Home প্রবন্ধ-নিবন্ধ হেফাজত ও কওমি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে তাবলীগকে দাঁড় করাচ্ছেন কেন?

হেফাজত ও কওমি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে তাবলীগকে দাঁড় করাচ্ছেন কেন?

0

।। তারেকুল ইসলাম ।।

মি. আফসান চৌধুরী— হেফাজত ও কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে তাবলীগকে দাঁড় করাচ্ছেন কেন? আপনি গত ১৫ জানুয়ারি সাউথ এশিয়ান মনিটরে ইংরেজিতে একটা কলাম লিখেছেন, যার শিরোনাম: Round one to Hefazot as Tabligh steps back—অর্থাৎ তাবলীগ পিছু হটায় প্রথম রাউন্ডে হেফাজতের জয়। আপনার এই শিরোনামটা পুরাই উদ্দেশ্যমূলক!

প্রথম রাউন্ডে হেফাজত জিতেছে মানে কী? যা বুঝলাম তা হলো, সামনে তাবলীগ আর হেফাজতের মধ্যে আরো কয়েক রাউন্ড দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের পরোক্ষ উস্কানি রয়েছে এই শিরোনামে। আর পুরো লেখাটাতে তাবলীগ জামাতকে আপনি কওমি মাদ্রাসা ও হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। কী ভয়ঙ্কর!!

অথচ বাস্তবতা ও ঘটনা এরকম কিছুই না; কিন্তু আপনি যে আপনার কওমি মাদ্রাসা ও হেফাজতবিরোধী এজেন্ডা অনুযায়ী লেখাটা লিখেছেন, তা বলাই বাহুল্য। ব্যক্তি সা’দ সাহেবের একটি বহুল বিতর্কিত বক্তব্যকে তুরুপের তাস হিসেবে কওমি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে সুচতুরভাবে ব্যবহার করেছেন।

দল হিসেবে হেফাজতের সাথে তাবলীগের কোনো দ্বন্দ্ব হয়নি। এমনকি কওমি মাদ্রাসার সাথেও তাবলীগের কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয়নি। বরং সমস্যা বা দ্বন্দ্বটা হয়েছে মূলত ব্যক্তি সা’দ সাহেবকে নিয়ে। তার মনগড়া ও বিভ্রান্তিকর কিছু বক্তব্য নিয়ে। যেগুলো তাবলীগের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট। সুতরাং, এবারের ইজতেমাকে সামনে রেখে দেশের শীর্ষ দায়িত্বশীল কওমি ওলামায়ে কেরাম সা’দ সাহেবের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

আপনি বরং একজন সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে ওলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপগুলো ভুল কি সঠিক ছিল—সে ব্যাপারে আপনার মতামত দিতে পারতেন। এমনকি চাইলে গঠনমূলক সমালোচনাও করতে পারতেন। কিন্তু না, আপনি তাবলীগের সঙ্কট বা ইস্যুকে হেফাজত ও কওমি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে আপনার ব্যক্তিগত এজেন্ডা ও প্রপাগান্ডার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেন!

যাই হোক, আপনি লিখেছেন (বঙ্গানুবাদ): “ভারতের মওলানা সাদ শুধু কওমি মাদ্রাসা ব্যবস্থারই বিরোধী নন, তিনি যেকোন ধর্মীয় কার্য সম্পাদনে কোন ধরনের অর্থ সাহায্য প্রদানের বিরুদ্ধে অবমাননাকর ভাষায় অনেক লেখালেখিও করেছেন। তিনি সরাসরি কওমি মাদ্রাসাকে আক্রমণ করে কথা বলেন। যা কওমিব্যবস্থা থেকে আসা হেফাজতকে মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। অনেক দাতব্য ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে হেফাজত জড়িত। তাই, বলতে হবে তাবলীগ জামাতই প্রথম গুলিটি ছুঁড়েছে, আর পাল্টা আঘাত হেনেছে হেফাজত।”

তাবলীগকে কওমি মাদ্রাসা ও হেফাজতের মুখোমুখি করে দিতে পারলেই তো কেল্লা ফতে! তাই না? তখন আপনারা সেকুলাররা মজা নিতেন। মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করাই তো আপনাদের এজেন্ডা। আপনার পুরো লেখাটাই তার প্রমাণ। কিন্তু মনে রাখুন, কওমি ওলামায়ে কেরামের সমর্থন সবসময় ছিল বলেই তাবলীগ জামাত এগিয়ে যেতে পেরেছে। তাবলীগকে সমস্ত বিভক্তি, ফেতনা ও ভ্রান্তি থেকে রক্ষায় কওমি আলেম-ওলামাই মূল রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। সুতরাং আপনার এজেন্ডা ও প্রপাগান্ডা পণ্ডশ্রম হতে বাধ্য।

আপনি আরো লিখেছেন (বঙ্গানুবাদ): “হেফাজত একটি পেশাদারীদের সংগঠন এবং তারা মসজিদভিত্তিক সেবা দিয়ে থাকে। অন্যদিকে, মওলানা সাদ ঘোষণা করেন যে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে অর্থপ্রদান ‘বেশ্যাকে মজুরি’ প্রদানের শামিল। অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে ধর্মীয় দলগুলোর এমন সব কর্মকাণ্ডকে সাদ-এর ওই বক্তব্যের ব্যাখ্যার আওতায় নিয়ে আসা হয়। এই ফতোয়ার ফলে ধর্মীয় অর্থনৈতিক খাতের গ্রামীণ মসজিদভিত্তিক মোল্লাদের প্রচলিত আয়ের উৎসগুলো সম্পূর্ণরূপে বন্ধের উপক্রম হয়। তাই, টিকে থাকার জন্য ভয়ংকরভাবে ওই ফতোয়ার বিরোধিতা করা ছাড়া হেফাজতের আর কোন উপায় ছিলো না।”

সা’দ সাহেবের এই বক্তব্যের কারণে কওমি মাদ্রাসার আয়ের উৎসগুলো সম্পূর্ণরূপে বন্ধের উপক্রম হয়েছিল? পাগলের মাথা খারাপ হলেই এমনটা বলা যায়। প্রপাগান্ডামূলক লেখা লিখেছেন, অতিরঞ্জন তো করবেনই, স্বাভাবিক। ঘুরেফিরেই আপনার মূল সুরটা তাবলীগ বনাম হেফাজত!

দেওবন্দি ওলামায়ে কেরাম কর্তৃক প্রদত্ত ফতোয়ার সূত্রমতে জানা যায়, সা’দ সাহেব এক বয়ানে বলেছিলেন, ‘পারিশ্রমিক নিয়ে ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া মানে ধর্মের সাথে ঠাট্টা করা। কুরআন শিক্ষা দিয়ে বেতন গ্রহণকারীদের আগে যিনা-ব্যভিচারকারীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে।’

আপনি তার এই বিতর্কিত বক্তব্যকে ‘ফতোয়া’ হিসেবে অভিহিত করেছেনে এবং কওমি মাদ্রাসা ও হেফাজতের বিরুদ্ধে তাবলীগ জামাতকে উস্কানি দিয়েছেন। অথচ তার আরো কিছু বিতর্কিত বক্তব্যের পাশাপাশি এই বক্তব্যও দেওবন্দের শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম কর্তৃক আপত্তিজনক, বিভ্রান্তিকর ও মনগড়া বলে বিবেচিত হয়েছে। আমাদের শীর্ষ কওমি ওলামায়ে কেরামও দেওবন্দকে অনুসরণ করে তার ব্যাপারে অবস্থান নিয়েছেন।

তাহলে একজন সিনিয়র দায়িত্বশীল সাংবাদিক হওয়া সত্ত্বেও আপনি একটি বিতর্কিত বক্তব্য অবলম্বনপূর্বক কওমি মাদ্রাসাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে টার্গেট করেছেন এবং তাবলীগ ও হেফাজতের মধ্যে একটা বানোয়াট সংঘাতমুখর সম্পর্ক তুলে ধরেছেন লেখাটাতে।

তাছাড়া, ফতোয়া আর ব্যক্তিবিশেষের সাধারণ মৌখিক বক্তব্য যে এক নয় কিংবা দুটোর মধ্যে যে গুরুতর তফাত আছে—এটুকু অন্তত বুঝার মতো কমনসেন্স আপনার থাকা উচিত ছিল। তাবলীগকে ব্যক্তিপূজায় পর্যবসিত করার সুযোগ নেই। কারো বিচ্ছিন্ন মনগড়া বক্তব্যের কারণে তাবলীগের প্রতি ধর্মপ্রাণ মানুষের আস্থার হানি ঘটতে দেবে না ওলামায়ে কেরাম।

মজার ব্যাপার হলো, আপনারা সেকুলাররা তো সারাক্ষণ ফতোয়াবাজির বিরুদ্ধে কথা বলেন। কিন্তু ঠিকই কোনো তথাকথিত ফতোয়া আপনাদের এজেন্ডা ও প্রপাগান্ডার স্বার্থে গেলে সেটাকে ব্যবহার করতে আপনারা দ্বিধা করেন না। কী ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আপনাদের!! মচৎকার!

আপনি ভালো করেই জানেন, কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের অর্থসহায়তায় চলে। জেনারেল প্রাইভেট ভার্সিটিগুলোর মতো শিক্ষাকে বাণিজ্য ও পণ্য বানায় নাই কওমি মাদ্রাসাগুলো। টিউশন ফি’র নামে অভিভাবকদের পকেট কেটে বছরের পর বছর রীতিমতো ডাকাতি করে যাচ্ছে প্রাইভেট ভার্সিটিগুলো। এগুলো এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হরদম ভর্তিবাণিজ্যের মচ্ছব চলেই। কোনোদিন তো আপনাকে এসব ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে দেখিনি?

পক্ষান্তরে, কওমি মাদ্রাসাগুলোতে ভর্তিবাণিজ্য ও শিক্ষাব্যবসা চলে না; বরং দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে কওমিদের আত্মত্যাগ ও অবদান ব্যাপক। আর আপনি কিনা কওমি মাদ্রাসার ইনকাম ও ইকোনমি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে আসছেন। নিজেদের চেহারাটা আগে আয়নায় দেখেন। অয়েল ইউর ওউন মেশিন।

এছাড়া আমি আগেও বলেছি, বাংলাদেশে নিরক্ষরতা দূর করে স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে কওমি মাদ্রাসাগুলোর অবদান অবিস্মরণীয়। দেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র অঞ্চলগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে কওমিরা শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়েছে। এক্ষেত্রে সরকার ও রাষ্ট্রের চেয়েও তাদের অবদান বেশি। কেননা দেশের প্রত্যেকটি প্রান্তিক দরিদ্র অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে সরকার বা রাষ্ট্র এখনতক পুরোপুরি সফল নয়। কওমিরা তা পেরেছে এনটায়ারলি উইদাউট দ্যা হেল্প অফ দ্যা গভর্নমেন্ট/দ্যা স্টেট। এজন্য তারা বাহবা পাওয়ার যোগ্য।

কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, তারা যেই শিক্ষাটা পৌঁছে দিয়েছে, তা হলো ধর্মীয় শিক্ষা। আপনাদের সেকুলারদের আসল চুলকানিটা এই জায়গায়। ইসলামি শিক্ষা নিয়েই আপনাদের যত চুলকানি।

ইতোমধ্যে ভারতের দেওবন্দী ওলামায়ে কেরাম সা’দ সাহেবের বেশ কিছু মনগড়া বিভ্রান্তিকর বক্তব্যে আপত্তি জানিয়ে সম্মিলিত ফতোয়া দিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরামও তার বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে আগে থেকেই সংশয়ে ছিলেন।

সুতরাং, দেওবন্দি ওলামায়ে কেরাম যখন তার মনগড়া বক্তব্যসমূহের প্রতিবাদ করে ফতোয়া দিলেন, তখন আমাদের শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম তদনুযায়ী সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিলেন যে, এবারের ইজতেমায় বিতর্কিত মাওলানা সা’দ সাহেবকে অংশগ্রহণ করতে এবং বয়ান রাখতে দেওয়া হবে না।

সো, ইট হ্যাজ নাথিং স্পেশাল টু ডু উইথ জাস্ট দ্যা অর্গানাইজেশন (HI), বাট উইথ দ্যা টপ কাওমি উলামায়ে কেরাম অফ বাংলাদেশ। নাউ হ্যাভ ইউ গট ইট মি. আফসান চৌধুরী?

হোয়াটস্ মোর, লক্ষ করুন, ইজতেমায় তাকে অংশগ্রহণ না করতে এবং বয়ান না রাখতে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিলো, তার মনগড়া ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য শুনে যেন সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষজন বিভ্রান্ত না হয়ে পড়েন। কিন্তু মাওলানা সা’দ সাহেব এদেশের ওলামায়ে কেরামকে ‘বুড়ো আঙুল’ দেখিয়ে বাংলাদেশে আসলেন। যদিও ধারণা করা হয়, এর পেছনে গভীর পলিটিক্স ছিল। এমনকি মাওলানা সা’দ সাহেবকে শিখণ্ডী বানিয়ে ইজতেমাকে বিশেষ কায়েমি স্বার্থে কব্জা করাও একটা রাজনৈতিক মহলের উদ্দেশ্য ছিল।

পরিশেষে বলবো, সেকুলারিজম, প্রগতিশীলতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধুয়া তুলে প্রধানত কওমি মাদ্রাসা ও হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে আপনাদের এজেন্ডা ও প্রপাগান্ডা সবসময়ই ক্রিয়াশীল থাকে। সুযোগ পেলেই সেই এজেন্ডা ও প্রপাগান্ডায় আপনারা মেতে ওঠেন। আপনার এই লেখাটাও তার ব্যতিক্রম নয়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও জাতীয় পত্রপত্রিকার কলাম লেখক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.