Home আন্তর্জাতিক রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুতে বাংলাদেশ

রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুতে বাংলাদেশ

।। তারেকুল ইসলাম ।।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে এ মুহূর্তে দেশে অনেক কথা হচ্ছে। সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের এক অধিবেশনে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা এবং অবিলম্বে সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে ভোটাভুটির আয়োজন করা হয়। প্রস্তাবের পক্ষে ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৪১টি দেশ ভোট দিলেও বাংলাদেশসহ ৩৫টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। সরকার বলেছে, নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত ছিল। কিন্তু এখানে যতটা না নিরপেক্ষতার বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমাদের ভৌগোলিক নিরাপত্তা-উদ্বেগ। কারণ বাংলাদেশ তিন দিক থেকে পারমাণবিক শক্তিধর বৃহৎ ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত। তা ছাড়া এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অখণ্ড রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে আমাদেরকে নিরন্তর আধিপত্যবাদের চাপ মোকাবেলা করে টিকে থাকতে হয়।

লক্ষণীয় আফগানিস্তান, নেপাল, মালদ্বীপ ও ভুটান কিন্তু প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কারণ তারা তাদের ভৌগোলিক নিরাপত্তার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার মধ্য দিয়ে সেখানে সবেমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তির সামরিক আগ্রাসনের অবসান ঘটেছে। অন্য দিকে নেপাল ও ভুটান চীন ও ভারত দ্বারা স্থলবেষ্টিত তথা ল্যান্ডলকড। তারা কিন্তু ভোটদানে বিরত থাকেনি। থাকার সুযোগও নেই, কারণ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সব কিছুর ঊর্ধ্বে। আর সার্বভৌমত্ব অক্ষুণœ রাখার বিবেচনায় একটি দেশের পক্ষে তার ভৌগোলিক নিরাপত্তার স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক কৌশলের প্রশ্নে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। বিশিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেছেন, ‘ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে যে ধরনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি থাকা দরকার সেটি বাংলাদেশের জন্য খুবই জরুরি। ইউক্রেন যদিও আয়তনের দিক থেকে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র নয়, কিন্তু তুলনামূলক ক্ষমতার বলয়ে সেটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবেই চিহ্নিত। কাজেই বড় শক্তিশালী রাষ্ট্র দ্বারা এ ধরনের ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে যদি আক্রমণ করা হয়, তা হলে অন্য যে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো আছে তাদের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম হবে’ (১২ মার্চ ২০২২, বাংলা ভয়েস অব আমেরিকা)। সে কারণেই নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক মহলের কাছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে ভোটদানে বিরত থাকা আমাদের দেশের জন্য একটি গুরুতর কৌশলগত ভুল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশকে চাপে ফেলতেই কি নীতা লালের রিপোর্ট

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেই ‘নিক্কেই এশিয়া’ নামে জাপানের একটি ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে ‘বাংলাদেশে ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র বানাচ্ছে চীন, সতর্ক ভারত’ শিরোনামে প্রকাশিত ভারতীয় সাংবাদিক নীতা লালের একটি রিপোর্ট আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ১১ মার্চ প্রকাশিত ওই রিপোর্টে ঢাকার ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’ এক সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, ‘২০১১ সালে বাংলাদেশকে চীন যে ‘সারফেস টু এয়ার মিসাইল’ দিয়েছে, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চীন একটি মিসাইল ফ্যাসিলিটি হাব বা কেন্দ্র গড়ে তুলছে। যা নয়াদিল্লিতে বিপদঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে।’ কিন্তু বাংলাদেশের কোথায়, কবে থেকে এবং সেটি তৈরি হচ্ছে তার কোনো উল্লেখ নেই প্রতিবেদনে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ওই প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘চীন-বাংলাদেশ ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র বলে কিছু নেই এবং ভবিষ্যতে কিছু করার পরিকল্পনাও নেই’ (১৫ মার্চ ২০২২, ডেইলি স্টার)। এ ছাড়া ইউএনবিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নিক্কেই এশিয়ার রিপোর্টটিকে ‘উসকানিমূলক’ সাব্যস্ত করে বলেছেন, গণমাধ্যমে এমন রিপোর্টের পেছনে ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ রয়েছে। চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেছেন, বাংলাদেশ কিংবা অন্য কোনো দেশের মাটিতে চীন কোনো ধরনের সামরিক ঘাঁটি বানাবে না।

এর আগে বাংলাদেশ তার সমুদ্রসীমা সুরক্ষায় চীনের কাছ থেকে দু’টি সাবমেরিন কেনায় ভারত উষ্মা প্রকাশ করেছিল। ভারতীয় মিডিয়া সেটিকে ‘ভারতের বিরুদ্ধাচরণ’ হিসেবে রংচং লাগিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু এটি জানা কথা যে, বাংলাদেশ সাধারণত চীন থেকেই সবচে বেশি অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কেনে। সে হিসেবে চীন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতের অন্যতম কৌশলগত অংশীদারও বটে। এ ছাড়া কোনো দেশ থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কোনো যুদ্ধাস্ত্র কিংবা সাবমেরিনের মতো কোনো যুদ্ধযান কিনলে স্বাভাবিকভাবে সেসবের রক্ষণাবেক্ষণের (মেইনটেনেন্স) বিষয়টিও চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিন্তু নীতা লালের রিপোর্টে যেভাবে বিষয়টিকে ‘চীন-বাংলাদেশ ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র’ বলে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ঢালাওভাবে ‘ভারতের বিরুদ্ধে চীনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, সেটাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কিছু বলার থাকে না।

তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় প্রকাশিত এমন রিপোর্টের উদ্দেশ্যটা বুঝতে কষ্ট হয় না। এ সময় এমন স্পর্শকাতর রিপোর্ট প্রকাশের মানে কি বাংলাদেশকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে চাপে ফেলা? মানে, চীনের সাথে দহরম-মহরম কমাতে প্রচ্ছন্ন চাপ দিতেই কি এমন রিপোর্ট? বাংলাদেশ তার প্রতিরক্ষা খাতের উন্নয়নে চীনের সাথে ‘সামরিক অংশীদারিত্ব’ বাড়াচ্ছে। বিষয়টি নয়াদিল্লির জন্য যতই অস্বস্তিকর হোক, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অধিকার রয়েছে তার প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার।

সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন ও রুশ আগ্রাসন

যত যুক্তিসঙ্গত কারণেই হোক, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর হামলা করাটা সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। এমনকি কোনো রাষ্ট্র সামরিকভাবে দুর্বল কিংবা আয়তনের দিক থেকে যতই ছোট হোক, তার ওপর প্রতিবেশী কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র কথিত ‘নিরাপত্তার অজুহাতে’ সামরিক আক্রমণ করলে তা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জাতিসঙ্ঘ সনদের ২ নম্বর আর্টিকেলে সব সদস্যরাষ্ট্রের সার্বভৌম মর্যাদা সমান বলা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের আন্তর্জাতিক বিরোধগুলো নিরসন করবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে (প্রধানত কূটনৈতিক পন্থায়), যাতে বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায় বিপন্ন না হয়। এ ছাড়া হুমকি ও শক্তি প্রয়োগ করা থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু রাশিয়া পরাশক্তি হওয়ায় তার ভূরাজনৈতিক স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইনকানুন লঙ্ঘন করে ইউক্রেনে আক্রমণ করেছে। ঠিক যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাশ্চাত্য শক্তি ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়ার মতো স্বাধীন-সার্বভৌম দেশগুলোতে একের পর এক আগ্রাসন চালিয়েছিল। বর্তমানে যেকোনো রাষ্ট্রের ওপর আগ্রাসন মানেই সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা, যা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য ভারী কলঙ্ক।

আমাদের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে ‘আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, শান্তি ও সংহতি উন্নয়ন’ শীর্ষক অনুচ্ছেদের (গ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন’। একাত্তরে আমাদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সামরিক আগ্রাসন চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। সুতরাং জাতীয় চেতনার জায়গা থেকে আমাদের উচিত ইউক্রেনের প্রতিরোধযোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন দিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করা।

আরও পড়তে পারেন-

এ ছাড়া মিয়ানমার থেকে যখন লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আমাদের দেশে পুশ করা হচ্ছিল, তখন আমাদের কথিত বন্ধুরাষ্ট্র ভারত ও উন্নয়ন সহযোগী চীন রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়নি। বরং মিয়ানমারকে সাবমেরিন উপহার দিয়েছিল। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে দফায় দফায় প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও চীন ও রাশিয়ার ভেটোতে তা পণ্ড হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশ দু’টির ক্রমাগত বিরোধিতার কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেয়া যায়নি। ফলে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন ও রাশিয়ার সমর্থন না পাওয়ায় গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম (১৭ আগস্ট ২০১৮, মানবজমিন)। এমনই প্রেক্ষাপটে আজকের দিনে ইউক্রেনে সেই রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ পরিষদের নিন্দা প্রস্তাবে বাংলাদেশের নীরবতা অপ্রত্যাশিত।

পশ্চিমাদের দ্বিচারিতা ও বর্ণবাদ

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার প্রতিক্রিয়ায় গোটা পাশ্চাত্য শক্তি তুমুল প্রতিবাদ ও নিন্দায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। পক্ষান্তরে, ফিলিস্তিনে ইসরাইলের অব্যাহত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কখনো তাদের এমন সরব হতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে আয়ারল্যান্ডের পার্লামেন্টে রিচার্ড বয়েড ব্যারেট নামে একজন আইরিশ আইনপ্রণেতা তার বক্তব্যে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের প্রতি তার সরকারের বর্তমান প্রতিক্রিয়া ও অবস্থানকে ‘চূড়ান্ত ভণ্ডামি’ বলে অভিহিত করেছেন। বলেছেন, ‘ইউক্রেনে আগ্রাসনের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া শুরু হয়েছে, অথচ ইসরাইল ৭৪ বছর ধরে ফিলিস্তিনে নিপীড়ন চালিয়ে গেলেও তাকে কোনো ফল ভোগ করতে হয়নি। আপনারা সবচেয়ে কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পুতিনের মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর সমালোচনা করছেন। কিন্তু আপনারা ফিলিস্তিনে ইসরাইলের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে একই রকম কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন না’ (৮ মার্চ ২০২২, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)। কিন্তু যুদ্ধ এখন ‘মুসলিম ভূমি’ থেকে ইউরোপে এসে পড়ায় পশ্চিমারা তাদের দ্বারা আগ্রাসনকবলিত মুসলিম দেশগুলোর নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত জনগণের করুণ অবস্থা উপলব্ধি করতে পারবে কি! বিশেষত দখলদার ইসরাইলের হাতে প্রতিনিয়ত নিপীড়িত হতে থাকা ফিলিস্তিনিদের কষ্ট তারা অনুভব করতে পারবে কি!

ইউক্রেন রুশ আগ্রাসনের শিকার হওয়ায় দেশটির প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বিশ্বজুড়ে সবার সাহায্য, সমর্থন ও সহানুভূতি চাচ্ছেন। অথচ সেই তিনিই গত বছরের মে মাসে গাজায় ইসরাইলি হামলার প্রতি অন্ধ সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। সেই হামলায় শিশুসহ কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়। আহত হয় শতাধিক। গাজায় উপর্যুপরি বোমা বর্ষণ করে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় ইসরাইল। তুরস্কের গণমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এক তথ্যচিত্রে বলেছিল, ‘ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংস হামলা করলেও এবং গাজায় বোমা হামলা চালিয়ে শিশুসহ নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালালেও জেলেনস্কি বলেন, ইসরাইলই একমাত্র ভিকটিম’ (১৩ মে ২০২১)। জেলেনস্কি একজন ইহুদি এবং তার স্বজাতিপ্রীতি থেকে তিনি ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলকে সবসময় সমর্থন দিয়ে এসেছেন; যে কারণে এখন তার দেশই যখন আগ্রাসনের কবলে, তখন ইসরাইলের প্রতি তার সমর্থন নিয়ে তাকে অনেকের বিদ্রƒপ শুনতে হচ্ছে। যদিও ইসরাইল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে মানবিক সাহায্য পাঠিয়েছে এবং কূটনৈতিক সহায়তা নিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে হঠাৎ ইসরাইলের এমন প্রকাশ্য তৎপরতার কারণ হলো, সিরিয়ায় ইরানের উপস্থিতিকে কোণঠাসা করতে রাশিয়ার নিরাপত্তা সহায়তা ইসরাইলের জন্য খুব জরুরি। তাই রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের অবরোধ আরোপে অংশ নিয়ে পুতিনকে চটাতে চায় না দেশটি। সে কারণে পরিস্থিতির চাপ ও পক্ষপাতিত্বের বাধ্যবাধকতা এড়াতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নেমেছে ইসরাইল। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, ফিলিস্তিনে অবৈধ সম্প্রসারণ বাড়াতে এবং ইহুদি জনসংখ্যা বৃদ্ধি করতে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইহুদি শরণার্থী নিতে চায় ইসরাইল। ইতোমধ্যে এক শ’ ইউক্রেনীয় ইহুদি শরণার্থী ইসরাইলে পৌঁছেছে। আরো প্রায় ১০ হাজার আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পৌঁছাবে (৪ মার্চ ২০২২, আলজাজিরা)। এ ছাড়া জেলেনস্কি ইসরাইলের মধ্যস্থতায় পুতিনের সাথে সমঝোতায় আগ্রহী বলে সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে। তবে সেটি কতটা ফলপ্রসূ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

একজন পশ্চিমা সাংবাদিক ইরাক-আফগানিস্তানের চেয়ে ইউক্রেনকে ‘সভ্য’ ও ‘ইউরোপিয়ান’ দেশ বলে অভিহিত করে বলেছেন, সে কারণে ইউক্রেনে এমন আগ্রাসন প্রত্যাশিত নয়। তার এ বক্তব্য শুধু বর্ণবাদী নয়, অজ্ঞতাপ্রসূতও। কারণ ঐতিহাসিকভাবে মেসোপটেমিয়া তথা আজকের ইরাককে বলা হয় ‘সভ্যতার উৎসমূল’ (the cradle of civilization) এবং আফগানিস্তানকে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো কয়েকটি নিরবচ্ছিন্ন বসবাসের স্থানগুলোর একটি বলে মনে করেন ঐতিহাসিকরা। তীব্র সমালোচনার মুখে ওই সাংবাদিক পরে তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তবে এটি সত্য যে, বিভিন্ন মুসলিম দেশে আগ্রাসন চালিয়ে অসম যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের এ ধরনের বর্ণবাদী ও শ্রেষ্ঠত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গিও কম দায়ী নয়। এ ছাড়া ইউক্রেনের প্রতিরোধযোদ্ধাদের বীর হিসেবে তুলে ধরা হলেও আগ্রাসনকবলিত মুসলিম ভূমির প্রতিরোধযোদ্ধাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবেই দেখানো হয় পশ্চিমা মিডিয়ায়। যাই হোক, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের দ্বিচারিতা নগ্নভাবে ধরা পড়েছে। সেটির সমালোচনার পাশাপাশি আমাদেরকে নৈতিকভাবে রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও দ্ব্যর্থহীন অবস্থান নিতে হবে। যেমনটি ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চকিত।

লেখক- রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।