Home সোশ্যাল মিডিয়া করোনা প্রাদুর্ভাবের এই সঙ্কটকালে তালিবে ইলমদের উদ্দেশ্যে কিছু জরুরী পরামর্শ

করোনা প্রাদুর্ভাবের এই সঙ্কটকালে তালিবে ইলমদের উদ্দেশ্যে কিছু জরুরী পরামর্শ

দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী। ছবি- উম্মাহ।

।। মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী ।।

নাহমাদুহু ওয়ানুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম। আম্মাবা’দ। আমার প্রাণ প্রিয় ছাত্র ভায়েরা! বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে প্রশাসনের পক্ষ হতে সারা দেশে লকডাউন জারি’সহ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে হাইআতুল উলইয়া ও বেফাকের পরীক্ষার্থী ছাড়া দেশের সর্বোবৃহৎ দ্বীনি শিক্ষা নিকেতন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসায় অধ্যায়নরত সকল ছাত্রদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, আগামী ৭ই শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী মোতাবেক ৩০ই মে ২০২০ ইং রোজ শনিবার জামেয়ার নতুন শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রম শুরু হবে এবং ৯ই শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী মোতাবেক ১লা জুন ২০২০ইং রোজ সোমবার হতে জামেয়ার বার্ষিক পরীক্ষা আরম্ভ হয়ে ১৩ই শাওয়াল মোতাবেক ৫ই জুন ২০২০ইং জুমাবার সমাপ্ত হবে, ইনশাআল্লাহ।

এমতাবস্থায় প্রায় দুই থেকে আড়াই মাস পর্যন্ত আপনারা ছুটিতে থাকবেন বা বাসা-বাড়িতে অবস্থান করবেন। এ দীর্ঘ সময় আপনারা কীভাবে সময় কাটাবেন বা আপনাদের করণীয় কী, তা জানা থাকা দরকার।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। প্রিয় নবিজী সা. ইরশাদ করেন, মানুষকে দু’টি অতি মূল্যবান নেয়ামত দেয়া হয়েছে। যে দু’টি নেয়ামতকে মানুষ অবমূল্যায়ন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; মুসীবতে পড়ে যায়। সে দু’টি নেয়ামতের প্রথমটি হচ্ছে- সুস্থতা এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে- অবসর।

আমার প্রিয় ছাত্র ভায়েরা একটু চিন্তা করে দেখুন, এই সুস্থতা কতো বড় নেয়ামত! যা বুঝা যায় অসুস্থ হওয়ার পর।

আলহামদুলিল্লাহ, এ নেয়ামত আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে দান করেছেন। তালিবে ইলমের যামানায় তারুণ্য ও যৌবনের যামানায় আল্লাহ তাআলা আপনাকে সুস্থ রেখেছেন। দ্বিতীয় নেয়ামত অবসর; জীবিকা উপার্জনের চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ বে-ফিকির। সুস্থতা ও অবসর এ উভয় নেয়ামত আপনারা পেয়েছেন। অপরদিকে ইরশাদ হচ্ছে- “ওয়ামা বিকুম মিন নি’মাতিন ফামিনাল্লাহ” এ দু’টি নেয়ামত আপনাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে।

আমার প্রিয় ছাত্র ভায়েরা! এরপর আমি একটি কথা আপনাদের অনুধাবনের জন্য বলতে চাই- বর্তমান পৃথিবীতে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে মুসলমানদের নিকট যেই নেয়ামত সমানভাবে অতি মূল্যবান সেই নেয়ামত হলো, ইলমে দ্বীন আর ইলমে দ্বীন অর্জন করতে হলে উপরোক্ত দু’টি নেয়ামতের খুবই প্রয়োজন হয়। সুস্থতা এবং অবসর। আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার প্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালে ভেতরে অবস্থান করেছিলেন একটি দ্বীনি এবং প্রাণচঞ্চল ইলমী ও আমলী পরিবেশে ছিলেন।

এখন বিশেষ জরুরি পরিস্থিতির কারণে, আপনারা আপনাদের ঘরে বাসা-বাড়ীতে অবস্থান করছেন। এমতবস্থায় বিতাড়িত শয়তান বসে থাকবে না বরং আপনাকে ইলমে দ্বীন থেকে মাহরুম করার জন্য বিভিন্ন ধরনের কুমন্ত্রণা দিবে।

সুতরাং সর্বস্তরের প্রিয় ছাত্র ভায়েরা এই দীর্ঘ আড়াই মাস ঘরে বাসা-বাড়ীতে অবস্থানকালীন সময় আপনাদের প্রতিটি মিনিটই মূল্যবান।

এ সময়ে আপনারা সময়ের ক্বদর করবেন এবং আপনাদের বার্ষিক পরিক্ষার জন্য তৈরি হবেন। আমার জানা মতো লেখা-পড়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। যেকোনো সময় লেখা-পড়া মুতালাআ করা যায়। “তা’লিমুল মুতাআল্লিম” কিতাবে পড়েছি- “কিঞ্চিত ইলম অর্জন করতে হলে স্বীয় জীবন পুরিপূর্ণভাবে করতে হবে।”

আমার প্রিয় ছাত্র ভায়েরা! আমাদের আকাবের মুরুব্বিয়ানে কেরামের মুতালাআর এক এক ঘটনা বর্ণনা করলে কয়েক খন্ড কিতাব হয়ে যাবে। জ্ঞান অর্জনের জন্য তাঁরা কি পরিমান পরিশ্রম করেছেন এবং কীভাবে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এ মুহূর্তে আমার হযরত মাওলানা আব্দুল হাই ফিরিঙ্গী রাহ.এর মুতালাআয় মগ্ন থাকার একটি আশ্চর্য ঘটনা মনে পড়েছে। তিনি মুতালাআয় এতো গভিরভাবে মগ্ন থাকতেন- একদিন তার মুতালাআ অবস্থায় পানি চাওয়ার পর, তাঁর পিতা হযরত মাওলানা আব্দুল হালীম রাহ. তাঁকে পরিক্ষা করতে চাইলেন যে, তার মুতালাআর মধ্যে তিনি কতোটুকু মনোনিবেশ আছেন।

পিতা খাদেমকে ইশারা দিয়ে বললেন- পানির পরিবর্তে গ্লাসে তেল দিয়ে তার সামনে রেখে দাও। পিতার নির্দেশ মোতাবেক তাই করা হলো। আর হযরত মাওলানা আব্দুল হাই ফিরিঙ্গী রাহ. সেই তেল ভর্তি গ্লাসই মুখে তুলে পান করে ফেললেন।

খাতামুল মুহাদ্দিসীন আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রাহ. মৃত্যুর কয়েক দিন পূর্বের প্রসিদ্ধ ঘটনা- আপনাদের জানা থাকার কথা। বার্ধক্য জনিত কারণে তিনি খুবই অসুস্থ, চলা-ফেরা করতে অক্ষম ছিলেন। হঠাৎ একদিন ভোর বেলায় মিথ্যা সংবাদ রটে গেলো তিনি ইন্তিকাল করছেন! ফজরের নামাযের পর পরই দারুল উলূম দেওবন্দে বড় বড় আসাতাযায়ে কেরাম তাঁর মৃত দেহ দেখার জন্য তাঁর বাস ভবনে গিয়ে দেখলেন- তাঁর কক্ষটি অন্ধকার। বাহির থেকে একটু আলো আর তিনি দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে একটি ছোট্ট কিতাব মুতালাআ করছেন। এই ছিলো আমাদের আকাবেরদের কিতাব মুতালাআর অপূর্ব দৃশ্য। তাঁরাই ছিলেন সত্যিকারের তালিবে ইলম।

আমার প্রিয় ছাত্র ভায়েরা! তোমরা খাঁটি তালিবে ইলম হওয়ার চেষ্টা করো। পুরো জাতি তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আজ বিশ্ব জুড়ে অশান্তি! শান্তি নেই কোথায়ও! চারদিকে হানা-হানি, রাহজানী, হিংসা-বিদ্ধেষ, অন্যায়, জুলম-অত্যাচার, অভাব- অনটন ও হাহাকার সর্বত্র! অশান্তির দাবানল জ্বলছে দাউ দাউ করে প্রতিনিয়ত; প্রতিক্ষণ। দেশের মানুষের অন্তরে একরাশ হতাশা। তার উপর এখন শুরু হলো করোনাভাইরাস মহমারী। এটি নিঃসন্দেহে আল্লাহর গজব।

এমন পরিস্থিতিতে তাওবা রুজু ইলাল্লাহ ছাড়া বিকল্প কোনো পথ আমাদের সামনে খোলা নেই। আল্লাহর সিদ্ধান্ত আল্লাহর গজব থেকে পরিত্রানের উপায় আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। মুকাবালা করার ক্ষমতা, যুদ্ধ করার ক্ষমতা আমাদের নেই।

জনৈক কবি বলেন- “পরিস্থিতির মুকাবালা করার জন্য বা পরিস্থিতির পট পরিবর্তনের জন্য কোনো কৌশল অবলম্বন করো না। কেননা, সব কৌশল ত্যাগ করাই হলো, আসল কৌশল।”

সুতরাং মুকাবালা নয়, কৌশল নয়, যুদ্ধ নয় আল্লাহর দিকে ফিরে আসতেই হবে। হে আল্লাহর বান্দা! বুঝার চেষ্টা করো, তোমার জন্য ভালো-মন্দ সবকিছুই নির্ধারণ করার দায়িত্ব এক আল্লাহর। সূরায়ে বাকারার ২১৬ নং আয়াত এ মুহূর্তে বারবার তিলাওয়াত করো- “হয়তোবা তোমাদের জন্য যা মঙ্গল, কল্যাণকর, তোমরা তা অপছন্দ করছো।”

প্রিয় ছাত্র ভায়েরা! সর্বশেষ কথা- বাড়ীতে অবস্থানকালীন সময়ে যদি মসজিদ আপনার নিকটে হয়,পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করার চেষ্টা করবেন। অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবেন না। পর্দার বিধান কোনো অবস্থায় লঙ্ঘন করবেন না। মোবাইলের চক্রান্তে পড়ে অযথা আপনার মূল্যবান সময় মোটেও নষ্ট করবেন না। সময় ও সুযোগ মতো আপনার একান্ত কাছের উস্তাযের সাথে যোগাযোগ রাখবেন, পরামর্শ নিবেন। সব কিছুর পূর্বে আপনার বার্ষিক পরিক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন। সময়কে সময় দিবেন। “সময় তাদের জন্য অপেক্ষা করে, যারা সময়ের সদ্ব্যবহার করতে জানে।

লেখক: মুহাদ্দিস- আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী চট্টগ্রাম এবং কেন্দ্রীয় সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক- হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।