী দলের আসনে বসলেও তাদের বিরোধী দলের বক্তব্যে ঝাঁজ লক্ষ করা যায়নি। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জন্য বিরোধীদলীয় নেতার আসন নির্ধারিত হয়ে থাকলেও অসুস্থ কারণে এখনো নিজ আসনে বসতে পারেননি তিনি। দশম সংসদের সংসদ উপনেতা বেগম সাজেদা চৌধুরী সংসদ নেতার পাশের আসনে বসলেও এখনো সংসদ উপনেতা কে, তা ঘোষিত হয়নি। অন্যদিকে সংসদীয় কমিটিগুলো গঠনসহ সংসদ সদস্যদের অফিস ও ফ্ল্যাট বরাদ্দের প্রক্রিয়াসহ প্রস্তুতিমূলক কাজগুলোই চলছে। চলছে নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত আটজন জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়া ও সংসদে যোগ দেয়া থেকে বিরত রয়েছেন।

সংসদ অধিবেশন শুরুর দিন ৩০ জানুয়ারি বিরোধী দলকে সংসদে কথা বলতে বাধা না দেয়া এবং জাতীয় নির্বাচনকে সফল নির্বাচন আখ্যায়িত করে ও গত বুধবার প্রশ্নোত্তরে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া-না-হওয়ার বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন উল্লেখ করে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রথম দিনের বক্তব্যেই মহাজোটে শরিকরা বিরোধী দলে বসা নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছেন বলে সংসদে বক্তব্যে জানান ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। এরপর শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির বিষয় ঝুলিয়ে রাখা, সড়ক দুর্ঘটনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বিষয়ে নিউ ইয়র্কের আদালতে দায়ের করা মামলা টেকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ এবং রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে অগ্রগতি না হওয়া প্রসঙ্গ সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে আলোচনায় আনেন সরকারি দলের মো: নাসিম, জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, জাসদের হাসানুল হক ইনু ও তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারি। এরই মধ্যে সংসদের ২৪টি কমিটি গঠিত হয়েছে। সংসদবিষয়ক কমিটির বৈঠকের মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার সংসদীয় কমিটির বৈঠকেরও সূচনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু : অধিবেশনের প্রথম দিন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী শপথ নেয়ার পর বৈঠকের সূচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে সংসদে বিরোধী দলকে কথা বলতে বাধা না দেয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, আমি এটুকু আশ্বাস দিতে পারি, আমাদের বিরোধী দলে যারা আছেন তারা যথেষ্ট সমালোচনা করতে পারবেন। এ ব্যাপারে আমরা কোনো বাধা সৃষ্টি করব না, কোনো দিন বাধা দেয়নি, দেবো না। তিনি ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে সফল নির্বাচন আখ্যায়িত করে বলেন, এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ, মা-বোনেরা, প্রথম যারা ভোটার তারা এবং সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে এবং সফল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার প্রশ্নোত্তর পর্বে নির্বাচন ও জামায়াত প্রসঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিচারাধীন বলে মন্তব্য করেন। একই সাথে তিনি জাতীয় নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন। সংসদে দুই দিনই তার বক্তব্য আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পায়।

বিরোধী দল প্রসঙ্গ: প্রথম দিন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে রাশেদ খান মেনন সংসদে তাদের অবস্থান নিয়ে নিজেদের বিব্রতকর অবস্থার কথা জানান। তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নিয়ে আমরা আনন্দিত। তবে এ আনন্দের সাথে সাথে আমরা একটু বিব্রতও বটে। আজকে ঢোকার মুখেও (সংসদে প্রবেশের সময়) আমাকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। জানতে চাওয়া হয়েছে, আপনাদের সংসদে অবস্থান কী হবে? অবশ্য পরে তিনি বিরোধী দল হিসেবে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি সমালোচনা করার কথাও জানান।

পয়েন্ট অব অর্ডারে আলোচনা : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির প্রসঙ্গ সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে উত্থাপন করেন সরকারি দলেরই সিনিয়র সদস্য মো: নাসিম। তিনি বিষয়টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল উল্লেখ করে আর ঝুলিয়ে না রাখার আহ্বান জানান। তাকে সমর্থন করে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদের সদস্যরা বক্তব্য রাখেন। পরপর দুই দিন পয়েন্ট অব অর্ডারে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের বিষয়ে সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দাবি করে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য রাখেন জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু। অবশ্য তার দাবির বিপরীতে কেউ কোনো জবাব এখন পর্যন্ত দেননি।

সর্বশেষ বুধবার রোহিঙ্গা ইস্যুতে সংসদে দিনক্ষণ ঠিক করে আলোচনা ও একটি সর্বদলীয় কমিটি গঠনের দাবি তোলেন সরকারি ও সংসদের বিরোধীদলীয় সদস্যদের কয়েকজন। পয়েন্ট অব অর্ডারে আলোচনার সূচনা করেন সরকারি দলের মো: নাসিম। তার বক্তব্যকে সমর্থন করে অন্যরা কথা বলেন। মো: নাসিম বলেন, আর কত দিন এই বোঝা আমরা বহন করব? সারা দুনিয়া কথা দিয়েছে। অনেকে এখানে এসে সার্ভিস দিয়েছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। যেহেতু সংসদ চলছে, একটি দিন নির্ধারণ করুন, যেখানে আমরা সব দল মিলে এখানে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে আমাদের করণীয় কী, সরকারের পদক্ষেপগুলো কী, তা নিয়ে আলোচনা করা দরকার। আমরা ১৬ কোটি মানুষ এখানে। তার মধ্যে ১১-১২ লাখ রোহিঙ্গা যারা আছেন তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র তিনজন দেশে ফিরে গেছেন এটি ঘটেছে মিয়ানমারের অনীহার কারণে। আমরা সরকারি ও বিরোধী দল আছি। আমরা আলোচনা করে মতামত দেই। প্রয়োজনে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। সব দল থেকে প্রতিনিধি নিয়ে সংসদীয় কমিটি গঠন করে ভারত, চীন, মিয়ানমারে গিয়ে প্রয়োজনে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। এভাবে চলতে পারে না।

রাশেদ খান মেনন বলেন, ট্র্যাক টু ডিপ্লোমেসি বলে একটি কথা আছে। সরকারের বাইরে যারা আছেন তারাও এ ইস্যুতে সহযোগিতা করতে পারেন। হাসানুল হক ইনু বলেন, জনপ্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে কী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন তা দেশবাসীকে ও বিশ্ববাসীকে জানানো উচিত। তবে এ বিষয়েও স্পিকার বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী কোনো জবাব দেননি।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা: এ দিকে সংসদে নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রশ্নোত্তর পর্বসহ রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আলোচকদের বেশির ভাগই ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু দাবি করে নির্বাচনে নিজেদের ভুলের কারণেই ঐক্যফ্রন্ট হেরেছে মর্মে বক্তব্য দেন।
বিরোধীদলীয় নেতার চেয়ার খালি : জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের আসনে বসলেও বিরোধী দলের নেতার আসনটি শূন্যই রয়েছে। অসুস্থতার কারণে পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধী নেতা হিসেবে মনোনীত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সর্বশেষ দেশে ফিরলেও বৃহস্পতিবারের বৈঠকেও যোগ দেননি। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এরশাদ সুস্থ রয়েছেন এবং তিনি সংসদের বৈঠকেও যোগ দেবেন।

উপনেতা ঘোষিত হয়নি: এ দিকে সংসদের উপনেতার বিষয়টিও এখনো ঘোষিত হয়নি। দশম সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে বসছেন আগের মতোই। ধারণা করা হচ্ছে তিনি এ সংসদেরও উপনেতা হতে যাচ্ছেন। এর আগে বেগম মতিয়া চৌধুরীর নাম উপনেতা হিসেবে আলোচনায় এলেও তাকে এরই মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।

ঐক্যফ্রন্টের সংসদ বর্জন : বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত আটজন সংসদ সদস্য সংসদে যোগ দেননি। ঐক্যফ্রন্ট তাদের যোগ না দেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানানোর পর বিষয়টি নিয়ে তেমন আলোচনা নেই।

সংসদীয় কমিটিতে বাদ পড়া মন্ত্রীরা : এ দিকে সংসদের ৫০টি সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি ও সংসদ কমিটিসহ ২৪টি কমিটি গঠিত হয়েছে। গত সংসদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়াদের অনেকেই এবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পাচ্ছেন। সংসদ নেতার পক্ষে সংসদের চিফ হুইপের প্রস্তাবে সংসদে কণ্ঠভোটে সংসদীয় কমিটিগুলো গঠিত হয় কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী।

মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ পড়া আমীর হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, শাজাহান খান, ফারুক খানসহ সাবেক মন্ত্রীদের অনেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি হয়েছেন এ পর্যন্ত ঘোষিত কমিটিগুলোতে। আগামী কয়েক দিনে বাকি কমিটিগুলোও গঠিত হবে বলে সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে। এখনো সংসদে কোনো আইন উত্থাপিত হয়নি। বৃহস্পতিবার সংসদ কমিটির বৈঠকের মধ্য দিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকের সূচনা হয়েছে। ওই বৈঠকে সংসদ সদস্যদের জন্য ফ্ল্যাট ও অফিস বরাদ্দে একটি সাব কমিটি গঠন করা হয়।

সংসদের এ অধিবেশন রাষ্ট্রপতির ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনার কারণে রেওয়াজ অনুযায়ী দীর্ঘ হবে। ফলে আগামী মাসের মাঝামাঝি বা শেষার্ধ পর্যন্ত অধিবেশনটি চলতে পারে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সামনে রেখে অধিবেশন এক সপ্তাহের জন্য মুলতবি হতে পারে বলে জানা গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.