Home শীর্ষ সংবাদ কক্সবাজারের ভার কমাতে এক লাখ রোহিঙ্গা গ্রহণে ‘ভাসান চর’ প্রস্তুত

কক্সবাজারের ভার কমাতে এক লাখ রোহিঙ্গা গ্রহণে ‘ভাসান চর’ প্রস্তুত

1

কক্সবাজারের জনাকীর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন৷ সরকার সেখান থেকে একলাখ শরণার্থীকে ভাসান চর দ্বীপে স্থানান্তরের চিন্তাভাবনা করছে৷ তবে, বিভিন্ন এনজিও’র অপপ্রচারের ফলে রোহিঙ্গারা সেই দ্বীপে যেতে রাজি নয়। ইতিমধ্যেই নৌ বাহিনীর তদারকিতে চরটিতে কার্যত ছোটখাট এক শহর গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে এক লাখের মতো মানুষ বসবাস করতে পারবে।

ভাসান চরে যাওয়ার জন্য এর আগ পর্যন্ত কোনো পশ্চিমা সাংবাদিক সরকারি অনুমতি পাননি৷ ডয়চে ভেলের তিন সাংবাদিককে গত ২৪ আগস্ট চরটি ঘুরে দেখার সুযোগ দেয়া হয়৷ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যরা সাংবাদিকদের সেখানে নিয়ে গেছেন এবং সবসময় সঙ্গে ছিলেন। এই চরে ২০১৫ সালে প্রথম শরণার্থীদের বসবাসের জন্য আবাসন গড়ার পরিকল্পনা করা হয়৷ সেসময় চরটিতে কোন জনবসতি ছিল না৷

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার থেকে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রাণভয়ে বাংলাদেশের টেকনাফ ও উখিয়ায় পালিয়ে আসলে চরটিতে অবকাঠামো গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলো জনাকীর্ণ৷ আর, পাহাড় কেটে গড়ে তোলা ক্যাম্পগুলো ততটা মজবুতও নয়৷ ফলে বৃষ্টির সময় এখানে ভূমিধসের আশঙ্কা প্রবল৷ আর বাঁকা লোহা এবং তেরপল দিয়ে গড়া তাঁবুগুলোর ভেতরে গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরম থাকে৷

শরণার্থী শিবিরগুলোতে দিনের বেলা নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও রাতে পরিস্থিতি বদলে যায়৷ কোন উন্নয়নসংস্থা কিংবা গণমাধ্যমের দেশিবিদেশি প্রতিনিধিদের সন্ধ্যার পর শিবিরে থাকার অনুমতি নেই৷ রাতের বেলা বিভিন্ন নিরাপত্তাবাহিনী শিবিরগুলোর ভেতরে টহল দেয়৷ তাসত্ত্বেও হত্যা, অপহরণ এবং ধর্ষণের মতো ঘটনা মাঝেমধ্যেই শোনা যায়৷

টেকনাফ এবং উখিয়ায় অবস্থিত শরণার্থী শিবিরগুলোর জনাকীর্ণ অবস্থা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ভাসান চর পরিকল্পনা, যেটি আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্প নামে পরিচিত, দ্রুত বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে৷

পলি জমে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা ভাসান চরে ২০১৮ সালের শুরুর দিকে নির্মাণ কাজ শুরু হয়৷ আর প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ করে মাত্র দেড়বছরে চরটিতে একলাখ মানুষের বসবাসের উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়৷ দ্বীপটিকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ নৌবাহিনী এ তথ্য জানায়৷

এখানকার ভবনগুলো দেখতে প্রায় একইরকম৷ স্টিল এবং কংক্রিটের ব্লক দিয়ে তৈরি একেকটি ভবনে ১৬টি বারো বাই চৌদ্দ ফুট ঘর রয়েছে, যেগুলোর প্রতিটিতে এক পরিবারের চারজন করে থাকতে পারবেন৷ নারী ও পুরুষের জন্য রয়েছে আলাদা বাথরুম৷ প্রতিটি ভবনে ৬৪ জনের জন্য থাকছে দু’টি রান্নাঘর যেখানে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি চুলা ব্যবহার করা যাবে৷

চরটিতে বিদ্যুতের জোগান দিতে জেনারেটরের পাশাপাশি রয়েছে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় আয়োজন৷ টিউবওয়েল ছাড়াও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তা ব্যবহারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে এই দ্বীপে৷ পাশাপাশি রয়েছে অনেক পুকুর, যেখানে মাছচাষ সম্ভব৷

ভাসান চরে গড়ে তোলা এই শহরের অভ্যন্তরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে পুলিশ৷ নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিতে চরটিতে শীঘ্রই ১২০টি সিসিটিভি ক্যামেরাও বসানো হবে৷

এই বসতি রোহিঙ্গাদের জন্য এক ‘‘স্বর্গ” বলে মনে করেন আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্পের প্রধান স্থপতি আহমেদ মুক্তা৷ তিনি বলেন, ‘‘এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই৷ আমরা রোহিঙ্গাদের এমন কিছু একটা দেবো, যা তারা সারাজীবন মনে রাখবে৷”

মুক্তার প্রতিষ্ঠান ‘‘এমডিএম আর্কিটেক্টস” অতীতে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সেল্টার হাউস তৈরি করেছে৷ ভাসান চরে অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করতে মাত্র এক সপ্তাহ সময় পেয়েছিলেন তিনি৷ তবে, সেই অল্প সময়ে পরিকল্পনা করে তিনি যা গড়েছেন তা নিয়ে তিনি গর্বিত৷

চরটির এক নির্মাণ শ্রমিক ডয়চে ভেলেকে জানান যে তাঁকে যদি এই দ্বীপে একটি ঘর দেয়া হয় তাহলে তিনি সানন্দে এখানে থাকবেন৷ ‘‘এটা বসবাসের জন্য চমৎকার স্থান,” বলেন তিনি৷

চরটিতে রোহিঙ্গাদের জন্য রয়েছে ১২০টি চারতলা শেল্টার হাউস, যেগুলোর প্রতিটিতে স্বাভাবিক সময়ে ৯২ জন অবস্থান করলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সহস্রাধিক মানুষ থাকতে পারবেন৷ আর অন্যান্য সময় এসব ভবন হাসপাতাল, প্রাথমিক স্কুল, মসজিদ কিংবা দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করা যাবে৷

শেল্টার হাউসগুলো ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার গতিবেগের বাতাসেও অক্ষত থাকবে৷ এগুলোর কয়েকটিতে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার কার্যালয় এবং কর্মীদের আবাসনের ব্যবস্থা করা যাবে৷ ডয়চে ভেলেকে এরকম একটি ভবন দেখানো হয়েছে যেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাসহ আধুনিক বাথরুমও রয়েছে৷ 

আহমেদ মুক্তা জানান, শেল্টার হাউসে ৪০ শয্যার হাসপাতালের আয়োজন থাকবে৷ তবে, জরুরী চিকিৎসার প্রয়োজনে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা পাশের হাতিয়া দ্বীপে অবস্থিত হাসপাতালে যেতে পারবেন৷ নৌকায় সেই চরে যেতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে বলে জানিয়েছেন নৌ কর্মকর্তারা৷ 

ইতোমধ্যে ভাসান চরে প্রায় সব ভবনের কাজ শেষ হয়ে গেছে বলেও ডয়চে ভেলেকে জানানো হয়েছে৷ যদি সরকার রোহিঙ্গাদের এই দ্বীপে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া তাহলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা কার্যকর সম্ভব৷ এজন্য নৌবাহিনীর চারটি জাহাজও প্রস্তুত রয়েছে৷ এসব জাহাজে করে একেকবারে চারশো থেকে পাঁচশো শরণার্থীকে এই চরে নিয়ে আসা যাবে৷

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন ঢাকায় তাঁর কার্যালয়ে ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন যে, সরকার প্রয়োজন মনে করলে জোর করে হলেও রোহিঙ্গাদের ভাসান চরে সরিয়ে নিতে পারে৷ তিনি বলেন, ‘‘রোহিঙ্গারা যদি স্বেচ্ছায় সেখানে যেতে না চায়, তাহলে আমরা জোর করবো৷”

রোহিঙ্গাদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার এখনই উপযুক্ত সময় উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘(কক্সবাজারের) জনাকীর্ণ ক্যাম্পে থাকলে রোহিঙ্গারা জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হতে পারে৷”

টেকনাফ এবং উখিয়ার স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে৷ ডয়চে ভেলে যেদিন ভাসান চর গিয়েছে, সেদিনও স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দুই রোহিঙ্গা পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে৷

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন মনে করেন, রোহিঙ্গারা নানা রকম সমস্যা সৃষ্টি করছে৷ তিনি বলেন, ‘‘সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা খুন হচ্ছেন৷ আমরা এটা মেনে নিতে পারি না৷ আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে৷ এজন্য আমরা হয়ত জোর করে রোহিঙ্গাদের ভাসান চরে সরিয়ে নেবো৷”

ডয়চে ভেলে সংবেদনশীল এক সময়ে ভাসান চরে গিয়েছে৷ সেসময় কয়েকহাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর এক প্রক্রিয়া পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে৷ রোহিঙ্গা জানিয়েছেন যে মিয়ানমারে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত সেখানে যাবেন না তারা৷

লাখখানেক রোহিঙ্গাকে ভাসান চরে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনায় সমর্থন পেতে বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ এবং অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার, যেগুলো রোহিঙ্গা শিবিরে কাজ করছে, উপর চাপ প্রয়োগ করছে বলে জানা গেছে৷ জাতিসংঘ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক এক বৈঠকের ‘মিটিং মিনিটস’ পেয়েছে ডয়চে ভেলে, যেখানে রোহিঙ্গাদের নিয়ে ২০২০ সালের পরিকল্পনায় ভাসান চর অন্তর্ভূক্ত করতে জাতিসংঘের বিভিন্ন উন্নয়নসংস্থাকে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার৷ 

আর সেটা না করা হলে ২০২০ সালের পরিকল্পনা বাংলাদেশ সরকার অনুমোদন দেবে না বলেও হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে৷

তবে, ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর মুখপাত্র এব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন৷ নামপ্রকাশের অনিচ্ছুক জাতিসংঘের কয়েক কর্মকর্তা অবশ্য ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন যে, ভাসান চরকে ভবিষ্যত পরিকল্পনায় অন্তর্ভূক্ত করতে তাদের উপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে৷

একটি উদ্বেগ হচ্ছে, রোহিঙ্গারা ভাসান চরে হয়ত বছরের পর বছর আটকে থাকবে এবং তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা অনেক সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে৷ তাছাড়া, একসঙ্গে কক্সবাজার এবং ভাসান চরে কার্যক্রম পরিচালনা সাহায্য সংস্থাগুলোর পক্ষে কঠিন হবে৷

ভাসানচরে তৈরি অবকাঠামো এখন তিন মিটার উঁচু বাঁধ দিয়ে সুরক্ষিত রয়েছে৷ পাশাপাশি চরটির ভূমিক্ষয় বা ভাঙ্গন রোধে রয়েছে তিনস্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা৷ সাগরের ঢেউ আটকানোর বিশেষ ব্যবস্থাসহ বালুর বস্তা এবং নুড়ি পাথর দিয়ে সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়া হয়েছে৷ চরটিকে বসবাসের উপযোগী করে তোলার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন এসব ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় চরটিকে রক্ষা করতে যথেষ্ট৷

তবে ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে৷ সেরকম পরিস্থিতিতে চরটিতে তৈরি করা ১২০টি শেল্টার হাউস, যেগুলোর নিজস্ব পানি এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে, রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা৷

স্থপতি আহমেদ মুক্তা কোনভাবেই মনে করেন না যে চরটি অনিরাপদ৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘যেসব মানুষ ভাসান চরকে ভাসমান চর, কিংবা অনিরাপদ চর বলেন, তারা আসলে চরটিকে চেনেন না৷ তারা চরটি এখনো দেখেননি৷”

সরকার জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর সহায়তা ছাড়াই ভাসান চর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে কিনা সেটা অবশ্য এখনো নিশ্চিত নয়৷ কক্সবাজারে এসব রোহিঙ্গাদের বাঁচিয়ে রাখতে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে আন্তর্জাতিক এসব সংস্থা৷

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন অবশ্য বলেছেন, প্রয়োজন মনে করলে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সম্মতি ছাড়াও রোহিঙ্গাদের ভাসান চরে স্থানান্তর করতে পারে বাংলাদেশ সরকার৷ তিনি বলেন, ‘‘জাতিসংঘ যদি এই প্রস্তাবে সায় না দেয়, তাহলে বাংলাদেশ তাদেরকে এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলতে পারে৷”

এদিকে, ভাসান চরে এরই মধ্যে একটি লাইটহাউসও স্থাপন করা হয়েছে, যেটির নাম দেয়া হয়েছে ‘‘আশার বাতিঘর৷” সেটির সাদা দেয়ালে ফলক স্থাপনের জন্য জায়গা রাখা হয়েছে৷ রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর শুরুর আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দ্বীপটি উদ্বোধন করলে সেখানে একটি ফলক স্থাপন করা হবে। সূত্র- ডয়চে ভেলে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.