Home নির্বাচিত সংবাদ ভারতের ভণ্ডগুরুদের দাপটের নেপথ্যে

ভারতের ভণ্ডগুরুদের দাপটের নেপথ্যে

0
রাম-রহীম সিং
রাম-রহীম সিং -ফাইল ছবি।
মালবী গুপ্ত
লেখক- মালবী গুপ্ত, কলকাতা।

কেউ নিজেকে বলছেন ‘মেসেঞ্জার অফ গড’ বা ‘ঈশ্বরের দূত’। কেউ সরাসরি নিজেকেই ‘ভগবান’ বলে দাবি করছেন। তাঁদের কারো বয়স ৪০, তো কারো ৭৫। তবে ভগবানই হন কিম্বা ঈশ্বরের দূত, দেখা যাচ্ছে তাঁদের অনেকেরই পথ শেষ পর্যন্ত এসে মিলে যাচ্ছে ওই ধর্ষণ, অপহরণ, খুন ইত্যাদির মতো ঘটনায়। সেই সঙ্গে তাঁদের, জমি জবর দখল করা, ‘নারী পাচার,’ ‘শিশু পাচার’, ‘সেক্স র‌্যাকেট’ চালানোর খবরও প্রকাশিত হচ্ছে।

হায়, তাঁরা এই সমস্ত কু-কর্মই করে চলেছেন ‘ঈশ্বরের দূত’ হয়ে? যদিও ধর্ষণের অভিযোগ উঠলেই, ডেরা সচ্চা সৌদা’র প্রধান ‘গুরমিত রাম-রহিম সিং’ বা রাজস্থানের ‘ফলাহারী বাবা’র মতো অনেক ‘ধর্মগুরু’ই তৎক্ষণাৎ নিজেদের ইম্পোটেন্ট বা ‘যৌন ক্ষমতাহীন’ বলে দাবি করে বসছেন। তবে ওই দাবি তেমন ধোপে টিকছে না। কারণ দুটি ধর্ষণের দায়ে ইতিমধ্যেই রাম-রহিমের ২০ বছরের হাজতবাসের সাজা হয়েছে। আপাতত তিনি জেলের ঘানি টানছেন।

অবশ্য তাতে কি? লজ্জা-ঘৃণা-ভয় কোনটাই যে এইসব ‘সাধু বাবা’ বা ‘ধর্মগুরু’দের তেমন থাকে না, পদে পদে তার প্রমাণ তাঁরা নিজেরাই দিয়ে যাচ্ছেন। এখন দেখছি, এই আধুনিক ‘গডম্যান’দের নামের সঙ্গে ‘রকস্টার বাবা’, ‘ডিস্কো বাবা’র মতো বিশেষণও যোগ হচ্ছে।

কিন্তু সাধু বা ধর্মগুরুর মুখোশের আড়ালে এই অ-সাধুরা যে হারে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন, তাতে সত্যিকারের সাধু সন্ন্যাসীদের বুঝি লজ্জা ও বিড়ম্বনার শেষ নেই। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ভারতে এইসব স্বঘোষিত ‘গডম্যান’দের পৃষ্ঠপোষকের তো অভাব নেই। এবং সেই পৃষ্ঠপোষকের তালিকায় রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, আমলা, অভিনেতা-অভিনেত্রী, খেলোয়াড়, ব্যবসায়ী – কে নেই?

এবং প্রভাবশালীদের সঙ্গে এই ‘বিশেষ যোগাযোগ’ প্রচারধন্য ‘বাবা’রা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধিতে কাজে লাগাতে এতটুকুও যে কসুর করেন না তা বলাই বাহুল্য। তা না হলে এইসব ‘ভণ্ড ধর্মগুরু’রা অল্প সময়ে এমন বৃহৎ ‘ধর্মীয় সাম্রাজ্য’ গড়ে তোলেন কি করে?

দেখে শুনে আমার তাই মনে হচ্ছে, আমাদের দেশে কেউ খুব সহজে বিপুল বৈভবের মালিক হতে চাইলে, দেশের তাবৎ আইন কানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নানা অন্যায় অপরাধমূলক কাজ করে যেতে চাইলে এবং আপাদ মস্তক স্বেচ্ছাচারীর জীবন কাটাতে চাইলে, ওই ‘সাধু বাবা’ র পোশাকটি গায়ে চড়িয়ে নিতে পারলেই একেবারে কেল্লা ফতে। এবং গুরমিত রাম-রহিম সিংয়ের এতদিন নানা ‘সমাজ সেবামূলক কাজ’-এর আড়ালে চলতে থাকা যাবতীয় অপকর্মের স্বরূপ যতই উদ্ঘাটিত হচ্ছে, আমার ওই ধারণা ততোই দৃঢ়মূল হচ্ছে।

জানা গেছে হরিয়ানার সিরসায় তাঁর ডেরায়, বিপুল অস্ত্রশস্ত্র (যার শতকরা ৬০ ভাগই লাইসেন্সহীন), আরডিএক্সের মতো বিস্ফোরক, ‘নিজস্ব মুদ্রা’ যেমন মিলেছে, তেমনি বেশ কিছু শিশুও উদ্ধার হয়েছে সেখান থেকে। জোর করে খোজা করে দেওয়া হয়েছে কয়েক’শ পুরুষকে।

প্রত্যক্ষদর্শীর কথায় জানা গেছে সেখানে কীভাবে ডেরা প্রধান গুরমিতের যৌন অত্যাচারের নিত্য শিকার হত কিশোরীরা, বন্দি ‘সিদ্ধা’রা। সেখানকার এক প্রাক্তন কর্তা সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, ডেরা চত্বরে এক ‘গণকবরে প্রায় ৬০০ কঙ্কাল’ থাকার কথাও। কাদের কঙ্কাল সেগুলি?

ভাবতে আশ্চর্য লাগে, একটা রাজ্যে ‘বাবা রাম-রহিমের এমন ভয়ঙ্কর অত্যাচার, এমন হিংস্র পীড়ন, এমন বীভৎস বিকৃত সম্ভোগ বছরের পর বছর ধরে চলল কীভাবে? আসলে এমন দুর্বিনেয় দুর্বৃত্তের মাথার ওপর কত যে আশীর্বাদ ধন্য হাত ছিল সেটাই বোধহয় এখন তদন্ত হওয়ার বিষয়। তবে একা গুরমিত নয়, জালিয়াতি, ধর্ষণ, অবৈধ যৌন ব্যবসা, অপহরণ, শিশুদের যৌন নির্যাতন, খুন, খুনের চেষ্টার অভিযোগে বহু ‘আধ্যাত্মিক গুরু’রই গ্রেপ্তার হওয়া বা হাজতবাস এখন আর কোনো নতুন ঘটনা নয়।

মনে পড়ছে ৭৬ বছর বয়েসি একাধিক খুন ও ধর্ষণে অভিযুক্ত, জেলবন্দি ‘বিখ্যাত গডম্যান আসারাম বাপু’র কথা। আর আসারামের ছেলে ‘নারায়ণ সাঁই’ এবং ‘সন্ত রামপাল’, ‘ইচ্ছাধারী ভীমানন্দ মহারাজ’, ‘স্বামী নিত্যানন্দ’, ইত্যাদি তথাকথিত সব ‘ধর্মগুরু’ও তো দেখছি ওই একই পথের পথিক।

সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ পুলিশ গত ৮ মাস ধরে একটি মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে ‘বাবা সিয়া রাম দাস’ নামে আরও এক ‘গডম্যান’কে গ্রেপ্তার করেছে। যিনি বিপুল সম্পত্তির মালিক, বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত এবং স্থানীয় রাজনীতিকদের ওপরও তাঁর নাকি যারপরনাই প্রভাব রয়েছে।

বস্তুত সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জনের জন্য বিশিষ্ট মানুষদের সঙ্গে তাঁদের দহরম মহরমের ছবিটি তুলে ধরা এই ‘স্বঘোষিত গডম্যান’দের কাছে অত্যন্ত জরুরি। এই ব্যাপারে তাঁদের উদ্যোগ ও তৎপরতারও অভাব থাকে না। আর একবার সাধারণের বিশ্বাস অর্জন করতে পারলেই ওই ‘বাবা’দের যাবতীয় অনৈতিক, যাবতীয় কুকর্ম সাধনের দিগন্ত খুলে যায়।

অপরদিকে বিশেষত রাজনৈতিক নেতাদের দৃষ্টি থাকে ওই ‘ধর্মগুরু’দের বিপুল ভক্তকুলের ওপর। কারণ ভোটযুদ্ধে ওই গুরুর হাত ধরে কোনও ভাবে তাদের সমর্থন একবার আদায় করতে পারলে ওই নেতার ভাগ্যাকাশে সূর্যোদয় কে ঠেকায়? তাই হয়তো তাঁদের এবং সমাজের নানা ‘সেলেব্রিটি’দের নাম, যোগাযোগ, জড়িয়ে যায় এইসব ‘ভণ্ড সাধু’দের সঙ্গে।

তবে আমার জানতে ইচ্ছা করে সত্যি কি সমাজের ওইসব বিশিষ্টদের অনেকের কাছেই এইসব ‘গডম্যান’দের স্বরূপ অপ্রকাশিত থেকে যায়? সত্যি কি অন্ধ বিশ্বাস ও ভক্তিরসে আপ্লুত, প্রশ্নহীন তাঁরা ওই ‘বাবা’ বা ‘ধর্মগুরু’দের দর্শনে নিজেদের ধন্য মনে করেন? নাকি ওই ‘বাবা’দের নানা কর্মকাণ্ডকে তাঁদের যাদু বাস্তবতা বলে ভ্রম হয়? কিন্তু ওই তথাকথিত গুরুদের মুখোশ যখন খুলে খুলে পড়ে, তখনও তাঁদের টু শব্দটি কেন শোনা যায় না? যেন তাঁরা কখনও ওই ‘গডম্যান’দের নামই শোনেন নি। যেন তাঁদের চেনেনই না।

আসলে দেশ বিদেশে প্রসারিত এইসব ‘বাবা’দের দীর্ঘ হাত সমাজের প্রভাবশালীদের কার কখন কোন কাজে লাগে, বলা মুশকিল। তাই তাঁদের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ সহায়তাকারীরা চোখ বুজেই থাকেন। কিন্তু কারো চোখ যদি খুলেই যায়, তাঁরা কি ওই ‘ঈশ্বরের দূত’দের চিরকালের মতো ‘গুড বাই’ জানাতে পারেন? নাকি সুবিধে মতো আবার চোখ বুজে ফেলেন?

– মালবী গুপ্ত সাংবাদিক, কলকাতা

সূত্র- বিবিসি বাংলা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.