Home আন্তর্জাতিক গাজা গণহত্যায় পশ্চিমা বিশ্বের মুখোশ ফের উন্মোচিত

গাজা গণহত্যায় পশ্চিমা বিশ্বের মুখোশ ফের উন্মোচিত

।। প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব ।।

আধুনিককালের অন্যতম বর্বরোচিত যুদ্ধ এখন চলছে ফিলিস্তিনের গাজায়। ৭ অক্টোবর ইসরাইল-গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ২৩/৪/২০২৪ তারিখ পর্যন্ত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে উপত্যকাটিতে ৩৪ হাজার ১৮৩ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৭৭ হাজার ৮৪ জন আহত হয়েছেন। ব্রিটিশ এনজিও অক্সফ্যাম এ বছরের ১১ জানুয়ারি জানায়, গাজায় প্রতিদিন মৃত্যুহার (২৫০ দিনপ্রতি) একবিংশ শতাব্দীতে পরিচালিত যেকোনো বড় যুদ্ধের চেয়ে বেশি।

গণমাধ্যম ও সোস্যাল মিডিয়ার সুবাদে গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত নারী-শিশু, বিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন বেসামরিক লোকের লাশ, ইসরাইলি অবরোধে ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করা কঙ্কালসার শিশুর ছবি ও ভিডিও দেখে বিশ্বের নানা দেশের মানুষ ইসরাইলের এ বর্বরোচিত যুদ্ধের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ছে। তবে এখন পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরকার ইসরাইলকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য পশ্চিমা সরকার ইসরাইলের এ যুদ্ধাপরাধ দেখে খুব একটা প্রতিবাদ জানাচ্ছে না। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা এসব দেশ নানা সময় ইসরাইলকে হামলা চালানোকালে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু না করতে আরো সতর্ক হতে বলেছে। কিন্তু তা কখনো কঠোর সমালোচনা ও পদক্ষেপের পর্যায়ে যায়নি। বরং এসব দেশ যুদ্ধ শুরু করতে হামাসকে দায়ী করেছে। অন্য দিকে দিন যত গড়াচ্ছে এ যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বপরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হচ্ছে। ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধারা এ সঙ্ঘাতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকা ইসরাইলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রচালিত গণহত্যার মামলা করে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে)। যদিও এ মামলার রায় আসতে বছরখানেক লাগতে পারে, তবে আইসিজে ইতোমধ্যে ইসরাইলকে নির্দেশ দিয়েছে যুদ্ধে এমন কাজ বা পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে; যা জাতিসঙ্ঘের গণহত্যা কনভেনশনের আওতায় পড়ে। হামাস ৭ অক্টোবর ইসরাইলে অভূতপূর্ব হামলা চালিয়ে নাকি এ যুদ্ধ উসকে দিয়েছে। আসলেই কি হামাসকে এ যুদ্ধ শুরুর জন্য দায়ী করা যায়? সেই সাথে ইসরাইল কেবল আত্মরক্ষা করছে বলে কি দেশটিকে দায়মুক্তি দেয়া যায়?

হামাসের ৭ অক্টোবর হামলা

গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরাইলের অভ্যন্তরে অভূতপূর্ব ব্যাপক পরিসরে সামরিক হামলা চালায়। ইসরাইলে একসাথে হাজার হাজার রকেট হামলা চালানোর পরপর হামাসের প্রতিরোধ যোদ্ধারা ভূমি, আকাশপথ ও নৌপথে ইসরাইলে ঢুকে পড়ে। তারা গাজার চার পাশে ইসরাইলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও ইহুদি বসতি স্বল্পসময়ের জন্য দখল করতে সক্ষম হয়। এতে ইসরাইলের ১২০০-এর মতো হতাহত হয়। হামাসের যোদ্ধারা মোট ২৪০ জন ইজরাইলিকে অপহরণ করে গাজায় নিয়ে যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, হামাস কি বিনা উসকানিতে এ হামলা চালিয়েছে; যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কিছু ইউরোপীয় দেশের সরকার ও ইসরাইল দাবি করছে? প্রথমত, নিকট অতীতের কথা যদি বিবেচনা করা হয়, ইসরাইলের ডানপন্থী সরকার দীর্ঘ দিন ধরে অধিকৃত পশ্চিমতীর ও জেরুসালেমে অবৈধভাবে ইসরাইলি বসতিদের জন্য স্থাপনা তৈরির কাজ করে যাচ্ছে। একই সাথে দীর্ঘ দিন ধরে জেরুসালেম শহরের ‘ইহুদিকরণের’ কাজ করছে। মাসখানেক ধরে ইসরাইলি বাহিনীর নিরাপত্তায় চরমপন্থী ইহুদিরা আল-আকসা প্রাঙ্গণে অনুপ্রবেশ করছে। প্রতিবাদে ফিলিস্তিনি মুসল্লিরা যখন বিক্ষোভ করছিলেন তাদের ওপর ইসরাইলি নিরাপত্তাবাহিনী আক্রমণ চালায়।

এবার আসা যাক, সুদূর অতীতের কথায়। ইসরাইল প্রতিষ্ঠা হয় একটি বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশবাদী জায়নবাদী প্রকল্প হিসেবে। জায়নবাদের শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় ঊনবিংশ শতাব্দীর বর্ণবাদী ইউরোপীয় উপনিবেশবাদে। ইউরোপে জন্ম নেয়া জায়নবাদী আন্দোলন মনে করত, দুনিয়ার ‘সব ইহুদি’ ইহুদি জাতির অংশ এবং তাদের ফিলিস্তিনে নিজেদের একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে জায়নবাদী আন্দোলন ১৮৮০-এর দশক থেকে ফিলিস্তিনে ছোট ছোট বসতি গড়ে তোলা শুরু করে। সেখানে সারা বিশ্ব থেকে ইহুদিদের দলে দলে স্থানান্তর উৎসাহিত করতে থাকে। জায়নবাদীরা এ লক্ষ্যে একটি প্রোপাগান্ডা চালায় : ‘ফিলিস্তিন হচ্ছে একটি ভূমিহীন জাতির জন্য একটি মানবহীন ভূমি।’ অথচ সেখানে হাজার বছর ধরে ফিলিস্তিনি আরবরা বসবাস করছেন। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিশেষ করে ব্রিটেনের সমর্থন পায় জায়নবাদ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জোটের অংশ হিসেবে উসমানি খেলাফত পরাজিত হলে, বিজয়ী শক্তি হিসেবে ব্রিটেন ফিলিস্তিনকে নিজেদের ম্যান্ডেট হিসেবে নিয়ে নেয়।

১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব আর্থার জেমস বেলফোর একটি চিঠিতে ফিলিস্তিনের মূল অধিবাসীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও জায়নবাদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখতে ব্রিটেনের সঙ্কল্প তুলে ধরেন এভাবে : ‘চার বিশ্বশক্তি জায়নবাদের সমর্থনে সঙ্কল্পবদ্ধ। জায়নবাদ ঠিক হোক কিংবা বেঠিক, ভালো হোক কিংবা খারাপ, তার চেয়েও বড় কথা, জায়নবাদের শিকড় সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, বর্তমান প্রয়োজনীয়তা, ভবিষ্যৎ প্রত্যাশায় প্রোথিত। সাত লাখ আরব যারা এখন সেই সুপ্রাচীন ভূমিতে (ফিলিস্তিন) বসবাস করছে, তাদের আকাক্সক্ষা ও পূর্বধারণার চেয়েও জায়নবাদের তাৎপর্য অনেক বেশি গভীর’। এটাকে আলোচিত বেলফোর ঘোষণা বলা হয়ে থাকে। মূলত ইহুদিরা বহুকাল ধরে পাশ্চাত্যে যে ইহুদি-বিরোধিতার সম্মুখীন হয়ে আসছিল এবং ইউরোপীয়রাও নিজের ভূমিতে ইহুদিদের অবস্থান ঝামেলা হিসেবে মনে করে যেটাকে ‘ইহুদি প্রশ্ন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল, সেটির একটি স্থায়ী সমাধান হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে আরব স্থানীয় অধিবাসীদের হটিয়ে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়। জায়নবাদীরা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী কর্তৃপক্ষ দ্বারা শক্তিশালী হয়ে ১৯৩০-এর দশক থেকে ‘ট্রান্সফার প্লানসের’ নামে ফিলিস্তিনিদের পূর্বপুরুষের ভিটা থেকে বিতাড়নের ফন্দি আঁটতে শুরু করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়ার সুবাদে ১৯৪৭ সালে জাতিসঙ্ঘ অন্যায়ভাবে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের মতের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিন ভাগ করে বেশির ভাগ এলাকা (৫৫%) নিয়ে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে, অথচ ফিলিস্তিনে তখন মাত্র ৬ শতাংশ এলাকায় ছিল ইহুদিদের বসবাস। ১৯৪৮ সালে জায়নবাদীরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী জাতিগত নির্মূল চালিয়ে প্রায় আট লাখ ফিলিস্তিনি আরবকে বাস্তুচ্যুত এবং ৫৩০টিরও বেশি ফিলিস্তিনি গ্রাম ও শহর ধ্বংস করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। এ ঘটনাকে ফিলিস্তিনিরা ‘নাকবা’ বা ‘দুর্যোগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। ১৯৪৯ সালের মধ্যে ইসরাইল পুরো ফিলিস্তিনের ৭৮ শতাংশ এলাকা দখল করে নেয়। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের দোহাই দিয়ে গাজা এবং পূর্ব জেরুসালেমসহ পশ্চিমতীর দখল করে নেয়। দখলকৃত অঞ্চলগুলো জাতিসঙ্ঘের ঘোষণা অনুযায়ী ফিলিস্তিনিদের বলে ঘোষিত হলেও ইসরাইল বিভিন্ন সময় অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে ইহুদি বসতি স্থাপনা তৈরি করেছে। এখনো করে যাচ্ছে, যা জাতিসঙ্ঘের ঘোষণা অনুযায়ী অবৈধ। একটি নিষ্ঠুর উপনিবেশবাদী প্রকল্প হিসেবে ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাওয়া সেখানকার মূল অধিবাসী হিসেবে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের ব্যাপারটি শুধু কাণ্ডজ্ঞানহীন এবং ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিতে বিশ্বাসীরা অস্বীকার করতে পারে।

ইসরাইল এবং পাশ্চাত্য বিশ্ব

ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর শক্তিশালী সমর্থন ছিল। ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাবাদী আদর্শ জায়নবাদের জন্ম ইউরোপে। রেনেসাঁ এবং এনলাইটেনমেন্ট পরবর্তী ইউরোপ ধীরে ধীরে ধর্মকেন্দ্রিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গিতে সরে আসে; তার আনুষঙ্গিক ফল ছিল ইউরোপে খ্রিষ্টানভিত্তিক একতা ভেঙে সেক্যুলার নৃতাত্ত্বিক ও আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের উৎপত্তি। সে সময়কালে জন্ম নেয়া জায়নবাদও এর ব্যতিক্রম ছিল না। মূলত ইহুদি রাষ্ট্রের কথা বললেও জায়নবাদ ছিল সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, যার নেতৃত্বে ছিল আশকেনাজি তথা ইউরোপীয় ইহুদিরা। অস্বাভাবিক নয়, ইউরোপের বর্ণবাদী সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদের মডেল গ্রহণ করে জায়নবাদ সামনে বাড়ে। ইউরোপীয় বিভিন্ন উপনিবেশবাদী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে জায়নবাদের প্রভূত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আধুনিক ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো নিজেদের উপনিবেশবাদ ও অর্থনৈতিক লুটপাটকে ন্যায্যতা দিতে যেমন উপনিবেশায়িত জনগোষ্ঠীকে বর্বর, অসভ্য ও পশ্চাৎপদ এবং নিজেদের উপনিবেশবাদকে ‘সভ্যকরণ মিশন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল, একইভাবে জায়নবাদ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা থিওডর হার্জল তার ঞযব ঔবরিংয ঝঃধঃব গ্রন্থে বলেন, ‘ফিলিস্তিনে প্রতিষ্ঠিত ইসরাইল হবে ‘বর্বরতার বিরুদ্ধে সভ্যতার একটি ফাঁড়ি।’ হার্জল এ কথার মাধ্যমে যা ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন তা হলো : ফিলিস্তিনের আরবরা ছিল অসভ্য। আরবদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ছিল বর্বরতানির্ভর।

যদিও ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাতাদের সামনে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর উপনিবেশবাদের মডেল ছিল। তবু ইসরাইল প্রতিষ্ঠায় এক বিশেষ ধরনের উপনিবেশবাদের প্রয়োজন ছিল, যার নাম বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশবাদ। সাধারণ উপনিবেশবাদে কোনো জাতি অথবা জাতির অন্তর্ভুক্ত একটি দল অন্য জাতি বা এলাকায় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। কিন্তু বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশবাদে একটি জাতির লোক অন্য জাতির এলাকা দখল করে সেখানে এমন সমাজ, শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতি কায়েম করে যা ওই অঞ্চলের মূল অধিবাসীদের সমাজ ও ব্যবস্থা থেকে আলাদা এবং সে অঞ্চলের ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। এ কাজ করতে গিয়ে বহিরাগত উপনিবেশকারীরা স্থানীয়দের উৎখাত করে সে জায়গা নিজেদের জাতির লোকদের দ্বারা দখল করে। কৌতূহল উদ্দীপক হলো, ইসরাইলের সামনে এ বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশবাদের ক্ষেত্রেও ইউরোপীয় মডেল হাজির ছিল। ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীরা উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে মূল অধিবাসীদের নির্মূল, গণহত্যা ও দমন-নিপীড়নের মাধ্যমে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। মূলত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এভাবে গঠিত হয়েছে। ব্রিটিশরা দক্ষিণ আফ্রিকায় এবং ফ্রান্স আলজেরিয়ায় একই কাজ করার চেষ্টা করে, তবে ব্যর্থ হয়। তাই এটা মোটেই কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, উপরোল্লিখিত বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশবাদের মাধ্যমে গঠিত দেশগুলোর সরকার দশকের পর দশক ধরে ইসরাইলকে শক্তিশালী সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কথা উল্লেখ না করলে নয়। ইসরাইলের জন্মের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র অবিচ্ছিন্ন ও একচ্ছত্রভাবে তেলআবিবকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়কালে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক ত্রাণ গ্রহীতা। ২০০৯-২০১৬ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে ৩০ বিলিয়ন ডলার সামরিক খাতে সাহায্য দিয়েছে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ওবামা ইসরাইলের সাথে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেন যেটাতে ইসরাইলে পরবর্তী ১০ বছরের জন্য সামরিক খাতে ৩৮ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের অঙ্গীকার করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ইসরাইল উচ্চ আয় এবং প্রযুক্তিগতভাবে অনেক অগ্রসর দেশ হওয়ায় এসব সাহায্যের মুখাপেক্ষী নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ যুক্তরাষ্ট্রের জনগণও ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাতে ইসরাইলের পক্ষে। গ্যালাপ পরিচালিত একটি জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৫৮ শতাংশ মানুষ ইসরাইলের সাথে সহমর্মিতা এবং ৭৫ শতাংশ মানুষ ইসরাইলকে সুনজরে দেখে থাকে। ইসরাইলের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের এ উচ্চ সমর্থনের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের শক্তিশালী জনসংযোগ ব্যবস্থা। রাজনীতিবিজ্ঞানের খ্যাতিমান অধ্যাপক জন মিয়ারশেমার ও স্টিফেন ওয়াল্ট রচিত বহুল পঠিত বই ‘দ্য ইসরাইল লবি’-তে দেখিয়েছেন, মার্কিন কংগ্রেসে ইসরাইল বলতে গেলে যেকোনো সমালোচনা থেকে নিরাপদ। এর পেছনে কাজ করে যাচ্ছে আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপিএসি) এবং জায়নিস্ট অর্গানাইজেশন অব আমেরিকার মতো শক্তিশালী ইসরাইলি লবি। ইউরোপেও একই ধরনের শক্তিশালী ইসরাইলি লবি বিদ্যমান।

আরও পড়তে পারেন-

জাতিসঙ্ঘ এবং ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে ইসরাইলকে অভিযুক্ত করার বিপক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সবসময় অবস্থান নিয়েছে। বিভিন্ন ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধে সম্পৃক্ত থাকার পরও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের অর্থায়ন এবং ইইউ আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করতে দিয়ে থাকে।

পাশ্চাত্যের দ্বিমুখিতা

পাশ্চাত্যের এ ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান এর দ্বিমুখিতা ফের নগ্নভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে; বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া এবং গাজায় ইসরাইলি আক্রমণ একই সময় সংঘটিত হচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্ব যে মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের যুক্তি তুলে ধরে রাশিয়ার বিপক্ষে ও ইউক্রেনের পক্ষ নিচ্ছে এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক একই যুক্তি গাজায় ইসরাইলের আক্রমণের ক্ষেত্রেও খাটে। কিন্তু ইসরাইল যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের মিত্র তাই সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ইসরাইলকে আরো সতর্ক হওয়ার নরম ও লোক দেখানো বিবৃতি দেয়া ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকা গত বছর ২৯ ডিসেম্বর ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে ইজরাইলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে গাজায় যুদ্ধাপরাধ চালানোর অভিযোগ আনে। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস ২৬ জানুয়ারি দেয়া এক অন্তর্বর্তী রায়ে ইসরাইলকে সবধরনের এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বলে; যেগুলোকে গণহত্যার আওতাভুক্ত করা যায়। ইসরাইল এ রায় মানতে আইনিভাবে বাধ্য। কিন্তু এরপরও ইসরাইল গাজায় এখন পর্যন্ত বেসামরিক মানুষ হত্যা করে যাচ্ছে। ইসরাইলকে এ অন্তর্বর্তী রায় মানতে বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য পশ্চিমা রাষ্ট্র কিছু করছে না।

সম্প্রতি আরেকটি ঘটনায় পাশ্চাত্যের দ্বিমুখিতা আবারো উঠে এসেছে। গাজা যুদ্ধ ঘিরে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং আশপাশের দেশগুলোতে একে অন্যের লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালানো হয়। ১ এপ্রিল সিরিয়ায় ইরানি কনসুলেটে ইসরাইল হামলা চালায় যাতে ইরানি রিপাবলিকান গার্ড কর্পসের প্রভাবশালী কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হন। ইসরাইলের এ আক্রমণ ছিল আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সুস্পষ্টভাবে ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলা। জবাবে ইরান ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু দেশকে আগে থেকে জানিয়ে ইসরাইলে সরাসরি ৩০০ ড্রোন ও মিসাইল দিয়ে হামলা চালায়, যেগুলোর বেশির ভাগ ইসরাইলের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সহায়তায় ধ্বংস করা হয়। অল্প যা কিছু ইসরাইলের ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হয় সেগুলো তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি করেনি বললেই চলে। সহজে বোধগম্য ইসরাইলে চালানো এ হামলা ছিল ইরানের সম্মান রক্ষার প্রতীকী হামলা। কিন্তু এর পরও পশ্চিমা বিশ্ব ইসরাইলের হামলার ব্যাপারে নীরবতা পালন করলেও ইরানের হামলায় প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে।

এ অবস্থায় বিশ্বের বিবেকবান মানুষের কাছে এটা সুস্পষ্ট যে, পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকারের বুলি কেবল নিজেদের জনগণ ও মিত্রদের জন্য। অবশ্য এটা অনেকের কাছে আরো আগে পরিষ্কার হয়েছে। স্মরণ রাখতে হবে, ইসরাইল নিজেকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করলেও এটা অনেকটা পশ্চিমা ধাঁচের রাষ্ট্র। ইসরাইলের বেশির ভাগ নাগরিক নিজেদের অধার্মিক মনে করে। ইসরাইল রাষ্ট্র পরিচালনায় কদাচিৎ ইহুদি ধর্মের আইন ও মূল্যবোধ মানা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা সভ্যতার এ ছোট অংশ ইসরাইলকে বাঁচাতে তাই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা বিশ্ব খুব তৎপর আর এখানে পশ্চিমা বিশ্বের দৈতনীতি সবচেয়ে কদর্যভাবে বিশ্বের সামনে উঠে আসে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ক্রিস হেজেস ‘গাজায় গণহত্যা’ শিরোনামে এক বক্তব্যে পশ্চিমা সভ্যতার এ দ্বিমুখিতা তুলে ধরে বলেন : ‘যখন দখলদারিত্বের শিকার মানুষ আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করে এবং প্রতিরোধ চালিয়ে যায় তখন আমরা, পশ্চিমারা, আমাদের সভ্যকরণ মিশনের সব অভিনয় ছেড়ে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ি যেমনটি কি না এখন গাজায় চলছে।

আমরা সহিংসতায় মাতাল হয়ে উঠি, বেপরোয়া হিংস্রতা নিয়ে হত্যাকাণ্ড চালাতে থাকি, আমরা জন্তু হয়ে উঠি, আমরা অত্যাচারিতের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলি। আমরা আমাদের আকাক্সিক্ষত নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যার জারিজুরি ফাঁস করে দিই; আমরা পশ্চিমা সভ্যতার একটি মৌলিক সত্য ফাঁস করে দিই: আমরা (পশ্চিমারা) এ গ্রহে সবচেয়ে নির্মম ও দক্ষ হত্যাকারী আর এ কারণে আমরা পৃথিবীর লাঞ্ছিত জনগণের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে থাকি। এ প্রাধান্য বিস্তারের পেছনে গণতন্ত্র বা স্বাধীনতার কোনো ভূমিকা নেই। অত্যাচারিতদের এসব অধিকার প্রদানের ইচ্ছা আমাদের কখনোই ছিল না।’

লেখক : নিরাপত্তা গবেষক।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

[দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন]