Home সংবাদ পর্যালোচনা ভারত ও মিয়ানমারের উল্টো যাত্রা: ধর্মনিরপেক্ষতার মৃত্যু ও রোহিঙ্গা গণহত্যা

ভারত ও মিয়ানমারের উল্টো যাত্রা: ধর্মনিরপেক্ষতার মৃত্যু ও রোহিঙ্গা গণহত্যা

।। আসাদ পারভেজ ।।

স্বাধীন বাংলাদেশের বিস্তৃত সীমান্ত বঙ্গোপসাগার, ভারত আর মিয়ানমারের সাথে। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের বাধা তেমন ক্ষতি না করলেও ভারত-মিয়ানমার অলেখিতভাবে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে রাষ্ট্রের উন্নয়নে। এদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের রয়েছে অফূরন্ত কর্তৃত্ব। দীর্ঘদিন থেকে তারা আমাদের গণতন্ত্র চর্চার কাজে পরোক্ষভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে যাচ্ছে। অবশ্য তাদের গণতন্ত্র আজ প্রায় মৃত। বর্তমানের বিজেপি সরকার নিজেদের পরিচয়কে হিন্দুত্ববাদী দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ মনে করে। তারা রাষ্ট্রটিকেও হিন্দুত্ববাদী বানাতে একাট্টা।

আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নিয়ন্ত্রিত বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী মোদি। যিনি লাল কৃষ্ণ আদভানির উত্তরসুরি। ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মূল ইন্ধনদাতা ৬৮ জনের প্রধান হিসেবে এই লোকটি চিহ্নিত। অপরদিকে ২০০২ সালে ভারতের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা গুজরাট দাঙ্গার উগ্রবাদীতার জন্য মোদি মার্কিন মুল্লকে ছিলেন নিষিদ্ধ।

হিন্দু পুণ্যার্থীদের একটি ট্রেনে লাগা আগুনে ৬০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় মুসলমানদের মিথ্যা ও বানোয়াট অনুমানে জড়ানো হয়। মোদি তখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে উগ্রবাদী হিন্দুদের নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থাই করেননি। এতে করে মিথ্যা প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত হিন্দু জনতা গুজরাটের শহর ও গ্রামগুলোর মুসলিম জনবসতিতে তিন দিন ধরে তাণ্ডব চালায়। আহমদাবাদের গুলবার্গ আবাসিক এলাকা আক্রমণের প্রধান লক্ষবস্তু ছিল। সেখানে মুসলমানদের ঘরবাড়ি আগুনে ধ্বংস করা এবং বেশ কয়েকজনকে নিশংসভাবে পুড়িয়ে মারা হয়। যাদের মধ্যে অন্যতম কংগ্রেস দলীয় সাবেক এমপি ও সুপরিচিত রাজনৈতিক নেতা ইহসান জাফরিও ছিলেন। যিনি আক্রান্ত হওয়ার আগমূহূর্তে মুখ্যমন্ত্রী মোদিকে ফোন করেও কোনো সাহায্য পাননি।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং এর সহযোগী সংগঠনের কর্মীরা ১৯৯০ সালে আদভানির নেতৃত্বে এক হয়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের রথযাত্রায় নামে। তারা ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর ৬ তারিখে উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যাতে ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে। যার ফলে তৈরি হয় হিন্দু-মুসলিম চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। যে দাঙ্গায় দু’হাজারের অধিক মুসলমান নিহত হয়।

অবশ্য ১৮২২ সালে মসজিদটি নিয়ে হিন্দুরা প্রথমবার অভিযোগ তুলে। ১৮৫৫ সালে কিছুটা বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ১৮৫৯ সালে ঝামেলা এড়াতে ব্রিটিশরা ইবাদতের জন্য জায়গাটিকে দু’ভাগ করে। ১৯৪৯ পর্যন্ত বাকীসব ছিল ঠিক। এসময় হিন্দু মহাসভার সদস্যরা মসজিদের ভিতর গোপনে মূর্তি রাখলে উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়। এসুযোগে নব্যভারতীয় সরকার মসজিদের দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেয়। তখন থেকে আরএসএস কর্তৃপক্ষ চক্রান্তের বীজ শক্ত করতে থাকে। যা আজ অবধি চলছে।

২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাবরি মসজিদের ২.৭৭ একর জায়গায় রামলালা মন্দির নির্মাণের নির্দেশনা জারি করে। গণতান্ত্রিক অবস্থা কি পরিমাণ ভঙ্গুর হলে একটি দেশের সুপ্রিম কোর্ট এমন একটি বিতর্কৃত রায় দিতে পারে। আদালত নিজেই বলেছে, ১৯৪৯ সালে মসজিদের ভিতরে ভগবান রামলালার মূর্তিটি বসানো অবৈধ ছিল। একই সাথে বলেছে, ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৯ পর্যন্ত সেখানে নিয়মিত নামাজ পড়া হতো এবং ‘৯২ সালে মসজিদ ভাঙ্গা ছিল বে-আইনি। এছাড়া তারা এটাও বলছে, বাবরি মসজিদ কোনো ফাঁকা জমিতে হয়নি। তারপরেই বলছে, মসজিদের নিচে কোনো হিন্দু স্থাপত্যও যদি হতো, তাহলেও তা হিন্দুদের হয়ে যায় না। অপরদিকে বাবরি মসজিদের মূল স্থাপনায় কোনো মন্দিরও করা যাবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছে। আধুনিক পৃথিবীতে বিপরীত্য চিন্তার আলোকে এমন রায় বোধগম্য হতে পারে না।

হিন্দু শাস্ত্র মতে, মূর্তিতে দেবতার আবাহন ও প্রাণপ্রতিষ্ঠা ফেলেই পূজার যোগ্য হয়। অর্থাৎ মন্দিরে প্রাণপ্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত এবং মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠা না পাওয়া পর্যন্ত কোনো মূর্তি শুধুই মূর্তি। তাতে কোনো প্রাণ থাকে না। আদালতের স্বীকারোক্তিতে স্পষ্ট হয়েছে, মূর্তিটি জোর করে ও বে-আইনিভাবে বসানো হয়েছিল। হিন্দু ধর্মে বলা আছে, কোনো দেবতা অন্যের জমি জবর-দখল করতে পারবেন না। দেবতার নামে জবর-দখল করা জমির মালিকানা দেবতা দাবি করতে পারেন না। তাই জোর করে বসানো রামলালার র্মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা পায়নি। যা দোবত্বের পর্যায়েও উপনীত হয়নি। তাহলে, সেই মূর্তি কি দেবতার মর্যাদা পেতে পারে? যদি না পায়, তাহলে কেনো ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হলো? পবিত্র সেস্থানে কেনোইবা হিন্দু স্থাপনা হবে? অত:পর কেনো আদভানি ও মোদিদের বিচার হবে না?      

কাশ্মিরকে সুবিধা দেয়া বিশেষ আইন ৩৭০ এবং ৩৫-ক ধারা বাতিলের পূর্ব প্রস্তুতি নেয় মোদির সরকার। ফলে ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কাশ্মির। ভারতীয় সরকার সেখানে পূর্বের পাঁচ লক্ষের অধিক সেনাবহরের সাথে নতুন সেনা যোগ করে। আগস্টের ৫ তারিখ সোমবার ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ ধারাগুলো বাতিলের সুপারিশ করে।

সংবিধানের ৩৫-ক ধারা অনুযায়ী কাশ্মিরের বাসিন্দা নয়- এমন ভারতীয় কাশ্মিরের মাটিতে সম্পদের মালিক হওয়া ও চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ছিল। আর ৩৭০ ধারা রাজ্যটিকে আলাদা সংবিধান, পতাকার স্বাধীনতা দিয়েছে। তাছাড়া পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বাদে সবক্ষেত্রেই এ ধারা স্বাধীনতার মর্যাদা দিয়েছে রাজ্যটিকে।

মোদির সরকার এমন অন্যায় কাজ করতে গিয়ে রাজ্যে নেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সমপূর্ণ বন্ধসহ ১৪৪ ধারা জারি করে। সাবেক মূখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি, ওমর আবদুল্লাহ ও বিধায়ক সাজ্জাদ লোনকে গৃহবন্দি এবং সিপিএম নেতাইউসুপ তারিগামি, কংগ্রেস নেতা উসমান মজিদসহ ৫শতাধিক নেতাদেরকে আটক করে। বিশেষজ্ঞদের ধারণার, মোদি ও অমিত শাহ যেভাবে আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের হয়ে কাজ করে যাচ্ছে, এতে ফিলিস্তিন ও আরাকানের মুসলমানদের চাইতে খারাপ অবস্থা কাশ্মিরিদের হতে পারে।

সর্বশেষ বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার ২৭তম বার্ষিকীর ঠিক ২ দিন পর ৯ ডিসেম্বর অমুসলিম শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দিয়ে ভারতের লোকসভায় পাশ হলো বিতর্কৃত বিল। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে যেসব হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, পার্সি বা খ্রিস্টান ভারতে ২০১৪ সালের আগে এসেছে এবং ৭ বছর অবস্থান করছে, তাদের নাগরিকত্ব দেয়া হবে। এই আইনের মাধ্যমে বিজেপি দেখাতে চায় ভারত হিন্দুদের জন্য একটা স্থায়ী নিরাপদ আশ্রয়। যেভাবে ইসরাইল ইহুদিদের জন্য। আইনটি পাশের মাধ্যমে ভারতের নাগরিকত্বকে স্পষ্ট চরম সাম্প্রদায়িক ভিত্তির উপর নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে করে ভারত রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংবিধানের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।

বিপন্ন রোহিঙ্গা

একদা স্বাধীন আরাকানের ঐতিহাসিক মুসলিম মানুষগুলোকে রোহিঙ্গা বলা হয়। যারা বর্তমানে রাষ্ট্রবিহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। ইসলামি সভ্যতার ইতিহাস মোতাবেক এরা নবী মুহাম্মদ (সা.)এর আমলে কিংবা নিকটবর্তী সময়ে প্রথমবার ইসলামের ছায়াতলে আসে। বাঙ্গালিরা সম্রাট নরমিখলার (১৪৩০-৩৪) সময়ে আরাকানে স্থায়ী নিবাস করে। তাও সম্রাটের রাজ্য উদ্ধারের প্রতিদান হিসেবে।

সময় এই জাতিকে করেছে পরাজিত। ১৭৮৫ সালে বর্মিরা আরাকান দখল করে। সেসময় থেকে তারা নানাভাবে গণহত্যার শিকার হচ্ছে। উনিশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে একই পথে হাঁটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জাপানিজরা স্বল্প সময়ের জন্য আরাকান দখল করে এদের উপর নির্যাতন, ধর্ষণ ও গণহত্যা চালায়।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা এই অঞ্চল থেকে চলে গেলে পাকিস্তান, ভারত ও বার্মা স্বাধীনতা পায়। দুর্ভাগ্য নিয়ে এরা বার্মার অধীনে পরাধীন থাকতে হয়। কিন্তু তারা তা মেনে নেয়নি। এতে করে বার্মিজ সরকারের সাথে তাদের দুরত্ব বাড়তে থাকে। ১৯৬২ সালে জান্তা সরকার ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে তাদের ওপর নেমে আসে বর্বরতা। ১৯৭৮ ও ‘৯২ সালে চলে চরম সামরিক অভিযান। নিপীড়ন-নির্যাতন ও গণহত্যা থেকে বাঁচতে পাঁচ লাখের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

২০১২ সালে আরাকানে মুসলিম ও বৌদ্ধদের মাঝে দাঙ্গা বাঁধে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বার্মিজ সামরিক বাহিনী বিরল ও নিশংস এক নির্মম গণহত্যা চালায় জাতিটির ওপর। ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়। জাতিসংঘের নানা সংস্থার উদ্যোগে বার্মিজরা বাংলাদেশ থেকে ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি থেকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা যাওয়ার ব্যাপারে আটটি দাবি তোলে। যার মধ্যে প্রধানতম নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়া। কেননা, নাগরিকত্ব মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও বার্মিজ সরকার ১৯৮২ সালে তাদের সেই অধিকার কেড়ে নিয়েছে।

পশ্চিম আফ্রিকার ১৮ লক্ষ জনসংখ্যার ছোট্ট একটি দেশ গাম্বিয়া। ওআইসি ৫৭টি মুসলিম দেশের পক্ষে তাদেরকে বিশ্ব মানবতার কাজে লাগাচ্ছে। আর এই কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু। গত বছরের মে মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে তিনি গাম্বিয়ার নেতৃত্ব দেন। তার আগে রোহিঙ্গা সমস্যা নিজ চোখে দেখার জন্য তিনি কক্সবাজার গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সেসময় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছিল। তখন গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়, দ্বিপক্ষীয়ভাবে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না। তাই মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আদালতে নিতে হবে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রুয়ান্ডার গণহত্যার সঙে তিনি আরাকানে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতার মিল খুঁজে পাচ্ছেন।  

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ওআইসি’র পক্ষে গাম্বিয়া ১১ নভেম্বর ২০১৯-এ জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক আদালতে (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত) মামলা করে। গাম্বিয়া ও মিয়ানমার উভয় দেশই ১৯৪৮ সালে জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষর করেন। ১৯৯৩ সালে বসনিয়া হার্জেগোভিনিয়ায় গণহত্যার দায়ে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম মামলা হয়েছিল। পরিশেষে সুচি জাতিসংঘের বিচারিক আদালতে যেতে হল।

বিশ্ব শান্তির জন্য নোবেল বিজয়ী সুচিকে আইসিজে-এর ১৭ জন বিচারকের সামনে গণহত্যার অভিযোগে হাজির হতে হল। দৃশ্যটি অভাবনীয় হলেও সত্য। তার থেকে দু’হাত দূরে দাঁড়িয়ে বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু মানবতাবিরোধী নৃশংসতার অভিযোগগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিবেকের কালিমা মোচনে আর দেরি করা যাবে না।

বিষয়টি রোহিঙ্গা নামের মজলুম একটি জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার লাভের অধিকারের বিষয় নয়, এটি বিশ্বমানবতার মর্যাদা রক্ষার প্রধানতম প্রশ্ন। তামবাদুসহ আমরা আশা রাখি, সেনানিয়ন্ত্রিত মিয়ানমার বেশ শক্তিশালী হলেও বিশ্ব আদালতে রোহিঙ্গারা ন্যায় বিচার পাবে। তবে ভয় হল নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী দেশগুলোকে নিয়ে। কেননা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় চূড়ান্তভাবে কার্যকর হতে হলে তাদের পূর্ণ সমর্থন প্রয়োজন। কিন্তু দুর্ভাগ্য ও হতাশার বিষয় যে, চীন ও রাশিয়ার মত দেশ অপরাধী মিয়ানমারের পক্ষ নিয়ে বসে আছে।

জাতিসংঘ প্রথমদিকে এমন অপরাধের বিচার করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। অবশ্য সেসময় জাতিসংঘ মিয়ানমারের ব্যক্তিদের দোষী হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিষয়টিকে এথনিক ক্লিনজিং শুধু বলেছে। সুভাগ্য হল- আজকের দিনে জাতিসংঘ মিয়ানমারের কার্যক্রমকে গণহত্যা হয়েছে বলে স্পষ্টভাবে বলে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্র হিসেবে দেশটিকে অভিযুক্ত করেছে।

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের গণহত্যার অকাট্য প্রমাণ নানা স্বাধীন সংস্থার কাছে রয়েছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিকতার জন্য অবশ্যই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনগুলোর কাছে থাকা জরুরি। কিন্তু মিয়ানমার এমন কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঘটনার স্থলে যেতে দেয়নি। মামলা যেহেতু বিশ্ব আদালতে, তাই জাতিসংঘ সরেজমিন পরিদর্শন করতে পারবে। বিশ্ববিবেক আশা করে, জাতিসংঘ সরেজমিনে পরিদর্শন করবে।

এরই মধ্যে সুচি’র রুচি ও মানসিকতার পরিচয় বিশ্ববাসী জানতে পেরেছে। রোহিঙ্গাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে সুচি তার ফেসবুক পেইজে লিখেছেন, ‘সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর কেউ নোংরা বাঙালী মেয়েকে ছোঁবে না। ওরা আকষর্ণীয় নয়’।

অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন যে, তিনি নিজেও তো আকর্ষণহীন, কিন্তু উনার রুচিবোধ যে এমন তা অনেকেই জানতেন না। তার কথাই প্রমাণিত হয় যে, সেনাবাহিনীর যাবতীয় কাজে তার সমর্থন ছিল। শক্তির জোরেই সেনাবহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর জুলুম নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছে। তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছে, তদপুরি গণহত্যা চালিয়েছে।

বিশ্ব আজ নানা জটিলতায় আটকে আছে। বহু দেশ রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান এমন গণহত্যার বিরুদ্ধে অবগত হলেও, ভূরাজনীতি ও নিজেদের স্বার্থের কারণে কথা বলতে চাইবে না। আমরা আশা রাখি, বিশ্ব আজ সজাগ হবে, মানবতার পক্ষে জয় গান গাইতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াবে। এরই মধ্যে গাম্বিয়ার পক্ষে কানাডা ও নেদারল্যান্ড এসে গেছে। তামান দুনিয়ার সকল প্রতিহিংসাকে বেধ করে গাম্বিয়ার জয় হবেই। আর তাতে রোহিঙ্গা নামক নিরীহ মানুষগুলো জগত সংসারে মাথা তুলে বেঁচে থাকবে, যুগ যুগ ধরে। 

লেখক: গবেষক, গ্রন্থাকার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।