Home ওপেনিয়ন নতুনধারার এক রাজতন্ত্রে প্রবেশ করলো শ্রী লঙ্কা

নতুনধারার এক রাজতন্ত্রে প্রবেশ করলো শ্রী লঙ্কা

ছবি- পলা ব্রনস্টেইন।

।। আলতাফ পারভেজ ।।

শ্রী লঙ্কায় গত সপ্তাহে নির্বাচন হয়ে গেল। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এই নির্বাচনের ফল প্রচারিত হলো চরম বিকৃতভাবে।

কিছু দেশ নির্বাচনী ফলকে ‘চীনপন্থী’দের বিজয় হিসেবে দেখেছে। কেউ দেখেছে ‘ভারতপন্থী’দের পরাজয় হিসেবে। অথচ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের মূল ঘটনাটি ঘটেছে আরও গভীর-তীব্র-বৃহত্তর পরিসরে। যার ভুক্তভোগী হবে চীন বা ভারত নয়, দেশটির জনগণ।

আপাতদৃষ্টিতে ‘পরিচ্ছন্ন’ এই নির্বাচনে শ্রী লঙ্কা নতুনধারার এক রাজতন্ত্রে প্রবেশ করলো। কেবল যে, দেশটিতে প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী এখন একই পরিবারের হলো তাই নয়—সমাজ ও প্রশাসনে রাজাপাকসা পরিবারের বিপুল আধিপত্য কায়েম হলো।

এক ভাইয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা-সচিব থাকাকালে যুদ্ধাপরাধের বিপুল অভিযোগ এবং অপর ভাইয়ের বিরুদ্ধে পূর্বে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে দুর্নীতির অভিযোগ ধামাচাপা পড়লো ধর্মীয় এবং উগ্র জাতিবাদী শক্তিসমূহকে সংঘবদ্ধ করার মাধ্যমে। এবং বিশেষভাবে, সামরিক আমলাতন্ত্রের প্রত্যক্ষ মদদে এই বিজয় এলো। স্মরণযোগ্য যে, রহস্যময় এক বোমা হামলাও এই ‘বিজয়’-এর পটভূমি হিসেবে কাজ করেছে।

আরও পড়তে পারেন-

হিজরত ও হিজরী সন: ত্যাগের মহিমা ও উজ্জীবিত হওয়ার প্রেরণা যোগায়

বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি রোধ করা না গেলে ক্রমবর্ধমান অপরাধ প্রবণতার রাশ টেনে ধরা যাবে না

দাম্পত্য কলহের আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি: ঘণ্টায় ঘন্টায় সংসার ভাঙছে

ইসলামের মত একটি সমৃদ্ধ ও যুক্তিভিত্তিক ধর্ম আর কোনোটি নেই: রাণী এলিজাবেথ

ট্রাম্প মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য হুমকি: ওবামা

সংক্ষেপে বলা যায়, ‘নির্বাচনী গণতন্ত্র’-এর মধ্যদিয়েই দেশটি গুটিকয়েকের কর্তৃত্ববাদী শাসনে প্রবেশ করলো। হিন্দু-তামিল, মুসলমান-তামিল, খ্রিস্টানসহ দেশটির জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য আগামীদিনগুলো দুঃসহ হয়ে ওঠার শঙ্কা তৈরি হয়েছে ইতোমধ্যে।

‘সিংহলি-বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ’ রাজাপাকসাদের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও দিয়েছে যাতে সংবিধান ইচ্ছামতো পাল্টে নেয়া যায়। রাজাপাকসারা দ্রুতই সেই কাজটি করবে। নতুন সংবিধানে দেশটির ফেডারেল বৈশিষ্ট্য কমিয়ে তাকে আরও এককেন্দ্রীক করে তোলা হবে এবং সমাজ জীবনে মূল জাতির সংস্কৃতিকে আরও প্রাধান্যের জায়গায় স্থাপন করা হবে বলে জোর আয়োজন চলছে।

শ্রী লঙ্কার এই ‘নতুন যাত্রা’ অনুমান-অযোগ্য ছিল না। তিন-চার বছর আগে ‘ঐতিহ্য’ প্রকাশিত লিখিত এই গ্রন্থটিতে স্বাধীনতা-উত্তর শ্রী লঙ্কার রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ শেষে এরকম অনুমানই করা হয়েছিল। বাংলাদেশে শ্রী লঙ্কাচর্চার আগ্রহহীনতার কারণে গ্রন্থটি খুব বেশি আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে বলে মনে হয়নি। তবে শ্রী লঙ্কার ইতিহাসের পূর্বাপর অনেক কিছুর সংগে বাংলাদেশের গভীর মিল দেখা যায়।

শ্রী লঙ্কার রাজনৈতিক ইতিহাসের আজকের সর্বশেষ পরিণতির বড় একটি কারণ দেশটিতে জাতিগত ও ধর্মীয় বহুত্ববাদের রক্তাক্ত পরাজয় এবং আন্তঃজাতি সম্পর্কের গণতন্ত্রায়নের ব্যর্থতাজনিত। বাংলাদেশ হয়তো এই অভিজ্ঞতার একেবারে বাইরে নেই।

উপনিবেশ-শাসন-উত্তর দক্ষিণ এশিয়ায় জাতিগত সম্পর্কের গণতন্ত্রায়ণ এবং প্রশাসনের আমূল সংস্কারে গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের ব্যর্থতা কীভাবে পুরো অঞ্চলজুড়ে ক্রমে ফ্যাসিবাদের জমিন তৈরি করেছে শ্রী লঙ্কা এবং আশ-পাশের দেশগুলো তার বড় নজির।

কিন্তু এসব দেশের রাজনৈতিক ঘটনাবলীকে বিশ্লেষণের সময় আজকাল সমাজের গভীরে থাকা জাতিগত, বর্ণগত, প্রশাসনিক এবং ধর্মীয় ঐতিহাসিক বিবেচনাগুলো সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাবলীকে ব্র্যান্ডিং করা হয় চীন-ভারতের স্বার্থের জায়গা থেকে।

কে চীনপন্থী আর কে ভারতপন্থী—তার চেয়েও জরুরি যে, দেশজ সমাজ-বিন্যাসে কার কী অবস্থান ও অঙ্গীকার– সেই বিবেচনাসমূহ আপাতত নিহত। মনে হচ্ছে নয়াদিল্লী আর বেইজিংই আশেপাশের দেশগুলোর মানুষকে ‘মুক্তি’ এনে দেবে! হাস্যকর এক অবস্থা!!

– আলতাফ পারভেজ, ইতিহাস বিষয়ে গবেষক।

উম্মাহ২৪ডটকম:এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।