Home সম্পাদকীয় কাশ্মীর পদানত: নেতানিয়াহু ভারত আসছেন!

কাশ্মীর পদানত: নেতানিয়াহু ভারত আসছেন!

3

।। আলতাফ পারভেজ ।।

কাশ্মীর বিষয়ক খবর ইতোমধ্যে হয়তো পুরো বাংলাদেশের জানা হয়ে গেছে। এখন বরং আমরা এই সংবাদ নিয়ে ভাবতে পারি যে, নিজ দেশে নির্বাচনের মাত্র আট দিন আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আগামী মাসের ৯ তারিখে ভারত সফরে আসছেন কেন?

বিশ্বের যেকোন দেশে নির্বাচন এলে প্রার্থীরা গ্রামে-গঞ্জে নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু সেই কাজ বাদ দিয়ে নেতানিয়াহু নয়াদিল্লী আসছেন কেন? এর কারণ স্পষ্ট। মোদি ইসরায়েলে দারুণ জনপ্রিয়। কেন মোদি সেখানে এত জনপ্রিয়, সেটা পাঠক অনুমান করে নিবেন আশা করি।

আসামে এনআরসি এবং কাশ্মীরকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ঐ জনপ্রিয়তা ক্রমে বাড়ছে। নির্বাচনের আগে তাই মোদির সঙ্গে তরতাজা কিছু ছবি তুলে নির্বাচনী ময়দান গরম করতে চান নেতানিয়াহু।

দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থা এত খারাপ হয়েছে যে, ভারত সফর ইসরায়েলের রাজনীতিবিদদের কাছে এখন নির্বাচনী প্রচারাভিযানের মতোই। এ যেন নিজ দেশের একটা অঞ্চলে যাওয়া।

সফরের আগেই তেল আবিবের কিং জর্জ স্ট্রিটে নেতানিয়াহুদের দল ‘লিকুদ পার্টি’র অফিসের সামনে মোদির বড় বড় ছবি দিয়ে ব্যানার টানানো হয়েছে। এসব  ব্যানারের মধ্যদিয়ে লিকুদ পার্টি দেখাতে চায়- দক্ষিণ এশিয়ায় মোদি তাদের প্রধান মিত্র। যে মিত্র সেই অঞ্চলে মুসলমানদের কোণঠাসা করার ক্ষেত্রে দৃষ্টিগ্রাহ্য অগ্রগতি ঘটিয়েছেন। মোদির কৃতিত্বে ভাগ বসাতে আগ্রহী নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদরা সবসময়ই বলেন, এই দুই জনের সম্পর্ক বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কিছু। টুইটারে পরস্পরকে তারা ‘প্রধানমন্ত্রী’ নয় – ‘বন্ধু’ হিসেবে সম্বোধন করেন।

কাশ্মীরকে পদানত করে মোদি-অমিত শাহ-দোভাল কী হাসিল করছেন

কাশ্মীরে ইতোমধ্যে প্রায় সাত লাখ ভারতীয় সৈনিক আছে। এর পরও গত দুই সপ্তাহে সেখানে আরও প্রায় ২০ হাজার ভারতীয় সৈন্য গেছে।

কাশ্মীরকে ইতোমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিকায়িত এলাকা বলা হয়। নতুন করে সৈন্য মোতায়েনের পর অবস্থা কী দাঁড়িয়েছে সহজে বোধগম্য। খাঁচায় অবরুদ্ধ এক জনপদের নাম এখন কাশ্মীর। এই লেখা তৈরির সময় শ্রীনগরে ১৪৪ ধারা জারি রয়েছে। স্কুল-কলেজ, ফোন এবং ইন্টারনেট সেবা, ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্ক বন্ধ। সভা, সমাবেশ ও মিছিলে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। সৈয়দ আলী শাহ গিলানিসহ অনেক নেতা ইতোমধ্যে গৃহবন্দি। দ্বিতীয় জনপ্রিয় নেতা ইয়াসিন মালিককে বন্দি করা হয়েছে দিল্লীতে তিহার কারাগারে। গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী কোন রাজনীতিবিদই আর মুক্ত অবস্থায় নেই সেখানে। সর্বশেষ আটক করা হয়েছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি ও ওমর আবদুল্লাহকে।

সমগ্র কাশ্মীরে রাস্তার মোড়ে মোড়ে সামরিক বাহিনী ব্যারিকেড বসিয়ে রেখেছে। থমথমে অবস্থা। গত দুই সপ্তাহের আতংকে সমগ্র ভ্যালিজুড়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম থমকে গেছে। কেউ জানে না এই জঘন্য অবস্থার শেষ কোথায়। ঠিক এরকম সময়ে নরেন্দ্র মোদির সরকার সিদ্ধান্ত জানালো, জম্মু ও কাশ্মীরের মর্যাদার স্মারক সংবিধানের ‘অনুচ্ছেদ ৩৭০’ প্রত্যাহার চায় তারা। লোকসভায় সেই প্রস্তাবই তুলে ধরলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ফলে সংবিধানের ‘৩৫-এ অনুচ্ছেদ’ও বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ কাশ্মীরের ইতিহাস থেকে আজাদির কাগুজে চিহ্নটুকুও মুছে দিতে চায় ভারত।

ভারতের আরএসএস শিবিরের সঙ্গে ইসরায়েলের দক্ষিণপন্থীদের মিত্রতা পুরানো। উভয়ের জন্য বোধগম্য কারণেই কাশ্মীরের এই অসহায়ত্ব উদযাপন করার মতো।

প্রশাসনিক সংস্কার নয় – এটা এক ধরনের বিদ্বেষের বাস্তবায়ন

ভারতীয় সংবিধানের ‘অনুচ্ছেদ ৩৭০’ ছিল জম্মু-কাশ্মীর-লাদাখের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও পররাষ্ট্রনীতি ব্যতীত রাষ্ট্র পরিচালনার বাকি বিষয়গুলোতে জম্মু ও কাশ্মীরে কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে ভারত সরকারকে স্থানীয় আইনসভার সঙ্গে আলাপ করতে হতো। আইন বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই অনুচ্ছেদ জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতীয় সংবিধান মেনে নেয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দিয়েছিল।

ভারতভুক্ত প্রিন্সলি স্টেইটগুলোর মধ্যে কেবল জম্মু ও কাশ্মীরই এইরূপ বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা ভোগ করছে। প্রায় সম্পূরক আরেকটি সাংবিধানিক ধারা ‘৩৫-এ’। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী  জম্মু ও কাশ্মীরে ‘স্থায়ী বাসিন্দা’দের বিশেষ মর্যাদা ও অধিকার দিতে পারতো স্থানীয় আইনসভা। পাশাপাশি ‘৩৫-ক’ অনুযায়ী কাশ্মীরের বাসিন্দা নয় এমন ভারতীয়দের সেখানে সম্পদের মালিক হওয়া ও চাকুরি পাওয়ায় বাধা ছিল। ১৯৫৪ সালের ১৪ মে ভারতের প্রেসিডেন্ট রাজেন্দ্র প্রসাদ অধ্যাদেশের মাধ্যমে কাশ্মীরের এই মর্যাদা নির্ধারণ করেছিলেন। সংবিধানের ‘অনুচ্ছেদ ৩৭০’-এর আলোকে অধ্যাদেশটি জারি হয়।

৩৭০ এবং ৩৫-ক অনুচ্ছেদ এতদিন কাশ্মীরকে যে স্বাতন্ত্র দিয়ে রেখেছিল এবার তার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটাতে চায় ভারত সরকার। যদিও ইতোমধ্যেই অনেক কাগুজে বিষয় হয়ে গিয়েছিল রাষ্ট্রনৈতিক ঐ স্বাতন্ত্র্য। নতুন প্রস্তাব অনুমোদিত হলে জম্মু ও কাশ্মীর একটি সাধারণ ভারতীয় রাজ্যের মর্যাদাও পাবে না। আরো খারাপ কিছু হবে সেখানে। স্পষ্টতই এটা কোন প্রশাসনিক সংস্কার নয় – একধরনের বিদ্বেষের বাস্তবায়ন মাত্র।

বিজেপির নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল এটা

বিজেপি সরকারের দিক থেকে কাশ্মীর বিষয়ে সর্বশেষ পদক্ষেপ অস্বাভাবিক নয়। যেহেতু ‘৩৫-ক’ এবং ‘৩৭০’ অনুচ্ছেদের বাতিল মোদি-অমিত শাহ জুটির নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল এবং শেষোক্তজনই আছেন এখন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে, সুতরাং এরকমই হওয়ার কথা। তবে এসব অনুচ্ছেদ নিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে অনেকগুলো মামলা চলছে। বিজেপি সরকার সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় সেটারও তোয়াক্কা করলো না। ভারতে আইনের শাসনের এক করুণ দশা দেখা গেল এই ক্ষেত্রে।

নতুন কাশ্মীর নীতির ফল কী হবে

ভারতীয় সংবিধানের আলোচ্য দুটি অনুচ্ছেদ প্রত্যাহারের বহু রকমের তাৎপর্য আছে। সাধারণভাবে এটা কাশ্মীরকে সাধারণ একটা ভারতীয় এলাকায় পরিণত করবে। অর্থাৎ কাশ্মীরের ‘আজাদি’র বিষয়টি বহু দূর পিছিয়ে যাবে এর মাধ্যমে। বিশেষভাবে ৩৫-ক অনুচ্ছেদ বাতিলের তাৎপর্য হবে সুদূরপ্রসারী। কাশ্মীর আর আগের মতো মুসলমানপ্রধান থাকবে না। জম্মুতেও অ-মুসলমানদের হিস্যা বাড়ানো হবে। মূলত: জনমিতি পাল্টে কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নতুন এক নিরীক্ষা হিসেবেই দোভাল-অমিত শাহ জুটি উদ্যোগটি নিচ্ছেন। আরএসএসের অনেকেই মনে করেন, হিন্দুপ্রধান জম্মু এবং বৌদ্ধপ্রধান লাদাখকে পাশে রেখে কাশ্মীরকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে- যদি কাশ্মীরে অ-মুসলমান হিস্যা বাড়ানো যায়। কাশ্মীরী অ-মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির আইনগত প্রতিবন্ধকতা অপসারিত হলে ধীরলয়ে এটা একসময় পূর্ণ ভারতীয় রূপ নিয়ে নেবে।

এমুহূর্তে জম্মু ও কাশ্মীরের জম্মুতে হিন্দু রয়েছে ৬৩ ভাগ, লাদাখে ১২ এবং কাশ্মীরে ২ ভাগ। গড়ে পুরো রাজ্যে ৩৬ ভাগ। বিজেপি এই অবস্থারই পরিবর্তন ঘটাতে চায় ৩৫-ক পাল্টে। অর্থাৎ ভ্যালিতে জনমিতিক পরিবর্তন ঘটিয়ে।

মুসলমানদের উম্মাহকোথায়?

বড় একটা গ্যারিসনের মতো কাশ্মীরের পরিবেশে এমুহূর্তে স্বাধীন মতামত বা ভিন্নমত প্রকাশের কার্যত কোন নিয়মতান্ত্রিক উপায় নেই। বিজেপি ছাড়া অন্যান্য দলের রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ। স্থানীয় সমাজে সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতা শাহ গিলানি এক টুইটার বার্তায় বিশ্ববাসীর কাছে তাঁদের রক্ষার আর্তি জানিয়ে লিখেছেন- ‘এই বার্তাকে এসওএস হিসেবে গণ্য করুন’। তবে পাকিস্তান ব্যতীত বিশ্বের আর কোথাও থেকে কাশ্মীর নিয়ে তাৎক্ষণিক কোন উদ্বেগ দেখা যায়নি। কথিত মুসলিম ‘উম্মাহ’ও এক্ষেত্রে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

[email protected]