Home লাইফ স্টাইল আনুগত্যের গুরুত্ব ও সীমারেখা

আনুগত্যের গুরুত্ব ও সীমারেখা

।। মাওলানা মুহাম্মদ আবুল আবরার ।।

আনুগত্য হচ্ছে ইসলামের মূল। আনুগত্য ছাড়া কেউ মুসলিম হতে পারে না। মুসলিম মানেই অনুগত, আত্মসমর্পণকারী। আল্লাহ তায়ালার কাছে আত্মসমর্পণ করে তাঁর বিধানের অনুগত বান্দাই মুসলিম। তাই সে আল্লাহরই আজ্ঞাবহ। তাঁর বিধিবিধান সানন্দে পালন করে। এতে নবী-রাসূলদের (আ.) স্থান সর্বাগ্রে। তাঁরা সরাসরি আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে নির্দেশিত হতেন এবং তাঁরই সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সর্বপ্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে নিজেদেরকে আল্লাহর হুকুমের কাছে উৎসর্গ করতেন। কুফর মিশ্রিত ঈমান ও বস্তুবাদী চিন্তাধারায় তাঁদের প্রতি আল্লাহর অনেক নির্দেশই অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক (নাঊযুবিল্লাহ্) এবং তাঁদের দ্বারা তা পালন ও এর ফলাফল অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। মূলতঃ তাই ছিল বাস্তব, সঠিক ও কল্যাণকর।

যেমন- নবী ইবরাহীম (আ.)এর আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া ও পুত্রকে কুরবানী দেওয়া; মূসা (আ.)কে ফিরআঊনের ধাওয়া কালে লাঠি দিয়ে নদীতে আঘাত করা এবং সাইয়্যিদানা রাসূলুল্লাহ (সা.)কে কুরাইশ কর্তৃক ঘেরাও কালে নিরস্ত্র অবস্থায় বের হওয়ার নির্দেশ ও তা পালন করাকে বস্তুবাদী জ্ঞানে বোকামীই বলা হতে পারে। অথচ এতেই ছিল সফলতা। অন্যথায় তাঁরা যদি আল্লাহর আনুগত্য না করে ইব্লিশের মত যুক্তি দেখাতে যেতেন, তবে তার মত তাঁরাও অভিশপ্ত হওয়া থেকে রেহাই পেতেন না।

মূসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য না করে বলতে পারতেন, লাঠি দিয়ে পানিতে আঘাত করার চেয়ে ফিরআঊন বাহিনীর দিকে আঘাত করার যৌক্তিকতা বেশী। আমাদের নবী (সা.) বলতে পারতেন- খালি হাতে বের হওয়ার চেয়ে অন্তত: ঘরের একটি খুঁটি ভেঙ্গে হাতে নিয়ে বের হওয়া যুক্তিসঙ্গত। এভাবে ইব্রাহীম, নূহ্ (আ.)সহ সকলেই আল্লাহর সাথে তর্ক করতে পারতেন। কিন্তু তাতে ধ্বংস অনিবার্য ছিল।

কারণ স্রষ্টার আনুগত্যেই সৃষ্টির কল্যাণ নিহিত। তাঁর আনুগত্য না করার কারণেই ইবলিশ শয়তান তিরস্কৃত ও অভিশপ্ত হয়ে ফেরেশ্তাকূল থেকে বহিস্কৃত হয়ে ছিল। আনুগত্যহীনতার পরিণতি এটাই।

নবী-রাসূলগণ (আ.) যেভাবে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য করতেন, অন্যদের জন্য এর প্রকৃতি একটু পরিবর্তন করে সহজ করা হয়েছে। যেহেতু অন্যদের কাছে ওয়াহী অবতীর্ণ হয় না, তাই তারা আল্লাহর আনুগত্যের সাথে নবী-রাসূলগণেরও আনুগত্য করবে। আর এই নির্দেশও স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার। ইরশাদ হচ্ছে- “হে নবী! ওদের বলে দিন, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর। অতঃপর যদি তারা তোমার আহ্বান গ্রহণ না করে, তবে (তাদের জানা উচিত) আল্লাহ কাফিরদেরকে (আল্লাহ ও তাঁর বিধান অমান্যকারী) পছন্দ করেন না।” (সূরা ইমরান- ১৩২)।

আরও পড়তে পারেন-

বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য অমান্যকারীকে কাফির হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সূরা মুহাম্মদের ৩৩ নম্বর আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যহীনতার কারণে আমল বাতিল হয়ে যাবে। এভাবে কুরআন মাজীদের অনেক আয়াতে (যেমন- সূরা ইমরান- ১৩২, সূরা আহ্যাব- ৭১, সূরা নিসা- ৮০) আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করার গুরুত্ব সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে।

মনে রাখতে হবে, আল্লাহ ও রাসূল (সা.)এর আনুগত্য করা মানে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করা। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইরশাদ করেন, “তোমাদের মাঝে আমি দু’টো জিনিস রেখে যাচ্ছি, তোমরা অবশ্যই পথভ্রষ্ট হবে না যতক্ষণ তা আঁকড়ে ধরবে। জিনিস দু’টো হলো, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহ্ (আদর্শ)।” (মালেক)।

সাহাবী ইমরান ইব্নে হুসাইন (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, “কুরআন নাযিল হল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা.)এর সুন্নাত প্রতিষ্ঠিত করলেন। অতঃপর বললেন, তোমরা আমার অনুসরণ কর। আল্লাহর ক্বসম, যদি তা না কর, তবে তোমরা গুমরাহ্ হয়ে যাবে। (মুসনাদে আহ্মদ)।

কুরআন ও হাদীসের এসব নির্দেশ থাকার কারণে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)এর সাহাবীগণ নিজেদের জীবন কুরবান করেও আল্লাহর ওয়াস্তে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)এর নির্দেশের আনুগত্য করতেন। যেমন, ওহূদের যুদ্ধে তাঁরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)কে রক্ষার্থে তাঁর নির্দেশে তাঁরা জীবন দিয়েছেন। মু’তার যুদ্ধের তিন জন সেনাপতি তাঁদের আগাম শাহাদাত সংবাদ জেনেও রাসূলুল্লাহ্ (সা.)এর নির্দেশের আনুগত্য করতে মৃত্যুর দুয়ার খুলে দিতে যুদ্ধে শরীক হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। এভাবে অনেক অনেক নিদর্শন বহন করে তাঁরা ইতিহাসকে আমাদের জন্য সাক্ষ্য বানিয়ে অমর হয়ে আছেন।

উল্লেখ্য, তাঁরা আমাদের মত নফল-মুস্তাহাবের নামে শিরক ও বিদ্আত করতেন না। বরং আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের উপর জীবন যাপন করতেন। আমাদের সমাজে রাকাআত বাড়ানোর নামায, খতম ও আয়াতের সংখ্যা বাড়ানোর তিলাওয়াত এবং অশুদ্ধ ও বিকৃত উচ্চারণের (কখনো বিভ্রান্তিকর অর্থের) লক্ষ বারের যিকর, তাসবীহ্ ও দরূদ আছে। কিন্তু নেই আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য, সুন্দর কবুলযোগ্য ধীর-স্থিরের নামায, তিলাওয়াত, যিকর ও তাসবীহ্-দরূদ। অথচ রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে লোক আল্লাহর আনুগত্য করল, সে-ই আল্লাহর যিকর করল, যদিও তার (নফল) নামায-রোযা ও কল্যাণময় কাজ খুব কমই হল।” (জামে লি আহ্কামিল কুরআন-২/১৭১)।

সর্বস্তরের মানুষের জন্য ইসলামী জীবন ধারণ সুগম করণ ও ইসলামী সমাজের শৃংখলা সুপ্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য পবিত্র কুরআন ও হাদীসের দ্বারা আল্লাহ ও রাসূল (সা.)এর আনুগত্যের সাথে সাথে উলুল আমরের আনুগত্যকে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। উলুল আমর বলতে সেই সব ব্যক্তিকেই বুঝায়, যারা মুসলিম সমাজের পরিচালক। আলেম-উলামা, ন্যায়সঙ্গত শাসক, বিচারপতি এবং সর্দার-মাতব্বরসহ নেতা-সেনাপতি সকলেই উলুল আমরের মধ্যে গণ্য। নিম্নবর্ণিত আয়াতের তাফ্সীরে মাআরিফুল কুরআন, নূরুল কুরআন, তাফসীরে তাহেরী ইত্যাদি গ্রন্থে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। “হে মু’মিনগণ! আনুগত্য কর আল্লাহ ও রাসূলের এবং সেইসব লোকদের যারা তোমাদের মধ্যে (ন্যায়সঙ্গত) শাসক। অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন মতবিরোধ হয়, তবে উহা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান এনে থাক।” (সূরা নিসা- ৫৯)।

উল্লিখিত আয়াতের প্রেক্ষাপটে তাফ্সীরে নরুল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবী আব্দুল্লাহ্ ইব্নে হুযাইফা (রাযি.) তাঁর অধীনস্তদের নির্দেশ দিলেন আগুনে ঝাঁপ দিতে। কিন্তু তারা ঝাঁপ না দিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)এর প্রতি প্রত্যাবর্তন করে ঘটনা বর্ণনা করলেন। হুযূর (সা.) বললেন, যদি তোমরা অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়তে, সর্বদা আগুনেই থাকতে। মনে রেখ আনুগত্য শুধু সৎকাজেই করতে হয়।”

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) আরো ইরশাদ করেছেন, “স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না।” (আহমদ)।

উল্লিখিত বর্ণনা থেকে পরিস্কার হয়ে গেল যে, আল্লাহ ও রাসূল (সা.)এর আনুগত্য করতে হবে নির্দ্বিধায়। আর অন্য যে কোন (পীর-দরবেশ, আলেম, নেতা, মুরুব্বী) ব্যক্তির আনুগত্য হবে শর্ত সাপেক্ষ। অর্থাৎ- আল্লাহ ও রাসূল (সা.)এর বিধান মুতাবেক হলেই মানা যাবে। অন্যথায় নয়। হযরত আবুবকর ও উমর (রাযি.) খলীফা নির্বাচিত হওয়ার পর অভিষেক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিধান মুতাবেক হুকুম দেব, কেবল ততক্ষণই আমাকে মানবে।”

হযরত উমর (রাযি.)এর এক প্রশ্নের জবাবে তো মজলিশের এক সাধারণ লোক দাঁড়িয়ে বললেন- আপনি কুরআন ও সুন্নাহর বিরুদ্ধে চলে গেলে এই তরবারী দিয়ে ফায়সালা করব। এবং হযরত উমর (রাযি.) এ কথা শুনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে ছিলেন। মূলতঃ এভাবেই তো মু’মিন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য না করার শপথ নিয়েছে- ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ (সা.)এর মাধ্যমে।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।