Home ইসলাম ঐতিহাসিক আশূরা এবং আশূরার রোযার ফযীলত

ঐতিহাসিক আশূরা এবং আশূরার রোযার ফযীলত

0

।। মাওলানা জয়নুল আবেদীন ।।

হিজরী সনের মহররম মাসের দশ তারিখ বা দিনকে আশূরা বলা হয়। এ দিনের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন জাতির ইতিহাস কিভাবে জড়িত তার প্রতি দৃষ্টি দিলে সহজেই আমরা আশূরার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি।

১। মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদমকে (আ.) প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি, জান্নাতে অবস্থান, পৃথিবীতে প্রেরণ ও তওবা কবুল সবই আশূরার তারিখে সংঘটিত হয়।

২। হযরত নূহ (আ.) সাড়ে ৯শ’ বছর তাওহিদের দাওয়াত দেওয়ার পরও যখন পথভ্রষ্ট জাতি আল্লাহর বিধান মানতে অস্বীকৃতি জানায়; তখন তাদের প্রতি নেমে আসে আল্লাহর গজব মহাপ্লাবন। এই মহাপ্লাবনের ধ্বংসলীলা থেকে রক্ষা পায় তারা যারা আল্লাহ ও নবীর প্রতি বিশ্বাসী হয়ে হযরত নূহের (আ.) নৌকায় আরোহণ করে। ওই নৌকা ৪০ দিন পর জুদি পাহাড়ের পাদদেশে মাটি স্পর্শ করে ঐতিহাসিক আশূরার দিন।

৩। এদিনেই হযরত ইবরাহিমের (আ.) জন্ম, ‘খলিলুল্লাহ’ উপাধিতে ভূষিত ও নমরুদের অগ্নি থেকে রক্ষা পান।

৪। হযরত ইদরিসকে (আ.) বিশেষ মর্যাদায় চতুর্থ আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয় আশূরার দিনে।

৫। সুদীর্ঘ ৪০ বছর পর হযরত ইউসুফের (আ.) সঙ্গে তার পিতা হযরত ইয়াকুবের (আ.) সাক্ষাৎ যেদিন হয়- সে দিনটি ছিল আশূরার দিন।

৬। নবী আইয়ুব (আ.) দীর্ঘ ১৮ বছর কুষ্ঠরোগ ভোগ করার পর আরোগ্য লাভ করেছিলেন আশূরার দিন।

৭। হযরত ইউনূস (আ.) ৪০ দিন মাছের পেটে থাকার পর মুক্তিলাভ করেন আশূরার দিন।

৮। ঘটনাক্রমে হযরত সোলায়মান (আ.) সাময়িক রাজত্বহারা হন। আল্লাহতায়ালা তাকে আবারও রাজত্ব ফিরিয়ে দেন আশূরার দিনে।

৯। আল্লাহতায়ালা হযরত মুসা (আ.) ও তার অনুসারী বনি ইসরাইলদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্ত করে পানির মধ্যে রাস্তা তৈরি করে দিয়ে পার করে দেন এবং ফেরাউনকে তার দলবলসহ সাগরে ডুবিয়ে মারেন আশূরার দিন।

১০। হযরত মুসা (আ.) তুর পাহাড়ে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছিলেন আশূরার দিনে।

১১। এ দিনে হযরত ঈসার (আ.) জন্ম হয় এবং ইহুদিরা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করলে আল্লাহতায়ালা তাকে ফেরেশতা কর্তৃক সশরীরে আসমানে উঠিয়ে নেন এ দিনেই।

১২। দাবী করা হয়, কাবা শরিফ সর্বপ্রথম গিলাফ দ্বারা আবৃত করা হয়েছিল আশূরার দিন। এ পৃথিবীর অস্তিত্বের সঙ্গেও আশূরার দিনের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। আশূরার দিনেই আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি করেছেন আকাশমালা, মর্তজগৎ, পর্বতরাজি, লওহ-কলম ও ফেরেশতাদের। আশূরার দিনে আল্লাহ নিজ আরশে আজিমে অধিষ্ঠিত হন।

এভাবে পৃথিবীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ দিনের সম্পর্ক। আশূরার দিনটি যে কারণে বিশ্ব মুসলিমের কাছে অত্যন্ত স্মরণীয়, শিক্ষণীয় ও হৃদয়বিদারক তা হলো- কারবালার ঘটনা।

হযরত রাসূলুল্লাহর (সা.) দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রা.) অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে সত্যের জন্য সংগ্রাম করে কারবালার প্রান্তরে সপরিবারে শাহাদত বরণ করে সর্বোচ্চ ত্যাগের অতুলনীয় আদর্শ রেখে গেছেন।

আশূরার এসব ঘটনাবলীতের রয়েছে মানব জাতির জন্য শিক্ষণীয় অনেক কিছু। আশূরার রোযা ইসলামের প্রাথমিক যুগে আশূরার রোযা ফরয ছিলো। দ্বিতীয় হিজরি সনে রমযানের রোযা ফরয হওয়ার বিধান নাযিল হলে আশূরার রোযা ঐচ্ছিক হিসেবে বিবেচিত হয়।

১। আশূরা দিবসে রোযা পালনের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তিনি বলেন- রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমযানের পর সর্বাধিক উত্তম রোযা হলো মহররম মাসের রোযা। আর ফরজের পরে সর্বাধিক উত্তম নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামায’। (মুসলিম- ১/৩৫৮)।

২। হাদিসে ‘আশূরা’ দিবসে রোযা পালনের বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমযানের রোযার পরে আল্লাহর নিকট মহররম মাসের রোযা ফজিলতের দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠতম।’ (সহিহ মুসলিম- ১/৩৮৮)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রোযা নিজে পালন করেছেন। উম্মতকে রাখার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তাই এর পূর্ণ অনুসরণ ও আনুগত্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে উম্মতের কল্যাণ।

৩। আবু কাতাদা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূল (সা.)-কে আশূরার রোযার ফযীলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এই রোযা বিগত বছরের গুনাহ মুছে দেয়’। (মুসলিম, হাদিস- ১১৬২)।

৪। আরও বর্ণিত আছে, ‘আশূরা দিনের রোযা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, এর ফলে আগের বছরের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (মুসলিম- ১/৩৫৮)।

৫। আয়েশা (রাযি.) বলেন, ‘জাহিলি যুগে কুরাইশরা আশূরার দিনে রোযা পালন করতো। রাসূলুল্লাহ (সা.)ও সে কালে রোযা পালন করতেন। মদিনায় এসেও তিনি রোযা পালন করতেন এবং অন্যদেরও নির্দেশ দিলেন। রমযানের রোযার আদেশ নাযিল হলে আশূরা দিবস বর্জন করা হয়। এখন কেউ চাইলে তা পালন করুক, আর চাইলে তা বর্জন করুক।’ (বুখারি- ১/২৬৮)।

৬। হযরত আয়েশা (রাযি.) আরও বলেন, ‘রাসূল (সা.) বলেন, রমযান মাসের রোযার পর সর্বোত্তম রোযা আল্লাহর মাস মহররমের আশূরার রোযা।’ (সুনানে কুবরা- ৪২১০)

৭। মুসলিম শরিফে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত- ‘মহানবী (সা.) যখন আশূরার দিনে রোযা রাখেন এবং অন্যদেরও রোযা রাখার নির্দেশ দেন, তখন সাহাবিরা অবাক হয়ে বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইহুদি-নাসারারা তো এই দিনটিকে বড় দিন মনে করে। (আমরা যদি এই দিনে রোযা রাখি, তাহলে তো তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য হবে।

তাদের প্রশ্নের উত্তরে রাসূল (সা.) বললেন, ‘তারা যেহেতু এদিন একটি রোযা পালন করে) আগামী বছর ইনশাআল্লাহ আমরা এই ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ মিলিয়ে দুই দিন রোযা পালন করবো। (মুসলিম- ১১৩৪)।

৮। এ মাসে রোযা রাখার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেন, ‘রমযানের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোযা হলো সর্বশ্রেষ্ঠ।’ (মুসলিম- ২/৩৬৮; জামে তিরমিজি- ১/১৫৭)।

৯। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আমি রাসূল (সা.)-কে রমযান ও আশূরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোযা রাখতে দেখেছি, অন্য সময় তা দেখিনি। (বুখারি- ১/২১৮)।

১০। আলী (রা.)-কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, রমযানের পর আর কোন মাস আছে, যাতে আপনি আমাকে রোযা রাখার আদেশ করেন? তিনি বললেন, এই প্রশ্ন রাসুলুল্লাহ (সা.)এর নিকট জনৈক সাহাবি করেছিলেন, তখন আমি তার কাছে উপস্থিত ছিলাম। উত্তরে রাসূল (সা.) বললেন, ‘রমযানের পর যদি তুমি রোযা রাখতে চাও, তবে মহররম মাসে রাখো। কারণ, এটি আল্লাহর মাস।

এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ তাআলা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন।’ (জামে তিরমিযী- ১/১৫৭)।

১১। আশূরার রোযা সম্পর্কে এক হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা আশূরার রোযা রাখো এবং ইহুদিদের সাদৃশ্য ত্যাগ করো; আশূরার আগে বা পরে আরও একদিন রোযা রাখো।’ (মুসনাদে আহমদ- ১/২৪১)।

আশূরা’র গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাসমূহ হলো-

১. আশূরার দিনটি মূলত বাতিলের পরাজয় এবং সত্যপন্থী, হকপন্থীদের বিজয় ও মুক্তির দিবস।

২. নবী ও তাদের অনুসারীগণের ইতিহাস স্মরণপূর্বক আল্লাহর বিধান পালন ও বাস্তবায়নে অবিচলতা, দৃঢ়তা ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা যথার্থমানের হতে হবে। তাহলেই কেবল আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর সব বাতিল শক্তির মোকাবেলায় মুসলমানদের বিজয়ী করবেন।

৩. ঈমান-আকিদাবিরোধী সকল কার্যকলাপ বন্ধ করতে সচেষ্ট হতে হবে।

৪. ইসলাম সম্পর্কে যারা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে তাদেরকে সঠিক ধারণা প্রদান করতে হবে এবং ইসলামের সুমহান আদর্শের দিকে সবাইকে আহ্বান জানাতে হবে।

৫. সত্য ও ন্যায়কে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে বাতিলের মোকাবেলায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে।

৬. আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সব কাজে ত্যাগ এবং কোরবানির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

৭. সুযোগ থাকার পরও যেমন হযরত হোসাইনের (রা.) সাথীরা তাকে ছেড়ে না গিয়ে তার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে সঙ্গে থেকেছেন; তেমনি আমাদেরও উচিত সর্বদা সত্যপন্থীদের সমর্থন, সহযোগিতা ও সঙ্গে থাকা।

৮. ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে সার্বিক সফলতা অর্জনের জন্য নিজেরা ভালো আমল করা, সর্বপর্যায়ে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন এবং খোদাভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানো। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে এ শিক্ষা গ্রহণের তওফিক দান করুন। আমিন।।

লেখক: শিক্ষক- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা-ঢাকা এবং কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.