Home ইতিহাস ও জীবনী সুলতান মাহমূদ গজনবী’র ঐতিহাসিক ভারত অভিযান এবং সোমনাথ বিজয়

সুলতান মাহমূদ গজনবী’র ঐতিহাসিক ভারত অভিযান এবং সোমনাথ বিজয়

0

।। আব্দুল্লাহ মাসউদ ।।

রাসূলুল্লাহ (সা.)এর ইন্তিকালের পর খিলাফত এলো খুলাফায়ে রাশিদার হাতে। খুলাফায়ে রাশিদার আমল শেষে হুকুমত এলো উমাইয়াদের হাতে। উমাইয়াদের পতন শেষে হুকুমতের লাগাম এলো আব্বাসীয়দের হাতে। হুকুমতের লাগাম যখন আব্বাসীয়দের হাতে তখন রাজতন্ত্রের অশুভ প্রতিক্রিয়ার সাথে সাথে অনারবী বর্বরতাও রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোতে ঢুকে পড়ল। নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো স্বজনপ্রীতি আর জাতীয়তাবোধের উগ্রতা। আলমে ইসলামে যে মহান ধর্মীয় সম্পর্কের দরুন একই বৃত্তের ফল স্বরূপ ছিল খসে পড়তে লাগলো এক এক করে তা।

তৃতীয় শতকে মুহাম্মদ ইব্নে যিয়াদ এদেশটিতে পুরোপুরী স্বায়ত্বশাসন কায়েম করেন। এ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে মিশরের গভর্ণর আহ্মদ ইব্নে তুলুন আব্বাসীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ফলে মিশরও হাতছাড়া হয়ে যায় তাদের।

৩৫৮ হিজরীতে মিশরে ফাতেমী হুকুমত কায়েম হলে কয়েক বছরের মধ্যে তারা গোটা শাম দেশ কব্জা করে নেয়। বিপর্যয়ের এ যুগে পারস্য খোরাসান ও উত্তর আরব দেশসমূহে নাম মাত্র আব্বাসীয়দের শাসন ছিল, চতুর্থ শতকে প্রতিটি রাজ্যেই স্বায়ত্ব শাসন শুরু হয়। ক্ষমতার লালসায় নতুন নতুন নীল ভ্রমরের অভ্যুদয় ঘটে রাজধানীর মঞ্চ ময়দানে। ৪র্থ শতকের শেষের দিকে আব্বাসীয়দের পতন ঘটলে সাসানীরা মুসলিম জাহানকে গ্রাস করে নিল। আর আব্বাসীয়রা নিক্ষিপ্ত হল ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে।

ঠিক এ সময়ে গজনীর হিমেল উপত্যকায় এমন এক বিশাল ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটল, যার সামনে মুখ থুবড়ে পড়ল ভাগ্যান্বেষীদের উৎসাহ। যার তলোয়ার ঝংকৃত হয়েছে তুর্কিস্তানে আবার কখনো ঝলসে উঠেছে হিন্দুস্তানের মাটিতে। যার ঘোড়া কখনো জাইহুন আবার কখনো গঙ্গার পানি পান করেছে। যার কাফেলা একস্থানে স্থায়ী না হয়ে দুশমনের সকল বাধার বিন্ধ্যাচল ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে যেত দরে বহুদরে। তাঁর নাম সুলতান মাহমূদ গজনবী।

মাহমুদ গজনবীর আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল সমুদ্রের মাঝে ফুঁসে উঠা ঐ উত্তাল তরঙ্গের মত, পাহাড়সম ঢেউ ঝুটি যার সামনে এসে চুপসে যেত। তিনি এমন এক দিগ্বিজয়ী বীর যার গতি পাহাড়-সাগর, অরণ্য-মাঠ কখনো রুদ্ধ করতে পারেনি। তাঁর তলোয়ার হিন্দুস্তানের মাটিতে এমনভাবে ঝলসে উঠেছে। মনে হয় যেন তিনি বিজয়ী ঝাণ্ডাকে উড্ডীন করাকে জীবনের ব্রত বানিয়ে নিয়েছেন। বৃন্তচ্যুত শুষ্ক পুষ্পটির নিরস পাপড়ীগুলো ঝেড়ে সেখানে বাসন্তি ছোঁয়ায় সুবাসিত ফুলকলি বসানোর মহান দায়িত্ব দিয়ে কুদরত তাঁকে পাঠিয়ে ছিলেন তেত্রিশ কোটি দেবতার ভারত ভূমিতে। পাহাড়ের গা বেয়ে আসা জলপ্রপাতকে স্তব্ধ করে দেয়ার কঠিন দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল তাঁর স্কন্ধে। চতুর্থ শতকের শেষের দিকে গজনী উপত্যকায় যে তুফান উঠেছিল শতাব্দী ধরে নির্যাতিত মানবতা তাঁর দিকে চেয়েছিল অধীর আগ্রহে।

৩৯২ হিজরীতে বিন্ধ্য সাম্রাজ্যের শাসক জয়পালের সাথে সুলতান মাহমূদ গজনবীর যুদ্ধ হয়। জয়পাল তার বার হাজার সাওয়ার, তিন শত হাতি ও ত্রিশ হাজার পায়দল সৈন্যবহর নিয়ে মাহমূদের মাত্র পনের হাজার সৈন্যের মুকাবেলায় অগ্রসর হয়।

৩৯২ হিজরী ১৮ই মুহাররম পেশোয়ারের নিকটে এক রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়। মুসলমানের তীর কামানের অনবরত আক্রমণে জয়পালের সৈন্য শিবিরে দুপুরের দিকে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচ হাজার লাশের স্তুপ মাড়িয়ে হিন্দুরা পিছ পা হয়। জয়পাল তার পনের জন নাতি-পুত্র নিয়ে বন্দী হয়। আড়াই লাখ দীনার ও পঞ্চাশটি হাতির বিনিময়ে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। এই অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে না পেরে ক্ষোভে দুঃখে জয়পাল আত্মহত্যা করে। তার স্থলে ক্ষমতায় আসে তদ্বীয় পুত্র আনন্দ পাল। লমগান জয় করার পর সুলতান মাহমূদ ভাতিণ্ডার সালতানাতের দিকে মনোনিবেশ করেন।

৩৯৫ হিজরীতে সুলতান মাহমূদ সিন্ধু নদ পাড়ি দিয়ে ভাতিণ্ডা পানে রোখ করেন। ভাতিণ্ডার দাম্ভিক রাজা বাজি রায় সৈন্যাধিক্যের উপর অগাধ আস্থাশীল হয়ে কিল্লায় অবস্থান করে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ না করে মুসলিমদের সাথে সম্মুখ সমরে নামে। একাধারে তিনদিন পর্যন্ত লড়াইয়ে জয় পরাজয় নির্ধারিত হল না। সুলতান মাহমূদ পূর্বে এমন শৌর্যবীর্যের সাথে পৌত্তলিকদের লড়াই করতে দেখেননি।

চতুর্থ দিনে বাজী রায়-এর সৈন্যরা মুসলমানদের পিছু হটতে বাধ্য করে কিন্তু মুসলিম সৈন্যদের সম্ভ্রম বোধহীনতার প্রতি ধিক্কার দিয়ে সুলতান নিজেই ঘোড়া ছুটিয়ে দুশমনের অগ্রবাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। মাহমূদের ঘোড়া যে দিকেই রোখ করত, সেদিকেই লাশের স্তুপ জমা হয়ে যেত। মাহমূদের জানবায সৈনিকরা সালারের এহেন দুঃসাহসিক হামলা দেখে ডানে-বামে ও মধ্যবর্তীস্থানে বীর বিক্রমে লড়াই শুরু করেন। সর্যাস্তের পূর্বেই বাজি রায় রণাঙ্গন ছেড়ে কিল্লায় আশ্রয় নেয় ও রাতের আধারে ভয়কাতুরে কিল্লা ছেড়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু পথিমধ্যে সুলতানের সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ে হাতিয়ার সমর্পণ না করে আত্মহত্যা করে।

৩৯৬ হিজরীতে সুলতানের বিরুদ্ধে খোরাসানের রাজা আলাক খান বিদ্রোহী হয়ে উঠলে সুলতান তাঁর সৈন্যদের খোরাসানের দিকে রোখ করলেন। গোটা ভারত বর্ষের রাজপূত রানা ও প্রশাসকদের ঐক্যবদ্ধ করে আলাক খান। সুলতানকে অংকুরেই বিনাশ করতে বিশাল এক সৈন্যবহর নিয়ে পেশোয়ারমুখী হল।

সুলতান গুপ্তচর মারফত খবর পেয়ে গজনী থেকে বিন্ধ্য সাম্রাজ্যের নিকটে উপনীত হন। এক রক্তক্ষয়ী তুমুল যুদ্ধের পর হিন্দু সৈন্যরা রণে ভঙ্গ দেয়। মাহমূদ তাদের কংগ্রো পর্যন্ত পশ্চাদপসরণ করে হিন্দুদের সবচেয়ে সুরক্ষিত কিল্লা নগরকোট অবরোধ করে তাও কব্জা করে নেন। এ কিল্লার মাঝে একটি খ্যাতনামা মন্দির ছিল। মন্দিরের শিষ্যরা গোটা ভারত বর্ষের রাজা-প্রজাদের থেকে ট্যাক্স উসল করে স্বর্ণ-রৌপ্যের পাহাড় গড়ে তোলে। এ মন্দির থেকে সুলতান ৭ কোটি রুপী মূল্যের মালামাল, ২০ মণের মত মণি মুক্তা ও অন্যান্য রত্নাদী আর সাত হাজার মণ স্বর্ণ-রৌপ্য উদ্ধার করে ছিলেন।

এর কিছুদিন পর সুলতান মাহমূদ নন্দনার উপর আক্রমণ করার জন্য অগ্রসর হন। নন্দনার রাজা তারালোচন পাল সুলতানের অগ্রযাত্রার খবর পেয়ে স্বীয় পুত্র ভীম পালকে কিল্লার দায়িত্ব দিয়ে কাশ্মীরে ছুটে যায় সৈন্য সংগ্রহের আশায়। এদিকে ভীম পাল খোলা ময়দানে মুসলিম ফৌজের মুকাবেলায় নেমে পড়ে। ইত্যবসরে কাশ্মীর থেকে তাজাদম ফৌজ ভীম পালের সাহায্যে এগিয়ে আসে। হিন্দু ফৌজের অগ্রে ছিল হাতির প্রাচীর। সুলতান বাহিনীর তীরন্দাজরা হাতির মুখ ফুটো করে দেন।

এ সুযোগে ডান-বাম ও মধ্যখানে মুসলিম সৈন্যবহর অতর্কিত দুশমনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুশমনের রণব্যুহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। বেগতিক অবস্থা দেখে ভীম পাল লাশের স্তুপ মাড়িয়ে পলায়ন করে। শোচনীয় পরাজয় বরণ করে তারালোচন পাল অবশিষ্ট বিধ্বস্ত ফৌজ নিয়ে পাঞ্জাবের শ্যালক পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করে। সুলতান নন্দনা অবরোধ করে তা কব্জা করে নেন এবং তারালোচন পালকে কুপোকাতের মাধ্যমে বিন্ধ্য সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকলেন। অতপর সুলতান মাহমূদ সোমনাথে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে জলন্ধর ও গোলালিয়র রাজাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাভূত করে তা দখল করে নেন।

সোমনাথ মন্দির পৌত্তলিক সমাজের আশা-ভরসার স্থল স্বর্গরাজ্য। এ দুর্ভেদ্য কিল্লা, সুবিশাল এক রাজত্ব সুবিস্তৃত এক মন্দির। দিগন্ত প্রসারী এক সুরম্য অফিস। কুঠিয়াওয়ার উপকূলের স্বরস্বতী নদীর তিন মাইল দরে সুউচ্চ একটি প্রাচীর দাঁড়িয়ে। মন্দিরের তেরসা ১৩টি বিল্ডিং পানিতে দাঁড়ান। এর ছাদে ১৪টি সোনার কলসী যা দরদরাজ থেকে দেখা যেত। মন্দিরের মধ্যবর্তী কামরায় কারুকার্যময় পাথরের বাহারী গাঁথুনী। এই কামরায় একটি বৃত্তাকার দেবীতে সেই মূর্তিরই অবস্থান, ভারত বর্ষের আনাচে-কানাচে যার শক্তি ও দাপটের প্রসিদ্ধি ছিল ছড়িয়ে। এই মূর্তি দেবী থেকে পাঁচ হাত উঁচু এবং দু’ হাত ঐ বৃত্তের মাঝে। তার দেহে মূল্যবান মণি-মাণিক্যের প্রলেপ। ছাদে সোনার শিকলের সাথে মূর্তির একটি জওহর খচিত তাজ লটকানো ছিল। আলোদানের জন্য ছাদে ঝুলানো ছিল দুষ্প্রাপ্য ঝাড় ফানুস। সোমনাথ মূর্তির আশেপাশে হাজারো স্বর্ণ-রৌপ্যের মূর্তি স্থাপিত ছিল। এগুলো সোমনাথ মূর্তির সেবক বলেই হিন্দুদের বিশ্বাস। দরজায় দু’শ মণ স্বর্ণের একটি ঘন্টা শিকলে ঝুলানো যা পূজার সময় বাজানো হয়।

হিন্দুদের বিশ্বাস মতে সোমনাথ মূর্তি জীবন-মৃত্যুর মালিক। এটা নাকি মানুষের হর্ষ-বিষাদ দিয়ে থাকে। মৃত্যুর পর মানবাত্মা এই মূর্তির আশেপাশে জমায়েত হয়। এই মূর্তিই তাদেরকে নবজীবন দান করে। (হিন্দুদের বিশ্বাস মতে, চাঁদের দেবতা থেকে একবার কোন একটা পাপ প্রকাশ পেল। তার ঐ পাপের প্রতিবিধানে তাকে মহাদেবের লিঙ্গাকৃতির এই মূর্তিতে রূপ নিতে হল। হিন্দী ভাষায় “সোম” অর্থ চাঁদ আর “নাথ” অর্থ প্রভু। সুতরাং সোমনাথ অর্থ হলো চাঁদের প্রভু। হিন্দুদের সোমনাথ মূর্তির প্রতি অগাধ বিশ্বাসের অন্যতম কারণ ছিল যে, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা হয় চাঁদের অবস্থান ও অস্ত-উদয়ের বিবর্তনের কারণেই। যখন সমুদ্রের ঢেউ উপকূলে আছড়ে পড়ত তখন সোমনাথ মূর্তি পানিতে ডুব দিত।

অত:পর পানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে মূর্তি তার স্বমহিমায় ফিরে যেত। সোমনাথের পূজারীরা এর দ্বারা এই অর্থ বের করল যে, সমুদ্র সোমনাথ মূর্তির খেদমতে আদিষ্ট।) সোমনাথ মন্দিরের কিল্লার আশেপাশে আলীশান সুরম্য অট্টালিকার প্রলম্বিত সারি যা রাজা মহারাজাদের রেষ্টহাউস হিসেবে ব্যবহার হত। মন্দিরে পূজারী ও ব্রাহ্মণদের বাসভবনও এর সংলগ্ন। এর সামনে সমুদ্রের দিকে সোমনাথের তীর্থ যাত্রীদের মেহমান খানা ও নকর-খাদেমদের বিশ্রামাগার। সোমনাথের প্রসিদ্ধি কেবল ভারত বর্ষেই নয় গোটা বিশ্বে ছড়ানো ছিল। প্রাচ্য-প্রাতিচ্যের বেশ কিছু দেশ থেকে ব্যবসায়ীরা পসরা নিয়ে সোমনাথ বন্দরে ভেড়াতে আসতো। গোটা ভারত বর্ষের প্রত্যেক রাজ্যের রাজা-মহারাজা ও প্রজাদের থেকে তারা ট্যাক্স উঠাত। তারা সোমনাথ মূর্তিকে দেবতাদের দেবতা মনে করত।

যখন ভারত বর্ষের সকল রাজ্যের রাজা ও তার লক্ষ লক্ষ সৈন্যরা গিয়ে উপস্থিত হল সোমনাথে এবং তারা অধির আগ্রহে সুলতানের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। তাদের খেয়াল সুলতান যদি সোমনাথে আসে ধ্বংস তার অনিবার্য। ভারত বর্ষের হাজার হাজার মূর্তি যে সুলতান ভেঙ্গে ছিল তা সোমনাথ মূর্তি সহ্য করবে না। তাই তারা সোমনাথে হাজির হয়ে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠল।

এ দিকে সুলতান মাহমূদ বজ্রের মত সোমনাথের দিকে তেড়ে আসছেন। পথিমধ্যে অনেক রাজ্যের সাথে যুদ্ধ করে তাদের বাধাকে বিধ্বস্ত করেন। অতপর ০৬.০১.১০২৬ খ্রীস্টাব্দ বৃহষ্পতিবার সুলতান মাহমূদ সোমনাথে উপনীত হয়ে তার নজর কাড়া দৃশ্য উপভোগ করছিলেন। হিন্দুরা সর্বশক্তি দিয়ে কিল্লায় জমায়েত হচ্ছিল। শহর ও জনপদ শন্যতায় পরিণত হল। কাজেই কোন রকম বাধা ছাড়াই মুসলিম বাহিনী ওগুলো দখল করে নিল।

অত:পর সুলতান কিল্লামুখে ছুটলেন। দুপুরের আগ মুহূর্তে তাঁর বাহিনী খানিক দরে এক বিস্ময়কর দৃশ্য অবলোকন করল। সোমনাথের অগণিত ফৌজ কিল্লা প্রাচীরে চড়ে উদ্দীপনা ভরে তাদের আহ্বান জানাচ্ছিল। ওরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলছিল, এবার তোমরা বেঁচে যেতে পারবে না। গোটা ভারত বর্ষের মূর্তি ধ্বংসের অপমানের প্রতিশোধ নিবেন দেবতাগণ।

কিল্লার প্রশস্ত চত্বরে ও ছাদে অগণিত মানুষের চিৎকার জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির উৎক্ষিপ্ত লাভার চেয়ে বিভীষিকাময় পরিবেশের সৃষ্টি করছিল। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছিল দেশের সব জনপদের হিন্দুরা সোমনাথে ঠাঁই নিয়েছে। অশ্বারোহীদের পিছনে নিয়ে যাওয়ার হুকুম করে সুলতান নেহায়েত এতমিনানের সাথে যুহরের নামায আদায় করে সিপাহীদের দিকে ঘুরে আগুন ঝরা এই বক্তব্য রাখেন-

আমার মর্দে মু’মিন মুজাহিদ ভাইয়েরা! এই সেই ভারত, ১৭ বছরের তরুণ সেনাপতি যেখানে হিলালী নিশান উড়িয়ে ছিলেন। উল্টে দিয়েছিলেন স্বৈরাচারী রাজা দাহিরের তখ্ত-তাজ। এখানে আমি চাই এমন কিছু বক্ষ, শত্রুর তীর খেতে যা থাকবে উন্মুক্ত। চাই এমন কিছু কোষমুক্ত তলোয়ার, দুশমনের হাড় কাটতে কাটতে যা হয়ে যাবে ভোঁতা। চাই এমন কিছু মুখ, তীর কামানের পশলা-বৃষ্টির মাঝে যারা দাঁড়িয়ে হাসবে। হায়দারী চেতনার সংগ্রামী সাথীরা আমার! দুশমন তার তলোয়ার শান দিয়ে ফেলেছে। তুণী ভরে ধনুক বাঁকা করে নিয়েছে। এক্ষণে তোমাদের পালা। তোমরা এগিয়ে যাবে খালিদী উদ্দীপনা নিয়ে। দুশমনের ভরসা খড়কুটো ও মাটি দিয়ে তৈরী শক্তিহীন মূর্তি। তোমাদের ভরসা লা-শরীক আল্লাহ্। তোমরা যদি কম্পন সৃষ্টি করতে পার ভূমিকম্পের মত, ধেয়ে যেতে পার যদি টর্ণেডো গতিতে, হুংকার মারতে পার যদি সিংহ শার্দুলের আকারে, যদি ইস্রাফিলের শিংগা ধ্বনির মত ক্বিয়ামতের বিভীষিকা কায়েম করতে পার, তাহলে আমি ক্বসম করে বলতে পারি- আগামীকাল জুম্আর নামায আমরা সোমনাথ মন্দিরেই আদায় করব ইনশাআল্লাহ্।

“নারায়ে তাকবীর” “আল্লাহু আকবার” শ্লোগানে সোমনাথের পাষাণ গাত্র কেঁপে উঠল। মুহূর্তে ঈমানী চেতনায় উদ্দীপ্ত মুসলিম বাহিনী কিল্লা প্রাচীরের দিকে ধেয়ে আসল। সন্ধ্যা পর্যন্ত তুমুল লড়াই করে মুসলিম বাহিনীর প্রাচীরে পা জমাতে পারল না। রাত্রে ছাউনীতে ফিরে গিয়ে ঈশার নামায আদায় করল। পর দিনের সর্য সোমনাথ প্রাচীর তলে এক রক্তক্ষয়ী লড়াই দেখছিল। তীর বৃষ্টির মাঝে ইষ্পাত কঠিন দাঁড়িয়ে পৌত্তলিক ত্রাস মাহমূদ গজনবী। মাহমূদের জানবায সৈন্যরা জিহাদী জোস নিয়ে প্রাচীরে চড়া আরম্ভ করল। হিন্দুরা তীর বৃষ্টি বর্ষণ করছিল। কিছু জানবায লাশের স্তুপ মাড়িয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে উঠানে নেমে এল। ডানে-বামে সামনে হিন্দু জনসমুদ্র, ঐ জনসমুদ্র তাদের গিলে নিতে এল। কিন্তু প্রাচীরের পথে মুসলমানরা পাহাড়ী ঝর্ণার মত নেমে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যে দশ হাজার মুসলিম বাহিনী উঠানে জমায়েত হয়ে এলোপাথাড়ি দুশমনের উপর তীর বর্ষণ করতে লাগল।

হিন্দুরা বীর বিক্রমেই যুদ্ধ করছিল। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর ক্রমবর্দ্ধমান হামলা আর অকস্মাৎ তুষারপাতের দরুন ওদের বাযু ঢিল হয়ে গেল। টর্ণেডোর গতিতে প্রচণ্ড আঘাত হানলেন সুলতান মাহমূদ গজনবী। দুশমনের কাতার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। অনবরত তুমুল লড়াইয়ের পর হাজার হাজার লাশের স্তুপ মাড়িয়ে হিন্দুরা কেউ পালিয়ে জান বাঁচালো আবার কেউ হাতিয়ার ফেলে আত্মসমর্পণ করল। জয় হয়ে গেল এক সময় হিন্দু সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিশাল উঁচু মন্দির সোমনাথ। যেখানে হাজার হাজার মণ স্বর্ণ-রৌপ্য ও বহু জওহর মণি-মাণিক্য রক্ষিত ছিল। যার লক্ষ লক্ষ পূজারী ও স্বেচ্ছাসেবক ছিল। স্বর্ণ-রৌপ্যের মূর্তিগুলো ভেঙ্গে খান খান করে দিলেন সুলতান মাহমূদ গজনবী। সোমনাথ মন্দিরে জুম্আর নামায আদায় করলেন সুলতান মাহমূদ গজনবী।

ঠিক যেদিক থেকে তুষার পাতের মত বজ্রবেগে ধেয়ে এসেছিলেন। পুনরায় সেদিকেই রোখ করে চলে গেলেন। গোলামীর জিঞ্জির ভেঙ্গে জাতিকে দাঁড় করালেন মানবতার অনুকূলে।

লেখক: সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ঢাকা মহানগর এবং শিক্ষক- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা-ঢাকা।


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.