Home ইসলাম মাহে শা’বান ও শবে-বরাত: যা করবেন এবং যা করবেন না

মাহে শা’বান ও শবে-বরাত: যা করবেন এবং যা করবেন না

0

।। মুফতি নূর আহমদ ।।

সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য এবং শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর মনোনীত বান্দা আম্বিয়ায়ে কিরামের উপর।

প্রকাশ থাকে যে, সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা পরওয়ার দিগারে আলম। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই সৃষ্টি করেন। অতঃপর এসব সৃষ্টি বস্তুর মধ্য থেকে যেগুলোকে তিনি ইচ্ছা করেন মনোনীত ও নির্বাচিত করে নেন। যেমন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাকুলকে সৃষ্টি করে তন্মধ্যে হযরত জিব্রাঈল (আ.), হযরত ইস্রাফীল (আ.), হযরত মীকাঈল (আ.) ও হযরত আজরাঈল (আ.)কে বিশেষভাবে মনোনীত ও নির্বাচিত করেন। এমনিভাবে মানবকুলের মধ্য থেকে আম্বিয়ায়ে কিরামকে বিশেষ করে হযরত ইব্রাহীম (আ.), হযরত মূসা (আ.), হযরত ঈসা (আ.) এবং নবীকুল শিরোমনি খাতিমুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদ আরবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশেষ মর্যাদা ও পরিপূর্ণতা দানের মাধ্যমে মনোনীত ও নির্বাচিত করেন।

তদ্রুপ আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্ট পর্বতসমূহের মধ্য থেকে ‘তূরে ছাইনা’ ও ‘জাবালে হেরা’কে বিশেষ মর্যাদা দান করেন। এমনিভাবে নগরসমূহের মধ্যে হারামাইন শরীফাইন অর্থাৎ মক্কা নগরী ও মদীনা নগরীকে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেন।

অনুরূপ দিবসসমূহের মধ্য থেকে আরাফা দিবস ও আশুরা দিবসকে বিশেষ মাহাত্ম্য দান করেন। চান্দ্র মাসসমূহের মধ্য থেকে রমযানুল মুবারক ও শা’বানুল মুয়ায্যামকে বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান প্রদান করেন। একইভাবে রাতসমূহের মধ্য থেকে শবে-ক্বদর ও শবে-বরাতকে বিশেষ মর্যাদা ও বরকতময় করেন।

মাহে শাবানের মাহাত্ম্য ও মর্যাদা

হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহে শা’বানে এত বেশী পরিমাণ রোযা রাখতেন, যা রমযান ব্যতীত অন্য কোন মাসে রাখতেন না। একারণেই মাহে শা’বানকে হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের দিকে ও মাহে রমযানকে আল্লাহর দিকে সম্বন্ধযুক্ত করেছেন।

হযরত উসামা বিন যায়েদ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, শা’বান আমার মাস (অর্থাৎ শা’বান মাসের রোযা আমার পক্ষ থেকে সুন্নাত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে)। আর রমযান আল্লাহর মাস (কেননা, রমযান মাসের রোযা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ফরয করা হয়েছে)।

এই শা’বান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশী বেশী রোযা রাখতেন। বিশেষ করে শবে-বরাত অর্থাৎ শা’বানের পনের তারিখ দিবসে রোযা রাখতেন এবং রাতে ইবাদতের জন্য খুব বেশী উৎসাহ প্রদান করতেন। এতদ্বিষয়ক কয়েকটি হাদীস এখানে উল্লেখ করা হল।

১. ইব্নে মাজাহ শরীফের উদ্ধৃতি দিয়ে মিশকাত শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আলী (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন শা’বানের মধ্যরাত্রি (শবে-বরাত) আগমন করে, তার দিবসে তোমরা রোযা পালন কর এবং রাতে আল্লাহর ইবাদতে দণ্ডায়মান থাক। কেননা, উক্ত দিবসে সূর্যা¯ের পর মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দুনিয়ার প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং জগদ্বাসীকে ডেকে ডেকে বলেন, হে মানব জাতি! আছ কি কেউ তোমাদের মধ্যে ক্ষমাপ্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। ওহে, আছ কি তোমাদের কেউ অভাবগ্রস্ত আমি তার অভাব পুরণ করে দেব। আছ কি কেউ বিপদগ্রস্ত আমি তাকে বিপদমুক্ত করব। আছ কি কেউ এই সমস্যায়, আছ কি কেউ ঐ সমস্যায়? অর্থাৎ এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক প্রয়োজনীয় বিষয় ও প্রত্যেক সমস্যার নাম ধরে ধরে বান্দাকে ডাকতে থাকেন। যেমন বলেন, আছ কি কোন ভিখারী? আমি তাকে দান করব। আছ কি কোন বিপন্ন? আমি তাকে আনন্দিত-আহলাদিত করব। এমনিভাবে সুব্হে সাদিক পর্যন্ত ডাকতে থাকেন। (ইব্নে মাজাহ, মিশকাত শরীফ-১১৫ পৃষ্ঠা)।

২. বাইহাকী শরীফে হযরত আবু বকর (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা শা’বানের মধ্য তারিখের (১৪ই শা’বান) রাতে বিশেষভাবে প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং মুশরিক ও হিংসা-বিদ্বেষকারী ব্যতীত সমস্ত গোনাহ্গারকে ক্ষমা করে দেন।

৩. হযরত আবু মূসা আশআরী (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা শা’বানের পনের তারিখ অর্থাৎ শবে-বরাতে দুনিয়াবাসীর প্রতি রহ্মতের দৃষ্টি ফেলেন এবং মুশরিক ও হিংসা-বিদ্বেষকারী ব্যতীত সকল মাখলুকের গোনাহ ক্ষমা করে দেন। অন্য রিওয়ায়াতে আছে, হিংসা-বিদ্বেষকারী এবং অন্যায়ভাবে হত্যাকারী ব্যতীত সমস্ত মাখলুককে ক্ষমা করে দেন।

৪. উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাযি.) বলেন- একবার আমি রাতের বেলা (সেদিন হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরেই ছিলেন) হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বিছানায় খোঁজার পর হঠাৎ দেখি, তিনি জান্নাতুল বাকী নামক কবরস্থানে অবস্থান করছেন। আমাকে দেখেই হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি আল্লাহ এবং তার রাসূলের পক্ষ থেকে তোমার উপর কোন প্রকার যুলুমের আশংকা করছ? আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি ধারণা করেছিলাম যে আপনি হয়তো অন্য কোন বিবির ঘরে তাশরীফ নিয়েছেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা ১৪ই শা’বানের রজনীতে দুনিয়ার আসমানে অর্থাৎ প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বনী ক্বালব নামক গোত্রের বকরীসমূহের পশমের চেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করে দেন। (তিরমিযী, ইব্নে মাজাহ। অন্য এক রিওয়ায়াতে আছে, যাদের প্রত্যেকের উপর জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গিয়েছিল এমন মানুষদেরকে ক্ষমা করে দেন। (মিশকাত শরীফ-১১৫)।

৫. উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, তুমি কি জান, এই রাত অর্থাৎ ১৪ই শা’বানের রাতটি কি? আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার তো এ সম্পর্কে জানা নেই। আপনিই বলুন। অতঃপর হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আদম সন্তান যারা এই বছর জন্মগ্রহণ করবে তাদের ব্যাপারে এই রাতে লেখা হয়ে থাকে এবং যারা মৃত্যুবরণ করবে তাদের কথাও এই রাতেই লেখা হয়ে থাকে। আর এই রাতেই বান্দাদের আমল আল্লাহর নিকট পৌঁছে এবং এই রাতেই তাদের রিযিক দুনিয়ায় অবতরণ করা হয়। (মিশকাত শরীফ-১১৫)।

উলামায়ে কিরাম লেখেন, পূর্ণ এক বছর বনী আদমের যা কিছু সংঘটিত হবে, যেমন- তার মৃত্যু, তার রিযিক, তার জন্ম ইত্যাদি সকল বিষয়াবলী বিস্তারিতভাবে এই রাতে লিপিবদ্ধ করা হয়। এবং প্রত্যেক বিভাগের দায়িত্বশীল ফেরেশতাগণের নিকট তা হস্তান্তর করা হয়। যেমন- হযরত আ’তা ইব্নে ইয়াসার (রাযি.) বর্ণনা করেন, যখন বরাতের রজনী আগমন করে তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে একটা তালিকা মালাকুল মউত হযরত আজরাঈল (আ.)কে প্রদান করা হয় এবং তাকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, এই তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের রূহ যেন এ বছর কবজ করা হয়। আর মানুষ বৃক্ষ রোপণ করে, বিবাহশাদী করে, বড় বড় সুন্দর সুরম্য অট্টালিকা তৈরী করতে থাকে, অথচ তার নাম মৃত্যুবরণ কারীদের তালিকায় উঠে গেছে।

শাইখ আব্দুল কাদের জিলানী (রাহ.) বলেন, পৃথিবীতে মুসলমানদের জন্য দু’টি ঈদ দিবস রয়েছে। একটি হচ্ছে ঈদুল ফিত্র অপরটি হচ্ছে ঈদুল আযহা। এমনিভাবে আকাশবাসী ফেরেশতাকুলের জন্য দু’টি ঈদ রজনী রয়েছে। একটি হচ্ছে ক্বদর রজনী অপরটি হচ্ছে বরাত রজনী। মু’মিনদের জন্য ঈদ তথা আনন্দের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে দিবসে আর ফেরেশতাগণের জন্য করা হয়েছে রাতে। কারণ মানুষ রাতের বেলা নিদ্রা যায়, আর ফেরেশতাগণ কখনই নিদ্রা যান না।

উল্লিখিত হাদীসগুলোর মধ্যে কয়েকটি হাদীস যদিও সনদের দিক দিয়ে কিছুটা দুর্বল কিন্তু মওজু’ তথা বানোয়াট ও মনগড়া মোটেই নয়। আর ফযীলতের বেলায় দুর্বল হাদীসও উলামায়ে কিরামের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত মোতাবেক গ্রহণযোগ্য। দ্বিতীয়তঃ কুরআনের আয়াত এবং কিছু বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারাও শবে বরাতের সমর্থন পাওয়া যায়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সুরায়ে দোখানে ইরশাদ করেনঃ “হা-মীম, শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, আমি একে অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরিকৃত হয়।” (সূরা দোখান, ১-৪)।

উল্লিখিত আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় বরকতময় রাত সম্পর্কে এক দল মুফাস্সিরীনে কিরাম বলেন, এখানে বরকতময় রাত দ্বারা শবে-বরাত বোঝানো হয়েছে। তাই উল্লিখিত আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলীর ব্যাপারে যেমন এই রাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় তদ্রুপ কুরআন অবতীর্ণ করার সিদ্ধান্তটিও এ রাতেই গ্রহণ করা হয়। আর ক্বদর রাতে গৃহীত সিদ্ধান্তটির বাস্তবায়ন করা হয়। তাই ক্বদর রজনীতে কুরআন অবতীর্ণ করণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং শবে-বরাতে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ উভয়ের মধ্যে আর কোন সংঘাত নেই। অতএব যে রজনী সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন- এই রাতটি বরকতময় এবং সাথে সাথে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও উক্ত রজনীতে ইবাদত ও দিবসে রোযা পালনের উৎসাহ প্রদান করেন, সেই রাতটি উত্তম ও বরকতময় হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ কোথায়?

আল্লামা ইবনুল জাওযী (রাহ.) ব্যক্তিগতভাবে হাদীসের ব্যাপারে অতি সতর্কতা ও কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। যে কারণে তিনি সিহাহ সিত্তাহ’র অনেক বিশুদ্ধ হাদীসকেও মওজু’ তথা বানোয়াট বলে আখ্যায়িত করেছেন। হাদীসের ব্যাপারে আল্লামা ইব্নুল জাওযী (রাহ.)এর তাহ্কীক ও অনুসন্ধান জমহর উলামায়ে কিরাম বিশেষ করে হানাফী মাযহাবের উলামায়ে কিরামের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।

হযরত শাইখ আব্দুল হক্ মুহাদ্দিসে দেহ্লভী (রাহ.) ‘শরহে সীরাতে’র ভূমিকায় এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। অতএব ১৪ই শা’বান দিবাগত রাত অর্থাৎ শবে-বরাত সম্পর্কিত হাদীসগুলোর প্রতি আল্লামা ইবনুল জওযী (রাহ.)এর উত্থাপিত বানোয়াটের প্রশ্নটি গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, ইব্নুল জাওযীর এসব অগ্রহণযোগ্য তাহ্কীকগুলোকে অনেকে ‘হিদায়াতুল ইবাদে’র টিকায় পর্যন্ত উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তারা একথা ভাবেন নি যে কোথাকার কথা কোথায় উল্লেখ করা হচ্ছে। যুগের ব্যবধান রয়েছে অন্যথায় যদি ইবনুল জাওযী (রাহ.) এ যুগে থাকতেন, তাহলে হযরত মুফতী আযম ফয়যুল্লাহ (রাহ.)এর শিষ্য হওয়াকে নিজের জন্য গৌরব মনে করতেন।

হযরত মুফতী আযম (রাহ.) প্রত্যেক বিষয়ে ইমাম হওয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কিন্তু আমরা হযরতের যথাযথ মূল্যায়ন করিনি। অতএব কুরআনে কারীমের আয়াত ও উল্লিখিত হাদীসগুলো দ্বারা শবে-বরাতের ফযীলত ও তার উত্তম এবং বরকতময় হওয়াটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। তবে এর বরকত ও ফযীলত লাভের জন্য পূর্বশর্ত হচ্ছে তা শরীয়ত সম্মতভাবে পালন করতে হবে এবং শরীয়ত বিরোধী কার্যকলাপ হতে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকতে হবে। অন্যথায় পুণ্যের পরিবর্তে গোনাহই হবে।

শবে-বরাতে আল্লাহ তাআলা সকল গোনাহ্গারদের ক্ষমা করবেন। কিন্তু কিছু সংখ্যক ব্যক্তি উক্ত পুণ্যময় রজনীতেও ক্ষমা পাবে না। তারা হচ্ছে, ১. মুশরিক অর্থাৎ যারা আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে। ২. হিংসা-বিদ্বেষকারী। ৩. পিতা-মাতার নাফরমান অর্থাৎ অবাধ্য সন্তান। ৪. অহংকারের বশবর্তী হয়ে টাখনুর (পায়ের গিরার) নীচে পায়জামা-লুঙ্গি পরিধানকারী। ৫. মদখোর। ৬. আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী, যদি তা দ্বীনের জন্য না হয়। ৭. যাদুকর। ৮. গণক, যারা ভবিষ্যদ্বাণী করে। ৯. অন্যায়ভাবে টেক্স আদায়কারী। ১০. হস্তরেখা দেখে অদৃশ্যের সংবাদ প্রদানকারী। ১১. অত্যাচারী সিপাহী। ১২. ঢোল-তবলা-হারমোনিয়াম ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বাদক। ১৩. তাস খেলোয়াড়। ১৪. আক্বীদাগত বিদ্আতী প্রমুখ।

এসব মানুষের গোনাহ শবে-বরাতেও ক্ষমা করা হয়না। হ্যাঁ, তারা যদি খাঁটি অন্তরে তাওবা করে নেয় অর্থাৎ উক্ত অন্যায় কাজ যদি সাথে সাথে পরিত্যাগ করে এবং এ ব্যাপারে লজ্জিত-অনুতপ্ত হয়ে ভবিষ্যতে এরূপ পাপকর্ম না করার দৃঢ় সংকল্প করে নেয় এবং যদি হঠাৎ কখনো করেই ফেলে, তবে সাথে সাথে পুনরায় তওবা করে নেয়। এরূপভাবে তাওবা করার দ্বারা তাদের গোনাহ মাফ হওয়ার আশা করা যায়।

মাহে শাবানের সুন্নাত আমলসমূহ

শা’বান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশী রোযা রাখতেন। এ ব্যাপারে হাদীসে আছে, হযরত উম্মে সালমা (রাযি.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ও শা’বান ব্যতীত অন্য কোন সময় একাধারে দুই মাস রোযা রাখতে দেখি নি। (মিশকাত শরীফ)।

অন্য হাদীসে আছে, হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এটা খুব পছন্দনীয় ছিল যে, তিনি শা’বানের রোযা রাখতে রাখতে রমযান পর্যন্ত পৌঁছে যেতেন।

তবে একথা স্মরণযোগ্য, মাহে শা’বানে অধিক পরিমাণ রোযা রাখাটা এক প্রকার হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষত্ব ছিল। উম্মতের জন্য ধারাবাহিকভাবে দুই মাস রোযা রাখা সম্ভব নয়। তারপরেও যিনি সক্ষম এবং রমযানের রোযার মধ্যে কোন প্রকার ব্যাঘাত হওয়ার আশঙ্কা না থাকে, তাহলে তার জন্য যথাসাধ্য রোযা রাখা জায়েয। আর প্রত্যেক চান্দ্র মাসের ১৩. ১৪. ও ১৫ তারিখ অর্থাৎ আইয়্যামে বিয়াযের রোযা রাখা তো মুস্তাহাব। যদি সব কয়টি রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে কমপক্ষে ১৫ তারিখের রোযাটা তো রাখা উচিত। যাতে এই মাসের বরকত হতে বঞ্চিত হতে না হয়।

শবে-বরাতের সুন্নাত আমলসমূহ

হাদীসের ভাষ্য দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, এই রাতে হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে তিনটি আমল প্রমাণিত।

১। ১৪ই শা’বান রাতে কবরস্থানে গমন করা এবং কোন প্রকার আবশ্যক ও গুরুত্বপূর্ণ মনে না করে, দলবদ্ধভাবে না হয়ে কবর যিয়ারতান্তে মৃতের জন্য দোয়া ইস্তিগফার করা।

২। এই রাতে জাগ্রত থেকে আল্লাহ তাআলার ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকা। কুরআন তিলাওয়াত করা, বেশী বেশী দরূদ শরীফ পাঠ করা এবং যথাসম্ভব নফল নামায পড়া। কিন্তু এই নফল নামায পূর্ব নির্ধারিত রাকাআত ও সূরা ব্যতীত জামাআতের মাধ্যমে না হয়ে একাকী পড়তে হবে। সাথে সাথে নিজের জন্য এবং সকল মুসলমানের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করা। নিজের গোনাহর জন্য তাওবা-ইস্তিগফার করা। বিশেষতঃ সেসব গোনাহ থেকে তাওবা করা যেগুলো বিদ্যমান থাকার কারণে এই বরকত ও পুণ্যময় রাতে দোয়া কবুল হয় না। আর দীর্ঘ সময় নামায পড়তে ইচ্ছুক ব্যক্তিবর্গের সালাতুত্ তাস্বীহ পড়া উচিত। আল্লাহর ভয়ে কেঁদে কেটে পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততির জন্য এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আঞ্জাম দেওয়ার শক্তি লাভের জন্য আল্লাহর শাহী দরবারে দোয়া প্রার্থনা করা। বিশেষভাবে এই দোয়াটি পাঠ করাঃ “আল্লাহুম্মা ইন্নি আঊযু বিআ’ফুয়্যিকা মিন ঈক্বাবিকা ওয়া আঊযু বিরিযা-কা মিন সাখাত্বিকা ওয়া আঊযুবিকা মিনকা জাল্লা ওয়াজহুকা লা-আহ্ছী ছানা-আন্ আ’লাইকা আন্তা কামা আছনাইতা আ’লা নাফ্সিকা”।

৩। শবে-বরাতের পরের দিন অর্থাৎ পনের তারিখ দিনে নফল রোযা রাখা।

শবে-বরাতসহ অন্যান্য বরকতময় রজনীগুলোতে পূর্ণ রাত জেগে থাকা যদি কষ্টকর হয়, তাহলে যতটুকু সম্ভব জেগে থেকে ইবাদত করবে। এবং ঈশা ও ফজর নামায জামাআতের সাথে পড়বে, তাহলে পূর্ণ রাত ইবাদতের সাওয়াব লাভ করবে। (ফাতওয়ায়ে শামী)।

ইমাম শা’রানী (রাহ.) বলেন, হুযর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতে মুহাম্মদী থেকে অঙ্গিকার নিয়েছেন যে, তারা যেন শবে-বরাত, শবে-ক্বদর ইত্যাদি পুণ্যময় রজনীগুলোতে ক্ষুধার্ত থাকাকে অবলম্বন করে ইবাদতে মশগুল থাকে।

শবে-বরাতের কুসংস্কার ও বর্জনীয় কর্মসমূহ

* অনেক স্থানে দেখা যায়, শবে-বরাতে জাগরণের জন্য ফরয ইবাদতসমূহের চেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষ একত্রিত করার ও ডাকাডাকির বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। নফল ইবাদতসমূহের জন্য এরূপ গুরুত্ব ও আবশ্যকতা দেখানো ও গুরুত্বের সাথে একত্রিত করা ও ডাকাডাকি করা জায়েয নেই বরং এটা বিদ্আতে সায়্যিআহ।

* এমনিভাবে এসকল নফল ইবাদত সমূহের জন্য মসজিদে সমবেত হওয়া ও রাতজাগা যেমন, বর্তমানে এটা রেওয়াজ ও প্রথায় পরিণত হয়েছে। এটাকে অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম মাকরূহ লিখেছেন। সাল্ফে সালিহীন হতে এর কোন প্রমাণ নেই বরং র্দুরে মুখতারে বলা হয়েছে, বরকতময় রজনীগুলোতে একা একা ইবাদত করা ও জাগ্রত থাকা মুস্তাহাব।

* এমনিভাবে নফল নামাযসমূহ জামাআতের সাথে পড়া মাকরূহে তাহ্রীমী, যখন চারজন হতে অধিক মানুষের জামাআত হয়। আর যদি তার জন্য দাওয়াত দেওয়া হয়, তাহলে এক ব্যক্তিও জামাআতে শরীক হওয়া মাক্রূহ হবে।

* নফল নামাযের কোন নির্ধারিত পরিমাণ নেই। পরিমাণ নির্ধারণ করা মাকরূহ।

* মূলতঃ যখন উক্ত রজনীতে জাগ্রত থেকে ইবাদতের জন্য হুকুম করা হয়েছে, তাই শুধুমাত্র ওয়াজ-নসীহত করে রাত কাটালে মাকরূহ হবে। সালফে সালিহীনগণ হতে এই রাতে ওয়াজ-নসীহতের মাধ্যমে রাত কাটানোর কথা কোথাও উল্লেখ নেই।

* মূলতঃ যখন এই রাতে বেশী বেশী পরিমাণ ইবাদত করার কথা বলা হয়েছে, তাই হালকা-পাতলা থাকা উচিত। অস্বাভাবিক পানাহার দ্বারা উদরপূর্তিতে অলসতা ও দুর্বলতা সৃষ্টি হয়। এজন্য এই রাতে ভাল খাবার তৈরী করে মাত্রাতিরিক্ত ভাবে উদরপূর্তি করে খাবার খাওয়া এবং অনুরূপভাবে অন্যদেরকে খাওয়ানো মাকরূহ।

* এই রাতে হালুয়া-রুটি তৈরী করা, মোরগ-মুরগী, গরু-ছাগল ইত্যাদি জবাই করা ইত্যাদি সুন্নাত পরিপন্থী। আর হালুয়া-রুটি তৈরীর এই কুপ্রথা আমাদের সমাজে শিয়াদের কাছ থেকে অনুপ্রবেশ করেছে। এই প্রথাটি অনেক এলাকায় এমন বাধ্যবাধকতার সাথে পালন করা হয় যে, সেদিন যদি হালুয়া-রুটি তৈরী করা না হয়, তাহলে তাদের শবে-বরাতই যেন পালন হয় না। যদ্দরুন অনেক স্থানে শা’বান মাসকে রুটির মাস বলা হয়। পুণ্যকর্ম ও জরুরী মনে করে এরূপ হালুয়া-রুটি তৈরী করা বিদ্আত ও মাকরূহ।

* বিশেষ বরকতময় রজনীগুলো যেমন- শবে-বরাত, শবে-ক্বদর ইত্যাদি রজনীগুলোতে কুরআন খতমের আয়োজন করে আলোকসজ্জা করা সম্পূর্ণরূপে বিদ্আত ও শরীয়ত পরিপন্থী। কেননা, এরূপ আলোকসজ্জার মধ্যে অগ্নিপূজকদের সাথে এবং হিন্দুদের লক্ষ্মীপূজার মধ্যে যে দীপাধার জ্বালানো হয়, সেগুলোর সাথে সাদৃশ্য হয়ে থাকে। হাদীস শরীফে কাফিরদের সাথে সাদৃশ্যতা সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারী বর্ণিত হয়েছে। আর মসজিদগুলোতে এরূপ আলোক সজ্জা করার দ্বারা এগুলো খেল-তামাশা ও ঠাট্টা-বিদ্রূপের স্থানে পরিণত হয়। এতে ছোট ছোট বাচ্চা ও গণ্ডমূর্খ লোকেরা মসজিদে হৈ-চৈ-শোরগোল করতে থাকে।

* প্রচলিত কুপ্রথাসমূহ যেগুলো বর্তমানে পবিত্র ও বরকতময় রজনীগুলোতে পালিত হয়ে থাকে, যেমন- মসজিদে ফিরনী, মিষ্টান্ন ইত্যাদি বিলানোর কুপ্রথা, এগুলো সম্পূর্ণরূপে বর্জনীয়।

* অনেক স্থানে দেখা যায়, শবে-বরাত ও শবে-ক্বদরসহ অন্যান্য বরকতময় রজনীগুলোতে আতশবাজী করা হয়। অথচ এগুলো মাকরূহ তথা নিষিদ্ধকর্ম।

* অনেক এলাকায় এ প্রথাটিরও প্রচলন দেখা যায় যে, শবে-বরাত ইত্যাদি বরকতময় দিবস উপলক্ষে মুসলমানরা তাদের ঘর-বাড়ী মেরামত করে, লেপা-মোছা ও রং-বেরঙের আল্পনা আঁকার বিশেষ ব্যবস্থা করে। এভাবে প্রতি বছর এসব দিনগুলোতে ঘর-বাড়ী সজ্জিত করা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এগুলো সম্পূর্ণরূপে হিন্দুয়ানী রীতি-নীতি। যা বর্জন করা মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য।

* অনেকে এই আক্বীদা পোষণ করে যে, বরাত রজনীতে মৃতলোকদের আত্মাসমূহ বাড়ী-ঘরে আগমন করে। অথচ কুরআন-হাদীসের আলোকে এই আক্বীদা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এর সামান্যতম প্রমাণও কোথাও নেই।

আমাদের মুসলমানদের প্রত্যেক আমলের ক্ষেত্রে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ও তরীকাকে সামনে রেখে চলা বাঞ্ছনীয়। এর মধ্যেই রয়েছে আমাদের উভয় জগতের সফলতা ও কামিয়াবী। যেমন কবি কলেছেন-

নবীর পথের বিপরীত চলিবে যে জন

মঞ্জিলে মাকসুদে কভু পৌঁছবে না সে জন।

– মুফতি নূর আহমদ, প্রবীণ মুফতি, মুহাদ্দিস ও বিভাগীয় প্রধান- ইসলামী আইন ও গবেষণা বিভাগ, দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

মহান আল্লাহর কুদরত ও মহিমা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.