Home আন্তর্জাতিক যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকারের মুখোশ উন্মোচিত

যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকারের মুখোশ উন্মোচিত

ছবি- সংগৃহীত।

।। সরদার সিরাজ ।।

যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার দীর্ঘদিন যাবত। কোনো দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে সে দেশের উপর যুক্তরাষ্ট্র চরম ক্ষিপ্ত হয়, অবরোধ-নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে। এমনকি আক্রমণ করে দখলও করে নেয়। এসব ক্ষেত্রে জাতিসংঘ ও তার অধীনস্থ সংস্থা এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোকেও প্রভাব খাটিয়ে কাজে লাগায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি ‘বিশ্ব গণতন্ত্র সম্মেলন’ করছে জাঁকজমকপূর্ণভাবে। তাতে শুধুমাত্র তাদের কথিত গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষাকারী দেশগুলোর কর্তৃপক্ষকে আমন্ত্রণ করছে। ভাবটা এমন, দেশটি বিশ্বের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার সোল এজেন্ট বনেছে।

এ ব্যাপারে তার মিত্ররা এবং তাদের মিডিয়া সার্বক্ষণিক সমর্থন করছে, অনেক ক্ষেত্রে শরীকও হচ্ছে। কিন্তু সেই যুক্তরাষ্ট্রই ইসরাইল ও তার প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কর্তৃক ফিলিস্তিনের গাজায় স্মরণকালের ভয়াবহ গণহত্যা ও ধ্বংসলীলার ব্যাপারে নীরব রয়েছে! উপরন্তু ইসরাইলের শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য সামরিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া, ইসরাইলের হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ওকালতি করছে, ক্ষেত্র বিশেষে চাপ দিচ্ছে। যেমন: ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোকে চাপ দিচ্ছে অনেক দিন থেকে। সম্প্রতি মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা

জ্যাক সুলিভান বলেছেন, ‘ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক না করা পর্যন্ত সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি করবে না যুক্তরাষ্ট্র’। সম্প্রতি ফিলিস্তিনের জাতিসংঘের সদস্য পদ পাওয়ার বিরুদ্ধে ভেটো দিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদে, যার নিন্দা করেছে ওআইসি, রাশিয়া ও চীন। গাজার যুদ্ধাপরাধের কারণে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেফতার এড়ানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে প্রবলভাবে। তার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক আদালতের কৌঁসুলি করিম খান গত ৩ মে বলেছেন, রোম সনদের অধীন এ আদালতের স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার বৈধ ক্ষমতা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র চরম নির্মমতার এখানেই শেষ নয়। খোদ স্বদেশে ইসরাইলের চরম নৃশংসতা বিরোধী তৎপরতা বন্ধ করার জন্য কঠোর পন্থা অবলম্বন করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। সেখানের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ইসরাইলের বর্বরতার বিরুদ্ধে এবং ফিলিস্তিনের পক্ষে ব্যাপক সোচ্চার হয়েছে। মিছিল, মিটিং ও অনশন করছে, যা ২০২০ সালে মার্কিন শিক্ষার্থীদের বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভের পর সবচেয়ে বড় আন্দোলন। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের জেরে স্নাতক সমাপনী পরীক্ষা বাতিল করেছে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। পুলিশ ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে তা দমন করছে। ইতোমধ্যে শত শত বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করেছে। সাউদার্ন ইলিনয়েস ইউনিভার্সিটি এডওয়ার্ডসভিলের ইতিহাসের অধ্যাপক স্টিভ তামারিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করার সময় পিটিয়ে তাঁর পাঁজরের ৯টি হাড় ও একটি হাত ভেঙে দিয়েছে। এই অধ্যাপকের অপরাধ তিনি বিক্ষোভকারীদের ভিডিও ধারণ করছিলেন। সে সময় তাঁর স্ত্রী সান্দ্রা তামারিকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

আরও পড়তে পারেন-

প্রেসিডেন্ট বাইডেন গত ২ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ফিলিস্তিন পন্থী বিক্ষোভকারীদের আইনের শাসন বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আমেরিকায় ইহুদি বিদ্বেষের কোনো স্থান নেই। ইহুদি শিক্ষার্থীদের ভয় দেখানো যাবে না। তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি দেওয়া যাবে না। অথচ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিক্ষোভ কভার করা ছাত্রদের প্রতি সম্মান জানিয়ে পুলিৎজার পুরস্কার বোর্ড একটি বিবৃতি দিয়েছে। গত ১ মে ইহুদি বিদ্বেষ সংক্রান্ত একটি বিল পাস হয়েছে নি¤œ কক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে। বিলটি এখন অনুমোদনের জন্য কংগ্রেসের উচ্চ কক্ষ সিনেটে যাবে। সেখানে পাস হলে আইনে পরিণত হয়ে কার্যকর হবে। এই আইনের মর্মকথা হচ্ছে, ‘ইহুদিদের নিয়ে একটি নির্দিষ্ট ধারণা, যা ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশে ব্যবহার করা হতে পারে। উপরন্তু ইসরাইল রাষ্ট্রকে আক্রমণ করে কিছু বলাকেও ইহুদি বিদ্বেষ হিসেবে গণ্য করা হবে।’

যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইসরাইলের চরম বর্বরতাকে সমর্থন করছে এবং শক্তি যোগাচ্ছে, অন্যদিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার চরম বিরোধিতা করছে, দেশটির বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবরোধ দিচ্ছে এবং ইউক্রেনকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা করছে, যা দ্বিচারিতার শামিল! যুক্তরাষ্ট্র যে ক্রমশ বর্ণবাদী তথা শ্বেতাঙ্গবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে! তার বড় প্রমাণ, সম্প্রতি এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে রাস্তায় ফেলে গলায় পাড়া দিয়ে হত্যা করেছে। ইতোপূর্বে একইভাবে জর্জ নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে রাস্তায় ফেলে পাড়া দিয়ে হত্যা করেছিল মার্কিন পুলিশ। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায়ই বন্দুকধারীরা এলোপাতাড়ি গুলি করে অনেক মানুষকে হত্যা করছে।

সম্প্রতি এ ধরনের হামলায় ২ বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। বিশ্ব প-িতরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ছাত্র বিক্ষোভে দমন-পীড়ন ও ধরপাকড়ের মাধ্যমে দেশটির ভ-ামির মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। এই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ৮৮ ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রি স্থগিতের কথা বিবেচনা করার জন্য চিঠি লিখেছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে। মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বলেছেন, বাইডেনের ভিয়েতনাম হয়ে উঠতে পারে ইসরাইল।

এছাড়া, ইসরাইলের বর্বরতার প্রতি অন্ধ সমর্থনের কারণে আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাইডেনের ভরাডুবি হতে পারে। অধ্যাপক নোয়াম চমস্কি বলেছেন, ইসরাইল পশ্চিম এশিয়ায় আরব জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং এ অঞ্চলে মার্কিন সরকারের জন্য সম্পদ লুণ্ঠনের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। আর এই অবস্থা সৃষ্টির সময় থেকে আজ পর্যন্ত মার্কিন-ইসরাইলি বন্ধুত্ব পুরোপুরি অটুট ও অক্ষত রয়েছে। তার এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে দিন দিন দেশটির প্রতিপক্ষের সংখ্যা বাড়ছে এবং তারা চীন-রাশিয়া বলয়ে যুক্ত হচ্ছে। ফলে এই বলয় ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে।

স্মরণীয় যে, ইসরাইলের নির্বিচার ফিলিস্তিনি হত্যা বন্ধের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় লন্ডন, প্যারিস ও রোম থেকে সিডনি, টোকিও, বৈরুত, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও মেক্সিকোসহ বহু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। এসব বিক্ষোভ থেকে অবিলম্বে গাজায় ইসরাইলের হামলা বন্ধের দাবি জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি ইসরাইল ও গাজা যুদ্ধকে সমর্থন করে, এমন সব কোম্পানির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি জানানো হচ্ছে। গাজার নিহত শিশু বাসিল, অ্যাডাম ইত্যাদির ছবি বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ বিশ্বের ধনী ও অমুসলিম দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ইসরাইলের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে আর নিরীহ-নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের পক্ষে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলেছে। বিক্ষোভকারীরা গাজায় হামলা বন্ধের পাশাপাশি ইসরাইলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে ও অস্ত্র সরবরাহ করে, এমন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক ত্যাগের দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলিম দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা এ ব্যাপারে নিঃশ্চুপ রয়েছে!

গত ৭ অক্টোবর থেকে একনাগাড়ে ফিলিস্তিনের গাজায় নজিরবিহীন সর্বাত্মক আক্রমণে গত ৮ মে পর্যন্ত ৩৫ হাজার বেসামরিক লোক নিহত ও ৭৮ হাজার আহত হয়েছে। এসবের মধ্যে বহু নারী, শিশু, সাংবাদিক ও ত্রাণকর্মী রয়েছে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী স্বাস্থ্য কর্মীদের ওপর হামলা করা নিষিদ্ধ হলেও গাজায় গত ৭ অক্টোবর আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে ১,৫০০ স্বাস্থ্যকর্মী আহত হয়েছেন। গাজায় নাসের ও আল শিফা হাসপাতালে গণকবরে শত শত লাশ পাওয়ার ঘটনায় একটি স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ, যা সমর্থন করেছে ইইউ।

এছাড়া, জাতিসংঘ বলেছে, ইসরাইলের হামলায় অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, যা পরিষ্কার করতে ১৪ বছর সময় লাগতে পারে। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম বলেছে, উত্তর গাজা এখন সম্পূর্ণ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছে। ইউএনডিপি বলেছে, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের জন্য ৪০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। গাজাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ৮০ বছর সময় লাগবে। গাজায় ভয়াবহ আক্রমণের কারণে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে কলম্বিয়া। এছাড়া, আফ্রিকার ৬টি দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত করেছে ইসরাইলের সাথে। তুরস্ক ইসরাইলের সাথে বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছে। মালয়েশিয়া ইসরাইলি পণ্য বর্জন করেছে। গাজার গণহত্যা ও ধ্বংসলীলার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের এক কবি ‘হলোকাস্টের প্রত্যাবর্তন’ শিরোনামে এক কবিতা লিখে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইমেইল- sardarsiraj1955@gmail.com

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

[দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন]