Home নির্বাচিত সংবাদ তুরস্কের ঐতিহাসিক ‘আয়া সোফিয়া’ যেভাবে মসজিদে রূপান্তরিত হয়েছিল!

তুরস্কের ঐতিহাসিক ‘আয়া সোফিয়া’ যেভাবে মসজিদে রূপান্তরিত হয়েছিল!

ঐতিহাসিক হাজিয়া সোফিয়া মসজিদ।

।। রফিক বিন আলী ।।

>> হাজিয়া সোফিয়া বা আয়া সোফিয়া নির্মিত হয়েছিল ৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ান (প্রথম)এর শাসনামলে। এটি তদানীন্তন কনস্ট্যান্টিনোপলে (বর্তমান ইস্তাম্বুলে) খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং একই সাথে এটি হয়ে উঠে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যীয় অনুষ্ঠানের যেমন রাজ্যাভিষেকের জন্য প্রধান স্থাপনা।

>> ১৪৫৩ সালে উসমানিয়া খলিফা আবুল ফতেহ সুলতান মোহাম্মদ ইস্তাম্বুল বিজয়ের পর খ্রিস্টান ধর্মীয় নেতাদের কাছে এটি ক্রয় করে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থে নয়, বরং নিজের ব্যক্তিগত অর্থ দ্বারা।

>> সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মদ (আবুল ফতেহ সুলতান মোহাম্মদ) শত্রু এবং ইতিহাস সম্পর্কে অত্যন্ত বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান ছিলেন। শাসক হিসেবে রাজ্যের কোষাগার কিংবা মুসলমানদের “বায়তুল মাল” থেকে কোনো অর্থের পরিবর্তে তিনি ওই ভবন ক্রয় করার প্রস্তাব দেন একান্ত ব্যক্তিগত সম্পদ দ্বারা, যা ছিল এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ।

১৪৫৩ খ্রীস্টাব্দে হরিণের চামড়ার উপর লিখিত খ্রীস্টান ধর্মীয় নেতাদের কাছ থেকে আয়া সোফিয়া ক্রয়ের দলীল এবং (ডান পার্শ্বে) তৎকালীন সময়ের মানচিত্র। সূত্র- জিডিএলআরসি, ২০০৫/এ।

খ্রিস্টান ধর্মীয় নেতারা “আয়া সোফিয়া”কে বিক্রয় করতে সম্মত হওয়ার পর একজন সাধারণ মুসলমান হিসেবেই তিনি ওই সম্পদ ক্রয় করতে একটি ব্যক্তিগত চুক্তি স্বাক্ষর করেন তাদের সাথে, যেটির সাথে প্রশাসনিক কোনো সংশ্লিষ্টতা রাখেননি।

>> লেনদেনটি ক্রয় ও স্বত্বত্যাগের একটি চুক্তির মাধ্যমে নথিভুক্ত করা হয়েছিল, এবং মূল্য পরিশোধের বিষয়টি ভাউচার দ্বারা প্রমাণিত।

>> এভাবেই “আয়া সোফিয়া” খ্রিস্টানদের কাছ থেকে ক্রয় করে নেওয়ার পরপরই আবুল ফতেহ সুলতান মোহাম্মদ (আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হউন) সেখানে একটি ওয়াকফ এসোসিয়েশন গঠন করেন, এবং আয়া সোফিয়া ভবনটিকে তাদের মালিকানায় দান করে দেন এবং তিনি ওসিয়তনামা লিখে যান। যাতে নিম্নোক্ত কথাও লেখা ছিল-

“এই ভিত্তি কেউ যদি পরিবর্তন করে, তার এবং তাদের উপরে আজীবন ধরে আল্লাহ পাকের, নবীজী (সা.) এর, ফেরেস্তাকূলের, সকল শাসকগণের এবং সকল মুসলমানের লানত পড়ুক! আল্লাহ পাক যাতে তাদের কবরের আজাব মাফ না করেন, হাশরের দিনে তাদের মুখের দিকে যাতে না তাকান!

এই কথা শোনার পরেও কেউ যদি একে পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে যায়, পরিবর্তনের গুনাহ তার উপরে পড়ুক! আল্লাহর আজাব পড়ুক তাদের উপরে! আল্লাহ পাক সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”

– আবুল ফতেহ সুলতান মুহাম্মদ, (১লা জুন, ১৪৫৩)।

** এই বিষয়টি কয়েক সপ্তাহ আগে তুরস্ককে কাঁপিয়েছিল, যখন ২৭ হাজার নথিপত্রের ম্যানুয়ালি যাচাই করা হয়েছিল এবং সৌভাগ্যবশত তারা একটি মূল শিরোনাম দলিল (ওয়াকফ সম্পত্তির মালিকানা দলিল) স্পষ্টভাবে খুঁজে পেয়েছিল।

(ছবি সংযুক্ত করা হলো এখানে)

** এরপর প্রকৃত মালিক কর্তৃপক্ষ একটি দরখাস্ত দায়ের করে, যাতে তাদের সম্পত্তি তারা পূর্ণ স্বাধীনতার সাথে ব্যবহার করতে পারে। একই সাথে তারা অনুরোধ জানায় এটিকে একটি মসজিদে রূপান্তরিত করে দিতে, ঠিক যেভাবে এটি ক্রয়ের প্রথম দিন থেকে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।

সমস্ত ঐতিহাসিক দলিল এবং হিস্টোরিক্যাল ফ্যাক্টস এটিই প্রমাণ করে যে, আয়া সোফিয়াকে ঘিরে খ্রিস্টান সম্প্রদায় ও পশ্চিমা বিশ্বের সকল অভিযোগ মিথ্যা। এ ব্যাপারে তুরস্কের সমালোচনা করার কোনো নৈতিক অধিকার তাদের নাই এবং এটি একান্তই তুরস্কের বিচারিক বিষয়। বাহিরের কোনো দেশ কিংবা পক্ষ এখানে কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখে না।

আল্লাহ তায়ালা রহম করুন প্রেসিডেন্ট এরদোগানের প্রতি। ৫৬৭ বছর পূর্বে আল্লাহর এক নিবেদিত গোলাম উসমানীয় খলিফা আবুল ফতেহ সুলতান মুহাম্মদ (রাহ.) তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরিত করেছিলেন অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং ৫৬৭ বছর পর আল্লাহর আরেক নিবেদিত গোলাম রজব তাইয়েব এরদোগান পুনরায় সেটিকে অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মসজিদে রূপান্তরিত করে সেটির প্রকৃত মালিকানা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্পণ করেন।

ইস্তাম্বুল বিজেতা খলিফা আবুল ফতেহ সুলতান মুহাম্মদ (রাহ.) ইন’শা’আল্লাহ একজন জান্নাতী। কারণ, রাসূল মোহাম্মদ (সা.) বলেছিলেন, মুসলমানদের যারা ইস্তাম্বুল বিজয় অভিযানে শামিল থাকবে, তারা জান্নাতী। একজন জান্নাতী মানুষের অন্ত:স্থলের অব্যক্ত দোয়া বর্ষিত হউক প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং তাঁর সাথীদের প্রতি।

উল্লেখ্য, পৃথিবীতে কি এমন কোনো নজীর আছে মুসলমানেরা অন্য ধর্মের কোনো উপাসনালয়কে খারাপ কিছুতে রূপান্তরিত করেছে? মুসলমানদের দেড় হাজার বছরের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে এমন একটি উদহারন কেউ খুঁজে পাবে না।

স্পেনে মুসলমানদের ভাগ্য বিপর্যয়ের পর বহু মসজিদকে মদের বার ও ড্যান্স ক্লাব বানানো হয়েছে এবং বহু মুসলমানকে জোরপূর্বক খৃষ্টান বানানো হয়েছে। এইতো সেদিনের কথা, মুসলমানদের মসজিদকে মদের বার বানিয়েছে ইসরাইল।

মুসলমান নামধারী যারা আজ ‘আয়া_সোফিয়া’কে তার আসল পরিচয়ে ফিরিয়ে আনার ঘটনায় সমালোচনা করছে, তারা কি কখনো কেঁদেছে যখন মসজিদকে পানশালা ও পতিতালয়ে রূপান্তরিত করা হয়েছে? পৃথিবীতে বহু স্থানে মুসলমানেরা অমুসলিমদের অত্যাচারে ধর্মীয় অধিকার হারিয়েছে। মানবিক অধিকার হারিয়ে প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত হচ্ছে। কখনো কি বিশ্ববাসী ওই সব তথাকথিত সুশীলদেরকে দু ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিতে দেখেছে?

আল্লাহর নাম যখন ধ্বনিত হয় মসজিদের মিনার থেকে, তখন শয়তানের গায়ে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। আয়া সোফিয়ার ঘটনায় যাদের জ্বালাপোড়া শুরু হয়েছে, বুঝতে হবে কেন হচ্ছে এই জ্বালাপোড়া!

পৃথিবীতে আরেকটি স্থান বৃদ্ধি পেলো যেখান থেকে শয়তানের গায়ে এসিড নিক্ষেপ করা হবে।

আরও পড়তে পারেন-

* ‘আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা পেতে হলে সঠিক আক্বিদা-বিশ্বাসে ফিরে আসা জরুরী’

* বিশ্বব্যাপী একই দিনে ঈদ উদযাপন চিন্তা মনগড়া ও শরয়ী সিদ্ধান্ত বিরোধী

* পবিত্র ঈদুল আযহা ও কুরবানীর ফাযায়েল ও মাসায়েল

* ইসলামের পথে আমার জীবনকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছি: অভিনেত্রী এ্যানি খান

* মওলানা বরকতুল্লাহ আমাদের ইতিহাসের কে হন?