Home ধর্মতত্ত্ব শয়তান যেভাবে গুনাহের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করে

শয়তান যেভাবে গুনাহের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করে

0

।। মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস ।।

আমরা সবাই জানি যে, আল্লাহ তাআলা মানুষ ও জ্বিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য। তাই আমাদেরকে শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করতে হবে; অন্য কারো ইবাদত করা যাবে না। আর তা সম্ভব যদি আমরা প্রতিটি কাজে দু’টি শর্ত মেনে চলি। (১) কাজটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধান মোতাবেক হতে হবে। (২) নিয়্যাত খালেস বা একনিষ্ঠ হতে হবে। কারণ ইখলাস ছাড়া কোন ভাল কাজও আল্লাহ কবুল করেন না। আবার আল্লাহর হুকুমের বাইরে গিয়ে খালেস বা একনিষ্ঠ হয়ে কাজ করলেও সাওয়াব পাওয়া যায় না, গুনাহই হয়ে থাকে। আরেকটু পরিস্কার করে বলা যায় যে, আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুকুমের বাইরে গিয়ে নামায পড়লেও তা ইবাদত হবে না। আবার নির্ভেজাল মন নিয়ে চুরি করে দান করলেও সাওয়াব হবে না। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই এ দুই বিষয় মানা হয় না। বরং উল্টা ব্যাখ্যা করা হয়। যেমন- একজন বেগানা নারীর সাথে কেউ ঘুরে বেড়ায় বা আড্ডা মারে, আবার বলে যে, আমাদের মন ফ্রেশ আছে। কিন্তু এখানে তো মন ফ্রেশের কারণে কাজটি জায়েয হয়ে যাবে না। কারণ আল্লাহ তাআলা তো শুধু মন দেখেন না, কাজও দেখেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের চেহারা-সুরত ও ধন-সম্পদের দিকে তাকাবেন না, বরং তিনি দেখবেন তোমাদের অন্তর ও আমল। (মুসলিম শরীফ)।

তাহলে বোঝা গেল, শুধু মন ঠিক থাকলে হবে না, কাজও আল্লাহর বিধান মোতাবেক হতে হবে। অন্যথায় চুরি করে পুরোটাই ফ্রেশ মনে দান করে দিলে সাওয়াব হওয়ার কথা। কিন্তু তা তো হবে না। কারণ, তাতে আল্লাহর বিধান লঙ্ঘিত হয়। এভাবে আল্লাহর বিধান থেকে বিমুখ হয়ে নামায রোযা করলেও ইবাদত হয় না। যেমন, নিষিদ্ধ সময়ে নামায পড়লে বা নিষিদ্ধ দিনে রোযা রাখলে ইবাদত তো হবেই না; বরং গুনাহ হবে। সুতরাং আমল ও নিয়্যাত উভয়টির বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে হবে।

এ জন্য আমাদেরকে প্রতিটি কাজের বিধি-বিধান বা আল্লাহর হুকুম জানতে হবে। তাঁর বিধান মত হয় কি-না, তা বুঝার জন্য আমাদের এই জ্ঞান থাকা ফরয। সেই জ্ঞানার্জনের ফরয পালন না করে আল্লাহ ক্ষমা করবেন বলে আশা নিয়ে বসে থাকা শয়তানের সাফল্য এনে দেওয়ারই নামান্তর।

আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃজন করলেও আমাদের কাছে তিনি খুব বেশী সময় চাচ্ছেন না। শুধু মাত্র প্রতিটি কাজ তাঁর হুকুম মত করার মানসিকতা এবং দৈনন্দিন নামায রোযা ইত্যাদি আদায় করা। এ জন্য তো খুব বেশী সময় ব্যয় হয় না। আল্লাহ যেমন কঠিন বিধান দেননি তেমনি সময়ও বেশী চাননি। বরং দুনিয়ার কাজই বেশী কঠিন ও ব্যয়বহুল। কিন্তু আমরা তো তাও দিতে রাজি না। কেউ কারো জন্য কোন উপকার করলে সারা জীবন সে মনে রাখে বা তারও কোন উপকার করতে চেষ্টা করে। নইলে সে নিমক-হারাম হয়ে যায়। আর আল্লাহ যে আমাদের এত উপকার করলেন, যার সাহায্য ছাড়া আমরা একটি সেকেন্ড বাঁচতে পারি না, যিনি আমাদের বেঁচে থাকার সর্বপ্রকার প্রয়োজন পুরো করলেন, তাঁর ইবাদত না করে আমরা কি নিমক-হালালী করছি? কোন ডাক্তার সামান্য চিকিৎসার মাধ্যমে কোন অসুখ বা একটিমাত্র অঙ্গ ভাল করলে, তার কাছে সারা জীবনের জন্য কৃতজ্ঞ হয়ে থাকি; আর যিনি আমাদেরকে এতগুলো অঙ্গ দিলেন এবং এত দিন থেকে সচল রাখলেন, তাঁর জন্য কি করছি? তাঁর জন্য পাঁচ ওয়াক্তের নামাযটা পড়ার সময় আমরা বের করতে পারি না। শুধু দুনিয়া দুনিয়া করে আমাদের সময় শেষ। এমনকি কবর পর্যন্ত চলে যাই। তাই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেনঃ প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে (আল্লাহর ইবাদত থেকে) গাফিল রাখে। এমনকি তোমরা কবর পর্যন্ত চলে যাও। এটা কখনোই উচিত নয়। (সূরা তাকাসুরঃ ১-৩)।

সূরা তাকাসুর ও মুনাফিকূনের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আরো সতর্ক করে জানালেন যে, এক সময় তোমাদের টনক নড়বে, যখন জাহান্নাম দেখবে। তখন ঈমান নয়, একেবারে ইয়াক্বীন হয়ে যাবে। কিন্তু তখন আর লাভ হবে না। তাই সময় থাকতেই সতর্ক হও। সেই সময় আসার আগেই আল্লাহর রাস্তায় জান, মাল ও সময় ব্যয় কর, যখন তোমাদের কারো মৃত্যু এসে যাবে আর বলবে, হে আমার রব! আমাকে আরো কিছু সময় দিলে না কেন? তাহলে আমি সাদকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। কিন্তু কারো নির্ধারিত সময় উপস্থিত হয়ে গেলে আল্লাহ কোন অবস্থাতেই আর অবকাশ দেন না।

৬০/৭০ বছরের জীবনে ইবাদত করার চিন্তা না করে মৃত্যুর সময় হা-হুতাশ করে লাভ হবে না। তাই শুধু মাল আওলাদের চিন্তা না করে আখেরাতের জন্য কি সঞ্চয় করা হয়েছে তার চিন্তা করতে হবে। (সূরা হাশরঃ ১৮)। অন্যথায় শুধু দুনিয়া দুনিয়া করেও পেট ভরবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- আদম সন্তানের যদি স্বর্ণে পরিপূর্ণ একটি উপত্যকা থাকে, তবে সে (তাতেও সন্তুষ্ট হবে না, বরং) দু’টি উপত্যকা কামনা করবে। তার মুখ তো (কবরের) মাটি ব্যতীত অন্য কোন কিছু দিয়ে ভর্তি করা সম্ভব নয়। বস্তুতঃ যে আল্লাহর দিকে রুজু করে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করে থাকেন। (বুখারী শরীফ)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন- মানুষ বলে আমার সম্পদ, আমার সম্পদ, অথচ তোমার অংশ তো ততটুকুই, যতটুকু তুমি খেয়ে শেষ কর অথবা পরিধান করে ছিন্ন করে ফেল অথবা সাদকা করে সম্মুখে পাঠিয়ে দাও। এছাড়া যা আছে, তা তোমার হাত থেকে চলে যাবে, তুমি অপরের জন্য তা ছেড়ে যাবে। (ইব্নে কাসীর, তিরমিযী, আহ্মদ এর বরাতে মাআরিফুল কুরআন, সূরা তাকাসুর)।

বস্তুতঃ শয়তানই আমাদের মনের মধ্যে দুনিয়ার লোভ লালসা জাগিয়ে দেয় এবং ইবাদত-বন্দেগী করে তেমন লাভ হয় না বলেও বুঝায়। উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করে সমাজের আর দশ জন বেআমলী মানুষের জীবন ধারণ ও কর্মধারা। তাতে দেখানো হয়, যারা খারাপ কাজ করে তারাই তো ভাল আছে। তাদের ধন সম্পদের কোন কমতি নেই।

হ্যাঁ, শয়তান খুব সুন্দর যুক্তি উপস্থাপন করতে পারদর্শী। আর এ জন্য ঈমানদারদেরকে এ জাতীয় প্ররোচনা থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে শয়তানকে চিনতে হবে। কারণ, শয়তান মানুষের মধ্যে থেকেও হয়। আর তার কৌশলকে বুঝতে হলে ইসলামের মোটামুটি জ্ঞান থাকতেই হবে। তার যুক্তিগুলোকে কুরআন-হাদীসের আলোকে যাচাই করতে হবে। শুধু যুক্তি দিয়ে নয়। কুরআন-হাদীসের কথা বিনা যুক্তিতেই মেনে নেওয়ার মত মানসিকতা থাকতে হবে।

এবার শয়তানের যুক্তি ‘ধনীরা ভাল আছে’ সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করা যাক। [চলবে]

লেখক: প্রিন্সিপাল- জামিয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলূম নলজুরী, সিলেট এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মেসার্স আব্দুল মজিদ এন্ড সন্স, তামাবিল, সিলেট।

বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপন ধর্ষণের শামিল: ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের অভিমত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.