Home ওপেনিয়ন বাংলাদেশ-ভারত কানেকটিভিটি ‘আঞ্চলিক’ কিছু নয়, এক তরফা সুবিধা নিচ্ছে ভারত

বাংলাদেশ-ভারত কানেকটিভিটি ‘আঞ্চলিক’ কিছু নয়, এক তরফা সুবিধা নিচ্ছে ভারত

0

।। শফিক রহমান ।।

বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে নৌ, রেল, সড়ক – সব পথেই ভারতের ভৌত যোগাযোগ পরিষ্কার। আকাশ পথেও যোগাযোগ সম্প্রসারণের প্রস্তাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের ভূমিতে বিমান বন্দর নির্মাণসহ দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহরগুলো গৌহাটি, শিলচর, আগরতলা, তেজপুর, ডিমাপুর এবং আইজলের সঙ্গে সরাসরি বিমান চলাচলের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

ফলে এটা কি ধরনের ‘আঞ্চলিক’ কানেকটিটিভিটি সেই প্রশ্ন উঠেছে।

নেপাল এখনও আটকে আছে ভারতের ‘চিকেন নেকে’ এবং বাংলাদেশগামী ভুটানের পণ্যবাহী ট্রাক আটকানো হচ্ছে আসামে। ফলে যা ঘটছে তা ভারতের সঙ্গে এবং ভারতের জন্যে।

সাউথ এশিয়ান সাব-রিজিওনাল ইকোনোমিক কোঅপারেশন রোড কানেকটিভিটি, ফেইজ-১, ফেইজ-২ শীর্ষক দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার। ওই একই প্রকল্পের ফেইজ-৩ এবং ফেইজ-৪ এর খসড়া প্রণয়ন প্রক্রিয়াধিন রয়েছে।

ফেইজ-১ এর আওতায় গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত ৭৪ কিলোমিটার সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা হবে। ফেইজ-২ এর আওতায় ছয় লেনে উন্নীত হচ্ছে এলেঙ্গা থেকে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল-বগুড়া হয়ে রংপুরের মডার্ন মোড় পর্যন্ত ১৯০.৪ কিলোমিটার সড়ক।

ফেইজ-৩ এর আওতায় রংপুরের মডার্ন মোড় থেকে লালমনিরহাটের বুড়িমাড়ি স্থলবন্দর পর্যন্ত সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করা হবে। যেটির সংযোগ ঘটবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চেংড়াবান্ধায়।

আর ফেইজ-৪ এর আওতায় ছয় লেনে উন্নীত হবে মডার্ন মোড় থেকে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থল বন্দর সড়কটি। এটির সংযোগ ঘটবে ভারতের জলপাইগুড়ির ফুলবাড়ি সীমান্তে।

ফেস-২ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী জয় প্রকাশ চৌধুরী জানান, পাঁচ বছর মেয়াদী এ প্রকল্পের আওতায় সড়কটি ৬ লেনে উন্নীত করা ছাড়া ব্রীজ, কালভার্ট, ফ্লাইওভার এবং ফুট ওভারব্রীজ নির্মাণ করা হবে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং শেষ হবে ২০২১ নাগাদ। প্রকল্পের বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৮,৯৯০.১২ মিলিয়ন টাকা। যার মধ্যে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক দিচ্ছে ৯৩,৫৪৯.৬৪ মিলিয়ন টাকা এবং বাকি ২৫,৪৪০.৪৮ মিলিয়ন টাকা বহন করছে বাংলাদেশ সরকার।

এছাড়া ‘ক্রসবর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকারের সড়ক ও জনপথ বিভাগ। প্রকল্পটির আওতায় দেশের ৮টি মহাসড়কের ৬০০ কিলোমিটারের উন্নয়ন এবং ওই ৬০০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ১৭টি সেতু, সাতটি কালভার্ট, একটি টোল গেট এবং দুটি এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে।

যশোর জেলার শার্শা ও ঝিকরগাছা, নড়াইল জেলার সদর ও লোহাগড়া, গোপালগঞ্জের সদর ও কাশিয়ানী, চট্টগ্রামের মিরসরাই, ফটিকছড়ি, পটিয়া ও চন্দনাইশ এবং কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় বাস্তবায়নাধীন ওই ৮টি সড়কের প্রতিটি ভারত সীমান্তে মিলিত হওয়ায় প্রকল্পটির নাম দেয়া হয়েছে ‘ক্রসবর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্ট’।

এদিকে মায়ানমারের ইয়াংগুন থেকে টেকনাফ-ঢাকা-বেনাপোল হয়ে ভারত, এই রুট ধরে ২০০৫ সালে এশিয়ান হাইওয়েতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ২০১০ সালে ‘ভারতের ট্রানজিট প্লান’ অনুযায়ী রুট পরিবর্তন করে।

তখন পরিবর্তিত রুট দাঁড়ায় ইয়াংগুন-তামু হয়ে ভারতের ইম্ফল। এরপর ভারতের মধ্য দিয়ে তামাবিলে এসে বাংলাদেশে সংযুক্ত হবে। সেখান থেকে ঢাকা হয়ে বেনাপোল দিয়ে আবার ভারতে গিয়ে যুক্ত হবে।

এশিয়ান হাইওয়ের পরিবর্তিত রুটের আরেকটি শাখা উত্তরে বাংলাবান্ধা দিয়ে ভারতে যাবে। সেখান থেকে যুক্ত হবে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে।

‘ঘুরপথ’ বলে এশিয়ান হাইওয়ে নিয়ে ওই সময়ে বিরোধিতা ছিল, ‘অঘোষিত’ভাবে সেই ঘুরপথেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার। বিশেষ করে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীতকরণের কাজ শুরু করেছে। নরসিংদীর কাঁচপুর থেকে সিলেটের শেরপুর হয়ে তামাবিল দিয়ে এই সড়কটি যুক্ত হবে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে।

২০১৮ সালের শেষের দিকে এ প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩,৮৮৫.৭২ কোটি টাকা। বর্তমানে ওই প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ।

এছাড়া সিলেট-চারখাই-শেওলা সড়কটিও এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত করতে শুরু হয়েছে জরিপকাজ।

হাইওয়েটি ভারতের সুতারকান্দি স্থলবন্দর থেকে  প্রবেশ করবে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার শেওলা দিয়ে। এরপর চারখাই-গোলাপগঞ্জ-চন্ডিপুল হয়ে মিলবে নরসিংদীর কাঁচপুরে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানাচ্ছে শেওলা থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত এই সড়কটির দূরত্ব হবে ২৮০ কিলোমিটার।

সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি বিয়ানিবাজারের শেওলাতে নির্মাণ হচ্ছে একটি স্থলবন্দর। সিলেট জেলা থেকে ৫০ কিলোমিটার এবং বিয়ানিবাজার উপজেলা সদর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে বন্দরটি নির্মাণে ইতোমধ্যে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং ২০২১ সাল নাগাদ নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে জানান স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান তপন কুমার চক্রবর্তী। এই বন্দরটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২২ কোটি টাকা।

এছাড়া এশিয়ান হাইওয়ের প্রকল্পের আওতায় বেনাপোল-ভাঙ্গা সড়কটিতে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে প্রাথমিক জরিপ কাজ। চলছে ম্যাপিংয়ের কাজও। এ পর্যায়ে সড়কটির দুই ধারে ৪৫ ফুট করে ৯০ ফুট জমি অধিগ্রহণ করা হবে। সড়কটিকে ৬ লেনে উন্নীত করা হবে। পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক থেকে বেনাপোল হয়ে এটি মিলবে ভারতের সঙ্গে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম মোয়াজ্জেম হোসেন এ তথ্য জানান।

খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরত্বে রামগড় পৌরসভার কাছে নির্মাণ হচ্ছে একটি স্থলবন্দর। রামগড়ের মহামুনি এবং ত্রিপুরার আনন্দপাড়া সীমান্ত সংযোগ ফেনী নদীতে তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু-১। যা পার হলে মাত্র ৭২ কিলোমিটার দূরত্বেই নাগাল মিলবে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের। ফলে ত্রিপুরা হবে ভারতের ভূমিবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর প্রবেশমুখ এবং রাজ্য সাতটি সুযোগ পাবে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে সরাসরি আমদানি-রফতানির।

গত ৫ অক্টোবর দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে সাতটি চুক্তি ও সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষর হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে ভারত থেকে এবং ভারতে পণ্য আনা-নেওয়ায় স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং সিস্টেম (এসওপি) স্বাক্ষর হয়েছে। ফলে ত্রিপুরা হবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রথম রাজ্য যারা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশ নিতে পারছে।

এর আগে আশুগঞ্জকে ট্রান্সশিপমেন্ট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে আখাউড়া সীমান্ত পার হয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ পেয়েছে ভারত। তবে আশুগঞ্জ-আখাউড়ার ওই রুটটি ব্যবহার করে কলকাতা থেকে আগরতলা পর্যন্ত পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হচ্ছে ৩৫০ কিলোমিটার পথ। এরও আগে কলকাতা থেকে আসামের গৌহাটি ঘুরে ত্রিপুরার আগরতলা যেতে পাড়ি দিতে হতো ১৬৫০ কিলোমিটার পথ। কিন্তু এবার ভারতকে চট্টগ্রাম বন্দর ধরে সড়ক পথে মাত্র ৭২ কিলোমিটার পাড়ি দিলেই রামগড় সীমান্ত এবং সীমান্তের ওপারে সাব্রুম-উদয়পুর হয়ে ১৩৩ কিলোমিটারের মাথায় আগরতলা।

ভারত সরকারের অর্থায়নে ফেনী নদীর ওপর নির্মিতব্য সেতু থেকে ওপারে প্রায় ১২শ মিটার অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ হচ্ছে। যা নবীনপাড়া-ঠাকুরপল্লী হয়ে সাব্রুম-আগরতলা জাতীয় সড়কে যুক্ত হবে।

এদিকে বাংলাদেশ অংশে রামগড়-বারৈয়ারহাট হয়ে ৩৮ কিলোমিটার চাল লেনের অ্যাপ্রোচ রোড ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। যা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকা বাস্তবায়ন করবে।

এছাড়া বাংলাদেশ স্থলবন্দর কতৃপক্ষের তত্বাবধানে এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে রামগড়ে নির্মাণ হচ্ছে স্থল বন্দর। ২০২১ সাল নাগাদ বন্দরটির নির্মাণ প্রক্রিয়া শেষ হবে এবং এর ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশের ২৩টি স্থল বন্দরের মধ্যে চালু আছে ১২টি। এর মধ্যে ১১টিই ভারতের সঙ্গে। বাকি একটি মিয়ানমারের সঙ্গে। আগামীতে জামালপুরের বক্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বাল্লায় এবং ফেনীর বেলুনিয়ায় বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান স্থল বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান তপণ কুমার চক্রবর্তী।

নৌপথে সংযোগ

ভারতের সঙ্গে সর্বশেষ স্বাক্ষরিত প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (নৌ প্রটোকল) চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে তিনটি রুট রয়েছে। যার একটি হলো কলকাতা-হলদিয়া-রায়মঙ্গল হয়ে বাংলাদেশের চালনা-খুলনা-মোংলা-কাউখালী-বরিশাল-হিজলা-চাঁদপুর-নারায়ণগঞ্জ-আরিচা-সিরাজগঞ্জ-বাহাদুরাবাদ-চিলমারি হয়ে ভারতের আসামের ধুবড়ি-পান্ডু পর্যন্ত।

দ্বিতীয় রুটটি হলো কলকাতা-হলদিয়া-রায়মঙ্গল হয়ে বাংলাদেশের চালনা-খুলনা-মোংলা-কাউখালী-বরিশাল-হিজলা-চাঁদপুর-নারায়ণগঞ্জ-ভৈরব বাজার-আশুগঞ্জ-আজমীরিগঞ্জ-মারকুলি-শেরপুর-ফেঞ্চুগঞ্জ-জকিগঞ্জ হয়ে ভারতের মেঘালয়ের করিমগঞ্জ পর্যন্ত। আরেকটি ভারতের ধুলিয়ান হয়ে বাংলাদেশের রাজশাহী-গোদাগারী পর্যন্ত।

এর মধ্যে কলকাতা-হলদিয়া-রায়মঙ্গল-চালনা-খুলনা-মোংলা-কাউখালী-বরিশাল-হিজলা-চাঁদপুর-নারায়ণগঞ্জ-ভৈরব বাজার-আশুগঞ্জ-আজমীরিগঞ্জ-মারকুলি-শেরপুর-ফেঞ্চুগঞ্জ-জকিগঞ্জ-করিমগঞ্জ রুটের কানাই কুশিয়ারা নদীর অংশ বিশেষ করে আশুগঞ্জ থেকে জকিগঞ্জ পর্যন্ত ২৯৫ কিলোমিটার অচল রুটকে সচল করতে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বিনিয়োগের ভিত্তিতে বাস্তবায়নাধিন প্রকল্পের আওতায় গত মার্চেই খনন কাজ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) প্রধান প্রকৌশলী আবদুল মতিন জানান, প্রকল্পের আওতায় প্রথম দুই বছর ১৫ লাখ ঘন মিটার খননের সিদ্ধান্ত রয়েছে এবং নদীর নাব্যতা ধরে রাখতে পরবর্তী পাঁচ বছরের প্রতি বছর সাড়ে চার লাখ ঘনমিটার করে সংস্কার খনন চলবে।

প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৫ কোটি ৪৯ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। যার ৮০ শতাংশ বহন করবে ভারত এবং বাকি ২০ শতাংশ বহন করবে বাংলাদেশ।

এছাড়া কলকাতা-হলদিয়া-রায়মঙ্গল-চালনা-খুলনা-মোংলা-কাউখালী-বরিশাল-হিজলা-চাঁদপুর-নারায়ণগঞ্জ-আরিচা-সিরাজগঞ্জ-বাহাদুরাবাদ-চিলমারি-ধুবড়া-পান্ডু রুটের যমুনা নদীর অংশ বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ১৭৮ কিলোমিটার খননের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রথম দুই বছর ৩৬ লাখ ঘন মিটার খনন করা হবে। পরবর্তী পাঁচ বছরের প্রতিবছর ১০ লাখ ৮০ হাজার ঘনমিটার সংস্কার খনন করা হবে।

এ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২২৭ কোটি ৪৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫০০ টাকা। যার ৮০ শতাংশ বহন করবে ভারত এবং ২০ শতাংশ বাংলাদেশ।

এছাড়া ধুলিয়ান-গোদাগারী-রাজশাহী রুটের পদ্মা নদীর বিশেষ করে ধুলিয়ান থেকে গোদাগারী পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার এবং গোদাগারী থেকে রাজশাহী পর্যন্ত ৯৮ কিলোমিটার খননেরও প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে।

এছাড়া ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের মধ্যে থাকা গোমতী ও হাড়োয়া নদীর খননের জন্যও সুপারিশ করেছে যৌথ কারিগরি কমিটি। গত বছরের অক্টোবরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারতের নৌ সচিব পর্যায়ের দুই দিনব্যাপী বৈঠকে ধুলিয়ান-গোদাগারী-রাজশাহী রুট এবং গোমতী ও হাড়োয়া নদীকে ব্যবহারযোগ্য করা যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ওই যৌথ কারিগরি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।

ওই বৈঠকেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাত্রী ও পর্যটকবাহী ক্রুজশিপ চলাচলের সুযোগ এবং দুই দেশের মধ্যে নতুন নৌবন্দর ‘পোর্ট অব কল’ ঘোষণা সংক্রান্তসহ বেশ কয়েকটি চুক্তি সই করে ঢাকা ও নয়া দিল্লি। বিশেষ করে ভারতের ধুবড়ি এবং বাংলাদেশের পানগাঁও-কে নতুন বন্দর হিসাবে ব্যবহারে চুক্তি হয়।

এছাড়া ভারতের রূপনারায়ণ নদীর গেঁওখালী থেকে কোলাঘাট পর্যন্ত প্রটোকল রুটে অন্তর্ভুক্ত করতে এবং পশ্চিমবঙ্গের কোলাঘাট ও বাংলাদেশের চিলমারীকে নতুন পোর্ট অব কল ঘোষণা করতে দুই দেশ সম্মত হয়।

ওই একই বৈঠকে আসামের বরাক নদীতে করিমগঞ্জের পাশাপাশি বদরপুরে এবং বাংলাদেশের আশুগঞ্জের পাশে ঘোড়াশালে বন্দর তৈরীর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বর্তমানে দুই দেশের ঘোষণা দেয়া পোর্ট অব কলের সংখ্যা ১২টি। এর মধ্যে বাংলাদেশর ৬টি হলো নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, মোংলা, সিরাজগঞ্জ, আশুগঞ্জ এবং পানগাঁও। আর ভারতের ৬টি হলো কলকাতা, হলদিয়া, করিমগঞ্জ, পান্ডু, শীলঘাট এবং ধুবড়ি।

রেলপথে ট্রানজিট

দুই দেশের মধ্যে রেলপথে পণ্য পরিবহন চুক্তির আওতায় দীর্ঘ দিন ধরেই পণ্য আমদানি-রফতানি হচ্ছে। তবে এবার বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে রেলপথে ট্রানজিট চায় ভারত। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে কনটেইনার পরিবহন চুক্তির প্রস্তাব করেছে দেশটি। যার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডার স্ট্যান্ডিং বিটুউইন কনটেইনার কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল) অ্যান্ড কনটেইনার করপোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড (কনকর) টু প্রোমোট অ্যান্ড এক্সপান্ড কো-অপারেশন বিটউইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ ইন দ্য ফিল্ড অব কনটেইনার ট্রান্সপোর্টেশন ফর মিউচুয়াল বেনিফিট অব বোথ কান্ট্রিজ’।

সিসিবিএল বাংলাদেশের রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি। আর কনকর ভারতের রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত একটি কোম্পানি।

এছাড়া কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের জন্য ঈশ্বরদীর ইয়ার্ডকে রেলভিত্তিক অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) হিসেবে উন্নয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কনটেইনার ট্রেন ও আইসিডি পরিচালনায় সিসিবিএলকে সহায়তা করবে কনকর।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক কাজী মো. রফিকুল আলম রেল পথে দুই দেশে কনটেইনার পরিবহনে অবকাঠামোগত দুর্বলতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রথমত বাধা হচ্ছে যমুনা সেতুর ওপর দিয়ে কনটেইনার ট্রেন চলছে না। তারপরও পরীক্ষামূলক চালিয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। তারা যমুনা সেতু ব্যবহারের সুপারিশ না দিলে সেতুর পশ্চিম জোনে কনটেইনার ডিপো নির্মাণ করা হতে পারে। এছাড়া ঈশ্বরদীর ইয়ার্ডকে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) হিসেবে উন্নয়নের প্রক্রিয়া চলছে।

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেলপথে ৮টি ইন্টারচেঞ্জ আছে। যেগুলো হলো বেনাপোল-পেট্রাপোল, দর্শনা-গেদে, রহনপুর-সিংগাবাদ, বিরল-রাধিকাপুর, কুলাউড়া-মহিষাসন, চিলাহাটি-হলদিবাড়ি, বুড়িমারি-চেংরাবান্ধা ও মোগলহাট-গিতলদহ। এর মধ্যে বেনাপোল-পেট্রাপোল, দর্শনা-গেদে, রহনপুর-সিংগাবাদ ‍রুটে আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। বিরল-রাধিকাপুর ব্রড গেজে রূপান্তরের পর ট্রেন চলাচলের উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

বাকি চারটি রুটের মধ্যে কুলাউড়া-মহিষাসনের সংস্কার কাজও শুরু করা হয়েছে। চিলাহাটি-হলদিবাড়ি পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে। বুড়িমারি-চেংরাবান্ধা ও মোগলহাট-গিতলদহ আপাতত চালুর কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে আখাউড়া-আগরতলা নতুন ইন্টারচেঞ্জ চালুর লক্ষ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে। এছাড়া ফেনী-বেলুনিয়া রুটেও নতুন ইন্টারচেঞ্জ চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানান কাজী মো. রফিকুল আলম।

মৈত্রী, বন্ধন ও সৌহার্দ সার্ভিস

১৯৯৯ সালে ঢাকা-কলকাতার মধ্যে শুরু হয় সরাসরি বাস সার্ভিস ‘সৌহার্দ্য’। বাংলাদেশের বিআরটিসি ও ভারতের ডব্লিউ বিটিসির কর্তৃপক্ষ উভয় দেশের মধ্যে এই বাস সার্ভিস চালু করে। পরে ২০১৫ সালে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঢাকা-শিলং-গৌহাটি-ঢাকা ও কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা রুটের বাস সার্ভিস। ২০১৭ সালে চালু হয় ঢাকা-খুলনা-কলকাতা-ঢাকা রুটে বাস সার্ভিস।

এছাড়া ২০০৮ সালে ঢাকা-কলকাতার মধ্যে শুরু হয় যাত্রীবাহী ট্রেন সার্ভিস ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’। এর পরে ২০১৭ সালে এর সঙ্গে যুক্ত হয় খুলনা-কলকাতা রুটের ট্রেন সার্ভিস। যার নাম দেয়া হয় ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’। সর্বশেষ গত ২৯ মার্চ পরীক্ষামূলক চালু হয়েছে ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা নৌরুটে যাত্রীবাহী জাহাজ সার্ভিস।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখে প্রায়ই শোনা যাচ্ছে দেশ দুটির মধ্যে ১৯৬৫ সাল পূর্ব রেল লাইনগুলো চালুর কথা।

গত ১৮ জুন দিল্লি ঘুরে এসে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব জানান পানিপথে বাংলাদেশ-ত্রিপুরার বাণিজ্য যোগাযোগের কথা। আর এবার অক্টোবরে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত করে আগরতলা থেকে ঢাকা পর্যন্ত সরাসরি ফ্লাইট চলাচলের প্রস্তাব দেন। এছাড়া আগরতলা বিমানবন্দর সম্প্রসারণ করতে বাংলাদেশের জমি ব্যবহার করতে চায় ভারত।

তবে এসব কানেকটিভিটিতে ভারতের নিশ্চিত লাভ হলেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত দৃশ্যত কোন সুফল পাচ্ছে না। সূত্র- এশিয়ান মনিটর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.