Home ওপেনিয়ন আলোচিত ভাইরাসঃ ‘প্রশ্নফাঁস’ ‘এতাআত’ ও ‘উগ্রবাদ’

আলোচিত ভাইরাসঃ ‘প্রশ্নফাঁস’ ‘এতাআত’ ও ‘উগ্রবাদ’

।। মাওলানা এরফান শাহ ।।

ইসলাম এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, অনুভূতি ও আদর্শের নাম। ধর্মপ্রাণ মুসলমান প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসেন আল্লাহ্, রাসূল, ঈমান, তাওহিদ ও রিসালাতকে। প্রকৃত মু’মিন দুনিয়ার চেয়ে আখেরাতকে বেশি প্রধান্য দিয়ে থাকেন। কারণ জন্ম যেরকম সত্য, মৃত্যুও অবধারিত সত্য। সুখ যেরকম বাস্তব, দুঃখও সেরকম বাস্তব। ইহকাল যেরকম পরিস্কার, পরকালও সেরকম পরিস্কার। রূহ জগত, মায়ের উদর, জীবন, মৃত্যু, কবর, কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নাম ধারাবাহিক এ জীবন পর্বকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। সৃষ্টি যেরকম দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট, স্রষ্টাও অনুরূপভাবে প্রমাণিত।

দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী পক্ষান্তরে আখেরাত চিরস্থায়ী। দুনিয়ায় আমল তথা কর্মের মাধ্যমে আখেরাতের পুজিঁ অর্জন করে, সম্বল ও সঞ্চয় তথা ঈমান ও আমল নিয়ে পরকালে যেতে হবে। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে খারাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখে এবং মৃত্যুর পরের চিরস্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

ইহকালীন ও পরকালীন উভয় শিক্ষার সমন্বয়ের নাম কওমি শিক্ষা। কওমি শিক্ষার স্বীকৃতি মানে ইসলামী শিক্ষার স্বীকৃতি। এটি ঐতিহাসিক মাইলফলক, যথাযথ পদক্ষেপ ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। আলেম-উলামার প্রাণের দাবী, লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত। এ নিয়ে অবজ্ঞা, অবহেলা, কাদা ছোঁড়াছুড়ি, রাজনীতি ও উদাসিনতা কাম্য নয়।

বিচক্ষণ ও সফল রাষ্ট্রনায়ক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে যেভাবে ঐতিহাসিক আইন পাশ করে কওমি সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে লক্ষ কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের হৃদয় জয় করেছেন। অনুরূপভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কওমি উলামায়ে কেরামগণ তা কার্যকরে শতভাগ সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদীহিতা ও নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং কওমি শিক্ষাব্যবস্থা যে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাব্যবস্থা তা বিশ্ব দরবারে প্রমাণ করে ইতিহাস সৃষ্টি করবেন এটিই জাতির স্বপ্ন ও প্রত্যাশা।

মনে রাখতে হবে, কওমি শিক্ষার প্রতি সামান্য অবহেলা ও ত্রুটি কওমি শিক্ষার বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইসলাম বিদ্বেষী গোষ্ঠি ও মহল বিশেষ যেন কওমি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আঙ্গুল হেলাতে না পারে, এ শিক্ষাপদ্ধতিকে বিতর্কিত করতে না পারে, সে বিষয়ে সদা সর্বদা সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।

উল্লেখ্য, কওমি শিক্ষার উপর শকুনের নজর পড়েছে। কওমি অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বিরোধীরা নানামূখী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কওমি উলামায়ে কেরামের অনৈক্য কওমি শিক্ষার অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। আশাকরি কর্মকর্তাগণ লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আরো  দায়িত্বশীল ও যতœবান হবেন।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সহায়তা করো না”। ২:৫।

হাদিসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা প্রত্যেকে জিম্মাদার, নিজ নিজ  দায়িত্ব ও জিম্মাদারী সম্পর্কে সকলে জিজ্ঞাসিত হবে। 

বিশ্বাসঘাতক, অসৎ, র্দূনীতিবাজ ও অযোগ্যদের খুঁজে বের করে যথাযত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। এক কথায় কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে যেকোন মূল্যে প্রশ্নফাসঁ, অনিয়ম ও দূর্নীতিমুক্ত রাখতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এ বিষয়ে কোন অজুহাত, ত্রুটি, ছাড় ও শিথিলতা গ্রহণযোগ্য নয়। পরস্পর দোষারূপ না করে বরং ঐক্যবদ্ধ্যভাবে এ সংকট মোকাবেলা করতে হবে। কোন ধরনের পাতা ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। তবে সবকিছুতেই ষড়যন্ত্রের গন্ধ না খোজেঁ বরং  নিজেদের দূর্বলতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি গুলো নির্ণয় করে, তা সমাধান ও সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। সিস্টেম তথা ব্যবস্থপনা আরো উন্নত, সুসংসহত, মজবুত  ও আধুনিক করতে হবে।

বলা হয়ে থাকে, “শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড”। শিক্ষাব্যবস্থার ক্যান্সার ‘প্রশ্নফাসেঁর’ মত মরণব্যাধি যেন ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থায় কোনোভাবে বাসা বাধঁতে না পারে এবং কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে যেন কোনোভাবে বিতর্কিত ও কলঙ্কিত করতে না পারে, সেজন্য সদা সর্বদা সতর্ক, সচেতন ও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

হাদিসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন- “মু’মিন এক গর্ত থেকে বার বার দংশিত হয় না”।  

কওমি শিক্ষা বিরোধীদের অপ্রচার, ষড়যন্ত্র ও বিভ্রান্তির জবাব বক্তব্য, লেখনী, মেধা ও কর্মের মাধ্যমে দিতে হবে। শিক্ষার শ্রেণীবিন্যাস, সিলেবাস, শৃংখলা, পদায়ন,  পদোন্নতি, প্রশাসনিক সিস্টেম ও মানোন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে। পড়ালেখা, অধ্যবসায়, মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে প্রমাণ করতে হবে কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষাব্যবস্থা। কওমিরাও পারে, কওমিরাই সেরা। কওমি সন্তানরা আদর্শবান, সৎ ও নীতিবান।

কওমি মাদরাসার সনদ নিয়ে মেধাবীরা যেন দেশ-বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা, গবেষণা, এমফিল ও পিএইচডির সুযোগ পায় এবং চাকুরীর ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দেশ সেবার সুযোগ পায় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কওমি মাদরাসার ছাত্র-ছাত্রীরা সৎ, মেধাবী ও পরিশ্রমী। তারা নাগরিক অধিকার ও সুযোগ পেলে তাদের মেধা, সততা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে দেশ ও জাতিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

[ ২ ]

দাওয়াত ও তাবলিগ নতুন কোনো আবিস্কার নয়। রাসূলে আকরাম (সা.) থেকে ধারাবাহিকভাবে এ কর্মসূচী চলে আসছে। মসজিদ মাদরাসাসহ দ্বীনের অন্যান্য প্রতিষ্টানগুলো যেভাবে সংস্কার হয়েছে সেই ধারায় মুজাদ্দেদে মিল্লাত হযরতজ¦ী হযরত মাওলানা ইলিয়াছ (রাহ.) পবিত্র ও মুবারক এ মেহনত ও কাফেলার সংস্কার, যুগোপযোগী পরির্বতন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন, মোডিফাই ও আপডেট করেছেন মাত্র।

হযরতজ্বী’র এ গবেষণাধর্মী সংস্কার পৃথিবীতে নতুন এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। নিঃসন্দেহে এর মাধ্যমে মানবজাতি উপকৃত হচ্ছে। সমাজ আলোকিত হচ্ছে। গোমরাহী তথা বদদ্বীন দূরীভ’ত  হচ্ছে। পবিত্র ও মুবারক এ মেহনত আজ সারা দুনিয়ায় প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়েছে। শতাব্দীকাল ধরে এ মেহনত যেভাবে পৃথিবীতে নিরব বিপ্লব ঘটিয়েছে, সারা দুনিয়ায় প্রসারিত হয়েছে, বিশ^ব্যাপী পরিচালিত হয়ে আসছে, তা আল-হামদুলিল্লাহ, বলা যেতে পারে, মহান রবের দরবারে মকবুলিয়তের স্বাক্ষর ও প্রমাণ বহন করে।

মুখলিস, খাটিঁ, নিরব ও প্রচার বিমূখ এ রকম একটি জামাতের নাম হচ্ছে তাবলিগ জামাত। যাদের ইখলাচ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে অমুসলিমরাও কখনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ হয়নি।  সকল বিতর্ক ও সমালোচনার উর্ধ্বে, সকল শ্রেণী পেশার মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিক। কৃষক-শ্রমিক, চাকুরীজীবি, কর্মজীবি, সাধারণ শিক্ষিত, ধর্মীয় শিক্ষিত, ছাত্র-শিক্ষক, উলামা ও ত্বলাবা সকল শ্রেণী পেশার মিলনমেলা তাবলিগ জামাত ও বিশ্ব ইজতেমা।

তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় সাম্প্রতিককালে সেই তাবলিগ জামাত ও বিশ্ব ইজতেমা আজ বিতর্কের মূখোমূখী! বিভক্তি, হেডলাইন ও শিরোনামে পরিণত হয়েছে! যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক, কষ্টদায়ক, অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্খিত ও অনভিপ্রেত! অশ্রুসিক্ত নয়নে এবং ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হয় এ রকম একটি পরিস্থিতি ধর্মপ্রাণ মুসলমান কখনো আশা করেনি। যা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত। কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আস্থা ও বিশ্বাসের পিলার যদি এভাবে আক্রান্ত হয়, তাহলে সাধারণ মুসলমানরা যাবে কোথায়?

মারকাজ নেজামুদ্দীন বলেন আর কাকরাইল বলেন- কোথাও মতানৈক্য, মতবিরোধ, বিতর্ক, অস্বস্তিকর ও বিব্রতকর পরিস্থিতি কাম্য নয়। আশাকরি, দায়িত্ববানরা আরো দায়িত্বশীল হবেন। মনে রাখা দরকার, সরাসরি তাবলিগ করুক বা না করুক, সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমান কিন্তু তাবলিগ জামাতকে সর্মথন করেন এবং অন্তর থেকে মহব্বত করেন, ভালবাসেন। তাদের বিশ্বাস তাবলিগের সাথীগণ মুত্তাকী, নিঃস্বার্থ, নির্লোভ, নির্মোহ ও প্রচার বিমূখ। অতএব, তাবলিগী কার্যক্রমে আবেগ ও বাড়াবাড়ি পরিহার করে দরদমাখা হৃদয় নিয়ে পরস্পর মাশওয়ারার ভিত্তিতে আগের মত নিরবে এগিয়ে যাবে, মুসলিম উম্মাহ’র ভক্তি, শ্রদ্ধা, আস্থা ও বিশ্বাস অক্ষুন্ন  ও অটুট থাকবে এটিই সকল ধর্মপ্রাণ তাওহিদি জনতার প্রত্যাশা। 

তাবলিগকে যদি সাগরের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে বলতে হবে, সাগরের পানি হচ্ছে মাননীয় উলামায়ে কেরাম আর মাছ হচ্ছে তাবলিগ জামাতের সম্মানিত মেহনতী ভাইয়েরা। পানি ছাড়া যেমন মাছ বাচঁতে পারে না, অনুরূপভাবে নবীর উত্তরসূরী উলামায়ে কেরামদের এড়িয়ে তাবলিগ জামাতের মেহনত কখনো সুচারুরূপে পরিচালিত হতে পারে না। অতএব, তাবলিগ জামাত আর দ্বীনি মাদরাসা তথা আলেম-উলামা পরস্পর সহযোগী, পরিপূরক ও সহায়ক।

মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’। ৩:৩।

হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “তুমি ঐ জিনিস পরিত্যাগ কর, যে জিনিস তোমাকে সন্দেহে ফেলে এবং তা গ্রহণ কর যাতে তোমার সন্দেহ নেই। কেননা, সত্য প্রশান্তির কারণ এবং মিথ্যা সন্দেহের কারণ” -তিরমিজি।

অন্য হাদিসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, “সৃষ্টির অনুগত্য করা যাবে না, সৃষ্টিকর্তার বিধি-নিষেধে”।

মুজাদ্দেদে মিল্লাত হযরতজ্বী হযরত মাওলানা ইলিয়াছ (রাহ.) এর ছয় উসূল যদি মনোযোগ দিয়ে অধ্যয়ন ও মোতালাআ করা হয় এবং মেনে চলা হয় তাহলে আলেম-উলামা ও তাবলিগ জামাতের মধ্যে কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব ও বিরোধ থাকে না। বরং পরস্পর মহব্বত, আন্তরিকতা, একতা, হৃদ্ধ্যতা ও ভালবাসা পয়দা হয়।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক বলেন- “বল, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? বুদ্ধিমান লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে থাকে”। ৯:৩৯।

আল্লাহপাক আমাদেরকে সকল মতানৈক্য, মতবিরোধ, বিতর্ক ও ব্যক্তি স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে লিল্লাহিয়াত ও খুলুচিয়াতের সাথে ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যবদ্ধভাবে এ মুবারক জিম্মাদারী ও পবিত্র মেহনতকে এগিয়ে নেয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

[ ৩ ]

আল্লাহপাকের মনোনীত ধর্ম ইসলাম। দ্বীন ইসলাম পরিপূর্ণ জীবন বিধান। ইসলামী শরীয়ায় সীমা লংঘন ও অতিরঞ্জন তথা বাড়াবাড়ির কোনো সুযোগ নেই। ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় কেবল মানব জাতির সার্বিক কল্যাণ, ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির নিশ্চয়তা প্রদান করে।

বিশ্বের পরাশক্তি গুলোর অব্যাহত জুলুম ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ মানবতা যখন শান্তিময় আদর্শের দিকে ছুটে আসছে ঠিক তখনই ইসলামকে সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে প্রমাণ করার জন্য একটি গোষ্ঠী কুরআন-সুন্নাহর অপব্যাখা করে চরমপন্থী দর্শন প্রচার করছে। তরুণদের মগজধোলাই, বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করছে। অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সন্ত্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত করছে। অতঃপর সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে বিশ্বব্যাপী নিরীহ মুসলমানের রক্ত ঝরানো হচ্ছে। ষড়যন্ত্রকারীরা একদিকে ধর্মীয় বিধি-বিধান সম্পর্কে অনভিজ্ঞ এমন কিছু ধর্মভীরু যুবকদের টার্গেট করে, পবিত্র জিহাদের ভুল ব্যাখা দিয়ে চরমপন্থার প্রতি উস্কানী দিচ্ছে।

অন্যদিকে সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের অজুহাত তোলে বিশ্বের বিভিন্ন উদীয়মান মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে মুসলিম দেশ গুলোকে একে একে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এতে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মজলুম, নির্যাতিত ও স্বাধীনতাকামী মুসলমানগণ। ফিলিস্তিন থেকে কাশ্মির, আফগানিস্তান থেকে আরাকান, টুইন টাওয়ার থেকে হলিআর্টিজেন, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, নিউজিল্যান্ড থেকে শ্রীলংকা বর্ণবাদ ও উগ্রবাদের জ¦লন্ত দৃষ্টান্ত। মনে রাখতে হবে, নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, মানুষ খুন করে, বোমাতঙ্ক সৃষ্টি করে, খেলাফত প্রতিষ্ঠার মনগড়া ব্যাখার সাথে ইসলামের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।

আরও পড়ুন- ‘রমজানে ইবাদত ও জনসেবামূলক কাজে অধিক হারে সম্পৃক্ত হোন: আল্লামা কাসেমী’

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম জঙ্গিদল “হাগানা”। ইহুদীরাই ১৯২০ সালে হাগানা গঠন করে। উদ্দেশ্য দু’হাজার বছরের পুরনো বসতি ফিলিস্তিনী জনগণকে তাদের নিজস্ব ভুমি থেকে উচ্ছেদ করা। মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল এ ষড়যন্ত্র মুসলমানের বিরুদ্ধে শতাব্দীকাল ধরে করে চলেছে। আইএসের সাথে ইসরাইলের দহরম মহরম প্রমাণ করে ইসরাইলই জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র। সারা দুনিয়ায় জঙ্গিবাদী সফটওয়ার রপ্তানীকারক।

পৃথিবীতে আজ যত জঙ্গিদল সৃষ্টি হয়েছে বলাযায় তা হাগানার শাখা-প্রশাখা। ইসরাইলী সাবেক সামরিক গোয়েন্দা প্রধান মেজর জেনারেল হার্জজি হ্যালেভি একটি সম্মেলনে সিরিয়ান সরকার বিষয়ক ইসরাইলের দীর্ঘ অবস্থানের কথা প্রকাশ করে বলেছেন, “ইসরাইল আই এসকে পছন্দ করে”। তিনি সম্মেলনে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, “ইসরাইল চায় না যে, আই এস সিরিয়ায় পরাজিত হোক”। যেখানে ইসরাইলের সাথে সকল মুসলিম রাষ্ট্রের সাপে নেউলে সম্পর্ক সেখানে সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের সাথে ইসরাইলের মানিকজোড় প্রমাণ করে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নিঃসন্দেহে ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি কোনো মু’মিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে তার শাস্তি জাহান্নাম”।

রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করবে সে জান্নাতের সুগন্ধিও লাভ করতে পারবে না, যদিও জান্নাতের সুগন্ধি চল্লিশ বৎসরের দূরত্ব থেকে লাভ করা যায়”-বুখারী।

অন্য হাদিসে রাসূলে আকরাম (সা.) ইরশাদ করেন, “তোমরা সরল পথে থাকো, মধ্যমপন্থা ধরো, রাতের কিছু অংশে ইবাদত করো, আর তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো, মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো, তাহলে গন্তব্যে পৌঁছে যাবে”। -বুখারী। 

শরীয়ত মূলত মসজিদকে পবিত্র রাখতে ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে নির্দেশ দিয়েছে, একে অপবিত্র ও নাপাক করা হারাম করেছে। পক্ষান্তরে আইএস এতে বোমা হামলা ও নাপাক করাকে বৈধ করেছে! মনেরাখতে হবে জিহাদ মানে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নয়। বরং ইসলাম, দাওয়াত ও জিহাদ এসব থেকে শ্রেষ্ঠতর, উন্নত ও পবিত্র।

হাদিসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, “যে, ব্যক্তি লা’ ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত অস্বীকার করে, তার হিসাব আল্লাহর উপরে”। (মুসলিম)।

আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী সম্প্রদায় করেছি, যাতে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলীর জন্যে এবং রাসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্যে। ১৪৩:২।

রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, “প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি যার হাত ও মুখ থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে”।

[ ৪ ]

ইসলামে রাজনীতি নেই এ কথা অবান্তর। চরমপন্থার মাধ্যমে খেলাফত প্রতিষ্টার দিবা স্বপ্ন ব্যাঙের সর্দি, অকার্যকর। রাজনীতি মানে অসহায়, বঞ্চিত ও নির্যাতিতদের পক্ষে সোচ্চার হওয়া। জনসেবা ও জনকল্যাণে ভূমিকা রাখা। জাতির ভাগ্যন্নোয়নে অবদান রাখা। এর অর্থ এই নয় যে, “প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলতে হবে”। হযরত ইউসুফ (আ.) তৎকালীন রাজার রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে খাদ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে ছিলেন। তিনি তৎকালীন মিসরের রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় অংশ গ্রহণ করে ছিলেন।

অতএব, প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে পাল্টে দিয়ে খেলাফত প্রতিষ্টার বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই। যদিও নীতি-আদর্শ ও মূল্যবোধের একটা মানদন্ড প্রতিষ্ঠিত করা খুবই জরুরী। তবে এটা করতে গিয়ে উলামা-মাশায়েখ ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামো থেকে নিজেদের দূরে রাখা অনুচিত।

রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, “দ্বীন হচ্ছে পরস্পর কল্যাণ কামনা”।

যারা উগ্রতা, চরমপন্থা ও সহিংসতার পথ অবলম্বন করছেন, তারা নিজ, দেশ ও ইসলামের সর্বনাশ করছেন। পক্ষান্তরে মধ্যমপন্থার অনুসারী হক্কানী ও রব্বানী উলামায়ে কেরামগণ উগ্রতা, চরমপন্থা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের পথ পরিহার করে শান্তিপূর্ণভাবে জনগণ ও সরকারকে উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে যুগে যুগে মুসলিম মিল্লাতের অবক্ষয় রোধ করেছেন। অতএব, মধ্যমপন্থায় হচ্ছে কোরআন-সুন্নাহ প্রদর্শিত সিরাতে মুসতাকিম তথা সরল ও সঠিক পথ।

পরিশেষে, উম্মাহর পথপ্রদর্শক, উত্তম আদর্শের অধিকারী, শান্তির অগ্রদূত, রাসূলে আরবী (সা.)এর  মূল্যবান বাণী থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে চাই।

হাদিসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, চারটি গুণ যদি তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলে দুনিয়াতে তোমাদের আর কিছু হারানোর নেই। এক. আমানতের  হেফাজত। দুই. সত্যবাদিতা। তিন. উত্তম চরিত্র। চার. হালাল খাদ্য।

আল্লাহপাক আমাদেরকে এ সকল গুণে গুণান্নিত হওয়ার তাওফিক দান করুন। মহান রবের দরবারে দু’হাত তুলে ফরিয়াদ করি, হে আল্লাহ্! মুসলিম উম্মাহর আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিক কওমি শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনিয়ম ও প্রশ্নফাসেঁর অভিশাপ থেকে মুক্ত করুন। মুসলিম মিল্লাতের অন্যতম ঐক্যের প্লাটর্ফম বিশ্ব ইজতেমা, দাওয়াত ও তাবলীগকে বিভক্তি, সংঘাত ও অনৈক্যের ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। ইসলামী শরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র বিধান ‘জিহাদ’ নিয়ে চরমপন্থীদের অপপ্রচার, মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্র থেকে মুসলিম উম্মাহকে এবং বিভ্রান্ত, বিপদগামী ও উগ্রবাদীদের হাত থেকে প্রিয় যুবসমাজকে রক্ষা করুন। আমিন।

লেখকঃ গ্রন্থকার ও গবেষক, খামিছ মোশায়েত, সৌদী আরব। E-mail: [email protected]

বই পর্যালোচনা: ‘এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্ট মডার্নিজম: চিন্তার অভিযাত্রা’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.