Home ওপেনিয়ন ধার্মিক ও রাজনৈতিক রবীন্দ্রনাথ এবং সেকুলারদের ফ্যালাসি!

ধার্মিক ও রাজনৈতিক রবীন্দ্রনাথ এবং সেকুলারদের ফ্যালাসি!

0

।। ত্বরিকুল ইসলাম ।।

রবীন্দ্রনাথ অফিসিয়ালি ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী হলেও কালচারালি হিন্দুই ছিলেন। কালচারাল হিন্দুত্ব ত্যাগ করার মতো হীনম্মন্য তিনি ছিলেন না। হিন্দুত্ব নিয়েই তিনি প্রগতিশীল থাকতে পেরেছিলেন। তার সময়ে তার চেয়ে বড় প্রগতিশীল আর কে ছিলেন?

আগাগোড়া হিন্দুত্ব ধারণ করা ধার্মিক রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে তার সময়কালে ছিলেন সবচে অগ্রসর সাহিত্যিক এবং আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত ও নোবেলজয়ী কবি। তিনি সেকুলার ছিলেন না। এমনকি তার কোনো লেখায় সেকুলারিজমের নামগন্ধও খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং রবীন্দ্রনাথ নিজেই হিন্দু-মুসলিম স্বাতন্ত্র্য বা পার্থক্য বিলুপ্ত করাকে ‘আত্মহত্যার নামান্তর’ বলে একটি প্রবন্ধও লিখেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দুত্ব নিয়ে তার ‘আত্মপরিচয়’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন- “আমরা যে-ধর্মকে গ্রহণ করিয়াছি, তাহা বিশ্বজনীন তথাপি তাহা হিন্দুরই ধর্ম। এই বিশ্বধর্মকে আমরা হিন্দুর চিত্ত দিয়াই চিন্তা করিয়াছি, হিন্দুর চিত্ত দিয়াই গ্রহণ করিয়াছি। শুধু ব্রহ্মের নামের মধ্যে নহে, ব্রহ্মের ধারণার মধ্যে নহে, আমাদের ব্রহ্মের উপাসনার মধ্যেও একটি গভীর বিশেষত্ব আছেই- এই বিশেষত্বের মধ্যে বহুশত বৎসরের হিন্দুর দর্শন, হিন্দুর ভক্তিতত্ত্ব, হিন্দুর যোগসাধনা, হিন্দুর অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠান, হিন্দুর ধ্যানদৃষ্টির বিশেষত্ব ওতপ্রোতভাবে মিলিত হইয়া আছে। আছে বলিয়াই তাহা বিশেষভাবে উপাদেয়, আছে বলিয়াই পৃথিবীতে তাহার বিশেষ মূল্য আছে।”

ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী হলেও রবীন্দ্রনাথ হিন্দুত্বের বাইরে আর কোনো স্বাক্ষর রাখেননি। বরং ছিলেন হিন্দুত্ববাদী। তিনি নিজেই চাইতেন যে, ভারতের মুসলমানরা হিন্দু পরিচয় ধারণ করুক, অর্থাৎ তাদেরকে হিন্দুরূপী মুসলমান হতে হবে। ভারতের কেউ ধর্মে খ্রিস্টান কিংবা মুসলিম হলেও তাকে জাতিতে ‘হিন্দু পরিচয়’ ধারণ করতে হবে— এমন সাম্প্রদায়িক নীতিই ছিল রবিঠাকুরের জাতিবাদী দর্শন!

রবীন্দ্রনাথ এই হিন্দুরূপী মুসলমান ও হিন্দুরূপী খ্রিস্টান থিওরি দিয়েছেন তাঁর ‘আত্মপরিচয়’ নামক প্রবন্ধে- “তবে কি মুসলমান অথবা খ্রীস্টান সম্প্রদায়ে যোগ দিলেও তুমি হিন্দু থাকিতে পার? নিশ্চয়ই পারি। ইহার মধ্যে পারাপারির তর্কমাত্রই নাই। হিন্দুসমাজের লোকেরা কী বলে সে কথায় কান দিতে আমরা বাধ্য নই; কিন্তু ইহা সত্য যে কালীচরণ বাঁড়ুজ্যে মশাই হিন্দু খ্রীস্টান ছিলেন। তাঁহার পূর্বে জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর হিন্দু খ্রীস্টান ছিলেন। তাঁহারও পূর্বে কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় হিন্দু খ্রীস্টান ছিলেন। অর্থাৎ তাঁহারা জাতিতে হিন্দু, ধর্মে খ্রীস্টান। খ্রীস্টান তাঁহাদের রঙ, হিন্দুই তাঁহাদের বস্তু। বাংলাদেশে হাজার হাজার মুসলমান আছে। হিন্দুরা অহর্নিশি তাহাদিগকে ‘হিন্দু নও হিন্দু নও’ বলিয়াছে এবং তাহারাও নিজেদিগকে ‘হিন্দু নই হিন্দু নই’ শুনাইয়া আসিয়াছে; কিন্তু তৎসত্ত্বেও তাহারা প্রকৃতই হিন্দুমুসলমান। কোনো হিন্দু পরিবারে এক ভাই খ্রীস্টান, এক ভাই মুসলমান ও এক ভাই বৈষ্ণব এক পিতামাতার স্নেহে একত্রে বাস করিতেছে—এই কথা কল্পনা করা কখনোই দুঃসাধ্য নহে, বরঞ্চ ইহাই কল্পনা করা সহজ— কারণ ইহাই যথার্থ সত্য, সুতরাং মঙ্গল এবং সুন্দর।”

আরও পড়ুন- ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছিল মুসলমানদের জন্য, ইসলামবিদ্বেষীদের জন্য নয়’

অথচ ধার্মিক রবীন্দ্রনাথকে সেকুলার বানিয়ে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা রবীন্দ্রস্বভাব ও রবীন্দ্রচিন্তার একেবারেই বিপরীত। এভাবেই ঊনিশ শতকে শুরু হওয়া এবং রবীন্দ্রযুগের বিশ শতক পর্যন্ত প্রবহমান বাংলার হিন্দু রেনেসাঁসের অভিঘাতে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যে-আধুনিক হিন্দু-মানস গড়ে উঠেছিল, সেটাকে আড়াল করার সেকুলার বঙ্গীয় ধূর্ত প্রচেষ্টাকে আমি মোকাবেলা করতে চাই।

আমাদের দেশের মুসলিম প্রগতিশীলরা প্রধানত ইসলামী ভাবধারার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েই সেকুলার প্রগতিশীল হওয়ার কোশেশ করেন। আর প্যারাডক্সিক্যালি ব্রাহ্মধর্মী হিন্দু রবীন্দ্রনাথই কিনা তাদের সেকুলার প্রগতিশীলতার আইডল! কী সেলুকাস! রবীন্দ্রজপ না করলে তাদের আচার-অনুষ্ঠানে সেকুলার আমেজটাই নাকি আসে না! ধার্মিক রবীন্দ্রনাথকে যারা সেকুলার বানিয়ে আজ প্রগতিশীলতার রাজনীতি করছেন, তারাই মূলত রবীন্দ্রচিন্তার শত্রু!

বস্তুতপক্ষে, আজকে আইরনিক্যালি সেকুলার প্রগতিশীল বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছেন রবীন্দ্রনাথ! আর এই অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে বাঙালি মুসলমানের ইসলামী ভাবচেতনা দমনের জন্য, সেকুলার ভণিতার মধ্য দিয়ে।

আর বাংলা সাহিত্যে হিন্দুত্ব থাকলে সেকুলারদের জাত যায় না, কিন্তু ইসলাম থাকলেই যেন বজ্জাতি ঘটে যায়! ফলে ফররুখ আহমেদ, আল মাহমুদ ও সৈয়দ আলী আহসানদের ব্রাত্য করে রাখা হয়। অথচ রবীন্দ্রনাথ তার কবিতা ও সাহিত্যের মৌলিক উপাদানগুলো নিয়েছিলেন হিন্দু ধর্মের ইতিহাস-ঐতিহ্য, বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ও হিন্দু সংস্কৃতি থেকে। ইউরোপ থেকেও নিয়েছিলেন। তবে তথাকথিত প্রগতির বিপদ সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন। তার ছোটগল্প ‘প্রগতি সংহার’ পড়লেই সেটা বুঝা যায়।

কিন্তু নিজে ফারসি চর্চা করলেও, ফারসি মুসলিম কবিদের দ্বারা প্রভাবিত হলেও এবং ইসলামী ব্যক্তিত্বদের সাথে তার পরিচয় ও সম্পর্ক থাকলেও রবীন্দ্রনাথ সচেতনভাবেই নিজের চিন্তা ও সাহিত্যকর্মকে ইসলাম ও মুসলিম উপাদান-ঐতিহ্য থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই জায়গায় রবীন্দ্রনাথের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ বা বিরাগ নেই, বরং নিজের ধর্মীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে অবলম্বন করেই তিনি যে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন, তাতে আমি মুগ্ধ ও অভিভূত! হিন্দুত্বকে ধারণ করেই তিনি বিশ্বমানবতার কবি বা বিশ্বকবি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এই জায়গায় অত্যন্ত শক্তিশালী। যেমনটা শক্তিশালী মহাকবি আল্লামা ইকবাল। উভয়ের কেউই সেকুলার ছিলেন না, বরং ধর্মানুরাগী ছিলেন।

অন্যদিকে, কবি হিসেবে রাজনৈতিক জায়গায় ইকবাল ও রবিঠাকুর থেকেও কাজী নজরুলের অবস্থান আরো শক্তিশালী। কারণ, সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে নজরুল ছিলেন হিন্দু-মুসলিম মিলনের ঐতিহাসিক অগ্রদূত। এটা ঐতিহাসিকভাবে তার রাজনৈতিক অবস্থান, একে সরাসরি আক্ষরিক বা নিছক ধর্মহীন সেকুলার পজিশন বলা ভুল হবে।

যাই হোক, কারো ‘পবিত্র রবীন্দ্রানুভূতি’তে আঘাত দেওয়া আমার লক্ষ্য নয়। এমনকি এখানে আমি কবি ও সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথকে বিচার করছি না, বরং বায়ান্ন’র ভাষা-আন্দোলনের কাল থেকে আজতক রবীন্দ্রনাথকে ‘সেকুলার দেবতা’ বানিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠার যে-নিরন্তর প্রয়াস চলছে, সেটার প্যারাডক্স ও দেউলিয়াপনাকে বোঝার চেষ্টা করছি। সেইসাথে এই ম্যানিপুলেটেড রাজনৈতিক রবীন্দ্রনাথের প্যারাডক্স বা বৈপরীত্যগুলো আনফোল্ড করার চেষ্টা করছি। যদিও কবি ও সাহিত্যিক রবিঠাকুরের ব্যাপারে আমি বরাবরই মুগ্ধ, কিন্তু তাই বলে তাকে দেবতার মতো অন্ধভাবে পূজা করার পক্ষে নই।

রবীন্দ্রনাথকে এদেশে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার দরকারেই ‘আমার সোনার বাংলা’ গানকে জাতীয় সঙ্গীত করা হয়েছিল—এমনটাই মনে করেন ফরহাদ মজহার তাঁর রচিত ‘রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্রপাঠ’ বইটিতে। তবে পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরশাসকরা যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রেণোদিত হয়ে রবীন্দ্রনাথের গান নিষিদ্ধ না করতো এবং রবীন্দ্রসাহিত্যের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সেন্সরশিপ আরোপ না করতো, তাহলে “সন্দেহ হয় রবীন্দ্রনাথের গান জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গাইবার প্রবল রাজনৈতিক ইচ্ছা এদেশের জনগণের মধ্যে জাগতো কিনা” (পৃষ্ঠা: ৩৮)।

এছাড়া বইটিতে তিনি লিখেছেন, “পারিবারিক ও ধর্মীয় পরিচয়, মনন, দর্শন, পঠন, পাঠন প্রভৃতির মধ্যদিয়ে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যে-মনোগাঠনিক প্রক্রিয়া ও প্রকাশ সচল ছিল তার সম্পৃক্তি হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে, কিন্তু বৌদ্ধ বা ইসলামী ঐহিত্যের সঙ্গে নয়। রবীন্দ্রনাথ কখনো ভোলেননি যে তিনি হিন্দু” (পৃষ্ঠা: ৩৯)।

সুতরাং একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র জাতিরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে তাঁর গানকে স্রেফ রাজনৈতিক বিবেচনায় গ্রহণ করা হলো। আর কিছু বিবেচনা করা হয়নি। জাতীয় সঙ্গীত নির্ধারণে আমাদের এখানকার বৃহত্তর ইসলামী ঐহিত্য, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ বা এজাতীয় কিছুকে আমলে নেওয়া হয়নি। এমনকি from any sense or aspect আমার সোনার বাংলা গানটি ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারারও নয় বলে আমি মনে করি। এছাড়া গানটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আবেদন আমলে নিলে এটি আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হওয়ার যোগ্যতা রাখে কিনা, তা এদেশের স্বাধীনচেতা গণমানুষের বিবেচনায় ছেড়ে দিলাম।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুসারে বাংলাদেশের ‍মুক্তিযুদ্ধের তিন মূলনীতি ছিল: সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর কারা আমাদেরকে রবিঠাকুরের সেই শোষণ-জুলুমের ‘সোনার বাংলা’য় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল? ফলে আমরা আজও শোষণ-জুলুম থেকে মুক্তি পাইনি। পানি আগ্রাসন, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, সীমান্তে নির্বিচারে গুলি করে বাংলাদেশিদের হত্যা, আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নগ্ন হস্তক্ষেপ, বহুমুখী শোষণ-জুলুম, সর্বোপরি বাংলাদেশকে একটি পদানত করদরাজ্যে পরিণত করার প্রচেষ্টা চলছেই। এখন অবস্থা এমন যে, শোষণ করতেই থাকবে, কিন্তু কোনো আওয়াজ আমাদের করা যাবেনা।

এদেশের একশ্রেণির রবীন্দ্রপূজারী সেকুলার গোষ্ঠী কর্তৃক ম্যানিপুলেটেড রাজনৈতিক রবীন্দ্রনাথকে আমাদের জাতিরাষ্ট্রের জন্য হুমকি মনে করি। কারণ ভূ-রাজনৈতিক পরিচয়ে তিনি ‘ভারতীয় বাঙালি কবি’ হিসেবেই সর্বজনস্বীকৃত। তাই, আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে কোনোভাবেই তাকে ‘বাংলাদেশের কবি’ বলার সুযোগ নেই। আবুল মনসুর আহমদও সেটাই বলেছিলেন। অবশ্য, সর্বজনীনভাবে তাকে ‘বাংলার কবি’ বলা যেতে পারে। সুতরাং এদেশে রবীন্দ্রনাথকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার অর্থ হলো, প্রকারান্তরে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদকে সম্প্রসারণ ও আধিপত্যবাদের অনুপ্রবেশের পথ সুগম করে দেওয়া। নিছক রবীন্দ্রমুগ্ধতা ও সাহিত্যিক আবেগ বাদ দিয়েই রাজনৈতিক বিষয়গুলো বুঝতে হবে। রাজনৈতিক রবীন্দ্রনাথ এক জিনিস, আর কবি-সাহিত্যিক-সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ আরেক জিনিস। দুইটাকে গুলিয়ে কনফিউজড হওয়া যাবে না।

এছাড়া হিন্দু-মুসলিম মিলনের অগ্রদূতরূপে আমরা নজরুলকে পেলেও রবীন্দ্রনাথকে আমরা ধার্মিক কালচারাল হিন্দু সাহিত্যিকরূপেই পাই। খেয়াল করলে দেখবেন, হিন্দু-মুসলিম মিলনের ঐতিহাসিক অগ্রদূতরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও নজরুলকে ঘিরে কিন্তু বিশেষ ধরনের কোনো সেকুলার প্রকল্প বা প্রজেক্ট দেখা যায় না। নজরুলের হিন্দু-মুসলিম মিলনের বিষয়টি তথাকথিত সেকুলারিজম নয়, বরং তা ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে গণঐক্য ও গণলড়াই সংগঠিত করার রাজনৈতিক সংগ্রাম।

নজরুলের হিন্দু-মুসলিম মিলনের বিষয়টি ইসলামবিদ্বেষী রেডিক্যাল সেকুলার ভাবধারার সাথেও সম্পর্কিত না। সেজন্যই সেকুলার প্রগতিশীলরা নজরুলের লাইনের সেকুলারগিরি করেন না। বরং তাদের লাইনের সেকুলারগিরির জন্য নজরুল অনুকূল নন। কারণ হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য অসংখ্য ভক্তিমূলক গানের রচয়িতা ও শ্যামাসঙ্গীতের স্রষ্টা নজরুলের মধ্যে একইসাথে ইসলামী ভাবচেতনাও শক্তিশালীরূপে পাওয়া যায়। এই জায়গায় রবীন্দ্রনাথের চেয়েও নজরুল অনেক বড় ও মহান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের জাতীয় কবি ও বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতির কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী, মৃত্যুবার্ষিকীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান অত আড়ম্বরপূর্ণভাবে করা হয়না, পাছে আবার রবীন্দ্রনাথের চেয়ে নজরুল পলিটিক্যালি আরো প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন কিনা এই ভয়!

তাই, এদেশে সেকুলার বিভ্রম তৈরি করে বাঙালি মুসলমানের ইসলামী ভাবচেতনার বিরুদ্ধে আপাত সেকুলার পজিশনের নজরুলের চেয়েও একজন হিন্দু সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথকে ব্যবহার করে হিন্দুত্ববাদের এজেন্ডা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অধিকতর সুবিধাজনক। আমার আফসোস, এখানেই মূলত রবীন্দ্রনাথের চরম অমর্যাদা ঘটে। তার ‘শ্রী’র হানি হয়। এখানেই বঙ্গীয় সেকুলারদের দেউলিয়াপনা উদামভাবে ধরা পড়ে!

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাতীয় ইংরেজি পত্রপত্রিকার কলামিস্ট।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.