Home আন্তর্জাতিক কেন ভারতীয়দের ওপর চড়া পর্যটন কর চাপাচ্ছে ভুটান?

কেন ভারতীয়দের ওপর চড়া পর্যটন কর চাপাচ্ছে ভুটান?

0

ডেস্ক রিপোর্ট: ভুটান ভ্রমণে ভারতীয় পর্যটকদের অত্যন্ত চড়া হারে কর দেওয়ার ক্ষেত্রে এতদিন যে ছাড় ছিল, থিম্পু তা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ভারত ও ভুটানের সম্পর্ক কোন খাতে বইছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

এখন বিদেশি পর্যটকদের ভুটান বেড়াতে হলে ট্যুর অপারেটরদের মাধ্যমে প্রতিদিন কম করে মাথাপিছু আড়াইশো ডলার খরচ করতেই হয় – যার মধ্যে সরকারের আরোপিত ষাট ডলারের ‘সাসটেনেবেল ডেভেলপমেন্ট ফি’, থাকা-খাওয়ার খরচ বা এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার ধরা থাকে।

কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ-মালদ্বীপ থেকে আসা পর্যটকদের ক্ষেত্রে এই কড়াকড়ি ছিল না। তারা অনেক কম খরচে ভুটান বেড়াতে পারতেন, তবে খুব শিগগিরি সেই সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে। ভুটানের পর্যটন কর্পোরেশনের সুপারিশে আগামী মাসেই সে দেশের মন্ত্রিসভা এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করতে চলেছে বলে ভারত সরকারকে আগাম জানানো হয়েছে।

ভারতে কোনও কোনও পর্যবেক্ষক মনে করছেন নরেন্দ্র মোদীর আমলে দিল্লি ও থিম্পুর মধ্যে সম্পর্কে যে সন্দেহের ছায়া পড়তে শুরু করেছে এই সিদ্ধান্ত তারই প্রতিফলন – যদিও সবাই আবার এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন।

এদিকে এই পটভূমিতেই ভুটানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে চীনও নীরবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বস্তুত সত্তর বছরেরও বেশি পুরনো ‘ফ্রেন্ডশিপ ট্রিটি’ বা মৈত্রী চুক্তি অনুযায়ী ভুটানের প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি ও বাণিজ্যে ভারতের প্রভাব দ্বিপাক্ষিকভাবেই স্বীকৃত।

আর সে কারণেই বিদেশি পর্যটকরা ভুটানে বেড়াতে গেলে রোজ যে অন্তত আড়াইশো ডলার বা আঠারো হাজার রুপি ফি দিতে হয়, তা থেকে অব্যাহতি ছিল ভারতীয়দের – সেই সঙ্গে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের নাগরিকদেরও।

কিন্তু ভুটান সরকার এই ছাড় তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আর গত সপ্তাহে দিল্লিতে এসে ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টান্ডি দোর্জি তা ভারত সরকারকে জানিয়েও গিয়েছেন।

সাবেক কংগ্রেসি মন্ত্রী ও কূটনীতিক মণিশঙ্কর আইয়ার বিবিসিকে বলছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদী তার প্রথম বিদেশ সফরে ভুটান গিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভুটানকে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ যেমন কমিয়ে দিয়েছিলেন, তেমনি সহায়তা পাওয়ার শর্তও অনেক কঠিন করে তুলেছিলেন।

মি আইয়ারের মতে, থিম্পু ও দিল্লির মধ্যে অস্বস্তির শুরু কিন্তু সেই থেকেই। তিনি জানাচ্ছেন, “ভুটান সরকার ও সে দেশের রাজা তখন ভাবলেশহীন নীরবতা বজায় রাখলেও সে দেশের সংবাদমাধ্যমে কিন্তু বেশ কিছু লেখা বেরিয়েছিল যে ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থাকলে এই জিনিসই হবে।”

“তারপর যখন নেপালের বিরুদ্ধে অবরোধেও ভারত প্রচ্ছন্ন মদত দিল, ভুটানও এটা দেখে প্রমাদ গুনেছিল যে উত্তরের প্রতিবেশীদের ওপর ভারত কীভাবে জোর খাটাতে পারে। কাজেই আমি অন্তত ভারতীয়দের ওপর চড়া পর্যটন ট্যাক্স চাপানোতে এতটুকুও বিস্মিত নই।”

মি আইয়ার আরও বলছিলেন, “মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আমাদের সম্পর্কে যে নানা সংঘাত দেখা দিচ্ছে, এটা আসলে তারই অবধারিত পরিণতি। আর তা ছাড়া ডোকলাম সঙ্কটের পর থেকে ভুটান এটাও কিছুতেই চাইছে না ভারত ও চীনের মতো দুই বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ তাদের একটা খেলার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করুক।”

চীন কানেকশন

চীন ও ভুটানের মধ্যে আজ পর্যন্ত কোনও ফর্মাল কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, ফলে দুই দেশের মধ্যে কোনও দূতাবাসও নেই। তবে সাম্প্রতিক অতীতে দিল্লিতে চীনা রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী থিম্পু গিয়ে ভুটানের রাজমাতার সঙ্গে দেখাও করে এসেছেন। আসলে ভুটানের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনে চীনের দিক থেকে আগ্রহের কোনও অভাব নেই, বলছিলেন দিল্লির ইনস্টিটিউট অব চাইনিজ স্টাডিজের ফেলো, অধ্যাপক শ্রীমতি চক্রবর্তী।

ড: চক্রবর্তীর কথায়, “চীন তো অবশ্যই চায় ভুটানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করতে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে ভারতের সঙ্গে ভুটানের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলে ভুটান হয়তো পিছিয়ে যাবে, এটা মাথায় রেখেই চীন এ ব্যাপারে একটু সাবধানে পা ফেলতে চায়। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে ভুটানের জনমত কতটা জোরালো, চীন সেটাও আগে ভালো করে বাজিয়ে দেখতে চায়। তবে আমার ধারণা এই ব্যাপারটা নিয়ে চীন এখনও পুরো নিশ্চিত নয়।”

“তবে ভুটানের আধুনিক প্রজন্ম অবশ্যই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী। ভুটানের তরুণরা মনে করে, চীন যেভাবে দ্রুত এগিয়ে চলেছে তাতে এই সম্পর্ক তৈরি হলেই লাভ”, বলছিলেন অধ্যাপক শ্রীমতি চক্রবর্তী।

ট্র্যাফিক জ্যাম, ব্যাঙের ছাতার মতো গেস্ট হাউস

তবে ভারতীয় পর্যটকদের ওপর ভুটানের ট্যাক্স চাপানোর সিদ্ধান্তে চীনা কোনও ‘অ্যাঙ্গল’ তো নয়ই, এমন কী ভারত-ভুটান সম্পর্কেরও কোনও প্রভাব আছে বলে মনে করেন না সাবেক ভারতীয় কূটনীতিবিদ ইন্দরপাল খোসলা।

মি খোসলা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “এটা তো সহজ অর্থনীতি – আর কোনও কিছুর সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। ওরা ‘গ্রিন ভুটান’ পলিসি নিয়েছে, যা ঢালাও পর্যটনকে উৎসাহ দেয় না। আমি যখন সাতের দশকে ভুটানে রাষ্ট্রদূত ছিলাম, গোটা থিম্পুতে মাত্র দুটো হোটেল আর গোটাছয়েক গাড়ি ছিল – ছিল না কোনও রেডলাইট ক্রসিং।”

“সেখানে আজকাল ট্র্যাফিক জ্যাম পর্যন্ত হচ্ছে, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়েছে হোটেল আর গেস্ট হাউস। ওরা এটাতে রাশ টানতে চাইলে আপনি কীভাবে ভুটানকে দোষ দেবেন? ফলে ভুটান ভারতের বিরুদ্ধে ঝুঁকছে, বিষয়টা এভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়”, বলছিলেন মি খোসলা।

ভুটানের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কূটনীতি থাকতেও পারে, আবার না-ও পারে। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ-মালদ্বীপ থেকে প্রতি বছর যে প্রায় দুলক্ষ পর্যটক সে দেশে যাচ্ছিলেন সেই সংখ্যায় যে এখন বিরাট ভাঁটা পড়বে তাতে অবশ্য বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

[প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন বিবিসি বাংলা’র দিল্লি সংবাদদাতা – শুভজ্যোতি ঘোষ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.