Home ওপেনিয়ন আঙ্গুল তোলা রাজনীতি!

আঙ্গুল তোলা রাজনীতি!

2

।। মজিবুর রহমান মঞ্জু ।।

বাসা থেকে বেরুবার পথে শিমুর হাতে ছাতাটা ধরিয়ে দিল নাসরিন।
– এটা নিয়ে যা, আকাশ অন্ধকার হয়ে আছে। কালকের মত ভিজিস না।
– থ্যাংক্যু। আচ্ছা আপু শুনেছিস বৃষ্টির জন্য এরশাদের ডেডবডি রংপুর নেয়া হচ্ছেনা। সিএমএইচ এর হিমঘরে রাখা হয়েছে। পরশু নেবে বলেছে।
– তাই নাকি! রংপুরে নিশ্চয়ই অনেক মানুষ হবে তার জানাজায়?
– হবে মানে অবশ্যই হবে। রংপুরই তো এরশাদ কে রাজনীতিতে বাঁচিয়ে রেখেছে। আসলে কী জানিস, উত্তরাঞ্চলের লোকেরা খুবই সহজ সরল।
– হুম্! উত্তরাঞ্চল বলে কথা না। গোপালগঞ্জ, বগুড়া এদের অবদানই বা কম কী! রাজনীতিতে নেতা ও নেতৃত্বের জন্য কনস্টিটুয়েন্সির শেল্টার খুব গুরুত্বপূর্ণ।
শিমুর ফোনটায় হঠাৎ রিং বেজে উঠলো। সে ফোন ধরতে ধরতে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে যায়।

নাসরিন দরজা বন্ধ করে ছোটনের রুমে উঁকি দেয়। ছোটন চায়ে চুমুক দিতে দিতে মোবাইল সেটটায় স্ক্রল করে যাচ্ছিল।
– কী দেখছ এত মনযোগ দিয়ে?
– কী আর, এরশাদের মৃত্যুতে কার কী প্রতিক্রিয়া সেটা দেখছি।
– তুমি কি কিছু লিখলে?
– না এখনো কিছু লিখিনি।
– দেখো খারাপ কিছু লিখোনা। মানুষ মরে গেলে তার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলা উচিত না।
ছোটন একটু নড়ে চড়ে বসলো। চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে নাসরিনের চোখে চোখ রেখে বললো-
– তোমার এ কথাটা সাধারণ কোন মানুষের জন্য প্রযোজ্য কিন্তু এরশাদ কোন সাধারণ মানুষ নয়। সে একটি দলের নেতা। স্বৈরশাসক ছিল। সে একটি প্রতিষ্ঠান। তাকে সেই জায়গা থেকে মূল্যায়ন করতে হবে।
– মানে তুমি কী বলতে চাইছো?
– আমি বলতে চাইছি বর্তমান শাসক গোষ্ঠী কত বড় স্বৈরাচার তার সাথে তুলনা করে এরশাদ কত কম স্বৈরচার ছিল তা হিসাব করার কোন সুযোগ নাই। কম্পারাটিভলি এরশাদ বেটার ছিল এটা বলা মোটেও সঠিক না।
– তাহলে কী বলতে হবে? তুমিই বলো এরশাদের সময় কি গুম ছিল? এত রাজনৈতিক সহিংসতা, দূর্নীতি ছিল? যথেষ্ট উন্নয়ন কী হয়নি তার সময়ে?

– তুমিতো বর্তমানের সাথে কম্পেয়ার করে কথা বলছো। কিন্তু মিছিলে ট্রাক উঠিয়ে দিয়ে মানুষ মারা, ভোট ডাকাতি, রাজনৈতিক দূর্বিত্তায়ন, সরকারী সম্পদ লোপাট… এরশাদের এরকম বহু অমূল্য অবদানের কথা বলা যাবে। উন্নয়ন তো আইয়ুব খানও করেছে।
– হয়েছে হয়েছে থাক। তোমার যা খুশী তা লিখ।

নাসরিনের উত্তেজনা দেখে ছোটন একটু উৎসাহ বোধ করে। মুখে হাসি টেনে বললো-
– শুধু শাসন আর শোষন না, অন্য ক্ষেত্রেও এরশাদের জুড়ি তো কম ছিলনা। বিদিশার আত্মজীবনী টা পড়নি?
– না তো! তুমি পড়েছো? পড়বেই তো, তোমার তো আবার..
– কী?
– না থাক।
– হে হে হে… শোন বিদিশা লিখেছিল- ‘তখনও জানতাম না, কুকুরের লেজ (এরশাদের) আসলেই সোজা করা যায় না।’ কেন কোন প্রসঙ্গে লিখেছিল জান?
– প্লিজ আমি ওসব শুনতে চাচ্ছিনা। এরশাদ নাকি জিয়ার খুনী! তাহলে এরশাদের সাথে কেন বিএনপি ৪ দলীয় জোট গঠন করেছিল? চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার সমাবেশে গুলী চালিয়ে এরশাদের পেটোয়া বাহিনী শেখ হাসিনা কে হ্ত্যা করতে চেয়েছিল, সেদিন পুলিশের গুলিতে বহু লোক মারা গেছে। সেই এরশাদ গত দশ বছর ধরে আওয়ামীলীগের সঙ্গী, ক্ষমতার অংশীদার। এরশাদ বেঈমান, মুনাফেক, বিশ্বাসঘাতক তাহলে বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জামায়াত সবাইতো তার মৃত্যুতে শোক জানালো।

নাসরীনের গলার স্বর ক্রমশ: বাড়ছে দেখে অবাক দৃষ্টিতে তাকায় ছোটন। তার অর্ধাঙ্গীনি যে এত রাজনীতি সচেতন আর বিতার্কিক হয়ে উঠেছে তা সে ভাবতেই পারেনা। মুখে তার মুচকি হাসি।
– কী ব্যপার হাসছো কেন?
– না তোমাকে দেখছি!
– দেখে কোন লাভ নেই। আসলে কী জান তলে তলে সবাই এরশাদ, সবার লেজটাই বাঁকা। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে স্বার্থটা যখন সামনে আসে তখন সবার লেজটা সোজা হয়ে যায়। নীতি তখন কৌশল আর প্রয়োজনের কাছে চাপা পড়ে থাকে।
– হুমম্, বুঝলাম। তার মানে তুমি আমাকে ইন্ডিকেট করে কিছু বলছো। বলতে চাইছো আমিও একজন স্বৈরাচার।
– আমি স্পেসিফ্যাকিলি তোমাকে মীন করছি না। বলছি- আমাদের সব দল এবং নেতাদের মধ্যেই স্বৈরতান্ত্রিকতা আছে ইভেন আমাদের নিজের মাঝেও। কিন্তু আমরা সবসময় আঙ্গুল তুলি অন্যের দিকে।
– ইটস্ ওকে, আমি আঙ্গুলটা আমার দিকেই ঘুরিয়ে নিলাম, কিন্তু তোমরটা!
– মানে?
– এবার তোমার আঙ্গুলটাও তুমি তোমার দিকে ঘুরাও।
– ঘুরালাম।
– এবার বল তুমি কী বিদিশা না রওশন? নাকি…..
সলাজ হাসিতে মুখটা ভরে ওঠে নাসরিনের।
– না না আমি বিদিশা, রওশন বা অন্য কেউ হতে যাব কেন! আমি নাসরিন।

লেখক: সাংবাদিক, কবি ও রাজনীতিবিদ।