Home ইতিহাস ও জীবনী রোমান বনাম ইসলামী আইন: কর্তৃত্ববাদের বয়ান!

রোমান বনাম ইসলামী আইন: কর্তৃত্ববাদের বয়ান!

।। মুসা আল হাফিজ ।।

জোসেফ ফ্রাঞ্জ শাখত (১৯০২-১৯৬৯) জন্মেছিলেন পোল্যান্ডে। মারা যান আমেরিকার নিউজার্সিতে। জাতীয়তায় জার্মান-ব্রিটিশ। জার্মানির ফ্রাইবুর্গ ও নেদারল্যান্ডসের লাইডেন ইউনিভার্সিটির নিয়োগকর্তা ছিলেন। অধ্যাপনা করেন নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিষয় ছিল আরবি ও ইসলাম। পশ্চিমা দুনিয়ায় তিনি ইসলাম প্রশ্নে ছিলেন শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ, মুসলিম দুনিয়ার পশ্চিমাপ্রভাবিত পণ্ডিতকুলেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ। তার সবচেয়ে আলোচিত বইয়ের নাম The Origins of Muhammadan Jurisprudence। প্রকাশিত হয় ১৯৫০ সালে। প্রকাশক- Oxford: Clarendon Press।

বইটি বিবিধ বিষয়ের পাশাপাশি ইসলামী আইন প্রশ্নে এমন কিছু প্রসঙ্গের বয়ান করে, যার মুখোমুখি হওয়ার জন্য মুসলিম মন প্রস্তুত ছিল না। পশ্চিমা দুনিয়া একে নিয়ে খুব আহ্লাদিত ছিল। বিশেষত তখন, যখন শাখত দাবি করেন, ইসলামী আইন রোমান আইনের সন্তান! এ দাবি প্রথম উচ্চারিত হয় এর শতাব্দীকাল পূর্বে, ইতালিয়ান ভদ্রলোক ডোমেনিকো গাথেসকির বয়ানে। যদিও কার্লো আলফন্সো নালিনিউ (১৮৭২-১৯৩৮) এমন দাবিকে ‘কল্পনাভিত্তিক অনুমান’ এর অধিক মূল্য দিতে রাজি নন।

গাথেসকি একে বয়ান আকারে হাজির করেন ইতালিয়ান ভাষায় প্রকাশিত তার সঙ্কলনগ্রন্থে, যার নাম Manuale Di Diritto Pubblico E Privato Ottomano বা সাধারণ ও বিশেষ ওসমানী আইন। এটি প্রকাশিত হয় ১৮৬৫ সালে। Real property, mortgage and wakf according to Ottoman lwa নামে এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৮৮৫ সালে।

এ দাবির সারবত্তা ঔপনিবেশিক পশ্চিমের কাছে দরকারি ছিল না, দরকারি ছিল দাবিটাই। মুসলিমদের ভালো জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সম্পদ থাকতে নেই, আর যদি থাকে, এর উৎস নিহিত আছে পশ্চিমে, এর মালিক হচ্ছে পশ্চিমারা। এ ছিল সাধারণ অর্থে মুসলিম মনের উপর উপনিবেশ জারির বিশেষ বয়ান। অতএব এমন বয়ানকে প্রমাণ থেকে জন্ম নিতে হবে, তা নয়, বয়ান যে এসেছে, সেটাই ছিল প্রমাণ।

১৮৮০ সালে আমেরিকান সমাজতাত্ত্বিক ও আইনবিদ হেনরি হিউজ (১৮২৯-১৮৬২) বলে বসলেন, ‘ইসলামী আইন আসলে রোমান আইন, যাতে অতি কষ্টে কিছু কথা বদলানো হয়েছে।’ ইংরেজ আইনবিদ শেলডন আমোস (১৮৩৫-১৮৮৬) ডেভিড ডি সান্টিলানা (১৮৫৫-১৯৩১) কিংবা হাঙ্গেরিয়ান পণ্ডিত ইগনাজ গোল্ডযিহার (১৮৫০-১৯২১) এই দাবিকে আরো জোরদার করতে সচেষ্ট থেকেছেন।

প্রফেসর নালিনি দেখিয়েছেন, এর বিপরীতে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল নানা রকম। উদাহরণ হিসেবে ইরানি বিশ্লেষক আবুল ফজল জারফুকদানির প্রসঙ্গ এনেছেন। নলিনির ভাষায়, ‘জারফুকদানি লিখিত এক গ্রন্থের আলোকে কোনো মুসলমান দাবি করেন যে, ইউরোপীয়রা যাকে রোমান আইন বলে, তা আসলে ইসলামী আইন থেকেই ধার করা।’ জারফুকদানির বইটির আরবি ভাষ্য রয়েছে আবদুল জলীল সা’দ রচিত বিখ্যাত মুকাদ্দিমাতুল কাওয়ানিন গ্রন্থে। কায়রোর মাতবায়া কুর্দিস্তান থেকে এটি প্রকাশিত হয় ১৯১০ সালে।

ফরাসি স্কলার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ (১৯০৮-২০০২) দেখান, কিভাবে ইসলামী আইনে রোমান আইনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ ছিল না! কারণ মহানবী সা:-এর যুগে এবং ইসলামের সূচনাপর্বে প্রাচ্যে রোমান আইন প্রচলিতই ছিল না। ইসলামী আইনের সূচনা হয় সপ্তম শতকে। নবম শতকের শেষে তার বিন্যাস ও বিস্তার পরিপূর্ণতা লাভ করে।

আরও পড়তে পারেন-

যেসব রোমান এলাকা মুসলিমরা জয় করেন, সেখানে বিজয়ীদের প্রভাব ছিল সাধারণ বাস্তবতা এবং রোমান আইন সেখানে অনেক আগে থেকেই ছিল মৃত। এগুলো চর্চা করবে, এমন কোনো বিদ্যালয়ও ছিল না। জাস্টিনিয়ানের গোটা সাম্রাজ্যে ছিল তার প্রতিষ্ঠিত তিনটি সরকারি বিদ্যালয়। দু’টি রোম ও কন্সস্ট্যান্টিনোপোলে, অপরটি বৈরুতে। বৈরুতের সেই বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায় ৫৫১ সালের ১৬ জুলাই; মহানবী সা:-এর জন্মের ৩০ বছর আগে! ৫৬৫ সালে সম্রাট জাস্টিনিয়ানের মৃত্যুর পরে রোমান আইন আবদ্ধ হয়ে যায় গির্জার ভেতর। আইনগুলো লিখিত হয় প্রধানত ল্যাটিন ভাষায়। আরবদের কাছে ল্যাটিন ছিল অজানা ভাষা।

অপর দিকে রোমান প্রশাসনের বড় বড় কেন্দ্রের বাইরে এসব আইনের অস্তিত্ব অনুভবই করা যেত না। জাস্টিনিয়ানের পরে রোমান আইন ঘুমিয়ে পড়ে, সমাজ ও রাষ্ট্রে এর প্রয়োগ বলতে গেলে ছিলই না। ইউরোপে রেনেসাঁর আগে সেটি আর পুনরুজ্জীবিত হতে পারেনি। পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পথে সে মুসলিম আইনের নানা উপাদান গ্রহণ করবে, এটাই ছিল স্বাভাবিক। কারণ রেনেসাঁপূর্ব ইউরোপ মুসলিম দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র ইত্যাদি গ্রহণ করছে দেদার। প্রতিটি ক্ষেত্রে যে জাগরণ সেখানে এসেছে, তার প্রতিটি শাখায় নিবিড়ভাবে কাজ করেছে মুসলিম প্রভাব। কথাটি স্পষ্ট করেছেন রবার্ট ব্রিফল্টের (১৮৭৬-১৯৪৮) মতো ঐতিহাসিকরা। সেই প্রভাবের একটি ক্ষেত্র যে আইন, তা স্বীকার করেছেন ডেভিড সান্টিলানাও!

ড. সুবহি রজব মাহমাসানী (১৯০৯-১৯৮৬) লিখেন, ইউরোপ বিজয়ের পরে মুসলমান ব্যবসায়ীরা ইতালি ও বিশেষভাবে স্পেনের মাধ্যমে পাশ্চাত্যের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। ক্রুসেড যুদ্ধগুলোও পাশ্চাত্য আইনের ওপর মুসলমানদের প্রভাব বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। পাশ্চাত্য একসময় মুসলমানদের থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য ও ও শিল্পকলা গ্রহণ করত। ভোগ্যপণ্য ও শিল্পকলার পাশাপাশি পাশ্চাত্য ইসলামী আইন দর্শনের প্রভাবও গ্রহণ করেছে। সেই প্রভাবের সাক্ষ্য দেবে, ফ্রান্সের বাণিজ্য আইনে বহুল ব্যবহৃত আধষ (তৃতীয়পক্ষ প্রদত্ত বিশেষ জামানত)। শব্দটি আরবি হিওয়ালাহ (ঋণের দায় হস্তান্তর করা) থেকে উদ্ভূত।

ইসলামী আইনে হিওয়ালাহ বৈধ, রোমান আইনে অবৈধ। ইউরোপীয় আইনে হিওয়ালাহ চালু হয় মুসলিম প্রভাবেই। অনুরূপ অ্যাংলো-আমেরিকান আইনে যে ট্রাস্ট সিস্টেম, সেটা মুসলিম ওয়াকফ নীতির জাতক। ইসলামী প্রভাবের আগে অমুসলিম দুনিয়ায় এ আইনের কোনো ধারণাই ছিল না। ইউরোপীয় সামুদ্রিক বাণিজ্য আইনে ব্যবহৃত এভাইরাজ শব্দটি আরবি আইওয়ার থেকে গৃহীত। যার মানে, সামুদ্রিক বাণিজ্যজাহাজ কিংবা তাতে বহনকৃত পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি। এভাইরাজ একই অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইসলামী বাণিজ্য আইনে রয়েছে মুদারাবা বা কিরাজ। এতে এক পক্ষ ব্যবসার পুঁজি জোগান দেয়, অপর পক্ষ দেয় শ্রম। পরে লাভের অংশ উভয়েই নেয় নির্ধারিত হারে। লোকসান হলে পুঁজিদাতার পুঁজি যায়, শ্রমদাতার যায় শ্রম। ইউরোপে এই পদ্ধতির কোনো ধারণাই ছিল না।

আর্নেস্ট এল বোগার্ট (১৮৭০-১৯৫৮) লিখেন, মুসলিমদের থেকে এ পদ্ধতি ইউরোপে আসে। এমনকি, ফরাসি রাজা দশম লুই সুদ নিষিদ্ধ করে কিরাজ আইন প্রণয়ন করেন। দৃষ্টান্ত আরো দেয়া যায়। যা স্পষ্ট করবে, ইসলামী আইন ও পশ্চিমা আইনের নানা জায়গায় সাদৃশ্য রয়েছে। সান্টিলানা ফরাসি আইনের সাথে ইসলামের সাদৃশ্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন! অপর দিকে ইসলামী আইনের সাথে রোমান আইনের যে কোনো সাদৃশ্য খোঁজে বেড়িয়েছেন। এর ওপর ভর করে চেয়েছেন রোমান আইনের স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে।

ইসলামী আইনবিদ বোঝাতে ফকিহ শব্দটির ব্যবহার হয়। বহু প্রাচ্যবিদ দাবি করেন, রোমানদের লঁৎরবং শব্দ থেকে এটির উৎপত্তি। যা ব্যবহৃত হয় মননশীলতা, প্রাজ্ঞতা ও বিজ্ঞতা অর্থে। কিন্তু ফকিহ শব্দটি ইসলামী জ্ঞানে বিশেষ মাত্রায় বৈদগ্ধ ও সম্পন্ন মানুষকে বোঝায়, যা ব্যবহৃত হয়েছে স্বয়ং কুরআন মজিদে, যেখানে রোমান প্রভাবের কথা ভাবাই যায় না। শব্দটির সাথে রোমান শব্দের আদৌ সাদৃশ্য যেমন নেই, তেমনিভাবে মর্মেও উভয়ে আলাদা।

বিচারের ক্ষেত্রে যেহেতু হাদিসে আছে, যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করা বাদির দায়িত্ব আর বিবাদির দায়িত্ব হলো শপথ করা, অতএব ইসলামী আইনে এটি প্রতিষ্ঠিত বিধান। রোমান আইনে আছে Affirmanti incubmit onus orobandi নীতি, যা ইসলামী আইনের অনুরূপ। গাথেসকির দাবি হলো, ইসলামী নীতিটা রোমান আইন থেকে ধার করা হয়েছে। কিন্তু মাহমাসানী দেখান, এটি মূলত ইসলামপূর্ব আরবেরই এক প্রথা, হাদিসের মাধ্যমে যাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। রোমান প্রথার সাথে এর আদৌ সম্পর্ক ছিল না।

সাবালকত্ব বা প্রাপ্ত বয়স্কতার বয়স এবং বিনিময় ও ক্রয়-বিক্রয় বিষয়ক চুক্তির নিয়মের প্রশ্নে ইসলামী আইনের সাথে রোমান আইনের মিল দাবি করা হয়। কিন্তু এ মিল আসলে কষ্টকল্পিত। কেননা ফিকহের অধিকাংশ মাজহাবে বালেগ হওয়ার বয়স ১৫ বছর, সেখানে রোমান আইনে ছেলের বালেগ হওয়ার বয়স বারো বছর, মেয়ের ১৪ বছর! রোমান আইনে ক্রয়-বিক্রয় এমন এক চুক্তি, যাতে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্মতিই যথেষ্ট। তবে বিনিময় চুক্তিতে সম্মতিই যথেষ্ট নয়, বিনিময়কৃত পণ্য উপস্থাপনও জরুরি। কিন্তু ইসলামী ফিকহে ক্রয়-বিক্রয়ের মতো বিনিময়চুক্তিতেও পণ্য উপস্থাপন জরুরি নয়, পক্ষদ্বয়ের সম্মতিই যথেষ্ট।
উভয় আইনে মিলের এসব দিক নিতান্তই দুর্বল।

কিন্তু বৈপরিত্য রয়েছে বিস্তর। যেমন চুক্তি আইন, উত্তরাধিকার আইন, তালাক আইন, নারীদের ওসিয়ত, যৌতুক আইন, পোষ্যবিধি, মৃত্যুর আগে সম্পত্তিদান, স্তন্যপানের ভিত্তিতে বিয়ে-শাদিতে নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদিতে উভয় আইনের ব্যবধান স্পষ্ট ও ব্যাপক। রোমান আইন শব্দপূজারী, আক্ষরিক। যেখানে আরজি, শুনানি ইত্যাদিতে নির্ধারিত শব্দ তো বটেই, আকার-ইকারও বদলানো যাবে না! এ আইন কোনো নির্ভেজাল রোমান জিনিস নয়, বরং বিভিন্ন জাতির সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগের ফসল। এখানে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা পাদ্রি ও শাসকবর্গের। এতে বিয়ে ও দাসপ্রথাপ্রশ্নে এমন সব ন্যায়পরিপন্থী বিধান রয়েছে, যা ইসলামে কল্পনাও করা যায় না!

ফরাসি প্রাচ্যবিদ জর্জ হেনরি বোস্কট (১৯০০-১৯৭৮) এবং আমেরিকান লেখক ফ্রান্সিস স্কট ফিটজেরাল্ড (১৮৯০-১৯৪০) প্রশ্ন তুলেছেন, কোন কারণের ভিত্তিতে পশ্চিমা গবেষকদের একটি অংশ ইসলামী আইনের জননী বানাতে চায় রোমান আইনকে? তাদের প্রশ্ন, এর কারণ কি নিহিত পশ্চিমা শ্রেষ্ঠত্ববাদের ভেতর? যা সব ভালোকে নিজের আর সব খারাপকে ‘অপরের’ জন্য বরাদ্দ রাখতে চায়? আর বলাই বাহুল্য, পশ্চিমা শ্রেষ্ঠত্ববাদের প্রধান ‘অপর’ হচ্ছে ইসলাম!

– মূসা আল হাফিজ, কবি ও গবেষক।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।