Home প্রবন্ধ-নিবন্ধ ভারতের মতো শ্রীলঙ্কাও মুসলমানদেরকে কলঙ্কিত করতে করোনভাইরাসকে হাতিয়ার করছে

ভারতের মতো শ্রীলঙ্কাও মুসলমানদেরকে কলঙ্কিত করতে করোনভাইরাসকে হাতিয়ার করছে

করোনায় মারা যাওয়া প্রতি ৯ জনের মধ্যে ৩ জন হলেন মুসলিম। তাদের সকলের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। যেটা মৃতকে কবর দেওয়ার ইসলামী বিধানের একেবারেই পরিপন্থী। - ফাইল ছবি, সৌজন্যে আজাথ সাল্লি।

ওমর সুলেমান : বিশ্ব একটা নজিরবিহনী অস্থিতিশীলতা, দুর্দশা এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারী এবং এটা বিভিন্ন দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির জন্য যে হুমকি সৃষ্টি করেছে, সেটার কারণে সারা বিশ্বেই বিভিন্ন সরকার অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে গেছে এবং তাদেরকে টিকে থাকার লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই সব দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী রাজনীতিবিদরা – যারা জনস্বাস্থ্যের এই সঙ্কটকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে ব্যার্থ হয়েছে, তারা তাদের সীমাবদ্ধতা ঢাকতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে, বিশেষ করে মুসলিমদেরকে বলির পাঁঠা বানিয়েছে।

এর কারণে যে মুসলিমরা মহামারী শুরুর আগ থেকেই বৈষম্য, দুর্ব্যবহার এবং নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিল, তারা এখন কঠিনভাবে বাধা পড়ে গেছে। বিশ্বের বহু দেশে সুবিধাবঞ্চিত মুসলিমরা শুধু জীবনের হুমকি সৃষ্টিকারী মহামারীর মুখোমুখিই হচ্ছে না, একই সাথে সে সব জায়গায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইসলামভীতি ছড়ানো হচ্ছে। 

ভারতে কোভিড-১৯ সংক্রমনের শুরু থেকেই ২০০ মিলিয়ন মুসলিমের শক্তিশালী সম্প্রদায়কে মিডিয়া এবং ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) করোনাভাইরাসের বাহক হিসেবে অপপ্রচার শুরু করে। 

শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্যকর্মীরা কলম্বোর একটি লকডাউন এলাকায় একজন মুসলিমের কাছ থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। ছবি- চামিলা করুণারথনে, ইপিএ।

মার্চের শেষ দিকে, নয়াদিল্লীর একটি মুসলিম ধর্মীয় সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত ব্যক্তি চিহ্নিত হওয়ার পর বিজেপির এক রাজনীতিবিদ ওই সমাবেশকে ‘করোনা সন্ত্রাসবাদ’ আখ্যা দেয় এবং মহামারীর মধ্যে যে সব মুসলিম মসজিদে গেছে, তাদেরকে ‘সন্ত্রাসীদের মতো শাস্তি দেয়ার’ আহ্বান জানায়। ফলে সোশাল মিডিয়ায় ‘করোনা জিহাদ’ একটা বহুল চর্চিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বিভিন্ন জায়গায় মুসলিমরা – এমনকি যারা ত্রাণ বিতরণ করছেন – তারাও শারীরিক ও মৌখিকভাবে হামলার শিকার হচ্ছেন। এদিকে, উত্তর প্রদেশের এক বিজেপির এমপি মুসলিম ব্যবসায়ীদেরকে বয়কট করার ডাক দিয়ে অভিযোগ করেছেন যে, মুসলিমরা ‘সবজিতে লালা দিয়ে ভাইরাস সংক্রমিত করছে’।

প্রতিবেশী শ্রীলংকায় সরকার মহামারীকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে মুসলিমদেরকে অপদস্থ করছে এবং ইসলামভীতি উসকে দিচ্ছে। 

শ্রীলংকা একটি দ্বীপরাষ্ট্র এবং প্রাণবন্তু বহুধর্মীয় ও বহুজাতিক ঐতিহ্য রয়েছে এখানে। কিন্তু মিডিয়া ও রাজনীতিবিদরা এখানে অনেক বছর ধরে ইসলামভীতিমূলক প্রচারণা অব্যাহতভাবে চালিয়ে আসছে। এর সাথে সন্দেহভাজন এক কট্টর মুসলিম গ্রুপের হামলা এবং সারা বিশ্বে ইসলামফোবিয়া মূলধারায় চলে আসার কারণে দেশটির মুসলিমরা এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। মুসলিমরা এখানে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা বারবার সহিংসতা ও ঘৃণার শিকার হচ্ছে। সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষার জন্য যথেষ্ট কিছু করছে না এবং হামলাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করতেও কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর একটি সড়কের পাশে মাস্ক পরা দুই মুসলিম মহিলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ছবি- দিনুকা লিয়ানাওয়াত্তে, রয়টার্স।

সে কারণে কোভিড-১৯ যখন শ্রীলংকায় পৌঁছায়, তখন কিছু প্রধান মিডিয়া সংস্থা এবং বর্তমান সরকারের ঘনিষ্ঠ জাতীয়তাবাদীরা দ্রুত এর বিস্তারের জন্য মুসলিমদের দোষারোপ শুরু করে, যারা দেশের জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ। ভারতের মতোই মুসলিম ধর্মীয় চর্চাগুলোকে ‘সুপার সংক্রমণের ক্ষেত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো এবং বৌদ্ধ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকদেরকে সতর্ক করা হলো যাতে তারা মুসলিম দোকানিদের কাছ থেকে খাবার না কিনে। 

শ্রীলঙ্কান সরকার করোনাভাইরাসে মৃত ব্যক্তিকে পোড়ানোর বাধ্যবাধকতা জারি করে, যেটা মুসলিমদের কবর দেয়ার রীতির ঘোর বিরোধী। এতে মুসলিমদেরকে শুধু তাদের মৌলিক ধর্ম পালনের অধিকার থেকেই বঞ্চিত করা হয়নি, বরং মুসলিমদের ধর্মীয় রীতি পালনের ভাইরাস ছড়ানোর যে ধারণা ছড়ানো হচ্ছে, সেই ধারণাকে আরও জোরালো করা হয়েছে।

এমন কোন বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি নেই যে, করোনাভাইরাসে মৃতদের কবর দিলে সেটা ভাইরাস সংক্রমনে কোন ভূমিকা রাখে। ইউরোপ থেকে নিয়ে আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকায় করোনাভাইরাসে মৃতদের সরকারের নির্দেশনা মেনে কবর দেয়া হচ্ছে, এবং এতে জনস্বাস্থ্যের জন্য কোন হুমকি সৃষ্টি হয়নি। 

সে কারণে শ্রীলংকা সরকার সকল কোভিড-১৯ এ মৃতদেরকে পোড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে জনস্বাস্থ্যের কোন বিষয় নেই, বরং ইসলামভীতিকে সেখানে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছে। 

ভারত আর শ্রীলংকা একমাত্র দেশ নয় যেখানে করোনাভাইরাস সঙ্কটের কারণে মুসলিমরা ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি, দুর্ব্যবহার এবং বৈষম্যের মধ্যে রয়েছে। 

বিশ্বকে অবশ্যই এই সব নেতা ও সরকারকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে যাতে কোভিড-১৯ এর সংক্রমনকে আমরা ফ্যাসিবাদের উত্থানে পরিণত হতে না দিই।  সূত্র- আল-জাজিরা।

– ইমাম ওমর সুলেমান, আমেরিকান মুসলিম বুদ্ধিজীবী ও সক্রিয় মানবাধিকার কর্মী।

আরও পড়তে পারেন-

ভাইরাস ও ভ্যাকসিন ব্যবসা: এখনি সোচ্চার হওয়ার সময়

গুনাহর ক্ষতি এবং বেঁচে থাকার উপায়

ঢাকার প্রায় অর্ধেক মানুষ বিষণ্ণতায় ভূগছে, সমাধান কী?

40 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.