Home শীর্ষ সংবাদ কুরআন-হাদীস অনুসরণের মাঝেই দুনিয়া-আখিরাতের শান্তি নিহীত: আল্লামা কাসেমী

কুরআন-হাদীস অনুসরণের মাঝেই দুনিয়া-আখিরাতের শান্তি নিহীত: আল্লামা কাসেমী

0

উম্মাহ রিপোর্ট: দেশের অন্যতম বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজধানীর জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা’র দাওরায়ে হাদীসের খতমে বুখারী ও দোয়া মাহফিল গতকাল (১৩ মার্চ) বুধবার সন্ধ্যায় সম্পন্ন হয়েছে। সমাপনী ক্লাস ও দোয়া মাহফিল পরিচালনা করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও প্রবীণ আলেম শায়খুল হাদীস পীরে কামেল আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী। বিকেল ৫টা থেকে শুরু হয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই দ্বীনি সমাবেশে দাওরায়ে হাদীস (টাইটেল)এর সমাপনী দরস সম্পন্ন হয়। সন্ধ্যা ৭টা থেকে হাদীস শাস্ত্রের বিশুদ্ধ ও প্রধান কিতাব বুখারী শরীফের আখেরী দরস বা সমাপনী ক্লাস শুরু হয়।

খতমে বুখারীর দরস শেষে শায়খুল হাদীস আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী বলেন, দেশে বিদেশে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও আঘাত চালানো হচ্ছে। দাড়ি-টুপী ও হিজাব পরিহিতা মুসলমান নারী-পুরুষ নানাভাবে হয়রানীর শিকার হচ্ছেন। ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিকব্যবাদিদের নানামুখী পদক্ষেপে ঈমান ইসলাম নিয়ে বসবাস করাটাই এখন কঠিন হয়ে ওঠছে। তিনি ঈমান ও ইসলামের হেফাজতের লক্ষ্যে উলামা-মাশায়েখ ও সাধারণ মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের উপর গুরুত্বারোপ করে তরুণ আলেমদের উদ্দেশ্য করে বলেন, এই কঠিন পরিস্থিতিতে ইসলামের শান্তি, সাম্য ও ঐক্যের বাণী জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে আপনাদেরকে জোরদার ভূমিকা রাখতে হবে। দেশ ও জাতির কল্যাণে ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও স্বকীয়তাবোধ বজায় রেখে সহনশীল আদর্শ সমাজ গড়তে আপনাদেরকে নিরলস কাজ করে যেতে হবে।

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী খতমে নবুওয়াতের গুরুত্ব ও ত্যৎপর্যের উপরও গুরুত্বপূর্ণ বয়ান করে বলেন, পবিত্র কুরআন যেমন শেষ আসমানী কিতাব, তেমনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)ও শেষ নবী। কুরআনের পর যেমন নতুন কোন আসমানী কিতাব আর আসবে না, তেমনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)এর পরও আর কোন নতুন নবী কিয়ামত পর্যন্ত আসবেন না। এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য আবশ্যকীয়। রাসূল (সা.)কে শেষ নবী স্বীকার না করে কেউ মুসলিম দাবি করতে পারে না। গোলাম আহমদ কাদিয়ানী রাসূল (সা.)কে শেষ নবী মানেন না। তাই কাদিয়ানী ও তার অনুসারীরা মুসলিম নয়। তারা মুসলিম বলে দাবি করার অধিকার রাখে না। সুতরাং কাদিয়ানীদের বিভ্রান্তি সম্পর্কে আপনাদেরকে জাতিকে সতর্ক করতে হবে।

তিনি তরুণ উলামায়ে কেরামের প্রতি ইলমে ওয়াহীর পরিপূর্ণ অনুকরণ-অনুসরণ করার উপদেশ দিয়ে বলেন, ওয়াহী দুই প্রকার। একটা হল ওয়াহী মাতলু, যার শব্দ ও বাখ্যা পুরোটাই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। এটা হল পবিত্র কুরআনে কারীম। অন্যটা হল ওয়াহী গায়রে মাতলু। যার শব্দ নবীর তরফ থেকে এসেছে। কিন্তু অর্থ ও ভাব আল্লাহর তরফ থেকে। আর এটা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.)। সুতরাং মুসলমানদের কাছে কুরআন-হাদীস উভয়ই অপরিহার্য গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং পবিত্র কুরআন যেমন ইলমে ওয়াহী, হাদীসে রাসূল (সা.)ও ইলমে ওয়াহী। সুতরাং আপনাকে আমাকে যদি জান্নাতে যেতে হয়, জাহান্নাম থেকে বাঁচতে হয়, তাহলে পরিপূর্ণরূপে ইলমে ওয়াহীর পরিপূর্ণ অনুসরণ অনুকরণ করে চলতে হবে।

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী রাশেদ খান মেননের সংসদে দেওয়া সাম্প্রতিক বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আমার যে ভাই মোল্লাতন্ত্র বলে কটাক্ষ করে সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন, আমি তাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, আপনি মোল্লাতন্ত্র বলে কী বুঝিয়েছেন? মোল্লাতন্ত্র বলে যদি নাউজুবিল্লাহ, আপনি কুরআন-সুন্নাহকে কটাক্ষ করে থাকেন, তাহলে আপনার ঈমান এখানেই শেষ। সুতরাং এই ভাইকে আমি উদাত্ত্ব আহ্বান জানিয়ে বলব, আপনি তাওবা করুন এবং কালেমা পড়ে ইসলামে প্রবেশ করেন। আমরা কারো শত্রু না। আমরা সারা মানব জাতির কল্যাণ চাই, আমরা সারা মানব জাতির শান্তি চাই।

প্রিয় উপস্থিতি, সত্যিকারের শান্তি পেতে হলে তার একমাত্র রাস্তা কুরআন হাদীসের রাস্তা, দ্বীন ইসলামের রাস্তা। আপনাদের সন্তানকে কুরআন-হাদীসের শিক্ষা দিবেন। এতে আখেরাতের জীবনও শান্তিময় হবে, দুনিয়ার জীবনও শান্তিময় হবে। আপনার সন্তান কুরআন হাদীসের শিক্ষা পেলে কোন পিতামাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হবে না। সন্তানের কাছ থেকে ভাল কিছু পেতে চান, সুন্দর আচরণ পেতে চান, দেশ ও জাতির মঙ্গল চান, সর্বস্তরে শান্তি চান, তাহলে অবশ্যই সন্তানকে কুরআন-হাদীসের শিক্ষায় শিক্ষিত করুন।

তিনি বলেন, ইসলাম কখনোই টেকনলোজির বিরুদ্ধে নয়। উলামায়ে কেরাম কখনো গবেষণা ও বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে নয়। ইসলামে সব সময় গবেষণা ও পড়াশোনাকে উৎসাহিত করেছে। কেউ বিরুদ্ধে ভাবলে এটা ভুল ব্যাখ্যা। আমরা বিজ্ঞান ও টেকনলোজির উত্তম ব্যবহার চাই। উত্তম কাজের জন্য গবেষণা চাই। আমরা সব সময় দেশ, জাতি ও মানবতার কল্যাণে কাজ করতে চাই। আমরা সর্বস্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চাই।

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী তরুণ আলেমদেরকে সতর্ক করে বলেন, ঈমান-আক্বীদা ও ইসলামের জন্য যে কোন পদক্ষেপ যেন শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক হয়, সে দিকে নজর রাখবেন। কারণ, মুসলমানরা সুশৃঙ্খল জাতি। ইসলামে বিশৃঙ্খলা, হানাহানি, ভাংচুর ও সন্ত্রাসের কোন স্থান নেই। হেকমত, বুদ্ধিমত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে দ্বীনি কাজ আঞ্জাম দিবেন।

দরসের শুরুতে আখেরী হাদীসের পুরো সনদসহ মতন পাঠের পর আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী বিদায়ী ছাত্রদের উদ্দেশ্যে হাদীসের উপর বিশদ আলোচনা করেন।

আলোচনায় হাদীসের বিশুদ্ধ কিতাব বুখারী শরীফ ও এর রচয়িতা ইমাম আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী (রাহ.)এর কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ইমাম বুখারী (রাহ.) দীর্ঘ ১৬ বছর পর্যন্ত সিয়াম সাধনার মাধ্যমে ১,০৮০ জন উস্তাদ থেকে অর্জনকৃত ৬ লক্ষ হাদীস থেকে বাচাই করে ৭,২৭৫টি হাদীস সংকলন করেছেন। প্রত্যেক হাদীস লেখার পূর্বে গোসল করে দুই রাকাত নামায আদায় করে আল্লাহ্ তাআলার দরবারে এই দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! হাদীস যদি ভুল হয়, তাহলে শুদ্ধতা অন্তরে ঢেলে দিন। রওজায়ে আক্বদাসের পাশে বসে ৩,৩৮৮টি বাব (অধ্যায়) নির্ধারণ করেছেন। আল্লামা কাসেমী এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন।

জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা মাসউদ আহমদ-এর পরিচালনায় খতমে বুখারী ও দোয়া মাহফিলে বক্তব্য রাখেন জামিয়া মাদানীয়ার সহকারী পরিচালক ও মুহাদ্দিস হাফেজ মাওলানা নাজমুল হাসান, প্রবীণ মুহাদ্দিস মাওলানা আবুল হাসান। উপস্থিত ছিলেনজামিয়ার মুহাদ্দিস, মুফতী ও শিক্ষকবৃন্দ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বগণ। খতমে বুখারীর দরস শুরু হওয়ার পূর্বে চলতি শিক্ষাবর্ষ শেষে এবারের খতমে বুখারী অনুষ্ঠানে জামিয়া মাদানিয়া বারিধরা থেকে উত্তীর্ণ হওয়া দাওরায়ে হাদীসের ২০২ তরুণ আলেম, দারুল ইফতার ৪১ জন তরুণ মুফতী এবং হেফাজত বিভাগের ৪০ জন নতুন হাফেজকে দস্তারে ফযীলত তথা সম্মানসূচক পাগড়ী দেওয়া হয়।

দরস চলাকালীন জামিয়া মাঠ, শিক্ষাভবন ও আশপাশের অন্যান্য ভবন ও ছাত্রাবাসে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।
দরস ও হিদায়াতী বয়ান শেষে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী বিদায়ী ছাত্র, উপস্থিত মুসল্লী এবং দেশ ও মুসলিম জাতির কল্যাণ ও শান্তির জন্য বিশেষ মুনাজাত পরিচালনা করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.