Home প্রবন্ধ-নিবন্ধ পোপ খ্রীস্টান বিশ্বের শান্তির দূত; মুসলিমদের নয়

পোপ খ্রীস্টান বিশ্বের শান্তির দূত; মুসলিমদের নয়

0
Tarequl Islam
Tarequl Islam

।। তারেকুল ইসলাম ।।

পোপ ফ্রান্সিস আজ বাংলাদেশে এসেছেন। শান্তির দূত হয়ে। ওনার আগমনকে স্বাগত জানানোর সাথে সাথে আমার মনে প্রচণ্ড আফসোসও জাগে এ কারণে যে, সৌদি বাদশাহ কিংবা সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি তো একবারের জন্যও আসলেন না! কী দুর্ভাগ্য এ মুসলিম জাতির!!

পোপ শান্তির দূত হতেই পারেন। তার এই সফর মানবিক হতেই পারে। কিন্তু আমি আরো গভীরভাবে ভাবতে চাই।

পোপের আগমনের পূর্বে গণহত্যার শিকার নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের অবস্থা যেমন ছিল, তার প্রস্থানের পরও একই অবস্থা বজায় থাকবে। সুতরাং পোপের এই সফরের ফলে রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতির চিত্র একটুও যে বদলাবে না, তাতে কোনো সন্দেহ নাই। আর দেখেন, মায়ানমারে পোপ তার বক্তব্যে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি! (সেখানের খ্রীস্টানদের পরামর্শেই)। কেন করেননি? ভয়ের কারণে? না, মোটেও ভয়ের কারণে নয়। বরং মায়ানমারে অবস্থিত খ্রীস্টান সম্প্রদায় যাতে আবার সেনা-কর্তৃপক্ষ দ্বারা প্রতিশোধের শিকার না হয়, সেজন্যই তিনি সতর্কতার সাথে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি কিন্তু ঘুরেফিরে খ্রীস্টনদের স্বার্থটাই দেখলেন। খ্রীস্টানদের ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি করবে- এমন শান্তির বাণী তিনি দিবেনইবা কেন? আর আমরা মুসলমানরাও কেন বোকার মতো তার কাছ থেকে দরদ পেতে চাইবো? পোপ ইসলামের প্রশংসা করবেন- এরকম অতিউৎসাহী আশা কেন করবো আমরা? উনি মূলত এসেছেন বাইবেলের বাণী নিয়ে, এটা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। পোপের জায়গায় পোপ ঠিক আছেন, সমস্যা আমাদের মুসলমানদের মধ্যে। নেফাক, মুনাফেকি, দুর্বল ঈমান, নির্বুদ্ধিতা, অদূরদর্শিতা- এসব আমাদেরকে একদম পেয়ে বসেছে। নিজেরা আগে ঠিক হই, তারপর নাহয় পোপের কথা ভাবা যাবে।

বলতে বাধ্য হচ্ছি, পোপের বাণী গ্রহণ করে রোহিঙ্গারা যদি দলে দলে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে, তাহলে তাদের দুর্দশা লাঘবের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বৈষয়িক উন্নতিও হবে নিঃসন্দেহে। পোপ আদেশ দিলে খ্রিস্টান বিশ্ব অবশ্যই নও-খ্রীস্টান রোহিঙ্গাদের জন্য শান্তিতে থাকার ব্যবস্থা করতে ঝাঁপিয়ে পড়বে অবশ্যই।

কিন্তু আপনি যদি ‘পোপ ফ্রান্সিসকে এই বাংলার মাটিতে পা রাখতে দেওয়া হবে না’ বলে হুমকি বা হুঙ্কার দেন, তাহলে আপনার মতো গর্দভ দুনিয়ায় আর নাই। আপনার এই ধরনের হুমকি অযৌক্তিক। কারণ পোপ তো হুমকি দিয়ে কিংবা পেশিশক্তির জোর দেখিয়ে আসেননি। তিনি এসেছেন শান্তি ও যীশুর বাণী নিয়ে। সুতরাং, আপনাকেও তদ্রুপ শান্তি ও ইসলামের বাণী দিয়ে তার ধর্মান্তরকরণের মিশন ঠেকিয়ে দিতে হবে। পোপ শান্তি ও যীশুর বাণী ছড়িয়ে খ্রীস্টান ধর্মের দীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করবেন, আর এর বিপরীতে মুসলমান হিসেবে আপনার করণীয় হলো, ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দিয়ে নির্যাতিত মুসলমানদের ঈমান-আকিদা রক্ষা করা। এই রাজনীতি ও কূটনীতির যুগে ফাও হুমকি-ধমকির কোনো ভাত নাই।

আজকের খ্রীস্টান বিশ্ব আজকের মুসলিম বিশ্বের মতো ভীরু কাপুরুষ নয়। দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়। খ্রীস্টান বিশ্ব খ্রিস্টানদের স্বার্থ ঠিকই রক্ষা করে, বৌদ্ধ বিশ্ব (জাপান, চীন ও মায়ানমার) ঠিকই বৌদ্ধ জাতির স্বার্থ রক্ষা করে, হিন্দু সভ্যতা হিন্দু জাতির এবং ইহুদি সভ্যতা ইহুদি জাতির স্বার্থ রক্ষায় অবিচল। শুধু ব্যতিক্রম মুসলিম বিশ্ব। মুসলমানদের স্বার্থের ব্যাপারে আজকের মুসলিম বিশ্ব বেখবর, উদাসীন। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের চরম ব্যর্থতা দৃশ্যমান। ধিক শত ধিক! আর তাছাড়া, আধুনিক গণতান্ত্রিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ার তত্ত্ব আওড়িয়ে এই ধর্মভিত্তিক সভ্যতার দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের বাস্তবতাকে আড়াল করা যাবে না।

এটা সত্য যে, অত্যাচার ও নিপীড়নের সময়ই ঈমানের আসল পরীক্ষা বুঝা যায়। দুঃখ, দুর্দশা ও অত্যাচারিত সময়ে ঈমান ধরে রেখে ইসলামের ওপর অটল থাকার পরীক্ষা অনেক অ-নে-ক কঠিন। সাহাবী হযরত বেলাল (রা.)-এর কথা ভাবুন। তপ্ত রোদে মরুতাবার ওপর চিত করে ফেলে রেখে বেলাল (রা.)-কে বুকের ওপর ভারী পাথর চাপিয়ে দেওয়ার পরও তিনি ঈমান থেকে একচুলও নড়েননি। সবার পক্ষে সম্ভব না বেলাল রা.-এর মতো ধৈর্য ও ঈমানের পরীক্ষা দেওয়া। তাই, দুর্দশাগ্রস্ত রোহিঙ্গা মুসলমানদের ঈমান-আমান ও মুসলমানিত্ব রক্ষা করার দায়িত্ব মুসলিম বিশ্বের। ইসলাম হেফাজত করবেন কার জন্য? মুসলমানদের মানবিক অধিকারগুলো হেফাজত না করে ইসলামের হেফাজত কীভাবে সম্ভব? নির্যাতিত মুসলমানদের অধিকার হেফাজত করতে পারলে ইসলামের হেফাজত করাও সহজ হয়ে যাবে। বেঁচে থাকার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে মুসলমানের ঈমান-আমান ও ইসলাম আর কীভাবে হেফাজত করা যায় আমি জানি না।

তিনি মুসলমানদের শান্তির দূত হয়ে আসবেন—এমন সরল সাধাসিধা আশা করাটাও বোকামি। বরং যেসব নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমানকে বৈষয়িক শান্তির লোভ দেখিয়ে ঈমানহারা করে খ্রীস্টান বানানো যাবে, সেইসব ইসলামচ্যুত নও-খ্রীস্টান রোহিঙ্গাদের শান্তির দূত হয়েই তিনি এসেছেন। মুসলমানদের জন্য তিনি যদি সত্যিই শান্তি কামনা করেন, তাহলে তার স্বজাতি খ্রীস্টানরা যখন একজোট হয়ে ইরাক-আফগানিস্তান-লেবানন-সিরিয়ায় গণহারে বোমা ফেলে মুসলমানদের হত্যা করছে, তখন কেন তিনি তার স্বজাতিকে যুদ্ধ থেকে ফিরিয়ে শান্তির পথে আনেননি? একটাই কথা, তিনি খ্রীস্টান জগতেরই শান্তির দূত। খ্রীস্টান সভ্যতা ও খ্রীস্টান বিশ্বের স্বার্থ রক্ষা করাই তার নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। কিন্তু আবেগসর্বস্ব মুসলমানরাই শুধু সেটা বোঝে না। পোপের মুখ থেকে একটু ইসলামের প্রশংসা কামনা করার মধ্যেই যেন তাদের ঈমানি দায়-দায়িত্ব শেষ!! এই ধরনের কিছু বেকুব মুসলমানের জন্য এক বদনা করুণা ছাড়া আর কীইবা থাকতে পারে!?

-তারেকুল ইসলাম, তরুণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক ও পত্রপত্রিকার কলাম লেখক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.