Home অর্থনীতি বিশ্ববাজারে চাপের মুখে গার্মেন্ট খাত: প্রেক্ষিত চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের অবসান

বিশ্ববাজারে চাপের মুখে গার্মেন্ট খাত: প্রেক্ষিত চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের অবসান

- প্রতিকী ছবি।

জিয়াউল হক মিজান: চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে তৈরী পোশাকের রফতানি চিত্র এমনিতেই চরম হতাশাজনক। তার ওপর বাণিজ্যবিরোধ অবসানের লক্ষ্যে আমেরিকা-চীনের সাম্প্রতিক চুক্তি এ দেশের রফতানিকারকদের আরো চাপে ফেলতে যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের অনুমান।

তাদের আশঙ্কা, রাজনীতির পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই দেশের সমঝোতা বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি তৈরী পোশাক রফতানি করে। আর বিশ্বব্যাপী রফতানিকারকের তালিকায় চীনের অবস্থান সবার ওপরে। গত ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে তৈরী পোশাক রফতানি সারা বিশ্বে কমলেও যুক্তরাষ্ট্রে বেড়েছে। আমেরিকা-চীন সমঝোতার পর এ বাজার ধরে রাখতে পারাই এখন বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সমঝোতার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র যদি পোশাক আমদানির জন্য চীনের দিকে ঝোঁকে, তাতে বেকায়দায় পড়বে বাংলাদেশ।

ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) দেয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে এক বছর ধরে বাংলাদেশে মার্কিন ক্রয়াদেশ তুলনামূলক বেশি এসেছে। চলতি বছরের সাত মাস শেষে প্রবৃদ্ধি বেড়ে সাড়ে ১১ শতাংশ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ পাঁচ পোশাক রফতানিকারক দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বাংলাদেশের। শীর্ষে আছে ভিয়েতনাম, তাদের প্রবৃদ্ধি ১৩ শতাংশের মতো।

বাণিজ্যযুদ্ধ চললেও গত বছরের প্রথম ৭ মাসে চীনের পোশাক রফতানি ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। দেশটি রফতানি করেছে ১ হাজার ৪৪৬ কোটি ডলারের পোশাক। তাদের বাজার হিস্যা ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। চীনের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৮০ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করেছে ভিয়েতনাম। তাদের বাজার হিস্যা বর্তমানে ১৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে তৃতীয় সর্বোচ্চ পোশাক রফতানিকারক বাংলাদেশ। তারপর আছে ভারত ও ইন্দোনেশিয়া। বিশ্লেষকদের অনুমান, বাণিজ্যযুদ্ধ অবসানের ফলে চীনের হিস্যা বাড়বে এবং স্বাভাবিক কারণেই বাংলাদেশসহ অন্যদের কমবে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যবিরোধে বাক্যবাণে পরস্পরকে জর্জরিত করা, চরম উত্তেজনা কিংবা পিছু হটে যুদ্ধবিরতির নরম সুরÑ সব কিছুই দেখা গেছে। পরিস্থিতির বাস্তবতায় শেষ পর্যন্ত দুই দেশের নেতারা এই যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। চীনা নেতারা এই চুক্তিকে বলছেন উইন-উইন। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, চুক্তি মার্কিন অর্থনীতিতে পরিবর্তন ঘটাবে। সমঝোতার ফলে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়িয়ে ২০০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে নিয়ে যাবে, যা ২০১৭ সালের সমপরিমাণ হবে। কৃষিপণ্য আমদানি বাড়াবে ৩২ বিলিয়ন ডলার, শিল্পপণ্য আমদানি করবে ৭৮ বিলিয়ন ডলার, বিদ্যুৎ খাতে আমদানি ৫২ বিলিয়ন ডলার এবং সেবা খাতে চীন আমদানি করবে ৩৮ বিলিয়ন ডলার। প্রায় একই রকম আশ্বাস এসেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ থেকেও। চীনা পণ্য আমদানিতে শুল্ক পুনর্বিন্যাসের ঘোষণাও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বিশ্ববাজারে ১৯৩০ কোটি ২১ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ২০৪৯ কোটি ৯৮ লাখ ৭০ হাজার ডলারের পণ্য। অর্থাৎ গত অর্থবছরের প্রথমার্ধের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে রফতানি কমেছে ১১৯ কোটি ৭৭ লাখ ১০ হাজার ডলার বা ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রফতানির নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির যে ধারা শুরু হয়, প্রথমার্ধ শেষেও তা অব্যাহত আছে। এ জন্য তৈরী পোশাক শিল্প খাতের ব্যর্থতাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পোশাক রফতানি হয় ১৬০২ কোটি ৪০ লাখ ১০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ১৭০৮ কোটি ৪৯ লাখ ২০ হাজার ডলারের পোশাক। এ হিসাবে ছয় মাসে পোশাক রফতানি কমেছে ১০৬ কোটি ডলারের বেশি তথা ৬ দশমিক ২১ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এবং তৈরী পোশাক ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, আমরা ভেবেছিলাম চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। কিন্তু দেখলাম ব্যবসাগুলো ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এমনকি মিয়ানমার, পাকিস্তান ও ভারতে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ সুযোগটি আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। এখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সমঝোতার ফলে ভবিষ্যতে আরো বেশি প্রতিযোগিতায় পড়তে হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের প্রথম সমস্যা বন্দর। পণ্য খালাস করতে এখনো আমাদের ছয়-সাত দিন লাগে। কোনো সমস্যা সৃষ্টি হলে সময় লাগে আরো বেশি। আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পণ্য পৌঁছতে সময় লাগে।

তিনি বলেন, ক্রেতাদের কয়েকটি চাহিদা রয়েছে। প্রথমটি হলো গতি। অর্থাৎ কত দ্রুত পণ্যটি আমরা বাজারে পাঠাতে পারব। দ্বিতীয়ত, উদ্ভাবন। আমাদের পণ্য সস্তা এটাই অর্ডার পাওয়ার একমাত্র কারণ নয়; বরং কত দ্রুত সময়ের মধ্যে কত নতুন ধরনের পণ্য আমরা দিতে পারছি, তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। আগে যেমন ক্রেতারা চার মাস সময় নিয়ে অর্ডার দিত, এখন মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে পণ্য হস্তান্তরের অর্ডার দেয়। আমাদের মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনা ভীষণ দুর্বল মন্তব্য করে তিনি বলেন- শ্রীলঙ্কা, ভারত ও চীনের লোকেরা এখানে প্রতিনিধিত্ব করছে। একজন বাংলাদেশীর তুলনায় তাদের দুই থেকে তিন গুণ বেশি বেতন দিয়ে রাখতে হচ্ছে। কেননা আমরা এখনো ভালো ডিজাইনার তৈরি করতে পারিনি। প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন ভালো ইংরেজি বলতে পারে, এমন লোকের সংখ্যা কম। তাদের বেতন হিসেবে ৬ বিলিয়ন ডলার প্রতি বছর আমাদের দেশ থেকে চলে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য সমঝোতা বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ খবর নিয়ে আসতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, সমঝোতার কথা বাদ দিলেও বর্তমানে চীন মিয়ানমারে পণ্য পাঠাচ্ছে। আর মিয়ানমার পাঠাচ্ছে ভিয়েতনামে এবং ভিয়েতনাম সেগুলো বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করছে। এভাবে ভিয়েতনামের রফতানি বাড়ছে।

তিনি বলেন, এখন আমরা ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে আছি। গত মাস পর্যন্ত আমাদের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আমার কথা হলো, এটা কেউ খেয়াল করছেন না যে কোথায় গেছি। শিল্প পরিপক্ব হয়েছে। কিন্তু এটি সানসেট ইন্ডাস্ট্রি নয়। হ্যাঁ, আমাদের ডুয়াল কারেন্সির দরকার নেই। কিন্তু যে নামেই হোক, ফরেন এক্সচেঞ্জে অন্তত ৫ টাকা সাহায্য করতে হবে। ভারত ৫০ হাজার কোটি টাকা সাপোর্ট দিচ্ছে। আমরা কোথায় আছি? আমি বলব, তৈরী পোশাক শিল্প মরে যাচ্ছে। আমরা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না।

শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কার্যকর হওয়ার পর অনেক কারখানাই শ্রমিকদের বেতন দিতে পারছে না। আমাদের পোশাক শিল্পের যেভাবে নেগেটিভ গ্রোথ চলছে এবং যদি বসে যাই, তবে একটি সামাজিক অবক্ষয় হবে। এত নারী শ্রমিকের কী হবে? তাদের কোথায় চাকরি হবে? নারী শ্রমিকরা যদি রাস্তায় নামেন, তাহলে এর দায় কে নেবে? আমি মনে করি, আমাদের প্রয়োজন এমএমএফ-বেইজড টেক্সটাইল। কারণ, ২০২৭ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পরে অবস্থা খুবই খারাপ হবে। আমরা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বলছি, অথচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলা উচিত, আমাদের এক্সটেন্ডেড ইভিএ এনগেজমেন্টে যেতে হবে। আমি মনে করি, বাংলাদেশে নীতির স্থবিরতা আছে। কারণ, আমরা পড়াশোনা করি না। ধরেই নিয়েছি পড়াশোনা না করে, কোনো কিছু রিসার্চ না করে কথা বলা খুব সহজ।

পোশাক খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, রফতানিতে নেতিবাচক চিত্র উঠে আসার প্রধান কারণ ডলারের বিপরীতে টাকার অতি মূল্যায়ন। তারা জানান, প্রতিযোগী দেশগুলো ডলারের বিপরীতে নিজেদের মুদ্রা অবমূল্যায়ন করেছে। এর ফলে তাদের মূল্য সক্ষমতা বেড়েছে। এ কারণে অনেক ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে না এসে প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে। ক্রয়াদেশ ঘাটতিতে পণ্য রফতানি, বিশেষ করে তৈরী পোশাকের রফতানি কমছে। আগামী কয়েক মাসও ক্রয়াদেশ কম থাকবে আশঙ্কা প্রকাশ করে তারা বলেন, ক্রয়াদেশের ন্যায্য অংশ পাচ্ছে ভিয়েতনাম। এ ছাড়া পাকিস্তান এবং ভারতেও ক্রয়াদেশ সরে যাচ্ছে। সবগুলো দেশই এ খাতের রফতানিতে প্রণোদনা ও বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের দাবি, গত কয়েক বছরে শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে ৫১ শতাংশ। ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির বিল। বেড়েছে পরিবহন ব্যয়, সরকারের ভ্যাট-ট্যাক্স, পৌরকর এবং বন্দর খরচ। কিন্তু পণ্যের দাম সে তুলনায় বাড়েনি, উল্টো কমেছে। স্বাভাবিক কারণে কমেছে রফতানির পরিমাণও। অসম এবং অনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে রফতানি মূল্যও প্রতিনিয়ত কমছে। এসব কারণে রফতানি বাণিজ্যে ৮৪ শতাংশ অবদান রক্ষাকারী সম্ভাবনাময় তৈরী পোশাক শিল্প খাতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হয়ে প্রতিনিয়ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারখানা। গত পাঁচ বছরে বন্ধ হয়েছে অন্তত ১৩০০ কারখানা। বাড়ছে শ্রমিক ছাঁটাই ও অসন্তোষ। স্বল্পসংখ্যক বড় কারখানার কথা বাদ দিলে অধিকাংশ কারখানার জন্য কোনো সুসংবাদ নেই আগামী দিনের রফতানি আদেশে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮৫ শতাংশ আসছে তৈরী পোশাক শিল্প খাত থেকে। শিল্প খাতে কর্মস্থান হওয়া মোট শ্রমিকের দুই-তৃতীয়াংশ কাজ করছে এ খাতে। প্রিন্টিং, প্যাকেজিং, বোতাম, জিপার, লেবেল, ট্যাগ, কার্টুন থেকে শুরু করে শত শত শিল্পের সাফল্য নির্ভর করছে পোশাকের ওপর। পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা আছে বৃহদাকার তুলা, সুতা, টেক্সটাইল, ডায়িং, উইভিং প্রভৃতি শিল্পেরও। ব্যাংক, বীমা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও টিকে আছে তৈরী পোশাক শিল্পকে ঘিরে। সঙ্গত কারণেই এই শিল্পে কোনো সঙ্কট দেখা দিলে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় সংশ্লিষ্ট অগ্র ও পশ্চাৎ শিল্পগুলোয়। এতে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি। সূত্র- দৈনিক নয়াদিগন্ত।