Home নির্বাচিত সংবাদ সংখ্যাগুরুবাদের এই সময়ে গান্ধীর কাছ থেকে কী শিখতে পারি আমরা?

সংখ্যাগুরুবাদের এই সময়ে গান্ধীর কাছ থেকে কী শিখতে পারি আমরা?

এম কে গান্ধীর জীবনী সু-সংরক্ষিত। এর আংশিক কারণ হলো তার আত্মজৈবনীক গ্রন্থ এবং হরিজন ও ইয়াং ইন্ডিয়াসহ নিজের প্রকাশনায় তিনি মাঝে মাঝেই যে সব হস্তক্ষেপ করেছেন সেগুলো। কিন্তু তার ১৫০তম জন্ম বার্ষিকীতে এসে এটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে, অন্যের উপর তার প্রভাব থেকে আমরা কি শিখতে পারি।

স্বাধীন ভারতের কাছে গান্ধীর অর্থ কি ছিল, যেটা দেখার জন্য তিনি বেঁচে ছিলেন না? আজকের ভারতের কিভাবে তাকে দেখা উচিত? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সংখ্যাগুরুবাদের এই সময়ে গান্ধীর কাছ থেকে আমরা কি শিখতে পারি?

দেশভাগের আতঙ্ক যখন মাথাচাড়া দিচ্ছে, (জীবনের শেষ কয়েক মাস সময়ে), গান্ধী তখন তার শেষ সত্যাগ্রহ গ্রহণ করেন। চাওড়ি চাওড়ার ঘটনার মতো সত্যাগ্রহের মধ্য দিয়ে বোঝা গিয়েছিল যে, গান্ধী তার নিজের নীতির প্রতি দায়বদ্ধ এবং জনতার বিপক্ষে দাঁড়ানোর ইচ্ছা তার রয়েছে – তা ভিন্নমতের জায়গা থেকে সেটাকে যতই স্বার্থবাদী মনে হোক না কেন।

১৯৪৮ সালের ১৩ জানুয়ারি গান্ধী তার সত্যাগ্রহ শুরু করেন। ভারতের বিরাট অংশ জুড়ে যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল, সেই প্রেক্ষিতেই ওই অনশন শুরু করেছিলেন তিনি। (দিল্লীতে অবস্থানরত) মুসলিমদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিহিংসার বহিপ্রকাশ ঘটেছিল। গান্ধী ততদিনে অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়েছেন কিন্তু তিনি বলেছিলেন যে, তিনি অনশন অব্যাহত রাখবেন যতক্ষণ না বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হৃদয়ের পুনর্মিলন ঘটে – বাইরের কোন চাপে নয়, বরং দায়িত্বের একটা আলোকিত বোধ থেকে, এবং যতক্ষণ না এটা দেখে তিনি সন্তুষ্ট হন।

সত্যাগ্রহ ভাঙ্গার জন্য সাতটি শর্ত দেন তিনি। এবং এর সবগুলোই ছিল দিল্লীর মুসলিমদের এবং তাদের সম্পদের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট। তার অনশনের কারণেই শিখ ও হিন্দুদের একটা অংশ দিল্লীর মুসলিমদের রক্ষা করার শপথ নিয়েছিলো।

সংখ্যাগুরু স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াতে সাহস লাগে, এবং যারা দুর্বল, তাদের পাশে দাঁড়াতেও সাহস লাগে। গান্ধী উত্তেজিত জনতার কুসংস্কার এবং তাদের ক্রোধের কাছে নতি স্বীকার করেননি। তিনি তার রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে মুসলিমদের অধিকার রক্ষা করেছেন। সম্ভবত আজকের সেক্যুলার দলগুলোর জন্য এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা, যারা নিজেদেরকে মুসলিমদের থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যারা বড় ধরনের বিচ্ছিন্নতা ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

তবে, এর অর্থ এটা নয় যে, গান্ধীর জীবনকে বিশ্লেষণী দৃষ্টিকোণ থেকে পড়া হবে না, বা তার রাজনীতি সমালোচনার ঊর্ধে। এ ব্যাপারে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বাবাসাহেব আম্বেদকার কিভাবে গান্ধীকে দেখেছিলেন – তিনি বেঁচে থাকতে এবং তার মৃত্যুর পর।

১৯৪৮ সালের জানুয়ারির অনশন ছিল সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য। ১৯৩২ সালের পুনার অনশন ছিল ডিপ্রেসড শ্রেণীর জন্য আলাদা নির্বাচনী এলাকা প্রতিহত করার জন্য। গান্ধী মুসলিম ও শিখদের জন্য আলাদা নির্বাচনী এলাকার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিলেন, কিন্তু ডিপ্রেসড শ্রেণীর জন্য একই সুবিধা দেয়ার পক্ষে ছিলেন না তিনি। এটা করা হলে ‘অস্পৃশ্য’রা হিন্দু সমাজ থেকে আলাদা হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা ছিল তার। আম্বেদকার দেখেছিলেন তার সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের জন্য এই রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করাটা ‘অনস্বীকার্য’। তিনি গান্ধীকে বলেছিলেন, “আমি হিন্দুদের বলতে চাই যে, আমার ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে আমি আশ্বস্ত হতে চাই”।

যে সব সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবে অন্যায়ের শিকার হয়েছে, তাদের জন্য এমন নেতৃত্বের দাবি তোলাটা জরুরি যারা আধিপত্যবাদী শ্রেণীর বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে পারেন। গান্ধী একটা কৌশল নিয়েছিলেন এবং দুর্বল, সবচেয়ে অপ্রতিনিধিত্বশীল শ্রেণীর পক্ষে ক্ষমতাশীলদের কাছে সত্যটা বলতেন তিনি। দুঃখজনক হলো, গান্ধী যে ঐতিহ্য রেখে গেছেন, তার মৃত্যুর পর ভারতে সেটার প্রয়োজনীয়তা শুধু বেড়েই চলেছে।

সবশেষে, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, কে গান্ধীকে খুন করেছিল এবং কেন করেছিল। ভারতীয় মুসলিমদের ব্যাপারে গান্ধীর যে অনমনীয় অবস্থান ছিল, স্বাধীন ভারতের প্রথম সন্ত্রাসী নাথুরাম গডসে সেটা পছন্দ করেনি। তাছাড়া গান্ধীর হত্যাকাণ্ডে হিন্দুত্ববাদের শীর্ষ নেতা ভি ডি সাবারকারের কি ভূমিকা ছিল, জিবন লাল কাপুর কমিশনের তদন্ত রিপোর্টে সেটারও রেকর্ড রয়েছে।

মুসলিমবিদ্বেষী ঘৃণার কারণেই গান্ধীর হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। তার ১৫০তম জন্মবার্ষিকীতে গান্ধীর ঘাতককে ‘দেশপ্রেমিক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দলের এক এমপি। গান্ধীর স্মৃতিকে অবশ্যই আমাদের সজিব রাখতে হবে – একটা মূর্তি হিসেবে নয় – বরং একজন মানুষ হিসেবে, যিনি এই ভারত ও সকল ভারতীয়ের জন্য বেঁচে ছিলেন (এবং মারা গেছেন)। [কৃতজ্ঞতা- সাউথ এশিয়ান মনিটর]

লেখক: অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) প্রেসিডেন্ট এবং লোকসভার এমপি