Home ফিকহ ও মাসায়েল মহিলাদের ইতিকাফের ফযীলত ও মাসায়েল

মহিলাদের ইতিকাফের ফযীলত ও মাসায়েল

- মুফতি জসিমুদ্দীন।

।। মুফতি জসিমুদ্দীন ।।

হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- ‘হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু পর্যন্ত রমযানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পর উম্মাহাতুল মুমিনীন ইতিকাফ করেছেন।’ (সহীহ বুখারী, বাবুল ইতিকাফ ফিল আশারিল আওয়াখির; সহীহ মুসলিম, বাবু ইতিকাফিল আশারিল আওয়াখির মিন রমযান)।

উল্লিখিত হাদীস থেকে জানা গেলো যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকালের পর তার বিবিগণ ইতিকাফ করতেন। তাই ইতিকাফ করা পুরুষদের জন্য যেমন নেকীর কাজ, তেমনি মহিলাদের জন্যেও পুণ্যের কাজ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলেও সত্য, মহিলারা অবহেলা করে কিংবা ইতিকাফ সংক্রান্ত মাসআলা না জানার কারণে তারা ইতিকাফের ফযীলত থেকে অধিকাংশই বঞ্চিত। তাই মহিলাদের ইতিকাফ সংক্রান্ত কিছু জরুরী মাসআলা নিচে উল্লেখ করা হলো।

মাসআলাঃ মেয়েরা নিজ ঘরে যে স্থানকে নামাযের জন্যে নির্ধারণ করেছে সেখানেই ইতিকাফ করবে। (হিদায়া- ১/২১০)।

মাসআলাঃ মেয়েদের জন্য ঘরের কোন স্থান নামাযের জন্য নির্ধারিত না থাকলে ঘরের যে কোনো এক রুম বা স্থানকে ইতিকাফের জন্য নির্দিষ্ট করে নেবে। (হিদায়া- ১/২১০)।

মাসআলাঃ মসজিদে সুব্যবস্থা থাকলে মহিলাদের জন্যে মসজিদে ইতিকাফ করা জায়েয আছে। কিন্তু মসজিদের তুলনায় নিজ ঘরে ইতিকাফ করা মহিলাদের জন্য অতি উত্তম। বর্তমান যুগে মসজিদে মহিলাদের ইতিকাফ করা মাকরুহ। আর বেপর্দা হওয়ার আশংকা থাকলে তা হারাম হবে। (ফাতাওয়া আলমগীরী- ১/২৭৪, মাকতাবায়ে ইত্তিহাদ, দেওবন্দ)।

মাসআলাঃ ইতিকাফ করার জন্যে মহিলাদের হায়েয-নিফাস থেকে পবিত্র হওয়া এবং তাই ভিন্নভাবে রোযা রাখা শর্ত করা হয়নি। তবে যদি মান্নতের ইতিকাফ হয়, তাহলে রোযা রাখা শর্ত। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/২৭৪, মাকতাবায়ে ইত্তিহাদ, দেওবন্দ)।

মাসআলাঃ মহিলাদের ইতকাফের জন্যে স্বামীর অনুমতি নেয়া জরুরী। স্বামী একবার অনুমতি দিয়ে তা আর রদ করতে পারে না। ((ফাতাওয়া আলমগীরী- ১/২৭৫, মাকতাবায়ে ইত্তিহাদ, দেওবন্দ)।

মাসআলাঃ যে মহিলার স্বামী নেই তার জন্যে নিজ অভিভাবকের পরামর্শ ও অনুমতি নিয়ে ইতকাফ করা উত্তম। (জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া- ১/৪১) ।

মাসআলাঃ যে মহিলার স্বামী অসুস্থ এবং তার সেবা করা প্রয়োজন, তার জন্যে ইতকাফ করার চেয়ে স্বামীর সেবা করা উত্তম। এতে তার জন্যে ইতিকাফের তুলনায় অধিক সাওয়াব লেখা হবে। (জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া- ১/৪৯)।

মাসআলাঃ যে মহিলার স্বামী এবং কোনো অভিভাবক নেই তার জন্যে ইতিকাফ করার ক্ষেত্রে কারো অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন নেই। (জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া- ১/৪১)।

মাসআলাঃ যে মহিলার ছোট ছোট ছেলে সন্তান রয়েছে এবং তাদের লালন-পালন দেখা-শোনা করার জন্য অন্য কোন লোক নেই, সে মহিলার ইতিকাফ না করে ছেলে-সন্তানের লালন-পালন ও দেখা-শোনা করা উচিত। যেন এ ইতিকাফের কারণে ছেলে-সন্তানের লালন-পালনের কোন ত্রুটি না আসে। (জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া- ১/৪২)।

মাসাআলাঃ যদি কোনো মহিলা স্বামী বা অভিভাবকে অনুমতি নিয়ে ইতকাফে বসে, পরে কোনা প্রকার ওযর ছাড়াই তাদের আদেশে ইতিকাফ ছেড়ে দিলে সে গুনাহগার হবে। আর কোনো শরয়ী ওযরের কারণে হলে সে গুনাহগার হবে না। (জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া- ১/৪২)।

মাসআলাঃ রমযানের শেষ দশ দিনের সুন্নাত ইতিকাফে বসার আগে কোনো মহিলার হায়েয বা নেফাস আসার আশঙ্কা থাকলে, তার জন্যে সুন্নাত ইতিকাফের নিয়ত না করে, হায়েয বা নেফাস আসার আগ পর্যন্ত নফল ইতকাফের নিয়তে ইতিকাফে বসা উচিত। (আহকামে ইতকাফ- ৫৩)।

মাসআলাঃ কোনো মহিলার ইতিকাফ অবস্থায় হায়েয বা নেফাস শুরু হলে সে তা আরম্ভ হওয়ার সাথে সাথেই ইতিকাফ ছেড়ে দেবে। পরে ওই দিনের কাযা আদায় করে নেবে।

কাযা আদায়ের পদ্ধতিঃ হায়েয-নেফাস থেকে পবিত্র হওয়ার পরও রমযান মাস বাকি থাকলে, সে ওই সময তার কাযা আদায় করতে পারবে। রমযানের রোযাই তার জন্যে যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। আর রমযান মাস না হলে তার জন্যে রোযা রাখা আবশ্যক। (আহসানুল ফাতাওয়া- ৪/১২; আহকামে রমযান- ৬৩)।

মাসআলাঃ যে মহিলার যুবতী মেয়ে আছে এবং তাকে দেখা-শোনার কেউ নেই, এ অবস্থায় তার জন্যে যুবতী মেয়ের দেখা-শোনা করা উত্তম ইতিকাফের চেয়ে। কেননা ইতিকাফে বসার কারণে তার দেখা-শোনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে, যা শরীয়তে কাম্য নয়। (জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া: ১/৪২)।

মাসআলাঃ ইতিকাফ অবস্থায় মহিলার জন্যে স্বামীর সাথে শয়ন করা এবং সহবাস করা নাজায়েয। (হিদায়া- ১/২৩০)।

মাসআলাঃ পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, চাচা, মামা বা অন্য কোনো মুহাররামাতের কেউ কিংবা মহিলারা তার সাথে সাক্ষাত করতে এলে নির্ধারিত জায়গায় থেকে তাদের সাথে সাক্ষাত করতে পারবে। (ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ৩/১৭৬)।

মাসআলাঃ কোনো মহিলা রাতে একাকী থাকতে ভয় পেলে তার সাথে অন্যদের থাকা বৈধ। ঘর বড় হোক বা ছেট। তবে শর্ত হলো, সে যেন তার নির্দিষ্ট স্থান থেকে বের হয়ে না যায়।

যে সব কাজে মহিলাদের ইতিকাফ ভঙ্গ হয় না

ক. খানা আনার কেউ না থাকলে রান্না ঘর থেকে খানা আনা। (আহসানুর ফাতাওয়া- ৪/৫০৭)।

খ. কোনো ওযরের কারণে নির্দিষ্ট স্থান ত্যাগ করা। যেমন নির্ধারিত স্থানে বৃষ্টি পড়রে বা সব সময় কোনো কারণে ভয় পেলে তার জন্যে ঘরের অন্য কোনো স্থান নির্বাচন করে সেখানে চলে যাওয়া। (ফাতাওয়া আলমগীরী- ১/২৭৪, মাকতাবায়ে ইত্তিহাদ, দেওবন্দ)।

গ. নিজ পরিবার-পরিজনের নিকট মাথা পরিস্কার করার জন্যে নির্দিষ্ট স্থান থেকে বাইরে বের করে দেয়া। (সহীহ বুখারী, বাবুল হায়েয তুরাজ্জিলুল মুতাকিফা)।

আরও পড়তে পারেন-

ঘ. বাথরুমে আসা-যাওয়ার পথে এদিক সেদিক দেখা এবং না দাঁড়িয়ে গমনা-গমনের পথে কারো সাথে কথা বলা। (মিরকাত- ৪/৩৩০; আহসানুল ফাতাওয়া- ৪/৫১০)।

ঙ. সহবাসের আনুষাঙ্গিক কাজ, যেমন- স্বামীকে চুমো দেওয়া, আলিঙ্গন করা ইত্যাদি ইতিকাফ অবস্থায় নাজায়েয। তবে এর কারণে বীর্যপাত না হলে ইতিকাফ ভাঙ্গবে না। অব্শ্য কেবল চিন্তা-ভাবনার কারণে বীর্যপাত হলে ইতিকাফ ফাসেদ বা বাতিল হবে না। (হিদায়া- ১/২৩০)।

চ. মহিলাদের জন্যে তাদের নির্ধারিত স্থানে বসে ঘরের কাজ যেমন সেলাই করা, হলুদ-মরিচ পিষা, তরকারী কাটা ইত্যাদি আঞ্জাম দেয়া বৈধ। অনুরূপভাবে নির্ধারিত স্থানে বসে কাউকে কোনো কাজের আদেশ দেয়াও জায়েয। তবে স্থান ত্যাগ করতে পারবে না। (আহকামে ইত্তকাফ- ৬৪)।

যে সব কারণে মহিলাদের ইতিকাফ ভেঙ্গে যায়

১. অযুর পূর্বে বা পরে অনিচ্ছায় অযুখানায় বা গোসলখানায় বসে সাবান দিয়ে হাত মুখ পরিস্কার করলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে। (আহসানুল ফাতাওয়া- ৪/৫১৮)।

২. অযুর পর অযুখানায় বা বাথরুমে দাঁড়িয়ে রুমাল কিংবা অন্য কিছু দিয়ে অযুর পানি মুছলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে। (আহসানুল ফাতাওয়া- ৪/৫১৮)।

৩. নির্ধারিত স্থান ত্যাগ করে ঘরের বাইরে বা ঘরের অন্য কোনো স্থানে কোনো বস্তু আনা-নেয়ার জন্যে বা কাউকে কিছু দেয়ার জন্যে গেলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে। (রদ্দুল মুহতার: বাবুল ইতিকাফ- ২/১৮২)।

৪. নির্দিষ্ট স্থান ছেড়ে কারো সাথে সাক্ষাত করতে যাওয়া কিংবা মেহমানদারী করার জন্যে বের হলে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।

৫. স্বাভাবিক প্রয়োজন যেমন বাথরুম করার জন্যে বাইরে যাওয়া বা পানাহার বস্তু আনার কেউ না থাকলে তা আনার জন্যে নির্দিষ্ট স্থান ত্যাগ করা বৈধ। এছাড়া অন্য কোনো কারণে সামান্য সময়ের জন্যে বের হলে ইমাম আযম আবু হানীফা রাহ. এর মত অনুসারে তার ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।

৬. ইচ্ছাকৃত বা ভুলক্রমে স্বামীর সাথে সহবাস করা। ইতিকাফের কথা ভুলে যেয়ে নির্দিষ্ট স্থানে করুক বা তার বাইরে করুক সর্বাবস্থায় ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে। (হিদায়া- ১/২৩৯)।

– মুফতি জসীমুদ্দীন, মুফতি, মুহাদ্দিস ও মুফাসসির, আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

উম্মাহ২৪ডটকম: এমএ

উম্মাহ পড়তে ক্লিক করুন-
https://www.ummah24.com

দেশি-বিদেশি খবরসহ ইসলামী ভাবধারার গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে ‘উম্মাহ’র ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।