Home শীর্ষ সংবাদ মধ্যরাতে গৃহবন্দী মেহবুবা মুফতি, ওমর আব্দুল্লাহ, ইউসুফ তারিগামি’সহ কাশ্মিরের বহু নেতা

মধ্যরাতে গৃহবন্দী মেহবুবা মুফতি, ওমর আব্দুল্লাহ, ইউসুফ তারিগামি’সহ কাশ্মিরের বহু নেতা

2

উম্মাহ অনলাইন: কাশ্মীরে রবিবার মধ্যরাতে থেকেই শুরু হয়ে গেল ভারতের হিন্দুত্ববাদি মোদি সরকারের দমনপীড়ন। উপত্যকার সংবাদ সূত্রে খবর, মাঝরাতেই গৃহবন্দি করা হয়েছে কাশ্মীরের মূল রাজনৈতিক নেতাদের। ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লা, পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি, সিপিআই(এম) নেতা মহম্মদ ইউসুফ তারিগামি, পিপলস কনফারেন্স নেতা সাজ্জাদ লোনকে গৃহবন্দি করা হয়েছে। শ্রীনগর সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। সমস্ত ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ হতে শুরু করেছে। দেশের বাকি প্রান্তের সঙ্গে কাশ্মীরের যোগাযোগ ধীরে ধীরে বন্ধ হতেও শুরু হয়েছে।

কিন্তু এই তৎপরতা কেন, কেনই বা কাশ্মীরে বিপুল পরিমাণ সেনা ও আধা সামরিক জওয়ান মোতায়েন, তার কোনো উত্তর মেলেনি রবিবার রাত পর্যন্ত। একাধিক গুঞ্জনের মধ্যেই সোমবার সকালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার জরুরী বৈঠক ডাকা হয়েছে। এই বৈঠকে কাশ্মীর নিয়ে কোনো ‘গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত’ হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে খবর। রবিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিরাপত্তা সংক্রান্ত শীর্ষপদস্থদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন। ছিলেন নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, স্বরাষ্ট্র সচিব রাজীব গৌবা, গোয়েন্দা ব্যুরো প্রধান অরবিন্দ কুমার, ‘র’ প্রধান সামন্ত গোয়েল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গে জড়িত সব মহলের অফিসারদের বার্তা দেওয়া হয়েছে কাশ্মীরে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত যে কোনো পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকতে। কিন্তু কী কারণে জওয়ান মোতায়েন, তা অফিসারদেরও জানানো হয়নি বলে খবর।

শ্বাসরোধী এই পরিস্থিতিতে একাধিক কারণ নিয়ে জল্পনা চড়ছেই। ‘সীমান্তপারের’ সন্ত্রাসকে সম্ভাব্য কারণ হিসাবে দেখিয়ে সেনাবাহিনীর তরফে আগেই কিছু বার্তা দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের মদতে সন্ত্রাসবাদীরা আক্রমণ করতে পারে আশঙ্কায় অমরনাথ যাত্রা নজিরবিহীন ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে আধা সরকারী সূত্রে খবর প্রকাশ করে। জম্মু কাশ্মীরের প্রশাসন বা নয়াদিল্লি এমন কোনো কথা সরকারীভাবে ঘোষণা করেনি। তারপরে দেখা গেছে শুধু অমরনাথ যাত্রীই নয়, সব পর্যটকদের রাজ্য ছাড়তে বলা হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে স্কুল-কলেজ। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়েছে কাজকর্ম, দোকানপাটও।

৩৭০নং ধারা বা অন্তত ৩৫-ক ধারা প্রত্যাহারের গুঞ্জন কমার বদলে আরো তীব্র হয়েছে। কাশ্মীরের আঞ্চলিক দলগুলি রবিবার বৈঠকে বসেছিল। প্রথমে ঠিক হয়েছিল এই বৈঠক একটি হোটেলে হবে। পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি অভিযোগ করেন, হোটেল মালিকদের প্রশাসনের তরফ থেকে বারণ করে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ফারুক আবদুল্লার বাসভবনে বৈঠক হয়েছে। পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা ছিলেন।

বৈঠকের পরে ফারুক বলেন, কাশ্মীরের স্বাধিকার ও সাংবিধানিক মর্যাদা বদলের চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না। এই প্রশ্নে সব দল একমত হয়েছে। কেন এই জওয়ান মোতায়েন তা ব্যাখ্যা করে কাশ্মীরের জনগণকে আতঙ্ক থেকে রেহাই দেবার জন্যও কেন্দ্রের কাছে বার্তা পাঠানো হবে। সোমবার প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি উভয়কেই কাশ্মীরের মানুষের উদ্বেগের কথা জানানো হবে বলেও ঠিক হয়েছে। একই সঙ্গে যযো কোনো পরিস্থিতিতে শান্তি বজায় রাখার জন্য কাশ্মীরের মানুষের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন এই নেতারা। তার কিছু পরেই একের পর এক নেতার গৃহবন্দি হবার খবর আসতে শুরু করে।

ওমর আবদুল্লা, মেহবুবা মুফতি টুইটারেই জানিয়েছেন তাঁরা সম্ভবত গৃহবন্দি। কাশ্মীরের জনগণের কন্ঠরুদ্ধ করার জন্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে তাঁরা ক্ষোভ জানিয়েছেন। 

এক টুইটে মেহবুবা মুফতি লিখেছেন, আমাদের মতো নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যারা শান্তির জন্য লড়াই করছি, তারা আজ গৃহবন্দি। তিনি বলেন, বিশ্ব দেখছে, জম্মু ও কাশ্মীরে কীভাবে মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। যে কাশ্মীর এক ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে পছন্দ করেছে, সেখানে অকল্পনীয় মাত্রা নিপীড়ন চলছে। জেগে ওঠো ভারত।

এদিকে নিয়ন্ত্রণ রেখায় বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে গুচ্ছ বোমা মারছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। গত মঙ্গলবার ও বুধবার রাতে নিলাম উপত্যকায় নারী-শিশুসহ নিষ্পাপ লোকজনকে নিশানা করে কামানের মাধ্যমে গুচ্ছ গোলা নিক্ষেপ করেছে তারা। এতে চার বছর বয়সী একটি শিশুসহ দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে রুশ গণমাধ্যম স্পুটনিক ও পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডেইলি টাইমস। দুই দেশের মধ্যে উত্তর কাশ্মীরের বারামুল্লাহ জেলায় ভারী গোলা বিনিময়ের একদিন পর পাকিস্তানের তরফ থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়, বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে গুচ্ছ বোমা নিক্ষেপ জেনেভা কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা জানায়, বেসামরিক লোকদের ওপর মারাত্মক প্রভাবের দরুন গুচ্ছ গোলার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সব আন্তর্জাতিক নীতিমালার বাইরে গিয়ে এই ভয়ানক ভারতীয় আগ্রাসনে দেশটির সেনাবাহিনীর আসল চরিত্র ও নৈতিক মানদণ্ড প্রকাশ পেয়েছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২৮ হাজার সদস্যকে শুক্রবার জম্মু ও কাশ্মীরে পাঠানো হয়েছে। আর গত সপ্তাহে সেখানে ১০ হাজার ভারতীয় সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল।

নিয়ন্ত্রণ রেখায় অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিবাদ জানাতে গত বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছিল পাকিস্তান। পরবর্তী সময়ে কাশ্মীর সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয় ভারত।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান তার আকাশপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমে বাড়ছে।

১৪ ফেব্রুয়ারিতে কাশ্মীরের স্থানীয় এক যুবকের আত্মঘাতী বোমা হামলায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ৪০ জওয়ান নিহত হন। পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জইশ-ই-মোহাম্মদ ওই হামলার দায় স্বীকার করে।

এদিকে আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরের সরকার লোকজনকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যারা নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর বসবাস করেন, তারা যেনো কোনো অপরিচিত ডিভাইস কিংবা গ্যাজেট কুড়িয়ে না নেয় কিংবা স্পর্শ না করে।

অক্ষত গোলা ও ছোট ছোট বোমা নিয়ে খেলতে গিয়ে এর আগে বহু শিশু হতাহতের শিকার হয়েছে।

এক বিবৃতিতে পাকিস্তানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, শত্রু বাহিনী অবিরত খেলনা-আকৃতির গুচ্ছ বোমা ও মাঝারি কামানের গোলা নিক্ষেপ করছে। যদি কেউ মোবাইল ফোনসহ এরকম কোনো ডিভাইস পড়ে থাকতে দেখে, তবে সেটি যেন স্পর্শ না করে কিংবা তুলে বাড়িতে নিয়ে না যায়।