Home লাইফ স্টাইল ‘আদর্শ পরিবার ও সমাজ গঠনে পিতা-মাতার ভূমিকা’ – মুফতী মুনির হোসাইন কাসেমী

‘আদর্শ পরিবার ও সমাজ গঠনে পিতা-মাতার ভূমিকা’ – মুফতী মুনির হোসাইন কাসেমী

2
মুফতি মুনির হোসাইন কাসেমী
মুফতি মুনির হোসাইন কাসেমী

সমগ্র পৃথিবী আজ অশান্ত; শান্তি নেই কোথাও। মানুষ মাত্রই শান্তিকামী। শান্তির অন্বেষায় দিকবিদিক সে ছুটছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত। কিন্তু শান্তি নামের সোনার হরিণটা শুধু দূর থেকে দূরে ছুটে পালাচ্ছে। আর অশান্তি তার নিত্যসহচর হচ্ছে। কিন্তু কেন এই অশান্তি?

আল্লাহ্ তাআলা অশান্তি দেওয়ার লক্ষ্যে মানুষকে তৈরী করেননি। প্রকৃত পক্ষে মানুষ নিজের অশান্তির জন্য নিজেই দায়ী। অসৎকাজে লিপ্ত হয়ে মানুষ নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, মানুষ অসৎ হয় কেন? অসৎ অবস্থায় কেউ তো জন্মগ্রহণ করে না। তাই তো হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- “প্রত্যেক মানুষ ফিতরাতের (দ্বীনের) উপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী-খ্রীস্টান, অগ্নিপূজক বানায়”। (মিশকাত শরীফ- ২১ পৃষ্ঠা)।

প্রত্যেকেই নিষ্পাপ অবস্থায় দুনিয়ায় আগমন করে। ধীরে ধীরে সে বড় হয় এবং মাতা-পিতা ও পরিবেশ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। তাই একজন আদর্শ মানুষ গঠনে পিতা-মাতার ভূমিকা ও দায়িত্ব অপরিসীম।

এই ভূমিকা শুরু হয় সন্তান মায়ের পেটে আসার আগেই। পিতা-মাতার চিন্তাধারার এক বিরাট প্রভাব পড়ে সন্তানের ভবিষ্যত জীবনের উপর। পিতা-মাতা যদি সর্বদা এই চিন্তায় থাকেন যে, আমাদের অনাগত সন্তান যেন দ্বীনদার হয়, আদর্শ মানুষ হয় এবং তারা সর্বদা এ জন্য আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করেন, তাহলে সন্তান জন্মের পর যদি পিতা-মাতা মারাও যান, তবুও তাঁদের সদ্ভাবনা ও দোয়ার উসীলায় আল্লাহ্ তাঁদের সন্তানকে নেককার করেন। স্বামী-স্ত্রী মিলনের পূর্বে যদি নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়ে নেন, তাহলে সেই মিলনে গর্ভজাত সন্তানকে আল্লাহ তাআলা শয়তানের হাত থেকে হিফাযতে রাখেন।

দোয়াটি এই- “বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিব্নাশ্ শাইত্বানা ওয়া জান্নিবিশ্ শাইত্বানা মা রাযাক্বতানা”। অর্থাৎ- আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি; হে আল্লাহ্! শয়তান থেকে আমাদেরকেও রক্ষা করুন এবং আমাদেরকে যে সন্তান দান করবেন তাকেও রক্ষা করুন।

সন্তানের চরিত্র গঠনে যদিও পিতা-মাতা উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে; কিন্তু পারিপার্শ্বিক নানা কারণে পিতা অপেক্ষা মাতার ভূমিকা ও দায়িত্ব অনেক বেশী। মাতা সন্তানকে দশ মাস গর্ভে ধারণ করেন। এ সময় মায়ের রক্ত গ্রহণ করে সন্তান বড় হয়। এই রক্তে যদি পাপের ক্রিয়া সংমিশ্রিত থাকে, তাহলে সেই রক্তের মাধ্যমে সন্তানের মাঝেও পাপী মানসিকতার বিস্তার ঘটাতে পারে। সন্তান গর্ভে থাকাবস্থায় মাতা যদি পর-পুরুষের দিকে কু-দৃষ্টিতে তাকান, সিনেমা, নাটক, নাচ-গান, নর-নারীর মিলন দৃশ্য ইত্যাদি অবলোকন ও উপভোগ করেন, তাহলে সন্তানের মধ্যে এর কুপ্রভাব পড়তে বাধ্য। এবং এতে সন্তান চরিত্রহীন হওয়ার আশংকা বেড়ে যায়।

গর্ভাবস্থায় মাতা যদি মিথ্যা, গীবত-পরনিন্দা চর্চায় লিপ্ত থাকেন বা নামায-রোযা না করে অধার্মিকের ন্যায় দিন কাটান, তাহলে সন্তানের উপরও এসবের প্রভাব পড়তে পারে।

কথিত আছে, জনৈক দ্বীনদার লোক তাঁর শিশু পুত্রকে নিয়ে বাজারে গিয়েছিলেন। ছেলেটি এক দোকান থেকে দোকানীর অগোচরে একটি খুরমা খেয়ে ফেলে। বাবা এ ব্যাপারটা লক্ষ্য করে বাড়ী ফিরে ছেলের মাকে জিজ্ঞেস করেন- আমাদের এই সন্তান গর্ভে থাকাবস্থায় তুমি কোনদিন কোন কিছু কারো কাছ থেকে না বলে খেয়েছিলে কি? মা বললেন- একদিন পেয়ারা গাছের নীচ থেকে একটি পেয়ারা কুড়িয়ে খেয়েছিলাম গাছের মালিককে না বলে। কি আশ্চর্যের ব্যাপার! এই ছোট্ট একটি ঘটনা ছেলের স্বভাবকে আক্রান্ত করে বসেছে।

অপরপক্ষে সন্তান গর্ভে থাকাবস্থায় মা নেককাজ করলে তার প্রভাবও সন্তানের উপর প্রকটভাবে পড়ে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মা যদি বেশী বেশী কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করেন, বেশী বেশী আল্লাহর যিকর করেন, প্রয়োজনীয় দ্বীনি ইলম অর্জন করেন, তাহলে এর উত্তম প্রভাব সন্তানের উপর পড়বেই। পরিবেশের কুপ্রভাব গর্ভস্থ সন্তানের উপর পড়ে। যে পরিবেশে অধিকাংশ মানুষ পাপে লিপ্ত, গর্ভবতী মায়েদের সেখান থেকে দূরে থাকা উচিত।

সন্তান জন্মগ্রহণের সাথে সাথে তার ডান কানে আযান ও বাম কানে ইক্বামত দেওয়ার ব্যবস্থা করা মাতা-পিতার একান্ত কর্তব্য। দুনিয়াতে এসেই যদি সন্তান আল্লাহর বড়ত্বের ঘোষণা শুনতে পায়, তাহলে এর স্থায়ী প্রভাব তার জীবনে পড়বেই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে জন্ম নেওয়া অধিকাংশ শিশু তাদের এই জন্মগত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এজন্য মাতা-পিতাকে আল্লাহর দরবারে অবশ্যই জবাবদেহী হতে হবে।

শিশু জন্মের পর প্রথম প্রয়োজন একটা সুন্দর আর্থবহ নামের, এটা শিশুর মৌলিক অধিকার। নাম সংস্কৃতি ও সভ্যতার পরিচায়ক, একটা জাতির স্বকীয়তা, সৌহার্দ ফুটে উঠে তাদের সন্তানদের নামের সাথে। শিশুর জন্য সুন্দর নাম নির্বাচন করা পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। সন্তানকে অর্থবহ নামে ডাকা হলে তার প্রভাব পড়ে সন্তানের উপর। এবং অর্থবহ নামে তাকে যে সারা দিনে বারংবার ঢাকা হচ্ছে, এটাও সন্তানের জন্য দোয়া হিসেবে কাজ দেয়। ফলে সুন্দর নামের পাশাপাশি সুন্দর অর্থও থাকা জরুরী। আল্লাহর রাসূল (সা.) কারো নামে অসংগতি বা নাম অপছন্দনীয় মনে হলে সাথে সাথে পরিবর্তন করে তিনি উত্তম নাম দিতেন। হযরত আবদুর রহমান (রাযি.) বলেন, “আমি রাসূল (সা.)এর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি প্রশ্ন করলেন, তোমার নাম কি? আমি বললাম, আমার নাম আবদুল উজ্জা। তিনি বললেন, ‘না তোমার নাম আবদুর রহমান।

হযরত আবু দারদা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে ডাকা হবে তোমাদের নামে এবং তোমাদের পিতার নামে। অতএব, তোমাদের নামগুলো সুন্দর করে রাখ। (আবু দাউদ)। ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থবহ এবং সুন্দর নাম বলতে বুঝায় ওই সমস্ত নাম, যে নামের মধ্য দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা, দাসত্ব প্রকাশ পায়। আল্লাহর প্রিয়পাত্র নবী-রাসূলদের বরকতময় নামসমূহ। যে নামের দ্বারা আল্লাহর রহমত, করুণা ও মহত্ত্ব ফুটে উঠে সে ধরনের নাম রাখা উত্তম। কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, “সুন্দরতম নামসমূহের অধিকারী আল্লাহ, অতএব তোমরা সেসব নাম ধরে তাঁকে ডাকো। যারা তাঁর নাম বিকৃত করে তাদেরকে বর্জন করো, তাদের কৃতকর্মের ফল তাদেরকে দেওয়া হবে”। (সূরা আরাফ-১৮০) । ইসলামের চেতনা, সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক হয় এমন কোন নাম রাখা উচিত নয়।

ইসলামী সংস্কৃতির অন্যতম বিষয় হলো সন্তানের জন্য আক্বিক্বা করা। পিতা-মাতার উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল সন্তানের জন্মের ৭ম দিনে তার জন্য আক্বিক্বা করা। ছেলের পক্ষ থেকে ২টি ছাগল এবং মেয়ের পক্ষ থেকে ১টি ছাগল আল্লাহর নামে যবেহ করা। এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে- হযরত সামুরা (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সকল নবজাতক তার আক্বিক্বার সাথে আবদ্ধ। জন্মের সপ্তম দিন তার পক্ষ থেকে জবেহ করা হবে। ঐ দিন তার নাম রাখা হবে। আর তার মাথার চুল কামানো হবে। (সুনানে আবূ দাউদ- ২৮৩৮)।

পিতা-মাতার উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল সন্তানের জন্য সদকাহ করা। ছেলে হোক বা মেয়ে হোক ৭ম দিবসে চুল কাটা এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকাহ করা সুন্নাত। হাদীসে এসেছে- হযরত আলী (রাযি.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) হাসান (রাযি.)এর পক্ষ থেকে ২টি বকরী আক্বীক্বা দিয়েছেন এবং বলেছেন, হে ফাতেমা ! তার মাথা মুণ্ডন কর এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকাহ কর। (সুনান আত-তিরমিযী- ১৫১৯)

পিতা-মাতার উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল ছেলে সন্তানদের খাতনা করানো। এটি একটি অন্যতম সুন্নাত। এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে- হযরত জাবির (রাযি.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) হাসান এবং হুসাইন (রাযি.)এর সপ্তম দিবসে আক্বিক্বা এবং খাতনা করিয়েছেন। (আল-মু’জামুল আওসাত- ৬৭০৮)।

পিতা-মাতার উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল সন্তানদেরকে তাওহীদ শিক্ষা দেয়া। শিশু যখন কথা বলা আরম্ভ করবে, তখন থেকেই আল্লাহর তাওহীদ শিক্ষা দতে হবে। যেমন-

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইবন আব্বাস (রাযি.)কে লক্ষ্য করে বলেন,  ‘হে বৎস! আমি তোমাকে কয়েকটি বাক্য শিখাতে চাই। তুমি আল্লাহর অধিকারের হেফাযত করবে, আল্লাহও তোমার হেফাযত করবেন। তুমি আল্লাহর অধিকারের হেফাযত করবে, তুমি তাঁকে সর্বদা সামনে পাবে। যখন কোন কিছু চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন সহযোগিতা চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর জেনে রাখ! পুরো জাতি যদি তোমার কোন উপকার করার জন্য একতাবদ্ধ হয়, তবে তোমার কোন উপকার করতে সমর্থ হবে না, শুধু ততটুকুই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। আর যদি পুরো জাতি তোমার কোন ক্ষতি করার জন্য একতাবদ্ধ হয়, তবে তোমার কোন ক্ষতি করতে সমর্থ হবে না, শুধু ততটুকুই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। কলমের লিখা শেষ হয়েছে এবং কাগজসমূহ শুকিয়ে গেছে। (তিরমিযী- ২৫১৬)।

পিতা-মাতার উপর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল সন্তানদেরকে ছোট বেলা থেকেই কুরআন শিক্ষা দেয়া। কেননা কুরআন শিক্ষা করা ফরয। কুরআন শিক্ষা দেয়ার চেয়ে উত্তম কাজ আর নেই। হযরত আলী (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের তিনটি বিষয় শিক্ষা দাও। তন্মধ্যে রয়েছে, তাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা ও কুরআনের জ্ঞান দাও। (জামিউল কাবীর)।

হযরত উসমান (রাযি.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে ও অপরকে শিক্ষা দেয়”। (সহীহ বুখারী- ৫০২৭)

জন্মের পর সন্তান দুই বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ পান করে। সন্তানের চরিত্রের উপর এই দুধেরও বড় একটা প্রভাব রয়েছে। মায়ের মধ্যে যদি সত্যিকারের দ্বীনদারী থাকে, তবে এই দ্বীনদারীর প্রভাব দুধের মাধ্যমে সন্তানের ক্বলবে সঞ্চারিত হবে। মা আল্লাহ্ তাআলার নাফরমানীতে লিপ্ত থাকলে তার দুগ্ধপোষ্য শিশুও কালক্রমে খোদাদ্রোহী হতে পারে। তাই দুগ্ধদানকারীনী মাতাকে খুব সতর্কতার সাথে আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

ছেলেমেয়ে মাতা-পিতা থেকে জেনেটিকেলি অনেক দোষ-গুণ পেয়ে থাকে। মানুষের প্রত্যেক কোষে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। মিলনের পর পিতার জননকোষের ২৩টি ও মাতার জননকোষের ২৩টি ক্রোমোজোম মিলিত হয়ে সন্তানের প্রথম কোষ গঠিত হয়। এই ক্রোমোজোম হলো বংশগতির বাহক। এই ক্রোমোজোমের মাধ্যমেই মাতা-পিতা, নানা-নানী, দাদা-দাদী ও ঊর্ধ্বতন পুরুষদের, চেহারা, গায়ের রং, স্বভাব-চরিত্র ও দ্বীনদারী সন্তানের ভেতর বিস্তার করে।

সন্তানের চরিত্র গঠনের প্রাথমিক বিদ্যালয় হল মায়ের কোল। এখানেই সন্তানের প্রত্যক্ষ শিক্ষা শুরু হয়। পারিবারিক শিক্ষা হলো স্থায়ী শিক্ষা। এই শিক্ষায় পাকাপোক্ত হয়ে গেলে পরবর্তীতে যত প্রতিকূল পরিবেশেই সন্তান থাকুক না কেন, সে প্রাথমিক শিক্ষার উপর টিকে থাকতে পারবে। তাই মাতা-পিতার উচিত, সন্তানকে শুরু থেকেই দ্বীনদারী ও ভাল আখলাক শিখানো।

নিজ গৃহ হচ্ছে সন্তানের প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং তার মাতা-পিতা প্রথম শিক্ষক। শিশুরা বিশেষ করে মায়ের সান্নিধ্যে বেশী থাকে। মায়ের দ্বারা শিশুর চরিত্র নিয়ন্ত্রিত হয়। মাতা-পিতা সন্তানকে গড়ে তোলেন আদর্শ মানব করে। আর আদর্শ মানবমণ্ডলী নিয়েই আদর্শ জাতি গড়ে উঠে। তাই সভ্য জাতি গঠনে মাতা-পিতার ভূমিকা অপরিসীম।

দুনিয়াকে বড় মনে করার শিক্ষা আজ মানব সন্তান তার মায়ের কোলেই পাচ্ছে। মা বলেন, আমার সন্তান ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে। এভাবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারের মর্যাদা শিশুর অন্তরে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমন মাতা-পিতা আছেন কি-না সন্দেহ, যারা সন্তানকে এই বলে উৎসাহিত করেন যে, আমার সন্তান ঈমানের মেহনত করে মানুষকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাবে। এসবের পরিবর্তে তারা সন্তানকে দিচ্ছেন ভার্সিটিতে পড়তে এবং আশা করছেন, সন্তান একটা বড় ডিগ্রী আনবে, প্রচুর টাকা রোজগার করবে। কিন্তু সন্তান যদি সৌভাগ্যক্রমে ঈমানের মেহনত শিখে, মানুষকে ঈমানের দাওয়াত দিয়ে শান্তির পথ দেখায়, তখন অনেক মাতা-পিতা আছেন যারা এতে সন্তানের উপর নারায হয়ে যান। পিতা আফসোস করে তার বন্ধুকে বলেন, ছেলেকে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করিয়েছিলাম ডাক্তার হওয়ার জন্য। কিন্তু ছেলে এখন দাড়ি রেখে পাক্কা মোল্লা হয়ে গেছে।

কত বড় আফ্সোসের কথা! ছেলেমেয়ে নাচ-গান করে জাহান্নামের দিকে এগিয়ে গেলে মাতা-পিতা খুশী হয়ে বাহাদুরী করে বলেন, আমার মেয়ে ভাল নাচতে পারে, আমার ছেলে সিনেমায় ভাল অভিনয় করতে পারে ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুকরণে ছেলে যদি দাড়ি রাখে, তখন মাতা-পিতা নারায হয়ে যান। শত আফসোস আমাদের এহেন মানসিকতার উপর।

মাতা-পিতা সন্তানের ভাল চান। কিন্তু কিসে ভাল, তা অনেক মাতা-পিতাই জানেন না। হাদীসে আছে, “সাত বছর বয়স হলে সন্তানকে নামায পড়ার আদেশ কর। আর দশ বছর বয়স হলে নামায না পড়লে প্রহার কর”। এই হাদীস যদি আমাদের মাতা-পিতারা মেনে চলতেন, তাহলে সমাজে এখন কি কোন বেনামাযী থাকতে পারতো?

সন্তানের জন্য দুষণ ও পঙ্কিলতামুক্ত সুন্দর পরিবেশের ব্যবস্থা করা পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব। আমাদের সমাজের বর্তমানে ভয়ংকর এক ফিতনা হল, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ফিতনা। মাতা-পিতারা নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে ছেলেমেয়েদের দেখার জন্য টেলিভিশন কিনে আনেন, ইন্টারনেট কানেকশন যুক্ত স্মার্ট ফোন দেন সন্তানদের হাতে। অপরিপক্ক বয়সে এসব কিছু হাতে পেয়ে আদরের সন্তানের উপকারের চেয়ে শতগুণ বেশী ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। এসব প্রযুক্তি দিয়ে হতে পারে সন্তান এক সময় নানা অনৈতিকতায় জড়িয়ে পড়ছে, পিতা-মাতার অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। লেখাপড়া তো লাটে উঠেই। যতসব অশ্লীলতা, অনৈতিক সম্পর্ক, বেহায়াপনা, নগ্নতা, বেলেল্লাপনা, মারামারী, খুনাখুনী শিখতে এখন আর সিনেমা হলে, পার্কে যেতে হয় না। ঘরে বসেই সব করা যাচ্ছে।  আমি বলতে চাচ্ছি না, ছেলেমেয়েদেরকে সাধারণ শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত করা বা তাদের হাতে হাল যামানার প্রযুক্তি দেওয়া যাবে না। তবে বয়সের একটা সীমা পর্যন্ত ছাত্র জীবনে যথাসম্ভব উন্নত যোগাযোগ প্রযুক্তি থেকে তাদেরকে দূরে রাখাতেই কল্যাণ। আর ছাত্র জীবন শেষ করার আগ পর্যন্ত সন্তানদের প্রতি অবশ্যই পিতা-মাতার সজাগ ও সতর্ক নজরদারি থাকা জরুরী। স্মার্টফোন, ল্যাপটম, কম্পউটার, ওয়াফাইন কানেকশন থাকলে অবশ্যই অতিরিক্ত সচেতন থাকা লাগবে। তাছাড়া সন্তানদের বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা, কী ধরনের সহপাঠীদের সাথে চলাফেরা করে এবং পড়াশোনা কেমন করছে, ভাল নম্বর পাচ্ছে কিনা, নিয়মিত নামায আদায়সহ ইসলামী অনুশাসন পালন করে কিনা, কন্যাসন্তান হলে কঠোরভাবে পর্দা মেনে চলার প্রতিও সচেতন অভিভাবকসূলভ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

আক্ষেপের বিষয়, আমাদের আজ এ কি অবস্থা! আমাদের বিবেকবোধের উপর গাফলতের আবরণ পড়ে গেছে। এ পর্যন্ত কেউ বলতে পারবেন না যে, দ্বীন মেনে চলা ছেলে ও মেয়ে সন্তানরা কোন ব্যতিক্রম ছাড়া সাধারণতঃ কোন খুন-খারাবি, চাঁদাবাজি ও ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ে। নারী নির্যাতন ও নারী ঘটিত অপরাধের মূলে রয়েছে নারী-পুরুষের বেপর্দা ও বেপরোয়া চলাচল। আর বেপর্দা ও বেপরোয়া চলাচলের জন্য একতরফা দায়ী করা যায় সন্তানের মাতা-পিতাকে। সব মাতা-পিতা যদি তাদের মেয়েদেরকে ছোট থাকতেই পারিবারিক অনুশাসন মেনে পর্দায় রাখতে অভ্যাস করাতেন, ছেলেদেরকে দ্বীন মেনে ও সংযত জীবন যাপনে অভ্যস্ত করে তুলতেন, তাহলে দেশে কোন ধরনের বেপর্দাও থাকত না এবং খুন-খারাবি, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন ও বেহায়াপনাসহ নানা প্রকৃতির অপরাধ সমাজে অনেকাংশে কমে যেত। মায়ের কোলই যখন মানুষের প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাতা-পিতাই যখন মানুষের প্রথম শিক্ষক, যাদের শিক্ষা সারা জীবন মানসপটে অংকিত থাকে, তখন দায়িত্বশীল মাতা-পিতারাই পারেন পরিবার, সমাজ, দেশ ও জগতকে ভাল মানুষ দিয়ে ভরে দিতে। কাজেই বলা যায়, আদর্শ মানুষ গঠনে প্রকৃত ভূমিকা মাতা-পিতারই।

প্রতিটি পিতা-মাতাকে অবশ্যই ছেলে-মেয়েদেরকে উপযুক্ত হওয়ার পর বিয়ের ব্যবস্থা করার প্রতি মনোযোগী হতে হবে। অন্যথায় নানা পাপাচার ও অসৎ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার আশংকা তৈরি হবে। যেটা মারাত্মক কবীরা গুনাহ’র পাশাপাশি পারিবারিক সুনামহানিরও কারণ ঘটাবে। সন্তানদেরকে বেকার রেখে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ালে নানা বাজে অভ্যাস ও বাজে আড্ডায় অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। তাই লেখাপড়া শেষ করার পর অথবা পরিণত হওয়ার পর সাধ্যানুপাতে সন্তানদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি পিতা-মাতা সবসময় সন্তানের উন্নতি, কামিয়াবী ও নেক আখলাকের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া-মুনাজাত করবেন। #

লেখকঃ ফাযেলে দারুল উলূম দেওবন্দ, মুহাদ্দিস- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা, খতীব- হাজী আব্দুস সাত্তার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ- শ্রীপুর, গাজীপুর, পরিচালক- হাজী আব্দুস সাত্তার দারুল উলূম শ্রীপুর, গাজীপুর এবং কেন্দ্রীয় অর্থসম্পাদক- জামিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.