Home নির্বাচিত সংবাদ ভারত-পাকিস্তান পারমাণবিক যুদ্ধে পৃথিবীর কোন জায়গা নিরাপদ থাকবে না

ভারত-পাকিস্তান পারমাণবিক যুদ্ধে পৃথিবীর কোন জায়গা নিরাপদ থাকবে না

0

উম্মাহ অনলাইন: ২০১৯ সালের ২৬ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি ভারত ও পাকিস্তানের জঙ্গিবিমানগুলো একে অন্যের ভূখণ্ডে হামলা চালায়। পাকিস্তান সে সময় ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, তারা ন্যাশনাল কমাণ্ড অথরিটির বৈঠক করছে, যে প্রতিষ্ঠানটি পারমাণবিক হামলার অনুমোদন দেয়।

১৯৪৭ সালের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে শত্রুতামূলক সম্পর্ক চলে আসছে। দুই দেশের কাছেই পারমাণবিক ওয়্যারহেড রয়েছে, সেগুলো স্থল, বিমান বা সাগর থেকে নিক্ষেপ করা যায়।

কিছু ভাষ্যকার বোকার মতো বলেছেন যে, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ‘সীমিত মাত্রার পারমাণবিক যুদ্ধ’ হলে সেটা হবে ওই দুই দেশের সমস্যা। পূর্ণমাত্রায় কোন পারমাণবিক যুদ্ধ কখনও হয়নি বলে মানুষ এ ধরনের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি অনুমান করতে পারে না।

সেখানে এই ধরনের পর্যবেক্ষণ মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ এবং স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন। আসলে, বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে বিষয়টি নিয়ে যেখানে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ১০ দিনের সীমিত যুদ্ধ হলে তারা যদি ১৫ কিলোটনের পঞ্চাশটি বোমা ব্যবহার করে, তাহলে এর পরিণতি কি হবে।

তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ধরনের যুদ্ধের প্রভাব কখনও ‘সীমিত’ থাকবে না, সেটা সারা বিশ্বের মানুষের উপর প্রভাব ফেলবে এবং মানচিত্রে কাশ্মীরকে খুঁজে পাওয়াটাই হবে কঠিন।

২০১৪ সালের এক গবেষণা দেখা গেছে যে, বোমা বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্টি আগুন, বায়ুচাপ, রেডিয়েশান মিলিয়ে বিশ মিলিয়নের বেশি মানুষ মারা যাবে। এর আগের এক গবেষণা বলা হয়েছিল ১৫ কিলোটনের একশটি বোমা বিস্ফোরিত হলে ভারতে ২৬ মিলিয়ন এবং পাকিস্তানে আট মিলিয়ন মানুষ মারা যাবে। সেই সাথে ১০০ কিলোটনের ওয়্যারহেড ব্যবহার করা হলে অতিরিক্ত চাপে শক্তিশালী অবকাঠামোও গুড়িয়ে যাবে এবং নিহতের হার চারগুণ বাড়বে।

ভারতের পারমাণবিক বোমাবাহী ব্রাহ্মস ও আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র। -ফাইল ছবি।

শরণার্থী প্রবাহ

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের কারণে ৫.৬ মিলিয়ন শরণার্থী দেশ ছেড়েছে। ইউরোপের যে সব দেশে তারা প্রবেশ করেছে, সে দেশগুলো তুলনামূলক স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধশালী হওয়ার পরও এ সব দেশে শরণার্থীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক জনমত তৈরি হয়েছে এবং দেশগুলোর সরকার চাপে আছে।

এখন ভারত-পাকিস্তানের পারমাণবিক যুদ্ধ হলে সেখানে শরণার্থী প্রবাহের কথা ভাবুন, যেখানকার জনসংখ্যা প্রায় ১.৫ বিলিয়ন। পারমাণবিক বোমা হামলা হলে শহরের বাসিন্দারা ক্ষতি এড়াতে গ্রামের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করবে। ধনী ব্যক্তিরা সম্পদ ব্যায় করে বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করবে।

বোমা ফেলা হলে পাকিস্তানের নাগরিকরা আফগানিস্তান ও ইরানে যাওয়ার চেষ্টা করবে, আর ভারতের নাগরিকরা নেপাল আর বাংলাদেশে যাবে। এই গরিব দেশগুলো বিপুল সংখ্যক শরণার্থীদের সাহায্য করতে পারবে না।

কিছু মানুষ সাগরপথে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং আরব উপসাগরের দিকে যেতে চেষ্টা করবে। নিশ্চিতভাবে বহু মানুষ এ সময় ডুবে প্রাণ হারাবে। বহু আঞ্চলিক সরকার তাদেরকে ফিরিয়ে দেবে, কারণ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এবং মিয়ানমারে সঙ্ঘাতের কারণে তাদের আগে থেকেই বহু শরণার্থী বহন করতে হচ্ছে।

বিপর্যয়

রেডিওঅ্যাকটিভ বিপর্যয়ও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, চেরনোবিল বিস্ফোরণের বিপর্যয় পশ্চিম দিকে পশ্চিম ইউরোপের ইউক্রেন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। সাড়ে ছয় লাখ মানুষ এই বিপর্যয়ের কবলে পড়েছিল এবং ৭৭,০০০ বর্গমাইল জায়গা দুষিত হয়ে পড়েছিল। দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা কয়েক দশক ধরে বজায় থাকবে। ভারত আর পাকিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিশেষভাবে এর প্রভাব পড়বে, এবং এ ধরনের বিপর্যয় মোকাবেলার মতো স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো অধিকাংশ দেশেরই নেই।

ক্ষেপণাস্ত্র অস্ত্রে পাকিস্তানকে সুসজ্জিত দেশ বলে থাকেন অনেকে।

পারমাণবিক শীত

২০০৮ ও ২০১৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে যে, যদি পনেরো কিলোটনের একশটি বোমা ব্যবহার করা হয়, তাহলে বায়ুমন্ডলে পাচ মিলিয়ন টন কণা ছড়িয়ে পড়বে, সেগুলো সারা বিশ্বে ছড়াবে এবং ২৫ বছরের জন্য বিশ্বের আবহাওয়ার ধরন পাল্টে দেবে।

এই কনাগুলো সূর্যতাপ ঠেকিয়ে দেবে। পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ে ২.৭ ডিগ্রি কমে যাবে। বিভিন্ন মওসুমের দৈর্ঘ দশ থেকে চল্লিশ দিন পর্যন্ত কমে যাবে। কানাডিয়ান গমের কিছু শস্য উৎপাদন করা যাবে না। বিশ্বের শস্য উৎপাদন হ্রাস পাবে, ফলে মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দুর্ভিক্ষ নেমে আসবে।

পারমাণবিক কনা ওজন স্তরের ক্ষতি করবে। ফলে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি আবহাওয়ামণ্ডলে প্রবেশ করবে। আরও বেশি ত্বকের রোগ ও ক্যান্সার হবে। সংবেদনশীল গাছপালা ও জলজ জীবজগৎ ধ্বংস হয়ে যাবে এবং মাছের উৎপাদন হ্রাস পাবে।

বৈশ্বিক মন্দা

উপরের যে কোন একটি বিষয়টি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। সবগুলো একসাথে মিলে মন্দার আকার হবে বিশাল।

ভারত ও পাকিস্তানের মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের এক পঞ্চমাংশেরও বেশি। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও এখানে বিশাল। এখানকার প্রধান শহরগুলো আক্রান্ত হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিপুলভাবে ব্যাহত হবে। ভোক্তা কমে যাবে, দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে উন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোও একইভাবে আক্রান্ত হবে।

সব মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায় এমনকি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যদি ‘সীমিত’ মাত্রার পারমাণবিক যুদ্ধও হয়, সেটা বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে আক্রান্ত করবে – তা তিনি নেব্রাস্কার স্কুল শিক্ষক হোন, শাংজি প্রদেশের কারখানা শ্রমিক হোন বা মোম্বাসার জেলে হোন। সূত্র- এসএএম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.