Home ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের যাকাত ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম

দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের যাকাত ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম

- উম্মাহ গ্রাফিক্স।

।। মুফতী মনির হোসাইন কাসেমী ।।

ইসলাম হল একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল কর্মকাণ্ডে সঠিক দিক নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। ইসলাম মানুষের মৌলিক অধিকার, সামাজিক সুবিচার এবং মানব সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার যেমন ব্যবস্থা করেছে, তেমনি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করে যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারসাম্যমূলক অর্থনীতি উপহার দিয়েছে।

বর্ণিত হয়েছে, কোন্ মানুষের পা ক্বিয়ামত দিবসে পাঁচটি প্রশ্নের সদুত্তর দেওয়া ব্যতিরেকে এক বিন্দুও জায়গা থেকে নড়তে পারবে না। (১) জীবন কোন পথে ব্যয় করেছো, (২) যৌবন কোন্ পথে ব্যয় করেছো, (৩) আয় কোন্ পথে করেছো, (৪) ব্যয় কোন্ পথে করেছো এবং (৫) ইসলাম সম্পর্কে যে জ্ঞান অর্জন করেছো তা কতটা বাস্তবায়িত করেছো। এখানে দেখা যাচ্ছে যে, পাঁচটি প্রশ্নের মধ্যে দু’টি প্রশ্নই অর্থনীতির উপর নির্ধারণ করা হয়েছে। কেউ যেন অবৈধভাবে সম্পদ সংগ্রহ করে ধনের পাহাড় গড়তে না পারে সে জন্য উপার্জিত অর্থের হিসাব গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আবার কেউ যেন অর্জিত অর্থ অবৈধ পথে ব্যয় করতে না পারে তার জন্য ব্যয়ের হিসাব গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে। সম্পদের আয়-ব্যয়ের হিসাব গ্রহণের ব্যবস্থা করে যেমন এক্ষেত্রে অন্যায় পথ থেকে দূরে থাকার সতর্ক করা হয়েছে, তেমনি ধনীরা অর্থ উপার্জন করে পুঁজিপতি আর গরীবরা আরো গরীব হওয়া থেকে রক্ষার জন্য ধনী-গরীবের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা ও বৈষম্য দূরীকরণের জন্য ইসলাম যাকাতের ব্যবস্থা করেছে।

ইসলামের মূল পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে যাকাত তৃতীয় স্তম্ভ। ইসলামের অন্যান্য মূল স্তম্ভের মতই যাকাত ফরয। আভিধানিক অর্থে যাকাতের অর্থ হল, বৃদ্ধি, পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধতা ইত্যাদি। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে সম্পদ পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও বিশুদ্ধ হয় এবং মালের পবিত্রতা ও বরকত বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ’র অসন্তুষ্টি ও গযব হতে সমাজ মুক্ত ও পবিত্র হয়, এ জন্য যাকাতকে যাকাত বলা হয়। অপরদিকে শরয়ী পরিভাষায় জীবন যাত্রার অপরিহার্য প্রয়োজন মিটানোর পর নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর কাল সঞ্চিত থাকলে, শরীয়ত নির্ধারিত পরিমাণ মোতাবেক অংশ শরীয়ত নির্ধারিত খাতে কোন প্রকার বিনিময় ছাড়া মালিকানা হস্তান্তরকে যাকাত বলে।

আরও পড়তে পারেন-

যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করে গেছেন

ভাইরাস ও ভ্যাকসিন ব্যবসা: এখনি সোচ্চার হওয়ার সময়

গুনাহর ক্ষতি এবং বেঁচে থাকার উপায়

ঢাকার প্রায় অর্ধেক মানুষ বিষণ্ণতায় ভূগছে, সমাধান কী?

ইসলামে যাকাত ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ্ তাআলার হুকুম মেনে চলার নামই ইবাদত। প্রাথমিকভাবে ইবাদতকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমতঃ দৈহিক ও দ্বিতীয়তঃ আর্থিক। যাকাত হল আর্থিক ইবাদত। আর্থিক ইবাদতের মধ্যে যাকাতের গুরুত্ব সর্বাধিক। নামাযের মতই এটি ফরয। কুরআন ও হাদীসে যাকাত প্রদানের জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

বর্ণিত হয়েছে, “নামায কায়েম কর, যাকাত দান কর এবং নামাযে অবনত হও তাদের সাথে যারা অবনত হয়।” (সূরা বাক্বারাহ্ ৪৩)। “নামায কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হও।” (সূরা নূর- ৫৬)। “নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে, এটাই সঠিক ধর্ম।” (সূরা বাইয়্যিনাহ- ৫)। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “আল্লাহ্ তাআলা ধনীদের উপর যাকাত ফরয করেছেন। যাতে ধনীদের নিকট হতে সংগ্রহ করে দরিদ্রের মধ্যে বণ্টন করা হয়।” (বুখারী শরীফ)।

অতএব, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, যাকাত আদায় করা ফরয। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বে যেসব নবী-রাসূল এসেছেন তাদের শরীয়ত ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও সে সময়ও যাকাতের বিধান ছিল। বর্ণিত হয়েছে, “এই কিতাবে ইসমাঈলের কথা স্মরণ করুন, তিনি প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যাশ্রয়ী এবং তিনি ছিলেন রাসূল, নবী। তিনি তাঁর পরিবারবর্গকে নামায ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিতেন এবং তিনি তার পালনকর্তার কাছে পছন্দনীয় ছিলেন।” (সূরা মরিয়াম- ৫৪, ৫৫)। যাকাত প্রদানের বিধান পূর্ববর্তী নবীগণের আমলেও ছিল এবং বর্তমানেও আছে। যাকাত প্রদান না করার জন্য পরকালে কঠোর ও ভীষণ শাস্তি ভোগ করতে হবে। পার্থিব জীবনেও নানা বালা-মুসীবত নেমে আসে। ক্বিয়ামত দিবসে নামায কায়েম ও যাকাত আদায় থেকে গাফেল ব্যক্তিদের প্রশ্ন করা হবে।

“তোমাদেরকে কিসে জাহান্নামে নীত করেছে? তারা বলবে; আমরা নামায পড়তাম না, অভাবগ্রস্তকে আহার্য দিতাম না।” (সূরা মুদ্দাস্সির- ৪২-৪৪)। “আর যারা সোনা ও রূপা সঞ্চিত করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দান করুন। সেদিন ঐসব (সোনা-রূপা) দোযখের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তদ্বারা তাদের ললাটে, পার্শ্বদেশ এবং তাদের পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হবে। (এবং বলা হবে) এটা তোমরা নিজেদের জন্য যা সঞ্চয় করেছিলে তার প্রতিফল। সুতরাং যা তোমরা সঞ্চিত করেছিলে তার স্বাদ গ্রহণ কর।” (সূরা তাওবাহ- ৩৪, ৩৫)।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- “আল্লাহ্ যাকে ধন-সম্পদ দান করেছেন অথচ সে তার যাকাত আদায় করে না, ক্বিয়ামতের দিন ঐ ধন-সম্পদ তার জন্য একটি টাক মাথাওয়ালা বিষধর সাপে রূপান্তরিত করা হবে, যার (চোখ দু’টোর উপর) দু’টি কালো বিন্দু থাকবে এবং ঐ সাপ তার গলদেশে পেঁচানো হবে। অতঃপর সাপটি ঐ ব্যক্তির উভয় অধর প্রান্ত (কামড়ে) ধরে বলবে, আমি তোমার ধন-সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত ভান্ডার।” (বুখারী শরীফ)।

উপরে বর্ণিত কুরআন ও হাদীসের আলোকে জানা যায়, ইসলামের যাকাতের বিধান পালন করা অপরিহার্য। বিধান অনুযায়ী যাকাত প্রদান করলে যেমন মালের পবিত্রতা হাসিল হয় এবং সাওয়াব পাওয়া যায়, তেমনি এ বিধান অমান্য বা মালের যাকাত প্রদান না করলে পরকালে কঠোর ও ভীষণ শাস্তি ভোগ করতে হবে। তথাপি এক শ্রেণীর মুসলমান যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত থাকে বা যাকাত প্রদান করাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না। কেউ আবার ঢাকঢোল পিটিয়ে সামান্য কিছু গরীব-দুঃখী মানুষকে যাকাত প্রদান করে থাকে। এটি যে লোক দেখানো বা সমাজের মানুষের কাছে দানবীর বা দাতা হিসেবে পরিচিতি লাভের আশায় করা হয়ে থাকে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। গচ্ছিত মালের শরীয়তের বিধান অনুযায়ী যত টাকা যাকাত প্রদান করা দরকার তা তারা করে না। যদি সঠিক হিসেব-নিকেশ করে যাকাত প্রদান করা হয়, তবে সমাজের অনেক অসহায়, গরীব, মিসকীন উপকৃত হবে।

যা হোক, ইসলামে যে যাকাত ব্যবস্থা রয়েছে, তার যথেষ্ট অবদান লক্ষ্য করা যায়। দুনিয়ার যাবতীয় ধন-সম্পদের মালিক একমাত্র আল্লাহ্ তাআলা। তিনি মানব জাতিকে নির্ধারিত নিয়মে আয়-ব্যয় করার অধিকার দিয়েছেন। আল্লাহ্ তাআলা কাউকে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক করেন আবার কাউকে রাস্তার ফকীর। মানব জাতিকে পরীক্ষার জন্যই এটি করা হয়ে থাকে। কারণ, এ পৃথিবীটা একটা পরীক্ষাগার সমতুল্য। যারা ধন-সম্পদের মালিক হয়ে থাকে অর্থাৎ সাহেবে নিসাব পরিমাণ মালের অধিকারী হয়, তাদেরকে আল্লাহ্ তাআলার নির্ধারিত বিধান মোতাবেক যাকাত প্রদান করতে হবে। যদি না করে তবে পরকালে কঠোর ও ভীষণ শাস্তি ভোগ করতে হবে। অতএব, আল্লাহর বিধান অমান্য করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার সুযোগ এবং ব্যক্তির ইচ্ছামত আয় ও ব্যয় করার সুযোগ ইসলামে নেই। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় কিছু লোক সমাজের সিংহ ভাগ মানুষকে শোষণ করে তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে বিরাট সম্পদের মালিক হয়ে উঠে এবং নিজের ইচ্ছামত ব্যয় করার অধিকারী হয়। অপর দিকে অন্যেরা হয় বঞ্চিত। ইসলাম যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনের ব্যবস্থা করেছে। ফলে দরিদ্র, দুঃস্থ, সর্বহারা মানুষের অনাহারে মরার সুযোগ নেই, যা পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় দেখা যায়।

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বিরাট বৈষম্য দেখা যায়। ইসলাম যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের ব্যবস্থা করেছে। ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুরোপুরি মেনে চললে মানব সমাজে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকতে পারে না। আমাদের সমাজে ধনী-দরিদ্রের যে পার্থক্য সৃষ্টি হয়, তা কেবল পুরোপুরি ইসলামী অর্থব্যবস্থা না মানার কারণে। যেসব লোক নিসাব পরিমাণ মালের অধিকারী, তারা যদি নির্ধারিত নিয়মে সঠিকভাবে যাকাত প্রদান করে, তাহলে সমাজের ধনী-দরিদ্রের এই বিরাট বৈষম্য থাকতে পারে না। তাই ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে ইসলামের যাকাত-সাদকা, দান ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

ধনীদের সম্পদে বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে। আর যাকাতের হকদার হল, দুঃস্থ, গরীব, মিসকীন-অসহায় মানুষ। কিন্তু তাই বলে তাদের প্রতি ধনীদের এটা অনুগ্রহ নয়। কারণ, আল্লাহ্ তাআলা যাকাত ফরয করার মাধ্যমে ধনীদের সম্পদে গরীবদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। বলতে গেলে ধনীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল, যারা যাকাতের হকদার তাদের নিকট পৌঁছে দেওয়অ। কাজেই যাকাত হল, ধনীদের সম্পদের গরীবদের একটি অংশ, যা প্রদান করা অপরিহার্য।

মানব সমাজের বিরাট অংশ দরিদ্র। এই দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে ইসলামের যাকাত ব্যবস্থা একটি কার্যকর পন্থা। শুধু আমাদের দেশেই নয়, গোটা মুসলিম জাহানের মুসলমানের বিরাট অংশ আজ দারিদ্রতার শিকার। আর এই দারিদ্রতা বিমোচনের ক্ষেত্রে যাকাত ব্যবস্থার অবদান অনস্বীকার্য। বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারিত নিয়মে যাকাত আদায়ের ব্যবস্থা করা হলে, দারিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

পুঁজিপতি বা ধনী ব্যক্তিরা উপার্জিত অর্থের একাংশ ভবিষ্যত জীবনের জন্য সঞ্চিত করে রাখে। কিন্তু দুঃখী, দরিদ্র, সর্বহারা মানুষের পক্ষে ভবিষ্যতের সঞ্চয় করা সম্ভব হয় না। কারণ তারা অভাব-অনটনের মধ্যে খেয়ে না খেয়ে জীবন যাপন করে। এসব গরীব-দুঃখী-অসহায় মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের মৌলিক প্রয়োজন মিটানোর ব্যবস্থা করা কল্যাণকর তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রধানের। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে ঘোষণা করলেন, “আমি তোমাদের অভিভাবক, যাদের কোন অভিভাবক নেই।” হযরত উমর (রাযি.) তাঁর শাসনামলে বলেন, “আমার শাসনে ফুরাতের উপকূলে একটি ছাগল ছানাও যদি না খেয়ে মারা যায়, তবে আল্লাহর আদালতে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।” কাজেই গরীব-অসহায় মানুষের দুঃখী জীবনের অবসান ঘটাতে ইসলামের যাকাতের বিধান একটি উত্তম ও কার্যকর পন্থা।

মুসলিম সমাজের গরীব, অসহায়, এতীম মানুষগুলো অর্ধাহারে, অনাহারে, গৃহহীন, বস্ত্রহীন হয়ে অসহনীয় দুঃখ যাতনার মধ্যে জীবন যাপন করছে। বাস্তুহারা জীবন যাপনে বাধ্য হয়ে এসব দুঃখী মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। ইসলামের যাকাত ব্যবস্থা সঠিকভাবে কার্যকর করে এসব অসহায় মানুষের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। অভাবগ্রস্ত, ভিক্ষুক, মিসকীন, দাস মুক্তি, ঋণগ্রস্তদের ঋণ মুক্তি, মুসাফিরসহ সকল অসহায় ও দুঃস্থদের পুনর্বাসনে ইসলামের যাকাত ব্যবস্থার যথেষ্ট অবদান রয়েছে।

যাদেরকে তাদের ধন-সম্পদ ও ঘরবাড়ী থেকে বহিস্কৃত করা হয়, সেসব উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনেও যাকাত ব্যবস্থা অবদান রেখেছে। আল্লাহ্ তাআলা বলেন, “যাকাতের অর্থ সেসব দুঃস্থ মুহাজিরদের জন্য, যাদেরকে তাদের ঘরবাড়ী ও ধন-সম্পদ হতে বহিস্কৃত করা হয়েছে, তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও রেযামন্দির উদ্দেশ্যেই সব কিছু ত্যাগ করেছে।” (সূরা হাশর)।

আল্লাহ্ তাআলা বলেন, “খয়রাত ঐ সকল গরীব লোকের জন্য, যারা আল্লাহর পথে আবদ্ধ হয়ে গেছে, জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র ঘোরাফেরা করতে সক্ষম নয়। অজ্ঞ লোকদের যাঞ্ছা না করার কারণে তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে। তোমরা তাদেরকে তাদের লক্ষণ দ্বারা চিনবে। তারা মানুষের কাছে কাকুতি-মিনতি করে ভিক্ষা চায় না। তোমরা যে অর্থ ব্যয় করবে, তা আল্লাহ্ তাআলা অবশ্যই পরিজ্ঞাত।” (সূরা বাক্বারাহ্)।

যারা আল্লাহ্ তাআলার দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে সার্বক্ষণিকভাবে নিজেকে নিয়োজিত রাখার কারণে জীবিকা নির্বাহ করার মত প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে পারে না, আবার অপরের নিকট চাইতেও পারে না, তাদেরকে সাহায্যের ক্ষেত্রেও যাকাত ব্যবস্থার অবদান অনস্বীকার্য। তাছাড়া যারা অর্থ সঙ্কট জনিত কারণে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না, বিশেষ করে দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা করার ব্যাপারে যাকাত ব্যবস্থার যথেষ্ট অবদান আছে। যেসব মক্তব, মাদ্রাসায় গরীব ছাত্রদেরকে বিনা বেতনে শিক্ষা দেওয়া হয়, সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়ের এক মাত্র উৎস হল, জনসাধারণের দান, যাকাত, সাদকা ইত্যাদি। কাজেই এক্ষেত্রে যাকাতের অর্থ যথেষ্ট অবদান রাখছে। তাছাড়াও ইসলামের যাকাত ব্যবস্থা বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে অবদান রাখতে সক্ষম, যা একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী সমাজ ও কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সহায়ক।

পরিশেষে, উপরের আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ্ তাআলা নিসাব পরিমাণ ধন-সম্পদের মালিকদের উপর যাকাত ফরয করেছেন এবং নির্ধারিত হারে যাকাত প্রদান করা অপরিহার্য। আর যাকাত আদায় না করাটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যাকাতের অর্থ দরিদ্র, দুঃস্থ, ফকীর, মিসকীন, অসহায় মানুষের প্রাপ্য। আর এসব মানুষের দারিদ্রতা বিমোচন ও পুনর্বাসনে ইসলামের যাকাত ব্যবস্থার যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।

প্রতিটি নিসাব পরিমাণ মালের অধিকারী ব্যক্তির নিকট থেকে সঠিকভাবে ইসলামী বিধান মোতাবেক যাকাত আদায়ের ব্যবস্থা করে সে অর্থে শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, ক্ষুদ্র শিল্প, কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের তহবিল যোগান ইত্যাদির মাধ্যমে অসহায় বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কর্মক্ষম গরীব, মিসকীন, দুঃখী মানুষকে এসব কর্মক্ষেত্রে নিয়োগ করে তাদের জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাছাড়াও যাকাতের অর্থে রিকশা, ভ্যানগাড়ী, ঠেলাগাড়ী ইত্যাদি ক্রয় করে দরিদ্র, দুঃস্থ এতীম, মিসকীন, সর্বহারা অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণ করে অর্থ উপার্জনের পথ করে দেওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন প্রকার জনকল্যাণমূলক কাজ, যা একটি সমৃদ্ধশালী সমাজ ও জনকল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহায়ক সেসব ক্ষেত্রে এ অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে। অতএব, দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের যাকাত ব্যবস্থার অবদান যথেষ্ট এবং অনস্বীকার্য। আর এ ব্যবস্থা কার্যকর করার ব্যাপারে শাসক শ্রেণী ও জনসাধারণ উভয়ের প্রচেষ্টা একান্ত কাম্য।

– মুফতী মুনরি হোসাইন কাসমেী, ফাযেলে- দারুল উলূম দওেবন্দ (দাওরা ও ইফতা), মুফতী ও মুহাদ্দসি- জাময়িা মাদানয়িা বারধিারা, ঢাকা এবং উপদষ্টো সম্পাদক- উম্মাহ ২৪ ডট কম।

উম্মাহ২৪ ডটকম: এসএএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

ভারতের মতো শ্রীলঙ্কাও মুসলমানদেরকে কলঙ্কিত করতে করোনভাইরাসকে হাতিয়ার করছে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.