Home জাতীয় করোনায় হিমশিম বাজেট ও সেবায় নড়বড়ে স্বাস্থ্য খাত

করোনায় হিমশিম বাজেট ও সেবায় নড়বড়ে স্বাস্থ্য খাত

প্রতিকী ছবি।

ডেস্ক রিপোর্ট: বিশ্বে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম বিনিয়োগের দেশের একটি বাংলাদেশ। এখানে মানুষ নিজের পকেট থেকেই চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করে। নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সুবিধা, আমদানি করা যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে, কেনাকাটায় চলে বড় দুর্নীতি।

খাতটির স্বল্প বাজেট, সেবা-সুবিধার ঘাটতি, অদক্ষতা আর জনবলসংকটের কারণেই নতুন করোনাভাইরাস মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে দেশ। রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে কোভিড-১৯-এর চিকিৎসা নেওয়ার সময় এই প্রতিবেদক এর কিছু দিক কাছ থেকে দেখেছেন। 

বাংলাদেশে সংক্রমণ প্রথম শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। সরকার তখন বলেছিল, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আছে। কিন্তু গোড়াতেই সমন্বয়হীনতা, শনাক্তকরণ পরীক্ষার সরঞ্জামের অপর্যাপ্ততা, চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সুরক্ষা পোশাকের (পিপিই) সংকট প্রকট হয়ে দেখা দেয়। এখন কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। সরকারি হাসপাতালগুলো বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিচ্ছে, তবে উপকরণ ও সুবিধা এখনো অপর্যাপ্ত। 

জিডিপি অনুপাতে বাজেট বরাদ্দের বিচারে বিশ্বে সর্বনিম্ন সারিতে। কোভিডের অভিজ্ঞতা বলছে, বিনিয়োগ বাড়িয়ে খাতটি ঢেলে সাজাতে হবে।

আরও পড়তে পারেন-

সফল জীবন ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ার সহজ উপায়

অমুসলিমদের সাথে ইসলামের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নীতি

মার্কিন গবেষকদের চোখে মুসলমানদের নামাজ

চিন্তার ইতিহাসে সেক্যুলারিজমের জন্ম কীভাবে হয়েছিলো?

মাহে রমযানের ফযীলত এবং বিধি-বিধান ও পূর্ণাঙ্গ মাসআলা

সরকার স্বাস্থ্য খাতে কখনোই প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করেনি। নামে অগ্রাধিকার খাত, কিন্তু বাজেটে তার প্রতিফলন নেই। কোভিড মোকাবিলার সংকট আসলে অতীতের সব অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতার ফল। 

গত ২৬ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তার অভ্যন্তরীণ নথিতে বলেছিল, করোনা মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ তার দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা। মহামারির শুরুতেই স্বাস্থ্যব্যবস্থা হিমশিম খাবে। 

মারাত্মকভাবে আক্রান্ত এবং সংকটজনক রোগীরা মহামারির বড় সময়জুড়ে হাসপাতালে উপযুক্ত চিকিৎসা পাবেন না। একদিকে পিপিইর সংকট, অন্যদিকে হাসপাতালগুলোয় রোগীর ভিড় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের ঝুঁকিতে ফেলবে।

সর্বনিম্ন ব্যয়ের কাতারে বাংলাদেশ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, স্বাস্থ্য বাজেটকে হতে হবে দেশের মোট বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ। কিন্তু চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বরাদ্দ এই দুটি হারের ধারেকাছেও নেই।

গত অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের হার ছিল সামান্য বেশি, কোনোমতে ৫ শতাংশ পেরিয়ে। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দের টাকা আগের বছরের চেয়ে অল্প বেড়েছে, কিন্তু তার তুলনায় মোট বাজেট বেড়েছে বেশি। অর্থাৎ প্রকৃত বরাদ্দ কমেছে। 

আবার চলতি ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হবে জিডিপির ১ দশমিক ১২ শতাংশ। সেটাও এ বছর ১ শতাংশের নিচে রয়ে গেছে। 

বিশ্বে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি খরচ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—জিডিপির ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্থানে আছে সুইজারল্যান্ড (১২ দশমিক ২ শতাংশ)। তৃতীয় স্থানে আছে জার্মানি (১১ দশমিক ২ শতাংশ)। 

স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ে সবচেয়ে কৃপণ দেশগুলোর একটি তালিকা তৈরি করেছে সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট। সেখানে সর্বশেষ পরিসংখ্যান ২০১৬ সালের। সেই তালিকা অনুযায়ী, জিডিপির তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম খরচ করে যথাক্রমে মোনাকো, পাপুয়া নিউগিনি এবং ব্রুনেই। এরপরেই রয়েছে বাংলাদেশ। 

জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিকের (এসকাপ) ২০১৮ সালের জরিপ বলছে, জিডিপি অনুপাতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ৫২টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। 

ডব্লিউএইচও এবং বিশ্বব্যাংক ২০১৯ সালে স্বাস্থ্য খাতের আর্থিক সুরক্ষার ওপর একটি বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি বলছে, স্বাস্থ্যসেবায় বিশ্বে সবচেয়ে কম খরচ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সরকারেরা। স্বাস্থ্যসেবা পেতে এ অঞ্চলের নাগরিকদের নিজেদের খরচ বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। গড়ে স্বাস্থ্যসেবা খরচের ৪৬ শতাংশ তারা মেটায় নিজেদের পকেট থেকে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের অবস্থা সবচয়ে খারাপ, নাগরিকেরা নিজেরা স্বাস্থ্যসেবা খরচের ৭০ শতাংশের বেশি জোগায়। 

২০১৭ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় স্বাস্থ্যব্যয় প্রতিবেদন বলেছিল, রোগী নিজের পকেট থেকে জোগায় ৬৭ শতাংশ। খরচের ২৩ শতাংশ জোগায় সরকার, ৭ শতাংশ জোগায় উন্নয়ন অংশীদারেরা। বাকি ৩ শতাংশ আসে গোষ্ঠী স্বাস্থ্যবিমাসহ অন্যান্য উৎস থেকে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে রোগীর নিজের ব্যয়ের অংশ সবচেয়ে বেশি। আর সবচেয়ে কম মালদ্বীপে, ১৮ শতাংশ। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির অন্তত ২ থেকে ৩ শতাংশে ওঠানো দরকার। তাঁর মতে, স্বাস্থ্য খাতের প্রধান সমস্যা হচ্ছে, রোগ নির্ণয়ের সুযোগ–সুবিধার ঘাটতি এবং জনসংখ্যার অনুপাতে স্বাস্থ্যকর্মী কম থাকা।

অধ্যাপক হামিদ বলছেন, বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিতে হবে। উন্নয়ন বাজেটের মানসম্পন্ন খরচ হয় না। মেডিকেল ও নার্স কলেজের অবকাঠামো সুবিধা বাড়াতেও প্রকল্প নিতে হবে। 

স্বাস্থ্য-সুবিধার অবস্থা

জরিপটি বলছে, দেশে ২৮ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছে। সাধারণ চিকিৎসক আছে প্রায় ৬০ শতাংশের আর নার্স আছে ৮০ শতাংশের। মাত্র ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে জরুরি পরিবহন বা অ্যাম্বুলেন্স আছে। ২২ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে অ্যালকোহলভিত্তিক জীবাণুনাশক আছে। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সংস্থা (নিপোর্ট) মার্কিন দাতা সংস্থা ইউএসএআইডির আর্থিক সহায়তায় দেশে স্বাস্থ্য-সুবিধার সর্বশেষ জরিপটি করেছে ২০১৭ সালে। তবে ‘বাংলাদেশ হেলথ ফ্যাসিলিটি সার্ভে-২০১৭’ নামে এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। 

এ ছাড়া সার্জিক্যাল মাস্ক আছে ২৮ শতাংশের কাছে। পরীক্ষাগারের সুবিধা আছে ৩৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে ‘উন্নততর’ পানি পাওয়া যায়, যদিও হাত ধোয়ার পানি ও সাবান আছে মাত্র ৫৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। 

তবে মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. হাবিবুর রহমান খান বলেন , গত তিন বছরে স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা অনেক বেড়েছে, বাড়ছে। কমিউনিটি ক্লিনিক এবং উপজেলা পর্যায়সহ হাসপাতাল আর শয্যাও বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য হাসপাতালে শয্যা আছে আটটি। যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা ২৯ আর চীনে ৪২। আবার বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক আছেন পাঁচজন, ভারতে আটজন। ইতালিতে আছেন ৪০ জন আর যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ জন।

এ ছাড়া নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর যেমন, তেমনি পরিচ্ছন্নতাকর্মীরও ঘাটতি আছে। এই প্রতিবেদক কোভিড-১৯–এ আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসা নিয়েছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি জনবলের ব্যাপক ঘাটতি দেখেছেন।

প্রতিবেদক দেখেছেন, সরকারের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী পঞ্চাশোর্ধ্ব চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মী সরাসরি রোগীর সংস্পর্শে আসেননি। অন্য কর্মীরা একেকটি দলে টানা সাত দিন করে কাজ করেছেন। পালা শেষে পুরো দল ১৪ দিনের সঙ্গনিরোধে গেছেন। একেক দলের কর্মীরা তিনটি পালায় কাজ করেছেন। জনবলের টানাটানির পাশাপাশি রয়েছে কর্মীদের মধ্যে সংক্রমণভীতি। অন্যদিকে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেককেই ভর্তি করা যাচ্ছে না। 

বরাদ্দ ও সংস্কার

করোনার বিরাট ধাক্কায় বিশ্বে স্বাস্থ্য বরাদ্দে শীর্ষ দেশ যুক্তরাষ্ট্রকেও হিমশিম খেতে হয়েছে। কোভিড-১৯ সারা বিশ্বকেই স্বাস্থ্য খাত নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। প্রায় প্রতিটি দেশের মতো বাংলাদেশকেও স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজানোর কথা ভাবতে হবে। কেবল বরাদ্দ বাড়ানোই নয়, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সংস্কার চাই। আর তা শুরু করতে হবে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট থেকেই, যেটা আগামী ১১ জুন পেশ করার কথা আছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ব্র্যাকের চেয়ারপারসন হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য খাতে গভীর সংস্কার না হলে সঠিকভাবে টাকা খরচ হবে না। সাধারণ মানুষ সুফল পাবে না। করোনা পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে যে এই খাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা প্রবল। জেঁকে বসে আছে দুর্নীতি। এখানে বড় বরাদ্দের চেয়ে সংস্কার বেশি জরুরি।

হোসেন জিল্লুর আরও বলেন, এ খাতে দক্ষ জনবল বাড়ানোর জন্য টাকা খরচের চেয়ে আমলারা অবকাঠামো নির্মাণে বেশি উৎসাহী। সেখানে দুর্নীতি করার সুযোগ বেশি। ফলে ২০০ শয্যার হাসপাতাল তৈরি হয়, জনবল রয়ে যায় ৫০ শয্যার। ভবন বানানোর টাকা বিফলে যায়। তা ছাড়া করোনা পরিস্থিতি বলছে, রোগবালাই প্রতিরোধেও মনোযোগ জরুরি। সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশনের মতো মৌলিক ব্যবস্থার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ চাই।

উম্মাহ২৪ডটকম:এসএএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

করোনাভাইরাস: হাসপাতাল থেকে রোগী পালানো নিয়ে কর্তৃপক্ষ কী ব্যাখ্যা দিচ্ছে