Home ওপেনিয়ন তদন্তের প্রয়োজনে নয় স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য যখন রিমান্ড

তদন্তের প্রয়োজনে নয় স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য যখন রিমান্ড

- এন আফরোজ রোজী।

।। এন আফরোজ রোজী ।।

ঘোড়াঘাট ইউএনও’র উপর হামলা সংক্রান্ত মামলার তদন্ত শুরুর পর এ পর্যন্ত যাকেই ধরা হয়েছে সেই হামলার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। যুবলীগ নেতা আসাদুল ও জাহাঙ্গীর, এরপর দুজন রংমিস্ত্রী এবং সর্বশেষ ইউএনও’র বাসভবনে টাকা চুরির দায়ে সাময়িক ভাবে বরখাস্ত হওয়া মালি রবিউল এ হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে গতকাল রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। পুলিশ আরো জানাচ্ছে- এ ঘটনায় আগে ৱ্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়াদের কোন সম্পৃক্ততার প্রমাণ তাঁরা পায়নি। দেখা যাক আর কে কে এ ঘটনার দায় স্বীকার করে দৃশ্যপটে আসে। তবে প্রশাসনের কেউকেটা না হয়ে অন্য কেউ হলে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ এবং ‘বেডরুম পাহারা দেয়া সম্ভব না’ এই থিওরি চালিয়ে দেয়া হতো।

কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জে তিন যুবক এক কিশোরীকে অপহরণ ও ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়ার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার ৫১দিন পর ওই কিশোরী জীবিত ফিরে আসে। জানা যায়, সে তার প্রেমিককে বিয়ে করে অন্য এলাকায় বসবাস তথা সংসার করছিল। তিন যুবকের পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ একদিকে টাকা নিয়েছে অন্যদিকে রিমান্ডে নির্যাতন করে, ভয় দেখিয়ে এই মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করেছিল। এই ঘটনায় তিনজনই কারাগারে আছেন।

বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী ও রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মিন্নিকে গ্রেপ্তার করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। আইনজ্ঞরা বলছেন, রিফাত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে মিন্নির কাছ থেকে আদালতে স্বীকারোক্তি আদায় করার প্রক্রিয়াটি বেআইনি ও সংবিধানবহির্ভূত।

কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে নিহত অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যাকান্ডকে পুলিশের হঠকারী ও অপেশাদারী আচরণ বলে উল্লেখ করেছে স্বয়ং পুলিশের নিয়িন্ত্রণকারী মন্ত্রনালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। এ তদন্তে পুলিশের ভুয়া মামলা সাজানোর বিষয়টিও উঠে এসেছে। যে ট্রাকে করে সিনহাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল সেই ট্রাকের চালক কমিটিকে বলেছেন ‘ওসি প্রদীপ আসার পর কনস্টেবল মামুন সিনহার গাড়ীর ভেতরে দুটি প্যাকেট রাখে’। গাড়ীর লুকিং গ্লাস দিয়ে তিনি এ দৃশ্য দেখেন। আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন লামার বাজারের বাবুলের দোকান থেকে কনস্টেবল মামুন ২০০ টাকায় এ গাঁজা কিনেছিলো। ঘটনার পর সিনহা এবং সিফাতের বিরুদ্ধে যে ভুয়া মাদকের মামলা হয় তা সাজায় ওসি প্রদীপ। ৩জন গ্রামবাসীকে জোরপূর্বক সাক্ষী হিসাবে দাঁড় করায়।

আরও পড়তে পারেন-

পুলিশের নির্যাতনে মৃত্যু , ভুয়া মামলা, তদন্তের নামে রিমান্ডে নিয়ে ভয়ভীতি ও নির্যাতন করে ইচ্ছামতো স্বীকারোক্তি আদায় করার এমন অসংখ্য ঘটনা আছে। সাত বছর আগে ২০১৩ সালে পাস্ হওয়া নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ ) আইনে করা প্রথম একটি মামলার রায় হয়েছে গত ৯ই সেপ্টেম্বর।২০১৪ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি পল্লবী থানায় ইশতিয়াক নামের এক যুবককে সোর্সের সাজানো অভিযোগের ভিত্তিতে ধরে এনে পুলিশ বেধড়ক পেটায় এবং বুকের উপর পা দিয়ে চেপে ধরে।পৈশাচিক এই নির্যাতনে ইশতিয়াক মারা যান।একটু পানির জন্য আকুতি জানালে পানি না দিয়ে তাঁর মুখে থুথু ছিটিয়ে দেয় নির্যাতনকারী পুলিশ। আদালত এ মামলার বিচার বিভাগীয় তদন্তের আদেশ দেন। এ মামলার রায়ে আদালত অভিযুক্ত ৩ পুলিশ সদস্যের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়।

জিজ্ঞাসাবাদের নামে মারাত্মক নির্যাতনের শিকার হয়েছে এমন একজন বলেন ‘নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পরলে পুলিশের পক্ষ থেকেই তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে আবারো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ‘দুই হাত ওপরে তুলে বাঁধার পর দুই পায়ের আঙ্গুলের ওপর দাঁড় করানো, বৈদ্যুতিক শক দেয়া, কম্বল থেরাপি (কম্বল পেঁচিয়ে পেটানো), বস্তা থেরাপি (বস্তায় পুরে পেটানো-আছড়ানো), বাদুড়ধোলাই (উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো), ড্যান্সিং টর্চার (বৈদ্যুতিক শক), পায়ুপথে লাঠি বা গরম ডিম ঢোকানো, পেনিস থেরাপি ইত্যাদি ধরনের রোমহর্ষক নিপীড়নে হেফাজত করা হয় সেখানে। আর রিমান্ডের আসামিটি নারী হলে হেফাজতের নমুনা হয় আরও জঘন্য-অকথ্য। সুস্থ-স্বাভাবিক কোনো নারীর পক্ষে রিমান্ডের সেই বর্ণনা বাইরের কারও কাছে বলার মতো নয়। তাই এরকম করলে তো যে কোনো স্বীকারোক্তি আপনার কাছ থেকে নেয়া সম্ভব’। হরিণকে রিমান্ডে এনে কুকুর বলে স্বীকার করানোর আইনি কৌতুকরে জন্ম এসব থেকেই হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও স্বীকারোক্তি নেওয়ার প্রক্রিয়া সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী ও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তবে আমরা প্রায় সব ক্ষেত্রেই বেআইনি প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ফলে আইনবহির্ভূত পদক্ষেপ নীরবে মেনে নিতে হচ্ছে।’

নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ ) আইনে, ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তা হেফাজতে শারীরিক এমনকি মানসিক নির্যাতনেরও বিচার চাইতে পারেন তাই পুলিশের পক্ষ থেকে একসময় এ আইনটি বাতিলের দাবিও উঠেছিল। তবে এ আইনের প্রয়োগ দেশে নেই বললেই চলে। কারণ আইনে নির্যাতনের প্রতিকারের সুযোগ থাকলেও ভুক্তোভূগীদের প্রশ্ন, আইনের আশ্রয় নেয়ার পরিণতি যে আরো ভয়াবহ হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়! এ নিশ্চয়তা সত্যিকার অর্থেই দুরাস্ত কারণ সংবিধানের গণমুখী অনুচ্ছেদগুলো শুধু কেতাবেই লিপিবদ্ধ, আত্মকেন্দ্রীক ও গোষ্ঠীকেন্দ্রীক রাজনীতির কারণে দেশের মানুষ সে সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে আইন ও সাংবিধানিক শাসন এখন সুদূরপরাহত, বিপন্ন ও অনিশ্চিত।

– এন. আফরোজ রোজী, সমাজ চিন্তক ও শিল্পোদ্যোক্তা।

উম্মাহ২৪ডটকম:এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।