Home ইসলাম ইসলামের সার্বজনীন শান্তি, মুসলমানদের হতাশাজনক পরিস্থিতি এবং উত্তরণের উপায়

ইসলামের সার্বজনীন শান্তি, মুসলমানদের হতাশাজনক পরিস্থিতি এবং উত্তরণের উপায়

1

।। মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস ।।

এ কথা ধ্রুব সত্য যে দুঃখ কষ্ট থেকে নিরাপদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন যাপনের লক্ষ্যেই মানুষ ঘর বাঁধে। কেননা তার আবাস গৃহ এবং কুটীর প্রসাদই তার জন্যে এক নিরাপদ আশ্রয় স্থল ও সুখ শান্তির নীড়। মানুষ সামাজিক জীব হেতু তার সমাজবদ্ধ জীবনে যেমনিভাবে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রয়োজন, তেমনিভাবেই তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে দুঃখ-কষ্ট ও অশান্তি থেকে পূর্ণ নিরাপত্তা লাভ এবং সুখ-শান্তি ও বাস্তব আরাম উন্নতির উদ্দেশ্যে তার জন্যে এক নির্ভেজাল মতাদর্শ ভিত্তিক উন্নত ও আদর্শ মানবতা বিকাশকামী কল্যাণমুখী নীতি বা কানুনের একান্ত দরকার এবং এটাই হচ্ছে ইসলামী বিধান। যা সর্বকালে, সর্বযুগে ও সকল দেশেই পরিপূর্ণ পরিণত যুগোপযোগী এবং বিজ্ঞান সম্মত বলে স্বীকৃত। এরই সত্যতা প্রমাণে বিশ্বের জ্ঞানীদের সুচিন্তিত অভিমত নিম্নরূপ-

১। মিঃ নেপোলিয়ানের ভাষ্য- AL ISLAM IS A COMPLATE CODE OF LIFE অর্থাৎ- ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান।

২। গুরু নানক বলেছেন, ‘‘বেদ পুরাণের যুগ অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। একমাত্র ইসলামের ধর্মগ্রন্থ কুরআনই এখন মানুষকে পরিচালনা করতে সক্ষম।’’

৩। মিঃ রবার্ট চার্লস বলেছেন, ‘‘মুসলমানদের ইসলাম ধর্মের প্রচার ও ধর্মীয় উদ্দীপনার সাথে ভিন্ন-ধর্মাবলম্বীদের সাথে তাদের ভদ্রোচিত সহ-অবস্থান নীতিও ছিল মিশ্রিত ও সম্বর্ধিত।’’

৪। মিঃ রেভারেণ্ড বস্ওয়ার্থ স্মিথ বলেছেন- “ইসলামের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কুরআন এক বিশুদ্ধ আইনের নিয়মাবলী, এক স্বাভাবিক ও সৃষ্টি কেন্দ্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের এক আবেগপূর্ণ প্রার্থনা”।

৫। জন্ডিভন বলেছেন- “ইসলামের অমিয় বিধান পবিত্র কুরআন জ্বলন্ত ও চিরসত্য বাণী”।

৬। ডক্টর মরিস বুকাইলী তদীয় রচিত ‘‘বাইবেল, বিজ্ঞান ও কুরআন’’ নামক গ্রন্থে ব্যক্ত করেছেন, ‘‘আজ সাড়ে চৌদ্দশত বৎসর পরও ইসলামের ধর্মগ্রন্থে (কুরআনে) কোনই পরিবর্তন ঘটেনি। আজ নিঃসন্দেহে বলা যায়, নিশ্চয়ই ইহা ঐশীবাণী এবং বিশ্ব মানবের কল্যাণ ভিত্তিক জীবন বিধান।

তাই দুনিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তা এবং আখিরাতের অনন্ত জীবনের অসহনীয় শাস্তি ও যন্ত্রণা হতে রক্ষা পেয়ে পরকালীন চির সুখ-শান্তি লাভে ধন্য হতে হলে প্রকৃত জীবন বিধান ইসলামকেই বাস্তবতঃ যথার্থ সত্য বুঝে মনে প্রাণে, একীন বিশ্বাসে গ্রহণ এবং মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে ও সকল কাজে নিবেদিত অন্তরে এর প্রতিফলনই হবে একমাত্র এবং মোক্ষম উপায়।

প্রকৃতপক্ষে ইসলাম ন্যায় নীতি নির্ধারক মানব জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি মানবতার ধর্ম। যা সমাজে পাশবিক কর্মকান্ড, অশ্লীলতা এবং সকল কুসংস্কারের মূলোৎপাটনকারী। ইসলামী দিক দর্শনের আলোকে আদিকাল থেকেই সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর প্রেম এবং তাঁর সকল সৃষ্টির প্রতি দয়া-মায়া প্রদর্শনের যে আমানত বা পূত পবিত্র যোগ্যতার বীজ মানব মনে সুপ্ত ছিল, খোদায়ী বিধানের স্বচ্ছ দ্বীপালোকে ওহী প্রাপ্ত আল্লাহর নবী রাসূল ও সত্যের দিশারী ওলী আউলিয়াদের সংস্পর্শে তাঁদের মাধ্যমে ঈমানী যোগ্যতা লাভের দ্বারা মানবতার পূর্ণতা অর্জনে ধন্য হয়।

অতএব যতই যুগ পরিবর্তন হচ্ছে ইসলামী আইন কানুনের ব্যাপক উপকারীতা প্রত্যক্ষভাবে সামাজিক জীবনে মানুষের মধ্যে বাস্তব রূপে প্রকাশ পাচ্ছে। আর এই বাস্তবতা ও সত্যকে অনুভব করা এবং চিনবার মত জ্ঞানার্জনকেই সঠিক ইসলামী জ্ঞানরূপে অভিহিত করা হয়। যেদিন দুনিয়ার মানুষ এ সত্যকে বুঝতে ও এর আলোকে জীবন গড়তে শিখবে, সেদিন সমগ্র জগৎ ব্যাপী এক শান্তিময় আনন্দ রাজ্যের স্থাপন হবে। অথচ কু-প্রবৃত্তির ক্রিয়া চক্রের চশমা পরিহিত চলতি যমানার তথাকথিত প্রগতিবাদীরা তাদের মনগড়া খেয়ালী কর্ম-কান্ডের দ্বারা পশুত্বাচারের রুদ্ধ ফটক খুলে দিয়ে সমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। যার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ফলে খোলা ফটক দিয়ে অসতর্কতা বশতঃ চরমভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে প্রকৃত মানবতা এবং ডেকে আনছে মানব সমাজে মহা বিপর্যয়।

তাই প্রকৃত জ্ঞানের চক্ষে ধরা পড়ে বর্তমান সমাজ দিন দিন আমরাও চলেছি ইসলাম পূর্বেকার আরবের মরুচারী বেদুঈনদের মত পতনের পথে, ধ্বংসের পথে ও জাহান্নামের পথে। এতে প্রত্যক্ষ বুঝা যায় যে, আমাদের বাহ্যিক গতি-ধারা চাল-চলন এবং আচার-আচরণও ভাল নয়। এতে শঙ্কাবোধ হয় যে, ক্রমান্বয়েই ফুরিয়ে আসছে আমাদের মানবতা ভিত্তিক জীবনী শক্তি কল্পনাতীত তীব্র গতিতে ও অপ্রত্যাশিত শোচনীয়ভাবে। তবুও আমরা চিন্তা করিনা যে, আমাদের দুর্বলতা আমাদের অবনতি, আমাদের নৈতিক, চারিত্রিক, রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক সকল ক্ষেত্রে অবক্ষয় অধঃপতনের সংশোধন কোন্ পথে। মানুষের রচিত গঠিত সামাজিক ব্যবস্থায় না সঠিক ইসলামী জীবন ব্যবস্থায়?

মনে হয় এর জবাবে একথার বিকল্প নেই যে, প্রকৃত ইসলামী বিধি-বিধান সম্মত রসাল বৃক্ষ নির্ভেজাল পরিবেশে লালিত হয়ে যেদিন শাখা-প্রশাখা পল্লবিত পাতা পুষ্প সুশোভিত হয়ে তার সুনিবিড় ও শান্ত স্নিগ্ধ ছায়াতলে আশ্রয় দিয়েছিল বিশ্বের ঈমানদার জনগোষ্ঠীকে এবং আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বিশ্ব মানবকে, আজ তাকে উপেক্ষা করে ও তার শান্তিময় সু-শীতল ছায়া তথা মহান স্রষ্টা ও শান্তিদাতা আল্লাহ পাকের প্রত্যাদেশ বাণী পবিত্র কুরআন এবং তদীয় শান্তির দূত মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহান চরিত্র অনিন্দ্য সুন্দর আদর্শ এবং অমিয় বাণী থেকে উদাসীন হওয়ার দরুণই আমাদের এ অধঃপতন।

অতএব বাস্তবতার নিরিখে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ইসলামকে এজীবনের সকল ক্ষেত্রে এবং পরকালের অনন্ত যিন্দেগীর শান্তি কামনায় যারা পূর্ণ বিশ্বাস করে, এতে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করে প্রকৃতপক্ষে তারাই মুসলমান। পক্ষান্তরে শুধু নামধাম এবং বংশ খান্দানের পরিচয় দিয়ে কোন মানুষ প্রকৃত মুসলমান হওয়ার উপযুক্ত নয়। কেননা সমাজে জ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে হলে যেমন জ্ঞানের প্রয়োজন, বুদ্ধিমানরূপে গণ্য হতে হলে বুদ্ধি থাকার প্রয়োজন, শিক্ষিতের মর্যাদা লাভ করতে হলে বাস্তব শিক্ষার প্রয়োজন, ধনী হিসেবে খ্যাতি লাভ করতে চাইলে ধন-সম্পদ থাকা আবশ্যক, সুন্দরের আদর ভালবাসা লাভ করতে চাইলে চাই সৌন্দর্য্য এবং রূপলাবণ্য। তেমনি অপরাপর জীব জগতের সাথে পার্থক্য স্বরূপ মানুষকে তার বাহ্যিক অবয়ব ও আখলাক চরিত্রে মানুষ হিসেবে পরিচিত ও পরিগণিত হতে হলে তার মধ্যে চাই মানুষের আকার আকৃতি, স্বভাব-প্রবৃত্তি এবং মানবতা সুলভ আচার আচরণ।

এরই প্রেক্ষাপটে দুনিয়ার মানব সমাজে মুসলমান নামে পরিচিত, সমাদৃত ও সম্মানিত হতে হলে চাই প্রত্যেকটি মানুষের ইসলামের পূত পবিত্র আদর্শ ও নিখুঁত চরিত্র। অন্যথায় ইসলামের নীতি বিধানকে উপেক্ষা করে বাহ্যিকভাবে মুসলমান নামে পরিচয় দান আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বেঈমানীর সামিল। আর এরূপ অভিনয় সদৃশতা বিরাট অপরাধ। তার কারণ এই যে, এ দুনিয়াতে সত-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় এবং দোষ-গুণের নিত্য ঝড়-ঝঞ্ঝা এমনকি আবহমান সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করেও হক বাতিল বা ভাল-মন্দ বুঝার অনুভূতি শক্তি বা রুচি যদি কোন মানুষের বিকৃত হয়ে যায় কিংবা সে হিতে বিপরীত বুঝে, সে যদি মৃত্যুর পথকেই মুক্তির পথ হিসেবে বরণ করে নেয়, কিংবা বিষকেই অমৃত ভেবে পান করে, তখন তার কি গতি? অনুরূপ কোন যুবক রাজপুত্র যদি রাজকন্যার পরিবর্তে কোন মুচি বা চামারের মেয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় কিংবা চামার, মুচি বা মেথরের পরিবেশ ধারণ করে তখন এর জন্য দায়ী কে?

বর্ণিত দৃষ্টান্ত সমূহের আলোকে বলা যায়, দুনিয়ার কিছু সংখ্যক নামধারী মুসলমান যদি ইসলাম ও ইসলামী ভাবধারা তথা ইসলামী কৃষ্টি কালচার বা তাহ্যীব ও তামাদ্দুন হতে উদাসীন হয়ে এর ভারসাম্য নীতি ও চিরন্তন গতি পথ থেকে বিমুখ ও বিচ্যুত হয়ে যায়, তবে ইসলামের কি আসে যায়? এ ধরণের নামধারী মুসলমানদের পক্ষে ইসলামের গোড়া কেটে ইসলামের আদর্শ বর্জন করে ইসলামের নিয়ম-নীতি ও আইন-কানুন পরিহার করে মুসলমান জাতি হিসেবে আসন জুড়ে থাকবার, গৌরব লাভ করবার এবং জাতীয় উন্নতি লাভে ধন্য হবার অধিকার থাকবে কেমন করে? প্রকৃত পক্ষে মুনাফিকী নীতি ধারণ করে এরূপ অপচেষ্টা অন্যায় না হয়ে কি হতে পারে? আর মূলতঃ এটা যেমন সাধুতা বর্জন করে সাধু সেজে এবং অকাট্য মূর্খ হয়ে ও শিক্ষিত বলে সরল সমাজকে ধাপ্পা ও ধোঁকা দেয়া।

আজকের সমাজে যে সব ভাই এবং যে সকল সমাজ হিতৈষী বন্ধুবর্গ মুসলমান হিসেবে আত্মপরিচয় প্রদান করেন, গৌরববোধ করেন মুসলমান জাতি হিসেবে, জাতির কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন আদর-অভ্যর্থনা, খ্যাতি-পদবী, সম্মান ও মর্যাদা; অথচ তাদের মুখেই শুনা যায় যে, ষষ্ঠ শতাব্দীর ইসলাম বিংশ শতাব্দীতে অচল। আবার তারাই গর্ব ভরে সমাজে মুসলমান হিসেবে বিশেষিত হতে চান ইসলামের বিশেষণকে বর্জন করে। লোক সমাজে এরূপ ভান করা স্বভাবতঃই বকধার্মিক এবং বিড়াল তপস্বীর চতুরতার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। অথচ এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না। অনুরূপ একটা মিথ্যা ও কোন একটা দোষকে ঢাকতে হলে এর পেছনে নাকি আরও তিনটা মিথ্যা বা দোষ সংগ্রহ করার প্রয়োজন হয়, তবুও দোষ দোষই থাকে।

পক্ষান্তরে স্বচ্ছ পানির মত গুণ উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ। তাই গুণ পুরাতন হলেও যেমন তাতে ঘুণে ধরেনা, তেমনিভাবে ইসলাম পুরাতন হলেও সে তার গুণে-সৌন্দর্যে বিশ্বব্যাপী একান্ত মর্যাদার সাথে পরিচিত ও পরিব্যাপ্ত। এতদসত্ত্বেও মুসলিম সমাজে হাল যমানার কিছু লোক যদি প্রচন্ড গরমের উত্তাপে বৃক্ষের সু-শীতল ছায়া প্রাপ্তীর আশায় বট গাছের ছায়া পরিত্যাগ করতঃ তেঁতুল তলায় বিশ্রাম নেন, এতে অন্য কারো আপত্তি থাকার কথা নয়, কিন্তু তাদের জন্য উচিত হবে যে, তারা তেঁতুল গাছকে তেঁতুল গাছ বলেই যেন পরিচয় দেন। কিন্তু জানা সত্ত্বেও তেঁতুল গাছকে বট গাছ বলে পরিচয় দেবার দুঃসাহস যেন না করেন। নতুবা সমাজের সরল প্রাণ জনগণ যেরূপ হবে প্রতারিত, তদ্রুপ দুঃসাহসপূর্ণ ব্যক্তিরাও যে সমাজে প্রতারকরূপে গণ্য হবেন, এতে সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না।
[আগামী কিস্তিতে সমাপ্য]

লেখক: প্রিন্সিপাল- জামিয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলূম নলজুরী, সিলেট, উপদেষ্টা- উম্মাহ ২৪ডটকম এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মেসার্স আব্দুল মজিদ এন্ড সন্স, তামাবিল, সিলেট।

মাযহাব মানা আপরিহার্য কেন?

1 COMMENT

  1. […] [প্রথম কিস্তির পর] ইসলামের বিধি-বিধান ও নীতি মালাকে পুরাতন ও সেকেলে ধরনের আখ্যায়িত করে মুসলিম সমাজের অন্য এক দল একে আধুনিক এবং তাদের মতে যুগোপযোগী করার মানসে বলে থাকেন যে, আমরা ইসলাম নামক বৃক্ষের আগাছা ও জঞ্জাল পরিষ্কার করতঃ এর নিখুঁত ছবি উদ্ধার করবো। এরই তলায় বিশ্রাম নিব, এরই ছায়ায় শান্তি লাভ করবো এবং এরই অমৃত ফল নিজে ভোগ করবো এবং অপরকেও করাবো। […]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.