Home প্রবন্ধ-নিবন্ধ রক্তার্জিত মাতৃভাষা: মৌখিক বন্দনা নয় কার্যকর মূল্যায়ন চাই

রক্তার্জিত মাতৃভাষা: মৌখিক বন্দনা নয় কার্যকর মূল্যায়ন চাই

।। মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমী ।।

বাংলা ১৩৫৯ সনের ৮ই ফাল্গুন। যা আজ ৪৪ বছর ধরে এদেশ মাতৃকায় একুশে ফেব্রুয়ারী নামে ‘ভাষা আন্দোলনের স্মারক’ হিসেবে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সাথে উদ্যাপিত হয়ে আসছে। এই মাতৃভাষার জন্য আজও তুরস্ক, বুলগেরিয়া ও মধ্য এশিয়ায় এবং ভারতের উত্তর প্রদেশে আন্দোলন হচ্ছে। কিন্তু ভাষার জন্য রক্তদান বা শহীদ হওয়ার ঘটনা শুধুমাত্র বাংলাদেশেই ঘটেছে। মায়ের ভাষা রক্ষার জন্য তৎকালিন পূর্ব বাংলার কৃতি সন্তানেরা দৃপ্ত শপথ নিয়ে নিজের শরীরের তাজা রক্ত দিয়ে তৎকালীন রক্তচক্ষু, কুটিল ভ্রুকুটি তুচ্ছ করে বুলেটের দাবানলের সামনে শীশাঢালা প্রাচীর তৈরি করতে গিয়ে নিজেদের তাজা রক্তের বিনিময়ে যে রক্তিম ইতিহাস গড়ে তুলেছিল, মানবেতিহাসে এর উদাহরণ দ্বিতীয়টি নেই।

ভাষা আন্দোলনের উদ্দেশ্য- ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভাষা ব্যবহার, তার সার্বিক উৎকর্ষ সাধন ও চর্চা করার অধিকার আদায়ের।

যদিও এ আন্দোলনের ইতিহাস অনেক অতীতকালের। কেননা, বৌদ্ধ যুগের পর বাহ্মণ্যবাদী সেন রাজারা বাংলা ভাষা চর্চা নিষিদ্ধ করেছিল। আর হিন্দু পুরোহিতরা প্রচার করত, যে বাংলায় কথা বলবে সে নরকে যাবে। তেমনিভাবে বৃটিশ ইংরেজরাও তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি এতদাঞ্চলে চাপিয়ে দেয়ার জন্য ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু বাঙ্গালী মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ নির্বিশেষে সকল ধর্মের বুদ্ধিজীবীরা সে নিষেধাজ্ঞা ও ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে বাংলা ভাষায় বিভিন্ন সাহিত্য রচনা করেছিল।

১৩৫০-১৮০০ সাল পর্যন্ত যুগটিকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মধ্যযুগ বলে চিহ্নিত করা হয়। এ সময় থেকেই বাংলা সাহিত্যের অনেক নিদর্শন পাওয়া যায়। আর তখনেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সমৃদ্ধি, শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। প্রথমে ইলিয়াস শাহী সুলতানের (১৩৫২-১৪১৪, ১৪৪২-১৪৮৭ খৃঃ) পৃষ্ঠপোষকতায় বিশেষ করে হুসাইন শাহীর আমলে (১৪৩৯-১৫৩৮ খৃঃ) বাংলা ভাষা ব্যাপক চর্চা ও প্রচার লাভ করে। সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অনেক শক্তিশালী হয়।

মাহমুদ শাহী রাজবংশের শাসনকর্তা শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহের আমলে (১৪৭৪-৮০খৃঃ) জয়েন উদ্দীনের ‘রাসূল বিদায়’ কাব্য প্রণীত হয়। ইসলামী ভাবধারায় জয়েন উদ্দীন অতি স্মরণীয় নাম। এছাড়াও দ্বিতীয় ফিরোজ শাহের আমলে চট্টগ্রাম সাতকানিয়ার কবি আফজাল এর নসিহত নামা কাব্য রচিত হয়। এভাবেই যুগে যুগে বাংলা সাহিত্য চর্চা হয়ে আসছে। অতঃপর মধ্যযুগের মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম কবি সাহিত্যিকগণের প্রচেষ্টায় বহু আরবী, ফার্সিশব্দ বাংলাভাষার শব্দ ভান্ডার এবং ইসলামী ভাবধারার সাহিত্য ভান্ডার সমৃদ্ধশালী করে তোলে। এখানে একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, তখন কোন গদ্য সাহিত্য ছিল না, সবই ছিল কাব্য ও পুঁথি সাহিত্য।

পঞ্চদশ শতাব্দীতে শাহ মুহাম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ জুলেখা’, জৈনুদ্দীনের ‘রাসূল বিজয়’, মোজাম্মেল হকের ‘নীতিশাস্ত্র’, ষোড়শ শতাব্দীতে সাররিদের ‘বিদ্যা সুন্দর’, ‘ভোনাগাজী’, ‘সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামান’, দৌলত উজিরের ‘লাইলী মজনু’ কবিদের মধুমালতী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকান রাজসভায় মুসলমান কবি সাহিত্যিকগণ অনুবাদ, জীবনীগ্রন্থ ও দোভাষী পুঁথি সাহিত্য রচনা শুরু করেন। কারবালার যুদ্ধ, আমীর হামজার যুদ্ধ, হনুফার লড়াই, জয়গুন বিবি, হাতেম তাঈর কিচ্ছা, শিরি ফরহাদের করুণ প্রণয় কাহিনী ইত্যাদি এগুলো মুসলিম সাহিত্য হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে। পুঁথি সাহিত্যে গাজী কালু, চম্পাবতী, ইসমাঈল গাজী, গোরাচাদ পীর, শাহজালাল পীর, ভেলুয়া সুন্দরী, দেওয়ানা মদীনা ইত্যাদি ছিল আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাহিত্য। গ্রামে-গঞ্জে রাত জেগে এখনো মানুষ এগুলো পাঠ করে।

সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকানের মুসলমানদের প্রভাবকালে সেখানকার রাজদরবারের বাঙ্গালী কবিদের মাধ্যমে বাংলাভাষা ও সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। ১৮০০ শতকে রংপুরের হায়াত মাহমুদ ‘জঙ্গনামা, চিত্ত উত্থান, হিতজ্ঞাবানী, আম্বিয়া বানী’ লিখে খ্যাতি লাভ করে। অষ্টদশ শতকে আলীরাজার ‘জ্ঞানসাগর, যুগকলন্দর, মাহমুদ মুকিমের ‘গোলে বাকওয়ালী’ সৈয়দ নুরুদ্দীনের দাকায়েক, মুসার সওয়াল, বায়তুল কুলুব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সুতরাং এভাবেই বাংলাভাষা চরম উৎকর্ষ (তথ্য ও বস্তুনিষ্ঠতার মাপকাঠিতে যদিও এসব পুঁথি-সাহিত্য গ্রহণযোগ্য নয়) লাভ করে। আর এ উৎকর্ষতা সমানভাবে অব্যাহত থাকে ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে পলাশীর বিপর্যয় পর্যন্ত।

১৭৫৭ এর পরই শুরু হয় ভাষার উপর নতুন ষড়যন্ত্র। ১৮০০ খৃষ্টাব্দে খৃষ্টানদের দ্বারা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলা ভাষার চেহারা পাল্টিয়ে দিয়ে দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার শুরু করে মানুষকে ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ইংরেজদের চক্রান্তের কথা বুঝতে পেরে মীর মোশাররফ হোসেন, মুন্সী মুহাম্মদ মেহেরুল্লাহ, সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী, মোজাম্মেল হক, ডাঃ লুৎফর রহমান, কায়কোবাদ, গোলাম মোস্তফা প্রমূখ ব্যক্তিবর্গ আবারো ইসলামী সাহিত্য রচনায় হাত দেয়। অবশ্য তখন মুসলমানদের চরম দুর্দিন চলছিল।

অতঃপর ১৯৫২ সালে বাংলার দামাল ছেলেরা বিভিন্ন ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে মাতৃভাষার বিজয় পতাকা ছিনিয়ে আনে। এ বিজয় অর্জন করতে গিয়ে বিলিয়ে দেয় নিজের শরীরের তাজা রক্ত। তাদের রক্তের বদলায় সুদীর্ঘ সংগ্রাম পথ-পরিক্রমার মাইলফলক তথা জাতীয় স্মারক দিবস হিসেবে ভাস্কর করে রেখেছে সেই স্মরণীয় ৮ই ফাল্গুনকে।

সে রক্তাক্ত পটভূমীতে এমন একটা মহৎ সৃজনশীল আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন হলো এ জাতীর সুগভীর আত্মপ্রত্যয় ও মৃত্যুঞ্জয়ী নব চেতনার, যা আজো জাতির হৃদয়ে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। এ চেতনার কারণেই রচিত হয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এর পথ ধরে অর্জিত হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আঁকা হলো বাংলাদেশ নামে একটি মানচিত্র পৃথিবীর বুকে। বাঙ্গালী জাতি পেল এক নতুন পতাকা। বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল সে অকুতোভয় শহীদ সন্তানদের আন্তরিক মনো বাসনা।

একুশের মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে বাংলাভাষাকে রাষ্টভাষা হিসেবে স্কীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, বাঙ্গালীর বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সেই মাতৃভাষা আজ অনেকাংশে উপেক্ষিত, চরমভাবে অবহেলিত। সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যিকগণের পদোন্নতি হচ্ছে না, হচ্ছে ইংরেজী লেকচারারদের। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও তা থেকে মুক্ত নয়।

এ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে পিতা-মাতারা তাদের আদরের সোনামণিদের ভবিষ্যৎ উন্নতির কথা চিন্তা করে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াচ্ছেন। আর তাই তো বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠেছে ইংলিশ মিডিয়াম ক্যাডেট স্কুল, চিলড্রেন কিন্ডার গার্টেনসহ নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একদল আলেমও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে না থেকে গড়ে তুলেছেন দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে কিছু এ্যরাবিক ও ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, বাংলাভাষা যেন প্রাণহীন। বাংলাভাষা শিখার কোন সরকারী বা ব্যক্তিগত পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করা যায় না, যা আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সুতরাং মাতৃভাষার সমৃদ্ধিকল্পে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত অপরিহার্য, সময়ের দাবী। অন্যথায় দেখা যাবে, আমরা বাংলা ভাষা থেকে অনেক দূরে সরে পড়েছি।

তাই আসুন, কেবল মাতৃভাষার মৌখিক বন্দনা না গেয়ে বাংলা ভাষার উন্নতিকল্পে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করি।

লেখকঃ মুহাদ্দিস- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ঢাকা, খতীব- তিস্তা গেট জামে মসজিদ টঙ্গী, গাজীপুর, উপদেষ্টা- উম্মাহ ২৪ ডটকম এবং কেন্দ্রীয় অর্থসম্পাদক- জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। ই-মেইল- [email protected]