Home ওপেনিয়ন আফগানিস্তান: রক্তপাত পেরিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনো বহু দূরের স্বপ্ন

আফগানিস্তান: রক্তপাত পেরিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনো বহু দূরের স্বপ্ন

0

।। শেখ ওমর শরীফ ।।

আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় নানগারহার প্রদেশে গত শনিবার (৮ ফেব্রুয়ারী) এক সংঘর্ষে অন্তত পাঁচ মার্কিন সেনা ও ছয় আফগান সেনা নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় তালেবান সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ঘটনার কারণ যেটাই হোক, আফগানিস্তানে আরও অন্তত পাঁচজন মার্কিন সেনার মৃত্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর আফগান যুদ্ধ সমাপ্তির চাপ আরও বাড়বে। গত বুধবারের বার্ষিক স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে ফের নিজের আগ্রহ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘কখনোই শেষ হবে না এমন’ লড়াইয়ে জড়িয়ে ‘কয়েক লাখ মানুষকে’ হত্যার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই। এ সময় তিনি আফগান তালেবানের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদের চলমান আলোচনায় নিজের সমর্থনের কথাও জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের শান্তি আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। ছবি- সংগৃহীত।

তালেবান শাসনের বিরুদ্ধে ২০০১ সালে শুরু হওয়া আফগানিস্তানের যুদ্ধ ইতিমধ্যে মার্কিন ইতিহাসের দীর্ঘতম যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। আল-কায়েদা ও তালেবানদের পতন হলেও আফগান যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, বরং ১৯ বছর পরও হামলা-পাল্টা হামলা এবং হতাহতের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। আফগান যুদ্ধ শুরু করেছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশ, পরে বারাক ওবামা এসেও যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন, এখন ডেনাল্ড ট্রাম্পও যুদ্ধ শেষ করতে পারেননি। বরং তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আফগানিস্তানে বোমা ফেলার সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছে মার্কিন সেনারা।

গত সপ্তাহে প্রকাশিত মার্কিন বিমানবাহিনীর প্রতিবেদন বলছে, আফগানিস্তানের মাটিতে গত ১০ বছরের মধ্যে ২০১৯ সালেই সবচেয়ে বেশি বোমা ফেলা হয়েছে। গত বছরে দেশটিতে ৭ হাজার ৪২৩টি বোমা ফেলেছে মার্কিন বাহিনী। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৩৬২।

জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো মার্কিন-আফগান বাহিনীর বিমান হামলায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় বহুবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিংঘের হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানে ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রসহ সরকারি বাহিনীর হামলায় অন্তত ৭১৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশ বেশি।

বহির্বিশ্বে মার্কিন যুদ্ধগুলো বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় বসেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘ প্রলম্বিত আফগান যুদ্ধ বন্ধে কিছু উদ্যোগও তিনি নিয়েছেন। যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের জুন থেকে কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করে তালেবান। তালেবানের সঙ্গে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ১১ দফা বৈঠকে বসেছে। কিন্তু এসব বৈঠক থেকে উল্লেখ করার মতো কোনো ফল বয়ে আসেনি। গত মাসের শেষ সপ্তাহে আফগানিস্তানের গজনি প্রদেশে একটি মার্কিন সামরিক বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানদের মধ্যে আলোচনা স্থগিত করা হয়।

আফগান রনাঙ্গনে তালেবান যোদ্ধা। – ফাইল ছবি।

আলোচনা স্থগিত হওয়ার পর তালেবানকে সহিংসতা কমানোর সুস্পষ্ট প্রমাণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে উজবেকিস্তানে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে তালেবানকে সহিংসতা কমানোর সুস্পষ্ট প্রমাণ দিতে হবে। চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তা শান্তি আলোচনার দিকে এগিয়ে যাবে এবং দেশটি থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরদিন তালেবান অভিযোগ করে, যুদ্ধ অবসানে সেনা প্রত্যাহারসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হতে দিচ্ছে না বলে ওয়াশিংটন। তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এক টুইট বার্তায় জানিয়েছেন, আফগান সমস্যা নিরসনে তালেবানেরও সদিচ্ছা ও ক্ষমতাও রয়েছে। শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়াটি ট্রাম্পের টুইট দ্বারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে অসংখ্য দাবি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

মার্কিন সরকার ও তালেবানদের মধ্যে যত দাবি-পাল্টা দাবিই থাকুক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে ‘কখনোই শেষ হবে না এমন’ একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের লাশ বানানোর মতো রাজনৈতিক অবস্থানে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মুহূর্তে নেই। নইলে আফগানিস্তান কিংবা ইরাকে ‘কয়েক লাখ মানুষকে’ হত্যার ব্যাপারে ট্রাম্প কিংবা কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টই অনাগ্রহী হতেন না। অন্তত ইতিহাস সেটাই বলে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আগামী নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে কিছু সৈন্য হলেও ফিরিয়ে আনতে মরিয়া। তা ছাড়া আফগান যুদ্ধকে আরও প্রলম্বিত করে সেখানে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে পড়তে চায় না মার্কিন প্রশাসন।

– ফাইল ছবি।

আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মানজনক প্রস্থান এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখরক্ষা—উভয়টির জন্যই আফগানিস্তান থেকে কিছু মার্কিন সেনা প্রত্যাহার জরুরি। আফগানিস্তানের মার্কিন অনুগত প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানিও দুই সপ্তাহ আগে সুইজারল্যান্ডে জানিয়েছেন, আফগানিস্তান থেকে ‘বড় আকারে’ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের জন্য তার দেশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

আফগান তালেবানরা অবশ্য আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার চায়। ইরানও বলেছে, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং দেশটিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ বন্ধ হলে দেশটিতে দ্রুত শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

যদিও নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে ট্রাম্প হয়তো শিগগিরই কিছু [যেমন ৪/৫ হাজার বড় জোর] সেনা আফগানিস্তান থেকে দেশে ফিরিয়ে আনবেন, কিন্তু এটাও সত্য যে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সেনা কোনো অবস্থাতেই প্রত্যাহার করবে না মার্কিন প্রশাসন। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের অবস্থানের ভূরাজনৈতিক ও যুদ্ধকৌশলগত সীমাহীন গুরুত্বের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ফ্যাক্টরি কখনোই আপসে আফগানিস্তান পুরোপুরি ত্যাগ করবে না। সুতরাং আফগানিস্তানে যুদ্ধ, রক্তপাত পেরিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা এখনো বহু দূরের স্বপ্ন।

– শেখ ওমর শরীফ, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.