Home অর্থনীতি কেনাকাটায় পেমেন্ট প্রদানে কিউআর কোডের ব্যবহার এবং ডিজিটাল অর্থনীতি

কেনাকাটায় পেমেন্ট প্রদানে কিউআর কোডের ব্যবহার এবং ডিজিটাল অর্থনীতি

।। শামস আরেফিন ।।

ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যম কিউআর কোডে নগদ টাকার ব্যবহার ছাড়া বা কেনাকাটায় পেমেন্ট প্রদানে ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার দেশে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ১৯৯০ সালের পরে বিশ্বে কিউআর কোডের প্রচলন শুরু হলেও আমাদের দেশে সম্প্রতি এটা চালু হয়েছে। যাতে স্মার্টফোনের বারকোড স্ক্যানারের মাধ্যমে স্ক্যান করে পেমেন্ট করা যায়। চীনে আলী পে, উইচ্যাট পে, ভারতে পেটিএম এবং কিউআর তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ১১ মার্চ বাংলা কিউআর স্ট্যান্ডার্ড ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত বাংলা কিউআর কোড দিয়ে নির্দিষ্ট যেকোনো ব্যাংকের অ্যাপ ব্যবহার করে কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন করা যায়। এতে করে ব্যাংক গ্রাহকদের বিভিন্ন পেমেন্ট নেটওয়ার্কের একাধিক কিউআর কোড ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় উদ্যোক্তা বা খুচরা বিক্রেতা এ আধুনিক পেমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহার করে দৈনন্দিন ব্যবসায়িক লেনদেন, আমদানি-রপ্তানি শুল্ক বা ভ্যাট সহজেই প্রদান করতে পারে। বলা হচ্ছে, কিউআর কোডের মাধ্যমে আধুনিক, দ্রুত ও ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। নগদ টাকা ও ব্যাংক কার্ড ব্যবহার ও বহনের পরিবর্তে এটি একটি ঝামেলামুক্ত পেমেন্ট সিস্টেম।

দেশের ১০ কোটির মতো মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং ১৬ কোটি মানুষ মোবাইল ব্যবহার করছে। যা ডিজিটাল অর্থনীতির সবেচেয়ে সম্ভাবনাময় দিক। নগদহীন সমাজ গঠনে সরকারের নিরলস প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিটি দেশে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণযোগ্যতার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। মোবাইল ব্যাংকিং থেকে ডিজিটাল ওয়ালেটে রূপান্তরের কাজও বর্তমানে চলছে। এতে করে ঘরে বসেই কেনাকাটা, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ, টিকিট কেনা, হোটেল বুকিং ইত্যাদি সব আর্থিক কার্যক্রম সহজে করা যাবে।

ব্যাংকিং খাতে কিউআর কোড ব্যবহারের সুবিধা

কিউআর কোড ভিত্তিক এই পেমেন্ট সমাধান ব্যবহার করতে গ্রাহকরা নির্দিষ্ট ব্যাংকের অ্যাপের মাধ্যমে কিউআর কোডটি স্ক্যান করে অর্থ প্রদান করার জন্য তাদের মাস্টার কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট বা প্রিপেইড কার্ড থেকে সব ধরনের আর্থিক লেনদেন করতে পারবে। এতে করে প্রথমত গ্রাহকদের বিভিন্ন পেমেন্ট নেটওয়ার্কে আর আলাদা কিউআর কোড স্ক্যান করতে হবে না। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ীরা দোকানে বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে একটি করে কিউআর কোড প্রদর্শন করে লেনদেন করতে পারবে। তৃতীয়ত, কিউআর কোডটি বৈদেশিক আন্তঃযোগাযোগ সমাধান হিসেবে অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশে আসা বিদেশি ব্যবসায়ী, বিদেশি কর্মজীবী ও ভ্রমণকারী গ্রাহকেরা স্ক্যান করে আর্থিক লেনদেন করতে পারবেন। কিউআর কোড আর্থিক খাতে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং আর্থিক সেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দিবে।

ইতোমধ্যে ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেড, ব্যাংক এশিয়া, সিটি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ও ইবিএলসহ বিভিন্ন ব্যাংক কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা পদ্ধতি চালু করেছে। এ পদ্ধতিতে সহজেই কিউআর কোড স্ক্যান করে ব্যবহারকারী যেকোনো ধরনের পেমেন্ট করতে পারবেন। দেশে বিকাশ, নেক্সাস পে, ইউপে ইত্যাদি মোবাইল ফিন্যান্সিং সার্ভিস কিউআর কোড সেবা চালু রয়েছে। কিউআর কোড দেশের অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহজীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

ব্যবসায়িক লেনদেনে কিউআর কোড ব্যবহার

বিশ্বব্যাপী করোনভাইরাসের সংক্রমণ হ্রাসে ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যার অন্যতম মাধ্যম হতে পারে কিউআর কোড স্ক্যান করে পেমেন্ট। একটা কিউআর কোডের পেছনে যদি থাকে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট, তখন ব্যবসায়ীর দোকানে থাকা কিউআর কোডের বিপরীতে পেমেন্ট করলেই হলো। আর তখন যেকোনো চা-বিক্রেতা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ট্যাক্সি চালক এবং এমনকি পাঠাওচালকও তার ভাড়া এই অ্যাপসের মাধ্যমে নিতে পারবেন। তা ছাড়া, সুপারশপগুলো তাদের গ্রাহকদের সুবিধার্থে কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট করার সুবিধা দিয়ে প্রতিদিনের ব্যয় সহজ ও সুবিধাজনক করে তুলতে পারে। যা ডিজিটাল অর্থনীতি বা নগদহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করবে।

ট্যাক্স, ভ্যাট ও আমদানি-রপ্তানি শুল্ক দেওয়ার ব্যবস্থা সহজীকরণ

বর্তমানে ট্যাক্স, ভ্যাট ও আমদানি-রপ্তানি শুল্ক দেওয়ার ব্যবস্থা সহজীকরণের জন্য কিউআর কোডের মাধ্যমে শুল্ক ও ভ্যাট দেওয়ার সুবিধা গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে করে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ও আমদানি-রপ্তানি শুল্ক প্রদান বা অগ্রিম কর প্রদান করার ব্যবস্থা যেমন সহজ হবে, ঠিক তেমনি আমদানি বাণিজ্যে পরিচালনা ব্যয় কমবে। পাশাপাশি, যেকোনো উদ্যোক্তা যিনি ট্যাক্স বা ভ্যাট পরিশোধ করতে চান দেশীয়ভাবে সংগৃহীত কাঁচামাল ও পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে, তিনিও সহজে ভ্যাট প্রদান করতে পারবেন।

কিউআর কোডের মাধ্যমে ভ্যাট প্রদান সহজীকরণ

কিউআর কোডের মাধ্যমে ভ্যাট দেওয়ার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কোনো সফটওয়্যার কোম্পানির মাধ্যমে একটি সিস্টেম ডেভলপ করে এর আওতায় একটি কিউআর কোড জেনারেট করতে পারে। যাতে করে একজন ভ্যাটদাতা তার বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বরের (বিআইএন) বিপরীতে সহজে অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে ঝামেলামুক্ত ভ্যাট প্রদান করতে পারে। ভ্যাটদাতা একজন আমদানিকারক হোক বা খুচরা বিক্রেতা বা পাইকারি বিক্রেতা বা অন্য কোনো সার্ভিস প্রোভাইডার হোক— তার প্রতিমাসে ভ্যাট প্রদান করার জন্য ভ্যাট অফিস বা ব্যাংকে চালান পূরণ করে ভ্যাট প্রদান করার প্রয়োজন পড়বে না।

আরও পড়তে পারেন-

কারণ, এ পদ্ধতিতে প্রত্যেক পণ্য আমদানি বা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট প্রদান করা হলো কি না— তার নিশ্চয়তার জন্য কিউআর কোড স্ক্যান করার পর একজন ব্যবসায়ীর বিআইএন নম্বর, মোবাইল নম্বর, ইমেইল অ্যাড্রেস ও ক্রয়কৃত পণ্য বা সেবার নাম কিউআর কোডে ইনপুট হিসেবে দিতে পারার ব্যবস্থা থাকবে— তার মোবাইল থেকে। এরপর তার প্রদত্ত ভ্যাট সংক্রান্ত এসব তথ্য এনবিআরের অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেসের (এপিআই) মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে ভ্যাটদাতার সত্যতা যাচাই করবেন। তারপর সিস্টেম থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই পণ্যের বা সেবার ওপর নির্ধারিত ভ্যাটের পরিমাণ উল্লেখ করে পেমেন্ট প্রদানের জন্য বলা হবে। এরপর ভ্যাট প্রদানের জন্য যেকোনো ব্যাংকিং চ্যানেলে পেমেন্ট বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের পেমেন্টের মাধ্যমে ভ্যাট পরিশোধ করতে চাইলে— সিস্টেমে তা সিলেক্ট করার সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাট পরিশোধ হয়ে যাবে।

এমএসএমই ডেটাবেজ সেন্টার গড়ে তোলা

করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের শিল্প খাতের (এমএসএমই) সুরক্ষায় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের সুফল নিশ্চিতে এমএসএমই ডেটাবেজ দ্রুত হালনাগাদ করা প্রয়োজন। আর ডেটাবেজ হালনাগাদকরণে কার্যকর হতে পারে আরকিউআর কোড ভিত্তিক ব্যবসায়িক লেনদেন বা ভ্যাট প্রদান। কিউআর কোডের মাধ্যমে একজন অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তা ব্যাংকিং লেনদেন, ভ্যাট বা অন্যান্য পেমেন্ট প্রদান করলে তখন উদ্যোক্তাদের লেনদেনের তথ্য-উপাত্ত এই সিস্টেমে থাকবে। এতে করে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের একটি ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা

স্বাভাবিক সময়ে বা করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত সুরক্ষায় সরকারঘোষিত বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ, সরকার প্রদত্ত নীতি সহায়তা— এলসি পেমেন্টের সময় বৃদ্ধি, ঋণ মওকুফ, কর অবকাশ সুবিধার সুফল নিশ্চিতে এমএসএমই ডেটাবেজ দ্রুত হালনাগাদ করা প্রয়োজন। আর ডেটাবেজ হালনাগাদকরণে কার্যকর হতে পারে কিউআর কোড ভিত্তিক ব্যবসায়িক লেনদেন। এই ডেটাবেজ হালনাগাদ হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সরকারি আর্থিক ও নীতিগত প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসতে সহায়তা করবে এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত এমএসএমইকে নির্ধারণ করা যাবে।

অপ্রাতিষ্ঠানিক এমএসএমই খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়ে আসা

পুঁজির অভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অনেক উদ্যোক্তাও বিকল্প ব্যবসায় সরে যাচ্ছেন। ব্যাংকিং সেক্টরের মাধ্যমে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করায় তারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারছে না। কিউআর কোড ভিত্তিক ব্যবসায়িক লেনদেন করা এবং আর্থিক কার্যক্রমে সংযুক্ত হলে এসব অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে চিহ্নিত করা যাবে এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে রূপান্তর সহজ হবে। পাশাপাশি আর্থিক সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা যাবে।

আমরা প্রত্যাশা করি— সহজ, আধুনকি ও প্রযুক্তি-বান্ধব কিউআর কোড দেশে পর্যায়ক্রমে সকল শ্রেণির ব্যবসায়িক কার্যক্রমে চালু করা সম্ভব। এ ছাড়া, এই বাংলা কিউআর কোড আমাদের ই-কমার্স কার্যক্রমসহ সত্যিকার অর্থে অর্থনৈতিক ডিজিটালাইজেশনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে, ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।

শামস আরেফিন, গবেষণা সহযোগী ও উপসচিব, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি
[email protected]

উম্মাহ২৪ডটকম: এসএএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।