Home সংবাদ পর্যালোচনা কর্তৃত্ববাদী নিরাপত্তা রাজনীতির দিকে হাঁটছে শ্রীলঙ্কা

কর্তৃত্ববাদী নিরাপত্তা রাজনীতির দিকে হাঁটছে শ্রীলঙ্কা

বছরটির শুরু হয়েছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিঙ্গের মধ্যকার কয়েক দফা রাজনৈতিক দড়ি টানাটানির মধ্য দিয়ে। এর আগে অনেকটা অসাংবিধানিকভাবে বিক্রমাসিঙ্গেকে বরখাস্ত করে মহিন্দা রাজাপাকসাকে প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন সিরিসেনা। এসব নাটকীয় ঘটনা বছরের শেষ দিকে আরো কিছু রাজনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি করে এবং পরিণতিতে তথাকথিত ইয়াহাপালান্য (সুশাসন) জোট সরকারের পতন ঘটায়।

আর ২০১৯ সালের এপ্রিলে ধর্মীয়-উদ্দীপ্ত বোমা হামলা রাজনৈতিক সঙ্কট আরো তীব্র করে। ইস্টার হামলা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হওয়া এবং এরপরের ঘটনাবলী সামাল দিতে অব্যবস্থাপনা সুশাসনের কফিনে শেষ পেরেকটি মেরে দেয়। নভেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটাররা এসব ঘটনার জবাব দেয়, ক্ষমতায় ফিরে আসেন রাজাপাকসারা। তারা ৫২.২৫ ভাগ ভোট পান। সিংহলি বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রায় সব এলাকায় তারা জয়ী হন।

তবে ২০১৯ সালের রাজনৈতিক সঙ্কটটি তৈরী হয়েছে অনেক দিনে। ২০১৭ সালে নতুন সরকার চীনা ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়ে ৯৯ বছরের জন্য চীনের কাছে হাম্বানতোতা বন্দরটি হস্তান্তর করার ঘটনাটি একটি ইস্যুতে পরিণত হয়। বন্দরটি হস্তান্তরকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কগুলো অর্থনৈতিক প্রশ্নগুলোর মধ্যেই সীমিত ছিল না। বরং এটি সিরিসেনা ও বিক্রমাসিঙ্গের মধ্যে সীমাহীন বিরোধের সৃষ্টি করে। সিরিসেনা ছিলেন চীনের দিকে ঝুঁকে, আর বিক্রমাসিঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কার সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করার এবং ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষিপ্ত করার অভিযোগ আনেন।

সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেলেঙ্কারি। এটি বিক্রমাসিঙ্গেকে রাজনৈতিক স্পটলাইটে নিয়ে আসে। সিরিসেনার নির্দেশনায় গঠিত বন্ড কমিশন তদন্ত রাজনৈতিক ইতিহাস তৈরী করে। শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্টের তদন্ত কমিশন কোনো দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রীকে তলব করে।

১০ বিলিয়ন শ্রীলঙ্কার রুপির (প্রায় ৫৫ মিলিয়ন ডলার) ওই বন্ড কেলেঙ্কারি নিশ্চিতভাবেই সরকারের ওপর জনসাধারণের আস্থা শেষ করে দেয়। প্রধানমন্ত্রী যদিও বলেন যে তিনি নির্দোষ, কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের অনেকেই ক্ষমতাসীন ইউএনপির সাথে সংশ্লিষ্ট। এই কেলেঙ্কারির তদন্ত রাজাপাকসাদের দিকে জনগণের আস্থা ফেরাতে সহায়ক হয়। তারাও সুযোগটি লুফে নিতে দেরি করেননি। পরিণতিতে ২০১৮ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ২০১৯ সালের নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তারা জয়ী হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট’ (এসিএসএ) ও ‘স্টাটাস অব ফোর্সেস এগ্রিমেন্ট’ (এসওএফএ) নতুন আলোড়ন তোলে। রাজাপাকসার আমলে এসিএসএ সই হয়, ২০১৭ সালের আগস্টে নবায়ন করা হয়। কিন্তু ২০১৯ সালে নবায়নের শর্তাবলী কলম্বোতে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়ায়, জনগণের তোপের মুখে পড়ে সরকার।

চুক্তির নতুন শর্তাবলী চীন ও ভারত উভয়ের মধ্যে সংশয়ের সৃষ্টি করে। চীনপন্থী সিরিসেনা ও মার্কিনপন্থী বিক্রমাসিঙ্গের মধ্যে বিভাজন আরো বাড়ে। নবায়নের সময়টি বিক্রমাসিঙ্গের জন্য খারাপ বিবেচিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই লোকরঞ্জক প্রার্থী গোতাবায়া রাজাপাকসা তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনর সময় এই ইস্যুতে কৌশলগতভাবে নীরবতা অবলম্বন করেন।

গত বছরের রাজনৈতিক সঙ্কট ব্যাখ্যা করার সময় সিরিসেনা ও বিক্রমাসিঙ্গের মধ্যকার সম্পর্কে প্রকট হয়ে আত্মপ্রকাশ করা ‘প্রতিবেশীসুলভ বৈরিতার’ বিষয়টি অগ্রাহ্য করা যায় না। সিরিসেনা ও বিক্রমাসিঙ্গে উভয়েই দীর্ঘ দিন ধরে রাজনীতি করলেও ‘সুশাসন সরকারের’ আমলে তাদের রাজনৈতিক আচরণ তাদের রাজনৈতিক অপরিণতিবোধ, ছেলেমি ও ঔদ্ধত্যই প্রকাশ করেছে। তাদের অহংয়ের সঙ্ঘাত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একসাথে কাজ করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

ফলে ২০২০ সালে শ্রীলঙ্কা কোন দিকে যাবে বলে মনে হয়?

প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসা সুস্পষ্টভাবেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে জাতীয় নিরাপত্তা হবে তার এক নম্বর অগ্রাধিকার। তার নতুন নীতির প্রায় সবকিছুতেই ‘শৃঙ্খলা’ ও ‘সমৃদ্ধির’ কথা বলা হচ্ছে। তার দৃষ্টিভঙ্গি অগ্রগতির দিকে ও বিচক্ষণমূলক।

অর্থনৈতিক দিক থেকে রাজাপাকসা ‘নতুন সিঙ্গাপুর’ বানানোর পুরনো স্বপ্নের দিকে আবার নজর দিয়েছেন। আর এজন্য প্রয়োজন স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা। তবে এই কাজ করার জন্য প্রথমেই বলি হতে পারে বাক-স্বাধীনতা, নাগরিক স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক সুযোগ-সুবিধা। আবার ২০১৫ সালে সংবিধানে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছিল, সেগুলোও বাদ দেয়া হতে পারে। এর একটি প্রয়োজন হলো তিনি যাতে কোনো সমস্যা ছাড়াই ক্ষমতায় থাকতে পারেন।

আন্তর্জাতিকভাবে শ্রীলঙ্কা পাশ্চাত্য থেকে সরে যেতে পারে। রাজাপাকসা নির্বাচিত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে সুইজারল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার কূটনৈতিক বিরোধকে পাশ্চাত্যের প্রতি কলম্বোর অসহিষ্ণুতার প্রতীক বিবেচনা করা যেতে পারে। আবার ভারতের প্রতি ইতোমধ্যেই বন্ধুসুলভ আচরণ প্রদর্শিত হয়েছে। সেইসাথে চীনের সাথেও ভারসাম্যমূলক নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই দুই দেশের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে প্রয়োজন আরো বেশি রাজনৈতিক বিজ্ঞতা ও দক্ষতা। চীন ও ভারত উভয়েই শ্রীলঙ্কার জন্য আরো সহায়ক অংশীদার হতে পারে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য উভয় দেশকেই প্রয়োজন শ্রীলঙ্কার।

এই প্রেক্ষাপটে শ্রীলঙ্কা দৃশ্যত আরো কর্তৃত্ববাদী নিরাপত্তা রাজনীতির দিকে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। সহিংসতাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে নিয়ন্ত্রিত সরকার পরিচালিত হলে ভিন্নমত প্রকাশের গণতান্ত্রিক অধিকার ও দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর দীর্ঘ দিনের কষ্ট সমাধানের অবকাশ কমই থাকবে। সূত্র- ইস্ট এশিয়া ফোরাম।