Home ফিচার শ্রীলঙ্কা: আন্তঃসম্প্রদায় সন্দেহের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক উস্কানি

শ্রীলঙ্কা: আন্তঃসম্প্রদায় সন্দেহের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক উস্কানি

।। জেহান পেরেরা ।।

মিষ্টি খাবার বিক্রেতা লোকটি জানাল, তার বেচাবিক্রি ভালো হচ্ছে না। যারা আগে তার কাছ থেকে কিনত, তারা এখন তাকে ভিন্ন চোখে দেখে। কারণ, সে একজন মুসলিম। সে গরিব মানুষ যে কলম্বোর রাস্তায় ক্যান্ডি ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করার চেষ্টা করছে। আমার স্ত্রী তার কাছ থেকে তিনটি প্যাকেট কিনে ভাংতি ফেরত না নিয়ে তাকে রেখে দিতে বলল। আমার সন্তানদের মা হিসেবে সে তাদের বলেছে, ‘এই ফেরিওয়ালারও একটা পরিবার আছে, যারা বাড়িতে তার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায়।’

(গত ২১ এপ্রিল) ইস্টার সানডে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার পর প্রথম তিন সপ্তাহ যে ভীতি বিরাজ করেছে, তা অনেকটাই কমে এসেছে। স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসার বিষয়টি দৃশ্যমান হয়েছে। এটাই তো হওয়া উচিত। গত সপ্তাহে আয়োজন করা হয়েছিল পুনর্মিলন অনুষ্ঠানগুলোর একটি। এতে হাজির থাকতে পেরে নিজে খুশি হয়েছি। মুসলিম সিভিল সোসাইটির এই ইফতার অনুষ্ঠান হয়েছে কলম্বো মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের চত্বরে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক মানুষ এতে শামিল হয়ে রোজা ভেঙেছেন। অন্যান্য ধর্মের মানুষ অনুষ্ঠানটিতে যোগ দিয়েছেন কম। সমাজে যে মেরুকরণ চলছে, সম্ভবত তারই প্রতিফলন এটা। প্রত্যেক কমিউনিটির ভেতরে দেখা যাচ্ছে ভীতি, উদ্বেগ আর সন্দেহ। যা হোক, ইস্টার সানডে ট্র্যাজেডিকে অনুষ্ঠানে স্মরণ করা হলো। সব জনগোষ্ঠীর তরুণরা নিজ নিজ ধর্মের আলোকে পুনর্মিলনের বার্তা দিলেন।

সে দিনের অনুষ্ঠানে গেছি একটু দেরিতে। মাহফিলের গেটের কাছে নিজেকে আবিষ্কার করলাম। বসার জায়গা পাওয়া ছিল কঠিন। কারণ সেখানে লোকজনের খুব ভিড় ছিল। কিছু ফাঁকা জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য বসা ছিলেন। তবে ইউনিফর্মধারীদের সাথে বসাটা স্বস্তিকর হবে না, বুঝলাম। সৌভাগ্যবশত, তাদের মধ্যে একজন অফিসার ছিলেন যিনি ইউনিভার্সিটিতে আমার একটি ক্লাসে অংশ নিয়েছেন। ক্লাস নিয়েছিলাম শান্তিপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে। ওই অফিসার নিজেই আমাকে তার পরিচয় দিলেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, আমাদের শেষ সাক্ষাতের সময়ে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সাবধান করে দিয়েছিলেন, দেশের পূর্ব অঞ্চলে মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে র‌্যাডিকেলের সংখ্যা বাড়ছে। উল্লেখ্য, আত্মঘাতী বোমাবাজদের নেতাও সে এলাকার লোক। অবশ্য, সেদিনের সেই সেনাকর্মকর্তা জানিয়েছেন, সহিংসতায় লিপ্ত ব্যক্তিরা বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর তেমন পরিচিত নয়। তারা বড়জোর জানত, লোকগুলো র‌্যাডিকেল এবং তাদের আচরণ দুর্বৃত্তদের মতো। তাদের জানা ছিল না যে, লোকগুলো ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের হত্যার পরিকল্পনা করেছে।

আমার মন চলে গেল ১৯৭১-এ। তখন শ্রীলঙ্কা সরকারের বিরুদ্ধে আরো ব্যাপক এবং অধিক সংগঠিত পন্থায় সহিংসতা চলছিল। জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) সংগঠনের বিদ্রোহের ধাক্কায় সরকার হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। সে সময়ে মাত্র দুই সপ্তাহেই বিদ্রোহীদের হামলায় পতন ঘটেছিল ৯০টি থানার। এ প্রেক্ষাপটে এটা বলা যুক্তিযুক্ত নয় যে, বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠী সন্ত্রাসীদের খবর গোপন রেখেছিল এবং আত্মঘাতী বোমাবাজদের সাথে যোগসাজশ করেছে। বরং, তারা নিজেদের একাংশের জঙ্গিপনার ব্যাপারে ২০১২ সাল থেকে সরকার ও সিভিল সোসাইটিকে কয়েকবার হুঁশিয়ার করেছে।

ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করা দরকার

বাস্তবে পরিস্থিতির উন্নতি সত্ত্বেও আন্তঃসম্প্রদায় সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। মুসলিমদের সন্দেহ করা এবং তাদের প্রতি ভুল ধারণা পোষণ বন্ধ হয়নি। প্রপাগান্ডার ধুম পড়েছে এ মর্মে যে, বহু মুসলমানই অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করে বিধায় বর্তমান পরিস্থিতি জন্ম নিয়েছে। এবার মিডিয়ার এক রিপোর্টে বলা হলো, একজন মুসলমান ডাক্তার চার হাজার নারীকে তাদের প্রসবকালে বন্ধ্যা বানিয়ে দিয়েছেন।

এই সংখ্যাটা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে এখন ‘আট হাজারে’ উন্নীত করা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট এলাকায় যারা কাজ করেন, তারাই বলছেন- এক ব্যক্তির পক্ষে এমন কিছু করা অসম্ভব। তা ছাড়া, যেসব টিম সেখানে হাজির ছিল, তাদের কারো চোখে পড়েনি এমন কোনো ঘটনা। আরো একটি প্রচারণা অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে। তা হলো, ‘মসজিদে মসজিদে তরবারি পাওয়া গেছে।’ বিশেষ করে সিংহলি (বৌদ্ধ) জনগোষ্ঠীর মনে এই প্রচারণা মারাত্মক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

ইস্টার সানডের সাম্প্রতিক সহিংসতার পর প্রথম তিন সপ্তাহে মিডিয়া জনমনে ভয়ের সঞ্চার করার দিক দিয়ে ‘বিপুল অবদান’ রেখেছে। মিডিয়া বারবার দেখিয়েছে ‘মসজিদগুলোতে তরবারির স্তূপ।’ এই তরবারি উঁচিয়ে মুসলমানেরা হামলা করবে- এমন ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে। একটি নিউজ আইটেমে বলা হয়েছে, এমপি মাহিন্দা অমরবীরা প্রশ্ন তুলেছেন, ‘মসজিদে পাওয়া তরবারির বিরুদ্ধে কোনো মুসলিম এমপি কিছু বলেননি কেন? এসব তরবারি রাখার উদ্দেশ্য কী।’ একই রাজনৈতিক মোর্চার আরেক এমপি ধেনুকা বিদানাগামায়ে বললেন, ‘দেশে ৫২ লাখ বাড়ি আছে। সবার ঘরে একটি করে তলোয়ার থাকলেও এর মোট সংখ্যা দাঁড়াবে ৫২ লাখ।’ এদিকে ‘ভেন ওমালপে সোবিথা থেরো’ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলায় জাতি সন্ত্রস্ত। তাই তলোয়ার প্রসঙ্গে মুসলিম নেতারা যা বলেছে, সেটা ভেবে দেখার বিষয়।’

দাবি করা হয়েছে- নারীদের নিরাপত্তা এবং ঝোপঝাড় কাটার জন্য তলোয়ার রাখা হয়েছিল। তবে ‘সর্বত্র শত শত’ তরবারি পাওয়ার দাবিদাররা মুসলমানদের কথায় বিশ্বাস করেনি। কোনো কোনো সূত্র বলেছে, ঘরবাড়িতে তলোয়ার বা তরবারি থাকা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই নতুন নয়।’ অথচ এমন ধারণা সৃষ্টি করা হয়েছে যে, মুসলমানেরা অন্যান্য সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালাতে মসজিদকে তরবারির মজুত রাখার জন্য ব্যবহার করছে। বাস্তবে শ্রীলঙ্কার দুই হাজার মসজিদের মধ্যে মাত্র দু’টিতে তরবারি পাওয়া গেছে।

নেতৃত্বের ব্যর্থতা

আরো বোমা হামলা হতে পারে- এমন ভীতি জনগণের মধ্যে ছড়ানোর ইচ্ছাকৃত প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়েছে। সম্প্রতি একটি স্কুলে পার্সেল বোমা পাওয়ার খবরটি ভীতি আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। সহিংস হামলার ভয়ে সরে থাকার পর শিশুরা সবেমাত্র তাদের নিজ নিজ স্কুলে ফিরে আসছে। জানা গেছে, উল্লিখিত স্কুলটির নিরাপত্তা প্রহরী লক্ষ করেন যে, এক লোক সন্দেহজনকভাবে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। লোকটাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। সে একজন রাজনৈতিক কর্মী এবং বিরোধী দলের সাথে জড়িত। যদি বোমাটি বিস্ফোরিত হতো এবং স্কুলের শিশুকিশোর শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করত, এতে ভীতির সঞ্চার হতো অনেক বেশি। হয়তো এর জের ধরে সংগঠিতভাবে আরেক দফা দাঙ্গা বাধানো হতো। সম্প্রতি উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে এমনটাই ঘটেছে।

সমাজে বিরাজমান ভীতির অপব্যবহার করে অনিশ্চিত পরিস্থিতি বজায় রাখার লক্ষ্যে রাজনৈতিক প্রচার চলছে। মনে করা হচ্ছে, এটাই সুবিধাজনক। কারণ স্থিতিশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ব্যর্থ সরকারকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে। উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা হয়েছে। এ থেকে বহু প্রমাণ মিলেছে, যেন এটা ছিল সংগঠিত প্রয়াস। দাঙ্গায় সংশ্লিষ্ট যাদের ধরা হয়েছে, তাদের অনেকে বিরোধী দলের লোক। জনতা নিজেদের হাতে আইন তুলে নিলেও কিছু রাজনীতিক নির্ভয়ে তাদের সাথে মিশেছেন। ১৯৮৩ সালে তামিলদের হত্যা করার তাণ্ডব শুরু হওয়ার পর থেকে এ দেশে সংগঠিতভাবে দাঙ্গা হয়ে আসছে। অথচ সরকারের নেতারা শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের এ জন্য দায়ী করতে চান না।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেয়ার লক্ষ্যে সরকারের যে অঙ্গীকার, তা প্রশংসনীয়। কারণ এটা গণতন্ত্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে যারা গুজব ও মূল তথ্য ছড়াচ্ছে এবং জনমনে ভীতি সঞ্চার করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে তৎপর, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার কারণ নেতৃত্বের ব্যর্থতা। এখন জাতীয় পর্যায়ে জরুরি অবস্থা চলছে। তাই সরকারের উচিত মিডিয়া ও যোগাযোগ কৌশল গ্রহণ করা। ভুয়া প্রচারণাকে নিয়মিতভাবে মোকাবেলা করতে হবে। রাজনৈতিক মতলবে মিডিয়ায় এ প্রচারণা চলছে। নেতৃত্বকে উঠতে হবে অনাস্থা, সন্দেহ আর ভুল ধারণার ঊর্ধ্বে। জনগণকে নিশ্চিত করা চাই জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং তাদের কল্যাণের ব্যাপারে।

লেখক : শ্রীলঙ্কার জাতীয় শান্তি পরিষদের নির্বাহী পরিচালক।
ভাষান্তর : মীযানুল করীম

ইতিহাসের সাক্ষী: আফগানিস্তানে কীভাবে ঢুকেছিল সোভিয়েত বাহিনী

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.