Home ওপেনিয়ন শিশু নাঈম ও বাংলাদেশের দেউলিয়া রাজনীতি!

শিশু নাঈম ও বাংলাদেশের দেউলিয়া রাজনীতি!

2

।। মেরী জোবায়দা ।।

শিশু নাঈম’কে নিয়ে জয়ের ধৃষ্টতা যেমন অত্যন্ত নিন্দনীয়, তেমনি নিন্দনীয় বিএনপির কিছু লোকদের এ নিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা লাভের চেষ্টা। দুই দলই যার যার সমর্থিত রাজনৈতিক দলের দেউলিয়াত্ব তুলে ধরেছেন।

জয় যেটা করেছে তাতে হয়তো তার হাত ছিলো না, হয়তো তিনি শিখিয়েও দেননি, হয়তো যারা শিখিয়ে দিয়েছে তাদেরকে তিনি জানেন বা জানেনও না। কিন্তু একটা শিশুকে সংকটাপন্ন অবস্থায় ফেলেছে এ অংশ এডিট না করে। প্রশ্নের ধরনে অবশ্য মনে হয় উত্তরের এ অংশটি কোন না কোন কারো জন্য খুব দরকারী ছিলো। তিনি হয়তো জয় নাও হতে পারতেন। কিন্তু জয় তারপরও দায়ী।

জয় যে কাজ করেছে, তা মূলত: একটি শিশুর প্রতি নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে। অনেকটা এক শিশুর নিজে খুঁজে পাওয়া একটি কাঁঠাল শিশুর মাথায়ই ভেঙ্গে সেই কাঁঠাল থেকে শিশুকে ধাক্কিয়ে দূরে ছুঁড়ে মারার অনুরূপ।

শিশুর প্রতি এই নিষ্ঠুরতা মানুষ মেনে নেয়নি। যে শিশুটি মানুষের উপকারে ঝাঁপিয়ে পড়ার সরল নিষ্কলুষ মন নিয়ে বাড়ছিল, হঠাৎ তাকে দিয়ে বলানো হলো কিছু বাজে কথা। একটা শিশুর কখনোই নিজের সামান্য কাজের স্বীকৃতি দিতে একজন সাবেক দেশ প্রধানের সম্মান নিয়ে টানাটানি করার কথা না। কেউ না কেউ তাকে তা মুখে তুলে দিয়েছে। এমনটা বড়দেরও করার কথা না। সুযোগও নেই।

একজন শিশু একটি পাইপের পানি আটকিয়ে আগুন নেভানোয় সাহায্য করেছে বলেই তারে মহামানব হয়ে গেছে ভাবার কোন কারণ নেই। তার ভালো মানুষ হওয়ারও কোন গ্যারান্টি নেই। শৈশব অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটা সময়। এই সময়ের নিষ্কলুষতা ধরে রাখার চেষ্টা তাই সকল অভিভাবকদের মধ্যে সর্বক্ষণ। শিশু নাঈম তার কাজের কারণে সবার মনে একটা জায়গা করে নিয়েছে।

বাংলাদেশ দল ক্রিকেটে জয় পেলে যেমন সবার আপনজন হয়ে যায়, তেমনি এই হিংসা বিদ্বেষের দিনে শিশু নাঈম হয়ে ওঠে সবার আপনজন, সবার ছোট্ট ভাই, সবার সন্তান। এমন অবস্থায় একজন দরদী ব্যক্তি দরিদ্র শিশু নাঈমের লেখাপড়া ও সুন্দর শৈশব নিশ্চিত করার জন্য কিছু ডলার উপহার দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

এখানে বলে রাখা ভালো যে, বিদেশে থাকা ডলার উপহার দিতে চাওয়া মানুষ মানেই ডলারের কারখানা না। বিদেশে মানুষ অনেক কষ্ট করেন। এখানে যেমন ডলারে আয়, তেমনি ব্যয়ও ডলারে। মানুষের হাড়ভাঙা পরিশ্রম যে কি, সেটা বিদেশে না আসলে বোঝা যায় না। দেশের মানুষের মতো এখানে কেউ ‘ভালো কাজ’ না পেলে বেকার থাকতে পারেন না। একজন ইউনিভার্সিটি পাশ করা মানুষও তাই ছোটখাটো দোকানের কাজও ফেলে দেয় না একটি ভাল কাজ হওয়ার আগ পর্যন্ত। প্রায় সকল মানুষই হাইস্কুলে বা হাইস্কুল শেষ করেই কাজে যোগ দেয়। যারা চান, তারা কাজের পাশাপাশি বাকী লেখাপড়া শেষ করেন। একান্ত ধনী ব্যক্তি, বিশেষ করে বাংলাদেশী সমাজে একেবারে নাই তা নয়, তবে সেই সংখ্যা খুব অল্প।

নাঈমকে যিনি ডলার পাঠাতে চেয়েছেন ধন সম্পদে তিনি ধনী না গরীব আমার জানা নেই। তবে যাকে ভালোবেসে, যার ভবিষ্যত চিন্তায় তিনি টাকা দিতে চেয়েছেন, সে যদি টাকার প্রয়োজন মনে না করে, সেটা যিনি দিতে চেয়েছেন তার জন্য বিশাল অপমানকর। কেউ অভাবমুক্ত থাকলে তাকে সেধে ভিক্ষা নেয়ার জন্য বলার মতো অপমানকর। অপমানের চেয়েও কষ্টকর হয়, যখন জানা যায়, সেই টাকা ব্যবহার করা হবে দেশের জনগণের একটা অংশকে কষ্ট দিতে বা খাট করতে।

খালেদা জিয়ার ভক্তদের সংখ্যা যদি বেশি থাকেন, তাহলে এটা অত্যন্ত নিন্দনীয় যে, দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর কষ্ট দেয়ার চেষ্টা হয়েছে এই টাকাকে ইস্যু করে। খালেদা জিয়ার ভক্ত যদি খুবই কম হয়, তাহলে এটা খুবই জঘন্য ব্যাপার যে, ভাঙ্গনের মুখে পড়া অসহায় একটি হাতিকে আঘাত করতে এই টাকা ইস্যু ব্যবহার করা হয়েছে।

শিশু নাঈমকে দিয়ে বলানো কথা যেদিক থেকেই বিবেচনা করা হোক, অবশ্যই আপত্তিকর। একটা শিশুর শৈশবের বরখেলাপ। আর এ জন্য দায়ী সাহরিয়ার নাজিম জয়। এ ঘটনায় যেমন বিব্রত দান করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিটি, তেমনি বিব্রত আওয়ামী লীগও। যখনই কোন না কোনভাবে দলটি মানুষের কাছাকাছি পৌঁছানোর পথে চলে আসে, জয়ের মতো কেউ না কেউ এসে ছোঁ মেরে সেই পথ ভেঙ্গে দিয়ে যায়। আর দান করতে ইচ্ছুক ব্যাক্তটির কথা কি বলব! তার জন্য আমার রীতিমতো কষ্ট হচ্ছে। না জানি নিজেকে কতটা দায়ী করছেন এই পুরো ঘটনার জন্য। তিনি তারপরও তার নিয়্যাত থেকে সরে যাননি। নাঈম যেহেতু বলেছে ইয়াতীমখানায় টাকাগুলো দান করবে, তাই নাঈমের ইচ্ছাপুরণেই ব্রতী হয়ে তিনি ইয়াতীমখানায় টাকাগুলো দান করার সিদ্ধান্তে আসেন।

কিন্তু পুরো ঘটনায় আহত হয় একটা পুরো দেশের মানুষ, যারা ইতিমধ্যে শিশু নাঈমকে মনের মাঝে সন্তান হিসাবে স্থান দিয়েছেন। গরীব শিশু নাঈমের টাকার দরকার আছে কিনা- এটা বলতে পারবে নাঈম না, নাঈমকে যিনি লালন করেন, সেই একমাত্র অভিভাবক মা। পরের বাসায় কাজ করে শিশু লালন করা কেমন কঠিন, যারা আপনারা বড় বড় চাকরী করে সন্তান লালন করতে হিমশিম খাচ্ছেন আপনারা সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারেন। তাই অর্বাচীনের মতো ঘটানো এই ঘটনায় সবাই আহত। আর এই আহত হওয়াকেই কাজে লাগাতে চাচ্ছে আরেকটা দল।

আহতদের মধ্যে খালেদা জিয়ার সমর্থনকারী যেমন আছেন, তেমনি আছেন যারা খালেদা জিয়াকে হিংসা করেন তারা। একটা দল কেবল এই কারণে আহত যে, এত কাঁচা রাজনীতি হয়ে গেছে ছেলেটাকে নিয়ে যে, এটা বিশ্রীভাবে মানুষের চোখে পড়ে। আর সবচেয়ে যারা বেশি আহত তারা রাজনীতির ঊর্ধ্বের মানুষ। একটা শিশুর দেশজোড়া অসহায় অভিভাবক। কিন্তু দিনের শেষে সবাই আহত। আহত এমন কি জয় নিজেও। সারা দেশের আঙ্গুলগুলো এখন তার দিকে। এই এত মানুষের এত আহত হওয়াকে যখন কেউ কেবলমাত্র খালেদা জিয়াকে অপমান করা হয়েছে ভাবার কারণে আহত বলেন, সেটাও মস্ত অপরাধ। জয় যদি অপরাধ করে ছেলেটির ভবিষ্যত জ্যান্ত পুড়েন, এ দলটি সেখানে সহানুভূতি তো দেখায়ই না, বরং আলু নিয়ে বসে থাকে পুড়ে ভর্তা খাবে বলে।

এ কোন দেউলিয়া রাজনীতির কবলে দেশ?

-মেরী জোবায়দা, সাবেক প্রোগ্রাম ম্যানেজার, টাইম টেলিভিশন, নিউ ইয়র্ক।

আরও পড়ুন- হিজাব ও ছাত্রলীগ