Home অপরাধ ও আইন-আদালত কোটি কোটি টাকা নিয়ে চট্টগ্রামের আরো একজন ফ্যাক্টরি মালিক উধাও: বিপাকে তিন...

কোটি কোটি টাকা নিয়ে চট্টগ্রামের আরো একজন ফ্যাক্টরি মালিক উধাও: বিপাকে তিন ব্যাংক

পূর্বপুরুষের হাত ধরে পোষাক খাতের ব্যবসায় আসেন চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদীবাগ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ মোরশেদ। এক সময়ের চট্টগ্রামের নামকরা কাশ গার্মেন্টস, কাসন গার্মেন্টস, হেরাল্ড গার্মেন্টস ও সামরোজ গার্মেন্টস’র মালিক ছিল তার পরিবার। পরে যৌথ পরিবার থেকে আলাদা হয়ে ১৯৯৫ সালের দিকে বাবা ও ভাইকে সাথে নিয়ে সিএন্ডএ টেক্সটাইল নামে পোষাক কারখানা গড়ে তোলেন মোরশেদ। 

সিএনএ টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান ছিলেন মোরশেদের পিতা মো. সেকান্দার মিয়া। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন মোরশেদ নিজেই। তার ভাই মোহাম্মদ আরশাদ ছিলেন পরিচালক। 

সিএন্ডএ টেক্সটাইলের শুরুর দিকটা ভালোই ছিল। ব্যবসার সফলতায় এরমধ্যে ইফকো ও সামরোজ নামে দুটি গার্মেন্টস কিনে নেয়।

কিন্তু অভিযোগ রয়েছে- ব্যবসার সাথে সাথে ভোগ বিলাসে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এই ব্যবসায়ী। একে একে বিয়ে করেন তিনটি। ২০১৫ সালে তৃতীয় বিয়ের পর পারিবারিক কলহে জড়িয়ে ব্যবসা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন মোরশেদ। এরপর থেকে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। খারাপ হতে থাকে ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণও। 

ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়াতে ২০১৫ সালে সিএন্ডএ টেক্সটাইলকে পুঁজি বাজারে অর্ন্তর্ভুক্ত করে বাজার থেকে প্রায় ২৯৩ কোটি টাকা তুলে নেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংক ঋণ ও শেয়ার বাজার থেকে তুলে নেয়া এই অর্থ ব্যবসার পরিবর্তে ভোগ বিলাসের পেছনে খরচ হয়েছে বেশি। 

২০১৬ সালের শেষ দিকে মোরশেদের মালিকানাধীন তিনটি প্রতিষ্ঠানেই উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সরেজমিনে বুধবার কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়- সিএন্ডএ গ্রুপের সব কারখানা বন্ধ রয়েছে। গ্রুপটির কার্যালয়ের প্রধান ফটকে একজন লোক বসে থাকলেও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় কার্যালয়টির দেয়ালে উদ্ভিদ-লতা জন্মেছে। স্থানীয় লোকজন ও পাওনাদার শ্রমিকরা ইফকো গার্মেন্টস কারখানাটির যন্ত্রপাতি ও দরজা-জানালা খুলে নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন পার্শ্ববর্তী কারখানায় নিয়োজিত নিরাপত্তারক্ষীরা।

দীর্ঘদিন ঋণ শোধ না করার পরও তার বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারে নি পাওনাদার ব্যাংকগুলো। কারণ হিসেবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা জানিয়েছেন- তিনি দেশের নামকরা এক শিল্পগ্রুপের কর্ণধারের নিকটাত্মীয়। ফলে ২০১৮ সালের শুরুর দিকে সুযোগ বুঝে তৃতীয় স্ত্রীকে নিয়ে আমেরিকায় পালিয়ে যান এই ব্যবসায়ী। 

এই ব্যবসায়ীর কাছে বর্তমানে তিন ব্যাংকের ২৮০ কোটি টাকা পাওনা আটকে গেছে। এই পাওনার বেশিরভাগ ঋণ খেলাপি ও শ্রেণিকৃত। পাওনা আদায়ে এই পর্যন্ত দুটি ব্যাংক তার বিরুদ্ধে ১৪ টি মামলা দায়ের করেছে। এরমধ্যে ১২ চেকের মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।  

কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নেজাম উদ্দিন বলেন, আমাদের থানায় মোরশেদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে। তবে তিনি পলাতক। 

আরও পড়তে পারেন-

ব্যাংকগুলোর তথ্যমতে, মোরশেদের প্রতিষ্ঠান সিএন্ডএ টেক্সটাইল লিমিটেডের কাছে ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ১৩৯ কোটি টাকা, সামরোজ গার্মেন্টেস লিমিটেডের কাছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৭৯ কোটি টাকা এবং ইফকো গার্মেন্টেস লিমিটেডের কাছে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পাওনা ৬২ কোটি টাকা। 

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জুবলি রোড শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবু হেনা নাজিমউদ্দিন বলেন, ‘এই শাখার পুরোনো গ্রাহক সামরোজ গার্মেন্টস। প্রথম দিকে ব্যাংকের সাথে ভালো লেনদেন করলেও পরে ব্যাংক ঋণ শোধ করতে গড়িমসি করে। শুনেছি ইতোমধ্যে তিনি দেশের বাইরে চলে গেছেন। এর আগে বহুবার চেষ্টা করে ঋণের টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। ফলে আমরা মামলা করতে বাধ্য হয়েছি’। 

আল আরাফাহ ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আমিনুর রহমান বলেন, ‘ব্যাংক ঋণ নিয়ে পোষাক রপ্তানি করে মুনাফা করলেও ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। পোষাক রপ্তানি খাতে নেয়া ঋণের এই টাকা পরে ভোগ-বিলাসসহ ভিন্ন খাতে স্থানান্তর করেছে বলে মন্তব্য করেন এই ব্যাংক কর্মকর্তা। পাওনার বিপরীতে ব্যাংকটির কাছে প্রতিষ্ঠানটির কালুরঘাট শিল্প নগরীর ৪ টি শিল্প প্লটসহ কারখানাগুলোর যন্ত্রপাতি বন্ধক রয়েছে’। 

বিপাকে তিন ব্যাংক  

২০০৬-২০১৫ সালের মধ্যে কাঁচামাল রপ্তানি ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ঋণ সুবিধা নেয় সামরোজ গার্মেন্টস। প্রথম দিকে ভালো থাকলেও ২০১৫ সালের পর থেকে ঋণ পরিশোধে গড়িমসি শুরু করে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মোরশেদ। এরপর ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে প্রতিষ্ঠানটিকে ১৪ বার চিঠি দেয় ব্যাংকটির জুবলি রোড শাখা। কিন্তু তাতেও কর্ণপাত করেন নি প্রতিষ্ঠান মালিক। 

পরে ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ২০২০ সালের ১৩ সেপ্টম্বর প্রতিষ্ঠান কর্নধারের ৩ তলা ভবনসহ ১৭ দশমিক ৭৫ শতক বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে তুলে ব্যাংক। কিন্তু সম্পত্তিটি প্রতিষ্ঠান কর্ণধারের দখলে থাকা এবং কোনো ক্রেতা না পাওয়ায় বিক্রি সম্ভব হয় নি। এরপর গত ৮ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অর্থঋণ মামলা দায়ের করে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতে দায়ের করা মামলায় সামরোজ গার্মেন্টস’র কাছে পাওনা রয়েছে ৭৮ কোটি ৫৩ লাখ ৭২ হাজার ১১০ টাকা।

এর আগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দুটি এনআই অ্যাক্ট মামলাও দায়ের করে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। ২০১৮ সালের দায়ের করা মামলা দুটি বর্তমানে শুনানি পর্যায়ে রয়েছে।

কালুরঘাট শিল্প এলাকায় মোরশেদের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ইফকো গার্মেন্টস। প্রি-শিপমেন্ট ও ব্যাক টু ব্যাক এলসি হিসেবে ২০১০ সালে আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নেয় প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ব্যাংকটির আগ্রাবাদ শাখা থেকে নেয়া সেই ঋণ শোধ হয়নি গত ১১ বছরেও। সময়মতো ঋণ শোধ না করায় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারের বিরুদ্ধে ১১ টি মামলা দায়ের করেছে এই ব্যাংক। এরমধ্যে ২০১৭ সালের বিভিন্ন সময়ে এনআই অ্যাক্টে দায়ের করা হয় ১০ টি মামলা। একই সালের ১০ জানুয়ারি দায়ের করা হয় অর্থঋণ মামলা। অর্থঋণ মামলায় প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকের পাওনা ৬২ কোটি ৩৯ লাখ ৪৯ হাজার ৮৯৩ টাকা। 

২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখা থেকে ঋণ সুবিধা নেয় সিএন্ডএ টেক্সটাইল। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকটির পাওনা ১৩৯ কোটি টাকা। এরমধ্যে ১৩৪ কোটি টাকা ইতোমধ্যে বিএল (বেড এন্ড লস) শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। 

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ঋণের বিপরীতে সিএন্ডএ টেক্সটাইলের কালুরঘাট শিল্প নগরীর কারখানাগুলোর যন্ত্রপাতিসহ চারটি প্লট বন্ধক হিসেবে রয়েছে। তবে বিসিক থেকে বরাদ্দ নেয়া এসব প্লট ও যন্ত্রপাতি বিক্রি বা কাউকে হস্তান্তর করেও পাওনার এক তৃতীয়াংশ উদ্ধার হবে না’।  

অনিশ্চয়তায় শেয়ার হোল্ডাররা   

এদিকে সিএন্ডএ টেক্সটাইলের কর্ণধার আমেরিকায় পালিয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে শেয়ারে বাজারে থাকা প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডাররা। 

বাংলাদেশ স্টক এক্সেচেঞ্জের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয় সিএন্ডএ টেক্সটাইল। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটি ২৩ কোটি ৯৩ লাখ ১৬ হাজার শেয়ারের বিপরীতে পুজিঁবাজার থেকে প্রায় ২৯৩ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি হয়।  

প্রতিষ্ঠানটির মোট শেয়ারের মধ্যে বর্তমানে পরিচালকদের ২২ দশমিক ১৪ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ১৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ৬২ দশমিক ১৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ ২০১৬ সালে বিনিয়োগকারীদের ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ট দিয়েছিলো।  সূত্র- দ্য বিজনেস স্টান্ডার্ড।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।