Home বুক রিভউ বই পর্যালোচনা: ‘এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্ট মডার্নিজম: চিন্তার অভিযাত্রা’

বই পর্যালোচনা: ‘এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্ট মডার্নিজম: চিন্তার অভিযাত্রা’

।। মনোয়ার মোস্তফা ।।

বইটি আমি খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। বেশ কয়েক বার পড়েছি। এক কথায় বলবো: বইটা ‘ভেরি ইন্টারেস্টিং‘। এটা আপনার চিন্তাকে দারুণভাবে নাড়া দেবে। এখানে যে সব ‘চিন্তা’র সমাবেশ ঘটানো হয়েছে, এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে, সেগুলি পিনাকী ভট্টাচার্যের মৌলিক চিন্তা। এ দাবি তিনি করেনও নি। বিগত কয়েক’শ বছর ধরে সভ্যতার হাত ধরে যে সব ‘চিন্তা’ উঠে এসেছে, বিশেষ করে পশ্চিমে, লেখক সেগুলিকে নিয়ে সুন্দর একটা ‘মালা’ গাঁথবার চেষ্টা করেছেন মাত্র। এই চেষ্টায় তিনি বেশ সফল- এমনটাই মনে হয়েছে।

তবে আমার ধারণা, বইটা লেখার ভেতর দিয়ে তিনি কয়েকটা এক্সপ্রিমেন্ট চালানোর চেষ্টা করেছেন। সুতরাং এই বই নিয়ে যখন আমি সামান্য কয়েকটা কথা বলবো, তখন মূলত: তিনটা দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার চেষ্টা করবো। এক: এই বইটা কি কায়দায় লিখা হয়েছে, তার মানে বইটা লেখার ‘ফর্ম’। দুই: এর বিষয়বস্তু কি, মানে কনটেন্ট কি? এর ভেতরে কি আছে? এবং তিন: বইটা আসলে আমাদের কি কাজে লাগবে?

শুরু করি বইটা লেখার ধরণ বা ফর্ম  নিয়ে। ধরণটা খুবই ইন্টারেস্টিং! এই ধরণটা যে একেবারেই নতুন তা না। আমাদের দেশেও এ কায়দায় অনেক বই লেখা হয়েছে। বিশেষ করে সে সব বিষয় নিয়েই এই ফর্মটা কাজ করে, যেটা খুব গুরু-গম্ভীর জটিল। এসব বিষয় নিয়ে সাধারণত: ‘পন্ডিতি কায়দায়’ যা লেখা হয়, তা সাধারণের বোধগম্য হয় না। আর বিশেষ করে করে তা যদি হয় দর্শন সংক্রান্ত, তাহলে সেটা আরও জটিল আকার ধারণ করে। কারণ, আপনারা দেখেছেন যে দর্শনের বেশির ভাগ বইগুলো যা বিজ্ঞজনরা লেখেন, তা খুবই জটিল ও র্দুবোধ্য ভাষায় লিখিত। এটা পিনাকী ভট্টাচার্যের এক্সপ্রিমেন্ট যে, উনি এ দূর্বোধ্য জিনিসকে সহজ করে সাধারণ মানুষের সামনে হাজির করার চেষ্টা করেছেন; এটা তার ‘এক্সিপ্রিমেন্ট’। এই ‘এক্সপ্রিমেন্ট’ যে তিনি নতুন করছেন, এমনটা নয়। আমি লেখকের আগের বইগুলোও পড়েছি। বিশেষ করে ‘সোনার বাংলার রূপালী কথা’ নামে যে বইটা আছে, যা মূলত: আমাদের বাঙ্গালীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পাঠ; সেখানেও এই ফর্মটা ছিল। তিনি তাঁর পুত্রের সাথে কথা বলছেন। পুত্রকে বুঝাচ্ছেন ইতিহাস কি? পিতা-পূত্র ইতিহাসের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, আর কথা বলছেন৷ এই ফর্মে হয়তো ইতিহাস বুঝানো যায়। কিন্তু দর্শন?

আমি খুব চমকে গিয়েছি যখন পূত্রকে দর্শন বুঝাচ্ছেন, দর্শনের ইতিহাসের ওপর দিয়ে হাঁটছেন দু‘জনে। এটা একটা দারুন ফর্ম। এই ফর্মটা আমরা পেয়েছিলাম অন্য একটা জায়গায়। একশত বছরেরও বেশি আগে বঙ্কিমচন্দ্র যখন ধর্মত্বত্ত লিখছিলেন, ধর্মত্বত্তের মতো জটিল দার্শনিক বিষয়গুলো বঙ্কিমও ঠিক এই ফর্মে লিখেছিলেন৷ তিনি গুরু-শিষ্যের সংলাপের ভেতর দিয়ে ধর্মত্বত্তের আলোচনা করেছিলেন। সেটাও ছিল খুবই কার্যকর। ধর্মত্বত্তের মতো এরকম জটিল ও দার্শনিক বিষয়াবলী সহজবোধ্য করে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে।

আজকের সময় ও প্রেক্ষিতটা ভিন্ন। পিনাকী ভট্টাচার্য হয়তো একই এক্সপ্রিমেন্টটাই করার চেষ্টা করলেন। ফর্মটা সব সময়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে জটিল-কঠিন বিষয়গুলোকে সহজবোধ্য করার জন্য এ ধরনের ডায়ালগ ফর্ম এর অপরিসীম গুরুত্ব আছে। আমরা জানি প্লেটো, সক্রেটিস প্রমূখেরা এই ডায়ালগ ফর্মটাকেই জ্ঞান চর্চার একটা অন্যতম ধারা হিসেবে নিয়েছিলেন। এবং পিনাকী ভট্টাচার্যের এই দর্শন বিষয়ক বইটার ভেতরে সে ফর্মটা আবিষ্কার করে, আমার আসলে খুবই ভালো লাগলো।

দ্বিতীয় যে জায়গাটা সেটা হলো ‘বিষয়বস্তু‘। এই বইয়ের ভেতরে কি আছে? আমি আগেই বলছি বইটার নাম ‘এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্টমর্ডানিজম: চিন্তার অভিযাত্রা’। তার মানে বুঝাই যাচ্ছে, এখানে এমন কতোগুলো গুরুগম্ভীর বিষয় এসে হাজির হয়েছে যেটা হয়তো সাধারণের বোধগম্য না। যা অন্তত: আমাদের বিদ্যমান যে লিটারেচার আছে, তা পড়ে বুঝা খুব শক্ত। কিন্তু তিনি এই শক্ত জিনিসটাকেই তিনি ‘তরল‘ বা সহজ করার চেষ্টা করছেন।

তিনি শুরুই করেছেন দর্শন কী জিনিস- এই প্রশ্ন দিয়ে।

বইটার মূল বিষয়বস্তু ‘উত্তর আধুনিকতাবাদ বা পোস্টমডার্নিজম’। কিন্তু বইয়ের ৭৫ ভাগই দেখবেন, পোস্টমডার্নিজম নিয়ে আলোচনা নয়। বরং পোস্টমডার্নিজমকে বুঝার জন্য অন্যান্য যে উপাদানগুলোর সাথে পরিচিত হওয়া দরকার তার সঙ্গে তিনি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন পূত্রকে।  মাত্র ২৫ ভাগ অংশে তিনি উত্তর আধুনিকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

মজার ব্যাপার হলো, ঐ ৭৫ ভাগ না জানলে পোস্ট মডার্নিজমে আসা যাবে না। এই সত্যটা উনার জানা ছিল বলেই, তিনি ঠিক এই ফর্মটাই বেছে নিলেন। তিনি পূত্রকে নিয়ে গেলেন, দর্শন কী সেটা বুঝাতে। সেই দর্শনের সূত্র ধরে চলে এলেন ‘আধুনিকতা’ কী, সেটা বলতে। ‘আধুনিকতা‘ বুঝতে গেলে যে জিনিসটা দরকার সেটা হচ্ছে ‘এনলাইটেনমেন্ট‘, সেটা জানা। কেউ কেউ এটাকে বলে ‘আলোকায়ন‘। পিনাকী ভট্ট্রাচার্য বলেছেন ‘জ্যোতির্ময় কাল‘। একটা নতুন শব্দ আমারা পেলাম। তিনি এ সময়কালটা যেমন বুঝিয়েছেন, ঠিক তেমনি এই ‘এনলাইটেনমেন্ট’ বা জ্যোতির্ময় কাল বলতে ঠিক কী বুঝায়, এর মূল মূল উপাদানগুলো কি, তার ব্যাখ্যা করলেন। এই এনলাইটেনমেন্ট এর ভেতর দিয়ে যে পশ্চিমা সভ্যতার বিকাশ ঘটলো- সেটাও দেখালেন। একই সাথে সেই সভ্যতার ভেতরে কীভাবে ফ্যাসিবাদের জন্ম হলো, সেই সূত্রটা তিনি ধরিয়ে দিলেন। এবং সেটা বলতে গিয়ে বললেন, এই ফ্যাসিবাদের বীজ হয়তো ঐ ‘জ্যোতির্ময়কাল‘র মধ্যেই নিহিত ছিলো।

এর পরে ফ্যাসিবাদকে আরও গভীরভাবে বুঝতে চেষ্টা করলেন। তিনি পুত্রকে টেনে নিয়ে গেলেন ‘পুঁজিবাদ‘ কি, সেটা বলতে। পুঁজিবাদ সংক্রান্ত আলোচনা করতে গিয়ে গিয়ে নতুন আরো কিছু শব্দ-ধারণার মুখোমুখি হলো পূত্র। সেটা ‘বুর্জোয়া’। এই ‘বুর্জোয়া‘ বুঝাতে বুঝাতে আলোচনায় এসে হাজির হলো- ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র’ কী জিনিস? তিনি পুত্রকে সেটাও বুঝালেন৷ তারপরে তিনি বললেন- বুর্জোয়া গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ বা এনলাইটেনমেন্ট- এগুলোকে আরও গভীরভাবে অনুধাবন করতে গেলে আরেকটা নতুন শব্দের সাথে পরিচিত হতে হবে৷ নতুন একটা ধারণার সাথে পরিচিত হতে হবে, যার নাম ‘ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদ’, আমরা যাকে বলি individualism। এই আলোচনাটাও তিনি করলেন৷

সবকিছু করার পর তিনি গোটা আধুনিকতার পিলারগুলোকে একটার পর একটা সাজালেন৷ এখান থেকে তিনি যে সিদ্ধান্তটা টানলেন, সেটা হলো আধুনিকতায় মানুষের চিন্তার একটা ‘প্যাটার্ন‘ তৈরি হয়৷ কীভাবে চিন্তা করতে হবে, কোনটা সঠিক, কোনটা বেঠিক, কোনটা আগে করা দরকার, কোনটা পরে করা দরকার- এই যে একটা ‘অডার্লী অ্যারেঞ্জমেন্ট‘, এটা পোস্ট মডার্ন চিন্তায় নাই। কেন নাই? কারণ, পৃথিবীটা আসলে ঐভাবে তৈরী না, পৃথিবীতে অনেক ধরনের ‘এনোমাইলিজ’ আছে, যেগুলো আমরা ঠিক মেলাতে পারি না। কিন্তু আধুনিকতা জোর করে সেটা মেলাবার চেষ্টা করে। সুতরাং ওর ভেতরে বোধ হয় কিছু কৃত্রিমতা আছে৷

এই প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি দার্শনিক দেরিদা‘কে নিয়ে এলেন, তার ‘দি কন্সট্রাকশান‘র ধারণাকে নিয়ে। এর আগেই মার্কসকে সামনে নিয়ে এসেছিলেন। এরকম বহু দার্শনিকদের আলোচনা করেই তিনি এই জায়গায় চলে এলেন যে, পোস্ট মডার্ণ ধারণাটার উদ্ভবই হয়েছে মূলত: আধুনিকতার যে Fundamental যে পিলারগুলো, যার উপরে সে দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোকে প্রশ্ন করার ভেতর দিয়ে।

এভাবে পিনাকী ভট্টাচার্য তার পূত্রকে টেনে নিয়ে গেলেন ‘পোস্ট মডার্ণ’ আলোচনার মধ্যে। তিনি সেখানে নানা উদাহরণ ও দার্শনিকদের বক্তব্য ধরে দেখালেন যে, খোদ আধুনিকতার ভেতরে থেকেই কীভাবে আধুনিকতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছিল। তিনি কার্ল মার্ক্সকে সামনে নিয়ে এলেন। বললেন, মার্ক্স কীভাবে আধুনিকতার গর্ভে জন্ম নেওয়ার পরও সেই আধুনিকতাকেই প্রশ্ন করতে শুরু করলেন৷ এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক।

এরপরেই তিনি পোস্ট মডার্নিজমের Fundamental কতগুলো জায়গা আলোচনা করলেন৷ মূলত: সেই আলোচনায় ‘দেরিদা’ একটা বড় জায়গা নিয়ে আছেন। উনি হয়তো মনে করেছেন, পোস্ট মডার্নিজমকে বুঝতে হলে দেরিদা ভালো উদাহরণ।  অন্যান্য আরও অনেকেই অবশ্য আছেন। তবে দেরিদা‘ই এখানে মূখ্য। অন্যদের আলোচনা থাকলে আরো ভালো হতো।

এ পর্যায়ে আমার মন্তব্য হলো: এখানে অনেকে ভুল বুঝতে পারেন, কিন্তু মনে রাখতে হবে ধারণা বা বিশ্লেষণী ক্যাটেগরি বা ডিসকোর্স হিসেবে ‘মডার্নিজম‘এককভাবে কোন দার্শনিকের প্রস্তাবনা নয়। এ কথা অবশ্য লেখক বিভিন্নভাবে বলেছেন। ‘আধুনিকতা’ যখন তৈরী হয়েছে, সেটা কোন একক ব্যক্তির লেখা নয়, বহুজনের একটা সময় ধরে লেখালেখি বা চিন্তার ফল হিসেবে আধুনিকতা হাজির হয়েছে। এবং তার ‘কমন ট্রেইট‘গুলো কি, কমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো কী, সেগুলো তিনি ঐ ৭৫ ভাগ অংশে বিবৃত করার চেষ্টা করেছেন। উত্তর আধুনিক পার্টে এসে যখন আলোচনা করছেন, তখনও অনেকের মনে হবে যে, এটা কি কেউ একজন বলেছেন যে, এগুলোই হচ্ছে ‘উত্তর আধুনিকতা’? না, তাও না। উত্তর আধুনিকতা নিয়ে যারা কাজ করেছেন, যারা লেখালেখি করেছেন, চিন্তা করেছেন, সেটাও কোন একক ব্যক্তির জায়গা থেকে আসেনি, একাধিক ব্যক্তির লেখনির ভেতর দিয়ে সেগুলো হাজির হয়েছে। এবং সেখান থেকে কতগুলো ‘কমন ট্রেইট’ বা কমন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। এটা হচ্ছে একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা এই বইটা পড়ার সময় আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে।

এখান থেকে তিনি একটা Fundamental প্রশ্ন তুলেছেন পুত্রের জবানিতে। প্রশ্নটা হল- তাহলে কি আধুনিকতা শেষ হয়ে গেছে? আমাদের পোস্ট মডার্ণ যুগ শুরু হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে পিনাকী ভট্টাচার্যের বক্তব্যটা খুব স্পষ্ট। যার সাথে সবাই হয়তো একমত হবেন না। তিনি বলছেন, একটা চিন্তা শেষ হওয়ার পরে আরেকটা চিন্তা শুরু হয় – ব্যাপারটা এরকম নয়। খোদ আধুনিকতার ভেতরে ‘উত্তর আধুনিক’ চিন্তার বীজ তৈরি হয়েছে। সেখান থেকে মানুষ প্রশ্ন করতে শিখেছে। তিনি কার্লমার্ক্সকে বার বার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। খোদ পশ্চিমা চিন্তা কাঠামো বা আধুনিকতার ভেতরে জন্ম নেওয়ার পরও তিনি (মার্কস) আধুনিকতার fundamental কতগুলো বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে প্রথম খড়ক হাতে নেমেছিলেন।

বইয়ের ‘মোস্ট ইন্টারেস্টিং’ একটা অংশটা সবার শেষে। এর আগে শুধু এটুকু বলেছি যে, বইটা শুরু হয়েছিল তার পূত্রের সাথে কথোপকথন-এর ভেতর দিয়ে। সন্তান ছোট। এখনো কম্পিউটারে ‘গেম‘ খেলে। পূত্রের উপর্যপুরি অনুরোধে ‘প্লে-স্টেশন‘ কিনে দেওয়া হয়েছিলো তাকে। পিনাকী ভট্টাচার্যের প্রথমে মনে হয়েছিলো, এই ‘প্লে-স্টেশন’ একটা ফালতু জিনিস। পুত্রের সাথে কয়েকদিন খেলেছেন, বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে একদিন তিনি অফিস থেকে সন্তানকে ফোন করে বললেন, ‘বাবা তুমি এটা খেল, আমার কোন আপত্তি নেই’।

ছেলে চমকে যায়। বাবার ভেতরে হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন? যে বাবা কয়েকদিন আগেও এই ‘প্লে-স্টেশন‘ খেলা নিয়ে বকাঝকা করতো, সে বাবা আজ কেন ফোন করে বলছে, প্লে-স্টেশন তুমি খেলতে পারো! সন্তানের এই জিজ্ঞাসা নিয়েই এই বইয়ের কাহিনী শুরু হয়েছিল।

বইয়ের শেষাংশে এসে সন্তানের মুখ দিয়ে আসলে পিনাকী ভট্টাচার্যই প্রশ্ন তুলছেন, ‘বাবা তাহলে এই প্লে-স্টেশন এর সাথে কি পোস্ট মডার্নিজম কোন সম্পর্ক আছে?’ ‘হ্যাঁ, আছে’। পোস্ট মর্ডানিজমকে বুঝতে হলে এটা একটা দারুন উদাহরণ। বইয়ের এই শেষাংশটা দারুন মজার ! 

সব মিলিয়ে বইয়ের স্বার্থকতা এটাই যে, চিন্তার অভিযাত্রার সাথে অভিযাত্রী হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে সন্তানতে, যে সময়ের সাথে সাথে অগ্রসর হবে। চিন্তার অভিযাত্রা মানে মানব প্রজাতির অভিযাত্রা- এ এক দীর্ঘ যাত্রা।

এবার আসি আমার তিন নাম্বার পয়েন্ট-এ।

এই বইটা খুবই কাজের, এই অর্থে যে, প্রতিদিন আমাদের চারপাশে যা কিছু ঘটছে, যা কিছু নিয়ে আমরা বসবাস করছি সেগুলো আমাদের চিন্তার ভেতরে এক ধরনের আলোড়ন তৈরি করছে, অভিঘাত তৈরি করছে৷ এগুলোকে গভীরভাবে অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করার জন্য আমাদের হাতে কিছু ইন্সট্রুমেন্ট থাকা দরকার। একটা জগত থেকে আমরা আরেকটা জগতে চলে যাচ্ছি প্রতিদিন। এটা যেতেই হবে, এটাই হচ্ছে চিন্তার অভিযাত্রা। তো, চিন্তার সেই নতুন জগতে যাওয়ার জন্য এই বইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে৷

একটা রূপক আকারে যদি বলি, এই বইটা হচ্ছে একটা চমৎকার ‘ব্রীজ‘। দু‘টো বনের ভেতরে, দু‘টো জঙ্গলের সাথে সংযোগ তৈরী করার জন্য একটা চমৎকার ব্রীজ, যার উপর দিয়ে আপনি স্বাচ্ছন্দে হেঁটে যাবেন। একটা নতুন জগতে প্রবেশ করবেন। সেখানে গিয়ে হয়তো আরও নতুন নতুন ‘জিনিস’ আপনাকে জানতে হবে। পোস্ট মডার্নিজম নিয়ে ‘সাধারণ‘ যা জেনে গেলেন, সেই নতুন জগত নিয়ে আপনাকে আরও ‘বিশেষ‘ কিছু জানতে হবে৷ কিন্তু যেতে হলে আপনি বহু পথ ঘুরে যেতে পারতেন। হয়তো কোন এক সময় পথ আপনি হারিয়েও যেতে পারেন।

কিন্তু এই বইটার সুবিধা হলো, এই বইয়ের ভেতর দিয়ে লেখক এমন একটা ব্রীজ রচনা করেছেন, সেই ব্রীজ-এর ওপর দিয়ে আপনি হেঁটে সহজে চলে যেতে পরবেন এবং খুব দ্রুত যেতে পারবেন। যদি চিন্তার নতুন জগতে নাও যেতে চান, তাতেও কোন অসুবিধা নেই। এই ব্রীজের ওপরে দাড়িয়ে হাওয়া খেলেও লাভ ! কারণ আপনি দাড়িয়ে আছেন চিন্তার দু‘জগতের মাঝখানে। দু’জগত থেকেই আপনি হাওয়া পাবেন- এপাশ থেকেও কিছু জানবেন ওপাশ থেকেও কিছু ধরবেন !! একারণেই বইটাকে আমার কাছে একটা well constructed bridge মনে হয়েছে।

দর্শন এবং বিশেষ করে দর্শনের ইতিহাস চর্চায় যাদের সামান্যতম আগ্রহ আছে, আমার মনে হয় এই বইটা তাদের সকলের পড়া উচিত। বিশেষ করে তরুন প্রজন্মকে বইটা পড়ার আহবান জানাই। আমি নিশ্চিত এটা আপনার চিন্তায় নাড়া ফেলবে। এই ‘নাড়া ফেলা’র ভেতর দিয়েই নতুন চিন্তার উন্মেষ ঘটবে, চিন্তার অভিযাত্রায় আরো নতুন জিনিস যুক্ত হবে। সেটা হবে এই বইকে অতিক্রম করে যাওয়া। চিন্তার অভিযাত্রায় নতুন অভিযাত্রী হিসেবে আপনিও আবির্ভূত হবেন। আমার আশাবাদ এতোটুকু মাত্র।

অনুলিখন: সাদিয়া আহমদ (আনিকা)
অনার্স তৃতীয় বর্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সাড়াজাগানো বই: ‘মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম’