Home ওপেনিয়ন নাটকের আড়ালে খালেদা জিয়া!

নাটকের আড়ালে খালেদা জিয়া!

1

।। আসাদ পারভেজ ।।

পৃথিবীর আদি থেকে আজ অবধি নাটকীয়তার ঘাটতি নেই বললেই চলে। কখনও কখনও মহানায়কদের পরাজয় ঘটেছে নাটকের রচয়িতাদের সুকৌশলী মঞ্চায়নে। তবে জাহিলিয়াতের নাটকীয়তার বর্বরতাকে সততা, মেধা আর এক রবের সত্যবাণী প্রচারের মধ্য দিয়ে হার মানিয়েছেন নবি মুহাম্মদ সা.। তিঁনিই প্রথম বিশ্ব সভ্যতাকে করেছেন বিকশিত। কিন্তু আদর্শ আর হীনমন্যতার লড়াই আজও চলমান।

আদি আর মধ্যযুগ পেরিয়ে সভ্যতার শীর্ষ পর্যায়ে মানবজাতির অবস্থান কী না জানি না। কিন্তু দেশে দেশে রাষ্ট্রনায়কদের আজকের কর্মকা- স্পষ্টভাবে পৃথিবীর ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করছে। সকল তন্ত্রকে পেছনে রেখে গণতন্ত্রের আড়ালে স্বৈরতন্ত্র আজ সবচাইতে বিকশিত ও শক্তিশালী। পৃথিবীর বেশকিছু দেশ এই গণতন্ত্রের বাতায়নে বিশ্বদরবারে নিজেদের শির করেছে উন্নত। স্পষ্টবাদী স্বৈরতন্ত্র, রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র কিংবা ফ্যাসিবাদের চাইতে গণতন্ত্রের লুকায়িত শাসনব্যবস্থা রাষ্ট্রের অধিবাসীদের চরমভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।

বহুদেশে এমনটাই চলছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এমন শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে একজন শাসক প্রভাবশালী হয়ে উঠলেও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেন না। আর দীর্ঘস্থায়ী হতে গেলে সাম্রাজ্যের গায়ে ভেঙে পড়ার দাগ আঘাত হানে। ইতালির বেনিতো মুসোলিনি আর জার্মানির এডলফ হিটলারের কর্মকা- কে না জানে! আমাদের দেশ কোন যে অজানা পথে তা অনেকেই জানেন না। যা কোনোভাবেই দেশ ও জাতির জন্য সুখকর হতে পারে না। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে; দেশের সার্বিক অবস্থা যখনই চরম নাজুকের পথে ধাবিত হয়, তখনই বিশেষ যেকেনো একটা ঘটনার অবতারণা হয়। যা অনেকের কাছে পূর্ব মঞ্চায়িত নাটক মনে হয়। গত দশবছর দেশ ও দেশের বাইরে অবস্থিত প্রায় আঠার কোটি বাংলাদেশি নাগরিক এই নিয়ে দৃশ্যমান অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য নাটকের অবতারণার মধ্যে বর্তমান সময়ে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা-কারাবন্দি জীবন, ক্যাসিনোকাণ্ড ও পেঁয়াজ রহস্য একাকার হয়ে গেলো।

সমগ্র জাতি আজ ক্যাসিনোকাণ্ড আর পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে রঙ-তামাশায় ব্যস্ত। নামকরা বেশকিছু আওয়ামীপন্থি উদিয়মান নেতা তাস-জুয়া-মাদক ও নারী কেলেঙ্কারির মতো অপমানজনক কাজে জড়িয়ে পড়েছেন। যাতে নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। কে জানে তাদের কর্মকাণ্ডে কত জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

পেঁয়াজের বাজারে কোথাও চাহিদার সাথে জোগানের ঘাটতি নেই। এমতাবস্থায় অর্থনীতির ভাষায় মূল্যবৃদ্ধি হবার কথা নয়। তাহলে কেনো হচ্ছে এই মূল্যবৃদ্ধি? কেন দেশ প্রেম হারিয়ে যাচ্ছে? কেন ন্যায়ের পথে সমাজ গড়া সম্ভব হচ্ছে না। জাতির অধিকাংশ মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত?

বিএনপি’সহ ২০ দলীয় জোটভুক্ত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে আজ কোণঠাসা করে রেখেছে গণতন্ত্র নামধারী চলমান সরকার। এমন প্রভাবশালী সরকার কেনো দ্রব্যমূল্যের দাম নায্য সীমার মধ্যে রাখতে পারছে না? বাজার ও জনগণ নিয়ে গবেষণায় থাকা মানুষগুলোর সাথে আমার কিঞ্চিত মেধাও এ নিয়ে ভাবনায় পড়ে যায়।

দীর্ঘদিন থেকে জনমুখে শুনে আসছি, সরকার কোনো বৃহৎ কিছুকে আড়াল করতে নাকি মিডিয়া ও জনগণকে অন্যদিকে ডাইভার্ট করে ব্যাতিব্যস্ত রাখে। আমি অবশ্য তা বিশ্বাস করি না। তবে ইদানিংকালে সাম্রাজ্যবাদি দেশগুলো এমনটাই করে যাচ্ছে।

অফুরন্ত ভোগ-বিলাসের চিন্তা থেকে লোভ-লালসা দানা বেঁধেছে আমাদের মনে। যা থেকে সততা ও নৈতিকতাবোধের অবক্ষয়, অধ:পতন এবং মানুষে মানুষে বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা, সামজিক ও রাজনৈতিক অস্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার অভাব দীর্ঘদিন ধরে মস্তকে জেঁকে বসেছে।

সমাজ সংস্কারকরা সমাজ ও রাজনীতির মূল ব্যবস্থাকে অনৈতিক নব্যসামন্ততান্ত্রিক ধারা থেকে বের করে আনতে পারেননি। একই সঙ্গে সামাজিক চরিত্রের নৈতিক ও গণতান্ত্রিক উত্তরণও ঘটাতে পারেননি। এর বিপরীতে যাদের কাজ করার কথা তারা নিজেরাই লাইনচ্যুত।

দেশের স্থপতির কন্যার কাছে আমরা এমন মেধাশূন্য কাজ আশা করতে পারি না। যদিও বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের নেতা-কর্মীরা বলেন, এরা তো ভোটারবিহীন সরকার। আমি অবশ্য তা নিয়ে ভাবি না। আমার কথা হলো, সরকার তো সরকারই। এই সরকার স্বৈরতান্ত্রিক কিংবা অগণতান্ত্রিক যাই হোক না কেনো।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে যিনি বসে থাকবেন তার কাজ হলো- যা কিছু নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত এমন সবকিছুর হেফাজত করা। তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি- চলমান সরকার দেশকে জনবান্ধব করে তুলতে বেশকিছু আগাছা পরিষ্কার করে নিচ্ছেন; যা নিজ দলের অনেকের কাছে পছন্দনীয় না হলেও আমাদের কাছে গ্রহণীয়।

সরকার প্রধান ক্যাসিনো সম্রাটদের মুখোশ উন্মোচন করার কিছুটা সাহস দেখিয়েছেন। সাথে অনেক জনবান্ধব নেতারা যে রাতের অন্ধকারে কুকর্ম করেন, তা প্রকাশ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। মূল হোতাদের আটক করতে পারলে জনগণ এমন কাজের প্রসংশা অবশ্যই করবে। অতঃপর বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা পাচার, শেয়ার বাজার ধ্বংস, যুবক ও হলমার্ক কেলেঙ্কারী, নারী- শিশুর প্রতি নৃশংসতা, কিশোর গ্যাং, টর্চার সেল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ধোঁকাবাজি, মিথ্যাচার, নদী-জলাশয় দখল, শিক্ষার দুরবস্থা, স্বাস্থ্য খাতে অব্যস্থা, খাদ্যে ভেজাল, বৈষম্য, গুম-খুন-ধর্ষণ, প্রশ্নপত্রফাঁস থেকে শুরু করে অবৈধ সকল কাজে লিপ্তদের আইনের আওতায় আনবে বলে বিশ্বাস করি। এই ক্ষেত্রে অবৈধভাবে নির্বাচিতদের বাদ দিলেও জনগণ আপাতত মানবে।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, দিনের শেষে এই জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। তাই জনগণকে বারবার ঠকানো যাবে না। জনগণের সবচেয়ে ভালোবাসার জায়গায় আঘাত করে পৃথিবীর কোনো সম্রাট সাম্রাজ্য রক্ষা করতে পারেনি।

সরকারের কাছে অনুরোধ করব, কোটি জনতার নয়ন মণি বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে এমন কিছু করবেন না; যা দেশ-জাতি কিংবা আপনাদের জন্যও ভাল কিছু বয়ে আনবে না।

যে বাতাসের সাহায্যে জীবনের গতি সঞ্চালন হয়, সেই বাতাস থেকে কেন জানি আজ দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। আমার নিশ্বাস নিতে চরম কষ্ট হচ্ছে। এ তো আমার শুধু একার নয়, এ তো সকলের ক্ষতি করবে নির্দ্বিধায়। আমার অবচেতন মনে এমনটাই মনে হচ্ছে। আমি সমগ্র দেশের অপূরণীয় লোকসান মেনে নিতে পারি না। এই দেশ যে আমার ‘মায়ের’ মতো অবিকল।

আমি বিএনপি কিংবা খালেদা জিয়া বুঝি না। আমি বুঝি বেগম জিয়া একটি রাষ্ট্রের অপর নাম। তিনি তিন তিনবারের সাবেক সরকারপ্রধান। যার রয়েছে কোটি জনতার সমর্থন।

নাটকীয় কোনো সিনেমার আড়ালে তার যেন অস্বাভাবিক মৃত্যু না হয়। সাধারণ জনগণসহ মেধার ভাণ্ডার প্রচার মাধ্যমও আজ পেঁয়াজ কাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত। আমি বিশ্বাস করি এই সরকার স্বল্প সময়ের মধ্যে পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। দেশের প্রতিটি চলমান বাজারে এই খাদ্যদ্রব্যের প্রতিনিয়ত জোগান পাওয়া যাচ্ছে। তাই মূল্য বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। অতএব, বড় কোনো ক্ষতি হবার আগে আমাদের খবর নিতে হবে বেগম জিয়া কেমন আছেন। ইয়াসির আরাফাতের কথা নিশ্চয় জানি! জায়নবাদীরা কেমন করে স্লো পয়জন দিয়ে তাকে হত্যা করল।

দুর্নীতি ও নিরাপত্তা এই জাতির সবচাইতে বড় সমস্যা। তা দূরীকরণে সমস্যার শিকড় চিহ্নিত করতে হবে। যদিও দেরি হয়ে গেছে, তারপরও সমাধানের পথে হাঁটার প্রক্রিয়া বের করা জরুরি। না হয়, দেশের মধ্যে যে পরিমাণ পুকুর চুরি হচ্ছে, তা সাগর চুরিতে পরিণত হবে।

সরকারপ্রধান, আপনি তো বঙ্গবন্ধুর কন্যা। আপনার মনে ভালোবাসার ঘাটতি থাকার কথা নয়। মেধাহীন কোনো মানুষের কথা শুনে নিশ্চয় আপনি হৃদয়হীন হবেন না। বেগম জিয়ার মুক্তির পথ সুগম করে দিলে আপনার জনপ্রিয়তা বাড়বে কিন্তু কমবে না। তিনি গুরুতর অসুস্থ। তার কিছু হলে আপনি জাতি ও বিবেকের কাছে হেরে যাবেন। এতে করে আপনার বাবাও প্রশ্ন বৃদ্ধ হবেন। আপনার একটু চিন্তাশীল ভাবনা মমতাময়ী একজন মা সুচিকিৎসা পাবেন। একই সাথে জাতির ঘোরতর অন্ধকার কেটে যাবে, ইনশা আল্লাহ।

লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিকবিশ্লেষক।

[উম্মাহ ২৪ ডটকম-এর সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, উম্মাহ ২৪ ডটকম কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার উম্মাহ ২৪ ডটকম নিবে না।]

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.