Home ওপেনিয়ন বিশ্বকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে করোনাভাইরাস

বিশ্বকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে করোনাভাইরাস

।। মারুফ মল্লিক ।।

গত আড়াই মাসে বিশ্বকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে করোনাভাইরাস। গোটা বিশ্বই এখন কার্যত অচল। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের বিমান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ইতালিতে ওষুধ ও খাবারের দোকান বাদে সব বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘর থেকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হওয়াও নিষেধ। স্পেনেও ওষুধ ও খাবারের দোকান ছাড়া সব বন্ধ রাখার জন্য বলা হয়েছে। লা লিগা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, জার্মানির বুন্দেস লিগও স্থগিত। সুপার শপগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে আতঙ্কিত নাগরিকেরা। শনিবার পর্যন্ত সারা বিশ্বে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। নানা গুজবে সয়লাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। রাস্তাঘাট, বাস, ট্রেন, ট্রাম—সর্বত্র করোনার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে আলোচনা, আলাপ, গপ্পো হচ্ছে। করোনাভাইরাস সমগ্র মানবসভ্যতাকে এক নিদারুণ পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

করোনা পরিস্থিতি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিনির্ভর হলিউডের সেসব সিনেমার কথাই মনে করিয়ে দেয়। দেশে দেশে এক অজানা রোগ দেখা দিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ পথেঘাটে মরে পড়ে থাকছে নতুন এক ভয়াবহ ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হয়ে। উজাড় হয়ে যাচ্ছে নানা জনপদ। ঘর থেকে কেউ বের হতে পারছে না। ঘরে ঘরে খাবারের সংকট। নিমেষেই দোকানপাট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। খাবারের সন্ধানে বাড়ির লোকজন বেরিয়ে রোগ নিয়ে ফিরেছে বা আর ফিরছেই না। পরিবারের অন্যরাও আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিষেধকের জন্য বিজ্ঞানীরা প্রাণান্ত গবেষণা করে যাচ্ছে। মানবসভ্যতা যখন একবারেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, মানবজাতি বিলুপ্তির ক্ষণ গুনছে, তখনই যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানী আবিষ্কার করে ফেলল ওষুধ। সেই ওষুধ নিয়ে মার্কিন স্বেচ্ছাসেবক ও সৈনিকেরা ঘরে ঘরে যাচ্ছে। বেঁচে থাকাদের সুস্থ করে তুলছে। এই হচ্ছে হলিউডের সিনেমার খুবই সাধারণ চিত্রনাট্য।

করোনা সবাইকে কাঁপিয়ে দিলেও কর্তৃত্ববাদী শাসকদের তাঁদের আচরণ থেকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারেনি। করোনা নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে ধুন্ধুমার। চলছে দোষারোপের রাজনীতি। এ পর্যন্ত পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। কিন্তু করোনার পিছু পিছু ধেয়ে এসেছে আরেক ভাইরাস। এটা হচ্ছে ‘সত্য’কে হত্যার ভাইরাস। ‘সত্য’ ঘটনাকে চেপে যাওয়ার কৌশল অবলম্বন করা। এদিক থেকে করোনার প্রথম শিকার হয়েছে ‘সত্য’। ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনে সুজানে নজেন লিখেছেন, করোনা মানবজাতির পাশাপাশি সত্যকেও হত্যা করছে। বিভিন্ন দেশ শুরু থেকেই করোনার প্রাদুর্ভাব আড়াল করার চেষ্টা করেছে। বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা করেছে। ডিসেম্বরে প্রথম সতর্কবার্তা দেওয়া চীনা চিকিৎসক লিভেন লিয়াংকে পুলিশ ধরে নিয়ে হেনস্তা করেছে। চীনের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা গুজব ছড়ানোর কোনো আইন আছে কি না, জানা নেই। এমন কোনো আইনেই মনে হয় লিয়াংকে আটক করা হয়। পরে লিয়াং নিজেই করোনাতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

চীনের মতো কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা অপছন্দ হলেই জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি বলে যে কাউকে আটকে রাখে। গুমও করে দেয়। উহানের করোনার সংক্রমণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের দায়ে চীনে তিন সাংবাদিককে আটক করা হয়। তাঁদের সর্বশেষ পরিণতি সম্পর্কে জানা যায়নি। তবে আটক হওয়ার সময় কলামিস্ট ঝুজি ইয়ং নিজেই সেই দৃশ্য ধারণ করেন। এই ভিডিও ৩ লাখ ৭৫ হাজার বার দেখা হয়েছে। ঝু জি ইয়াং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সমালোচনা করে কলাম লিখেছিলেন। এতে তিনি বলেন, সি চিন পিং করোনা মোকাবিলায় যথাযথ পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করেছেন।

একই অবস্থা হয়েছে ইরানেও। শুরুতে ইরান স্বীকার করতে চায়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ইরান করোনার ব্যাপকতা স্বীকার করে নেয়। ইরানের কয়েকজন সাংসদ মৃত্যুবরণ করেছেন। শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন। অথচ শুরুর দিকে ইরান করোনা নিয়ে গুজব ছড়ানোর দায়ে কয়েকজনকে আটক করে। শতাধিক মানুষকে সতর্ক করা হয় গুজব ছড়ানোর দায়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের আচরণও চীন ও ইরান থেকে খুব বেশি পৃথক ছিল না। স্বভাবতই গণমাধ্যমের একধরনের আগ্রহ ছিল করোনার প্রাদুর্ভাব নিয়ে। গণমাধ্যমকর্মীদের এই ধরনের আগ্রহ থাকাই স্বাভাবিক। আগ্রহের জায়গা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম হোয়াইট হাউসের সমালোচনার মুখে পড়েন। হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ মিক মুলভানি অভিযোগ করেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিপাকে ফেলতে করোনাভাইরাস নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইরান—সবাই করোনার সংক্রমণকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। চীনের সরকার–নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে, সবকিছুই যথাযথভাবে চলছে। তথ্য গোপন করার কারণে ধারণার চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়িয়েছে ভাইরাস। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। প্রকৃত তথ্য প্রকাশ না করে বরং কর্তৃত্ববাদী দেশগুলো একে অপরকে দায়ী করার চেষ্টা করেছে। চীন ও ইরান করোনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছে। চীনের কূটনৈতিক কর্মকর্তা ঝাও লিজান টুইটারে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে চীনে করোনা ছড়িয়েছে। চীন ও ইরানের সঙ্গে যোগ দিয়ে রাশিয়া প্রচার করেছে করোনাভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রই ছড়িয়েছে। আবার ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রও খুব বেশি পিছিয়ে নেই এই প্রপাগান্ডার লড়াইয়ে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, করোনার বিস্তারের জন্য চীন দায়ী। কিন্তু পারস্পরিক দোষারোপের কোনো তোয়াক্কাই করছে না করোনাভাইরাস। করোনা জানে না কে কর্তৃত্ববাদী, কারা উদার গণতান্ত্রিক। করোনার কাছে সবাই সমান। চীন, ইরান, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া—কাউকে বাদ রাখছে না করোনাভাইরাস।

চীন, ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র করোনা নিয়ে যা করছে, তা গ্রহণযোগ্য না হলেও খুব বেশি অবাক হওয়ার কিছু নেই। কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র বা শাসকেরা এ রকমই আচরণ করবেন। কিন্তু শাসকের কর্তৃত্ববাদী আচরণ সব সময়ই সবার জন্য ক্ষতিকর। করোনাভাইরাস এসব কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের জন্য মাইনফিল্ড তৈরি করছে। ইরানে ব্যাপক বিস্তার ও প্রাণহানির পরও জনসাধারণ ঘরে থাকার নির্দেশ উপেক্ষা করে শনিবারও বাইরে বেরিয়েছে। ইরানের জনসাধারণ মনে করছে, যথাযথভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেয়নি ইরানের সরকার। যদিও করোনার মহামারির জন্য রাজনীতিবিদদের এককভাবে দায়ী করা যায় না। কিন্তু বিস্তার শুরুর পর যে ধরনের পদক্ষেপ ও তৎপরতার দরকার ছিল, অনেক দেশের রাজনীতিবিদেরাই তা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

অভিজ্ঞতা বলছে, করোনা নিয়ে রাখঢাক করার কিছু নেই। গোপন রাখার পরিণতি কী হতে পারে, চীন ও ইরান তার উদাহরণ। এখনো যেসব দেশে খুব বেশি আক্রান্ত হয়নি, তাদের উচিত জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। স্থানীয়ভাবে মহামারি আকার ধারণ করার আগেই কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ রকম বিপর্যয় মানবসভ্যতা আর প্রত্যক্ষ করেনি। এই বিপর্যয় মোকাবিলায় জনসাধারণকে আশ্বস্ত করে, যথাযথ তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে হবে। মানবজাতির অতিরিক্ত লোভ ও লাভের রাজনীতি ও অর্থনীতি সভ্যতাকে এই পর্যায়ে উপনীত করেছে। বর্তমান সময়ের সবকিছু বিবেচনার নিরিখে কখনো কখনো মনে হয়, এই পরিণতি হয়তো অবশ্যম্ভাবী ছিল।

– মারুফ মল্লিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।